বেশিরভাগ আমেরিকানই তাদের দেশের চীনা নীতির ব্যাপারে সচেতন না। ছবি: সংগৃহীত

চীন সম্পর্কে কথা বলা দরকার যুক্তরাষ্ট্রের

গত দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের দ্রুত অবনতিতে প্রাথমিকভাবে ভূ-রাজনীতি বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। আর ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধও এই আলোকেই বিবেচনা করা যায়।

রুহুল আমিন
জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ২২ জুলাই ২০১৯, ২২:৩৫ আপডেট: ২২ জুলাই ২০১৯, ২২:৩৯
প্রকাশিত: ২২ জুলাই ২০১৯, ২২:৩৫ আপডেট: ২২ জুলাই ২০১৯, ২২:৩৯


বেশিরভাগ আমেরিকানই তাদের দেশের চীনা নীতির ব্যাপারে সচেতন না। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন পররাষ্ট্র নীতিতে যেসব পরিবর্তন এনেছে তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো, চীনের প্রতি বৈরিতাপূর্ণ মনোভাব। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা নীতির বাইরে গিয়ে নেওয়া ট্রাম্পের এ নীতির কারণে বিশ্বের বড় দুই অর্থনীতির দেশের মধ্যে কেবল ঠাণ্ডা লড়াই-ই চলছে না, এটি দক্ষিণ চীন সাগর ও তাইওয়ান প্রণালীতে সশস্ত্র সংঘাতেরও আশঙ্কা বৃদ্ধি করেছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রথম এক বছরের শাসনামলেই চীনকে কৌশলগত ‘প্রতিযোগী’ ও ‘প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। শুধু ট্রাম্পের জন্য নয়, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা এবং কংগ্রেসের নেতৃত্বস্থানীয় সদস্য, এমনকি কিছু ডেমোক্রেটদের জন্যও চীন যেন গুরুতর দীর্ঘমেয়াদী এক হুমকির প্রতিনিধিত্ব করছে। যা আমেরিকার বিশ্বের অভিভাবকত্ব ও গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থের জন্যও হুমকি।

গত দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের দ্রুত অবনতিতে প্রাথমিকভাবে ভূ-রাজনীতি বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। আর ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধও এই আলোকেই বিবেচনা করা যায়। চীনের দীর্ঘ মেয়াদী অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকে চেপে ধরার লক্ষ্যেই সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক আরোপ করে। আর এই চেপে ধরা চীনকে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দুর্বল করেছে।

ট্রাম্পের এই উদ্যোগের ব্যাপারে একটি বিষয় পরিষ্কার করা উচিত যে, অর্থনীতির ক্ষেত্রে তার এই যুক্তি কি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা, ইনটেলেকচুয়াল প্রপার্টি এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে যে ভারসাম্যহীনতা তা দূর করবে? গত চার দশক ধরে যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক দাঁড়িয়েছিল তা শুল্ক আরোপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। প্রকৃত অর্থেই যুক্তরাষ্ট্রের চীনা নীতি সম্পূর্ণরূপে আগ্রাসী বা বৈরিতাপূর্ণ।

আর পররাষ্ট্র নীতির এই পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে অভিজ্ঞ কয়েকজন চীনা স্কলার এবং সাবেক নীতি-নির্ধারকদের ভাবিয়েছে। তারা ট্রাম্প প্রশাসনকে উদ্দেশ্য করে একটি খোলা চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে স্বাক্ষরকারী অন্তত ১০০ জনের মধ্যে রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটও রয়েছে। এমনকি চীনের নীতি ও আচরণকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করতেন এমনও কয়েকজন আছেন। চিঠিতে তারা চীনকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা না করতে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকে চীনের ব্যাপারে একমত বলেই মনে হয়। এটা নিশ্চিতও যে যুক্তরাষ্ট্রজুড়েই চীন বিদ্বেষী একটা প্রবণতা বিদ্যমান। গত আগস্টে চালানো পেউ রিসার্চ সেন্টারের এক সমীক্ষা অনুসারে এমনটাই মনে হয়েছে। ওই সমীক্ষায় দেখা গেছে, মাত্র ৩৮ শতাংশ আমেরিকান চীনকে ভালো চোখে দেখেন। আর ৪৭ শতাংশ আমেরিকানই তার উল্টোটা মনে করেন। তবে মাত্র ২৯ শতাংশ উত্তরদাতা কেবল মনে করেন চীনের সেনাবাহিনী উদ্বেগের কারণ হতে পারে। কিন্তু ৫৮ শতাংশ উত্তরদাতা চীনের অর্থনৈতিক ক্ষমতার বিষয়ে উদ্বিগ্ন। আর এ থেকেই বোঝা যায়, বেশিরভাগ আমেরিকানের চোখে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের প্রাথমিক উদ্দেশ্য হওয়া উচিত তাদের জীবিকা রক্ষার, ভূ-রাজনৈতিক সংঘর্ষের উদ্দেশ্যে নয়।

তবুও ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশলই যেন ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। যা আমেরিকানদের জীবিকার ওপর চাপ তৈরি করবে। আর এই যে জনগণের সঙ্গে সরকারের চিন্তার কোনো যোগসূত্র নেই তাতেই বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের চীনা নীতির পরিবর্তন হয়েছে জনগণের মতের তোয়াক্কা না করে এবং এর জন্য দেশটিতে কোনো উন্মুক্ত বিতর্কও হয়নি।

ওইরকম একটি বিতর্ক দেশটিতে জরুরি প্রয়োজন। যদিও এই বাণিজ্য যুদ্ধ প্রতিনিয়তই সংবাদের শিরোনাম হচ্ছে তারপরও বেশিরভাগ আমেরিকানই তাদের দেশের চীনা নীতির ব্যাপারে সচেতন না। আর যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি দেশের সঙ্গে বৈরিতার নীতি অবলম্বন করেছে যারা খুব শিগগিরই বিশ্বের সর্ববৃহৎ অর্থনীতির দেশ হবে এবং বিশ্বের শীর্ষ ক্ষমতাধর হয়ে উঠছে।

গণতান্ত্রিক একটি সরকার সচেতন নাগরকিদের রাজনৈতিক সমর্থন ছাড়া কখনোই একটি শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে দীর্ঘ সময় প্রতিযোগিতা করে টিকতে পারে না। এই ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের তরুণদের দিকে নজর দেওয়া দরকার, (পিউয়ের সমীক্ষা অনুযায়ী বৃদ্ধদের চেয়ে তরুণরা চীনের প্রতি বেশি ইতিবাচক) কারণ তাদেরই চীন-যুক্তরাষ্ট্রের এ ঠাণ্ডা লড়াইয়ের খরচ বহন করতে হবে।

এই রকম একটি বিতর্ক বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে যে, ট্রাম্প প্রশাসনকে চীনা নীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্পর্কে উত্তর দিতে হবে। প্রথম ও প্রধান প্রশ্ন হবে, এই নীতির প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? সম্ভাব্য উত্তরের মধ্যে চীনের কিছু আচরণ ও নীতির পরিবর্তন, চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা রোধ ও সরকার পরিবর্তনের বিষয়টি হয়তো অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

এরপর ট্রাম্প প্রশাসনকে ব্যাখ্যা করতে হবে তারা কীভাবে তাদের এই উদ্দেশ্য হাসিল করবে বা লক্ষ্যে পৌঁছাবে। ট্রাম্পের দুনিয়ায় চীনের ‘অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা’ কি কোনো কার্যকরী বা যুক্তিযুক্ত কৌশল হবে? সাম্প্রতিক লেখা ওই খোলা চিঠিতে লেখকরা যুক্তি দেখিয়েছেন, বিশ্ব অর্থনীতি থেকে চীনকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগ দেশটির বিশ্বব্যাপী যে ভূমিকা ও সুনাম আছে তা ‘নষ্ট করে দিবে’ এবং বিশ্বের সব দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগ কি বিশ্বের অন্য দেশগুলো, এমনকি তাদের পুরানো যেসব মিত্র দেশ আছে তাদের সমর্থন আদায়ে সচেষ্ট হবে?  যুক্তরাষ্ট্র কি এককভাবে এটি করবে (করতে সক্ষম)?

যে নীতিই গ্রহণ করুক না কেন ট্রাম্প প্রশাসনকে অবশ্যই তার গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে। গত অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স এক জ্বালাময়ী বক্তৃতায় চীনের সঙ্গে ‘ঠাণ্ডা লড়াই’ ঘোষণা করেন। বক্তৃতায় তিনি বরাবরের মতোই যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ ও  নিজ (চীনে) দেশের জনগণের ওপর নিপীড়নের অভিযোগ করেন। চীনের প্রতি আমেরিকার মনোভাব এবং মাইক পেন্স ও ট্রাম্প প্রশাসনের অন্য সবার কর্মকাণ্ডে কি চীন যে তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি এটা প্রমাণ করে না?

চূড়ান্ত প্রশ্নটি হবে বহুপাক্ষিক সহযোগিতার বিষয়ে। কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়, বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন, পরমাণুর বিস্তার, এইগুলো হলো প্রকৃত অস্তিত্বগত হুমকি। এইসব মোকাবিলায় বিশ্বের দেশগুলোকে যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ করা দরকার। এইসবের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না করে কি যুক্তরাষ্ট্র চীনের প্রতি সংঘাতময় কোনো নীতি গ্রহণ করবে?

ওই খোলা চিঠিতে খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিক ও চিন্তকদের স্বাক্ষর চীনের প্রতি তাদের চিন্তাশীল যৌথ বিবৃতি এবং তারা যে বিষয়টিতে অবগত আছেন তা প্রকাশ পেয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনকে তাদের নিজেদের মনোভাব এবং উদ্দেশ্য নাগরিকদের কাছে খোলাসা করতে হবে যে, এটা তাদের প্রতিনিধিত্ব করে কি না।

মিনজিন পেই: সরকারি ক্ল্যারেমন্ট মেকেন্না কলেজের অধ্যাপক এবং চায়না’স ক্রনি ক্যাপাটিলিজম বইয়ের লেখক।

ইংরেজি থেকে অনূদিত

সূত্র: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

প্রিয় সংবাদ/কামরুল