ফিটনেসবিহীন বাস। ফাইল ছবি

ফিটনেসবিহীন গাড়ি: পুলিশের অভিযান আর মন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ

প্রচলিত আইনে ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে উচ্চহারে জরিমানার কোনো বিধান নেই। এ কারণে বারবার মামলা ও জরিমানা হলেও ফিটনেসবিহীন গাড়ির চলাচল বন্ধ হচ্ছে না।

মোক্তাদির হোসেন প্রান্তিক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৩ জুলাই ২০১৯, ১৫:৩২ আপডেট: ২৩ জুলাই ২০১৯, ১৫:৩২
প্রকাশিত: ২৩ জুলাই ২০১৯, ১৫:৩২ আপডেট: ২৩ জুলাই ২০১৯, ১৫:৩২


ফিটনেসবিহীন বাস। ফাইল ছবি

(প্রিয়.কম) যাত্রাপথে জীবনের বড় অভিশাপ সড়ক দুর্ঘটনা। আর দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে ফিটনেসবিহীন গাড়ি, রাস্তাঘাটের দুর্দশা, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, চালকের খামখেয়ালিপনা, অনভিজ্ঞ চালক দ্বারা গাড়ি পরিচালনাকেই দায়ী করা হয়। যেখানে দেশের প্রতিটি মানুষই চায় তাদের যাত্রা পথ যেন হয় নিরাপদ। সেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। আশার কথা হচ্ছে-উদ্ভুত পরিস্থিতি উত্তোরণে সড়ক-মহাসড়কগুলোতে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও লাইসেন্সবিহীন চালকদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে আসছে। কিন্তু সরকারের গৃহীত এই পদক্ষেপ কতটুকু আলোর মুখ দেখবে তা নিয়েও সাধারণ মানুষদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। যাত্রী সেবার নামে জীবনের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে।

ফিটনেসবিহীন কোনো গাড়ি রাস্তায় থাকবে না: হাইকোর্ট

আপনাদের নাকের ডগার ওপর দিয়ে কীভাবে লাখ লাখ ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলে বিআরটিএ উদ্দেশ করে এমন প্রশ্ন করেছেন হাইকোর্ট। এ সময় রাস্তায় কোনো ফিটনেসবিহীন গাড়ি থাকবে না বলে মন্তব্য করে আদালত। একই সঙ্গে আদালত পহেলা আগস্ট থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশের ফিটনেসহীন সব পরিবহনের লাইসেন্স নবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন। এ সময়ের মধ্যে লাইসেন্স নবায়ন করা না হলে আগামী ১৫ অক্টোবর পরিবহনগুলো জব্দের নির্দেশ দেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেছেন আদালত।

ফিটনেসবিহীন গাড়ি নিয়ে বিআরটিএর দাখিল করা প্রতিবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে আজ (২৩ জুলাই) হাইকোর্টের বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কে এম হাফিজুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এমন মন্তব্য করেন।

ট্রাফিক পুলিশের অভিযান

সরকার সাধারণ মানুষের চলারপথ নিরাপদ রাখতে ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও লাইসেন্সশূন্য চালকদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করলেও যাত্রীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনায় প্রায় সময়েই কিছুটা গাড়িশূন্য থাকছে রাস্তাঘাট। ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রীরা। এ সময় বাস স্টপেজগুলোতে যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় চোখে পড়ছে। বাসে জায়গা না পেয়ে অনেক যাত্রী বাদুরঝোলা হয়ে গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছেন।

রাজধানীতে পরিবহন সঙ্কটের কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে বহু যাত্রীকে। তাদের অভিযোগ, পুলিশ কয়েকটি পয়েন্টে অভিযান শুরু করেছে। পরিবহন শ্রমিকরা আগে থেকে জেনে যাচ্ছেন কোথায় কখন মোবাইল কোর্ট বসবে। তারা ওই রুট এড়িয়ে অন্য রুটে চলে যাচ্ছেন। আর এ সুযোগে অটোরিক্সা চালকেররা ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করে নিচ্ছে যাত্রীদের কাছ থেকে। যাত্রীরা এদের কাছে অনেকটা জিম্মি অবস্থায় থাকলেও সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না।

মন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ

রাজধানীতে ফিসনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে পুলিশের সহায়তায় অভিযান পরিচালনা করে থাকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের কিছুদিন আগে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘আনফিট যানবাহন উচ্ছেদ করতে আটঘাট বেঁধে নেমেছি। এজন্য রাজধানীতে কিছুটা যানবাহন সঙ্কট দেখা দিচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কম পোহাতে রাজধানীতে বিআরটিসির অতিরিক্ত বাস নামানো হয়েছে।’

মামলা ও জরিমানা আদায়েও ফিটনেসবিহীন গাড়ি কমছে না

প্রশাসন এবং আইন–শৃঙ্খলা বাহিনীর নাকের ডগা দিয়ে প্রকাশ্যে সড়কে গাড়ি চালাচ্ছে শত শত লাইসেন্সবিহীন কিশোর চালক। পিকআপ ভ্যান চালানোর কাজে নিয়োজিত এসব কিশোর চালকের গাড়ি চালানোর ন্যূনতম কোনো জ্ঞান তো নেই, নেই প্রাতিষ্ঠারিক শিক্ষাগত যোগ্যতাও। পিকআপের ভ্যানের হেলপারি করার পর কোনো ধরনের অভিজ্ঞতা ছাড়াই এসব শিশু–কিশোর বসে যাচ্ছে মিনিবাস বা লেগুনার চালকের আসনে। ফলে যা ঘটার তা–ই ঘটছে।

একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও লাইসেন্স থাকা চালকের বেতন যেখানে দৈনিক ৬০০ টাকা থেকে ৭০০ টাকা দিতে হয় সেখানে ৩০০ টাকা থেকে সাড়ে ৩০০ টাকা দিয়ে এসব অদক্ষ কিশোর চালককে পাওয়া যায়। আর অদক্ষ চালকরা স্টিয়ারিং হাতে পেয়ে হয়ে ওঠে বেপরোয়া। ফলে ঘটছে একের পর এক দুর্ঘটনা। একদিকে অপ্রাপ্তবয়স্ক–অদক্ষ চালক, অন্যদিকে লাইসেন্সবিহীন বাহনে চলে ‘আগে পৌঁছানোর’ প্রতিযোগিতা। যে গাড়ি আগে গন্তব্যে পৌঁছাবে, সে আবার যাত্রী বোঝাই করে আগে ফিরে এসে সিরিয়াল রাখতে পারবে। আর এ জন্যই চলে তাদের বেপরোয়া গতির ‘রেস’। ফলে বেপরোয়া গতির কারণে অকাতরে সড়কে প্রাণ যাচ্ছে।

ট্রাফিক পুলিশ সূত্র জানায়, প্রচলিত আইনে ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে উচ্চহারে জরিমানা করার কোনো বিধান নেই। এ কারণে বারবার মামলা ও জরিমানা হলেও ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল বন্ধ হচ্ছে না।

মেয়াদোত্তীর্ণ ফিটনেসবিহীন গাড়ি ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৩২০

ঢাকাসহ সারাদেশে লাইসেন্স নিয়ে ফিটনেস নবায়ন না করা ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৩২০টি। ২৩ জুলাই মঙ্গলবার হাইকোর্টে এমন প্রতিবেদন দিয়েছে বলে জানিয়েছেন বিআরটিএ’র আইনজীবী রাফিউল ইসলাম।

তিনি জানান, এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ২ লাখ ৬১ হাজার ১১৩, চট্টগ্রাম বিভাগে ১ লাখ ১৯ হাজার ৫৮৮, রাজশাহী বিভাগে ২৬ হাজার ২৪০, রংপুর বিভাগে ৬ হাজার ৫৬৮, খুলনা বিভাগে ১৫ হাজার ৬৬৮, সিলেট বিভাগে ৪৪ হাজার ৮০৫ এবং বরিশাল বিভাগে ৫ হাজার ৩৩৮টি গাড়ি মেয়াদোত্তীর্ণ ফিটনেসবিহীন রয়েছে।

ফিটনেসবিহীন গাড়ি থেকে জরিমানা ৬ কোটি ৭২ লাখ

ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানোর দায়ে চলতি বছর ছয় কোটি ৭২ লাখ ২৩ হাজার ৩৯২ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে বলে প্রতিবেদন দাখিল করেছে বিআরটিএ। এ ছাড়া রাস্তায় গাড়ি ধরে ৩৯ হাজার ৮৩৭ মামলা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এ সময় ফিটনেসবিহীন ২১৪ গাড়ি ডাম্পিং এবং ৭২৮ চালককে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

পরিবহণ খাতে যত অব্যবস্থাপনা

ফিটনেসবিহীন হাজার হাজার গাড়ির ভাগাড়ে পরিণত হচ্ছে রাজধানী। ঢাকার রাস্তায় বের হলেই চোখে পড়ে লক্কড়-ঝক্কড় মার্কার যানবাহন। বাস-মিনিবাসের বাম্পারসহ নানা অংশ খুলে ঝুলতে থাকে বিপজ্জনকভাবে। কোনোটার সামনের অংশ ভাঙা, স্থানে স্থানে ছোট-বড় ফোকলা, দরজা-জানালার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়াও মুশকিল। কোনোটির রং চটা, কোনোটির ছাল ওঠা। জোড়াতালি দিতে দিতে সিট-কভারের ওপর পড়ে গেছে দুর্ভিক্ষের ছাপ। এসব গণপরিবহনের সঙ্গে যোগ হয়েছে ফিটনেসবিহীন ট্রাক, লরি, সিএনজি, টেম্পো, মাইক্রো ও প্রাইভেটকার। সেসব গাড়ি ইঞ্জিনে ভয়ানক শব্দ তুলে, নিকষ কালো ধোঁয়া উড়িয়ে দাপিয়ে বেড়ায় রাজপথ-জনপথ। সড়ক ও পরিবহন খাতের নৈরাজ্য চরম আকার ধারণ করেছে। দিন দিনই তা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে।

ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণেই দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। ঘটছে নানা বিশৃঙ্খলা।

বেশির ভাগ বাস-মিনিবাসই ফিটনেসবিহীন

রাজপথ দাপিয়ে বেড়ানো বেশির ভাগ বাস-মিনিবাসই ফিটনেসবিহীন। কিন্তু গাড়ির মালিক, রুট কমিটি, ট্রাফিক বিভাগ-কারও যেন সেদিকে দেখারও ফুরসত নেই। সবাই ছুটছেন টাকার ধান্দায়। ঢাকায় আট সহস্রাধিক বাস-মিনিবাসের ফিটনেসের মেয়াদ পাঁচ-সাত বছর অতিক্রান্ত হলেও ফিটনেস সার্টিফিকেট মিলছে না।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিআরটিএতে ‘কম্পিউটারাইজড ব্যবস্থাপনা’ চালুর পর থেকে চোরাগোপ্তা পথে ফিটনেস সার্টিফিকেট ম্যানেজের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। সে হিসেবে কমবেশি ৮-১০ বছর ধরেই ফিটনেসবিহীন কয়েক হাজার বাস-মিনিবাস দিব্যি যাত্রী বোঝাই করে রাজধানীর বিভিন্ন রুটে চলাচল করছে। সেসব গাড়ির বেশির ভাগ চালকেরও কোনো লাইসেন্স নেই। এ ক্ষেত্রে গাড়ির মালিকের রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা পরিবহন-সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোই অবৈধ গাড়ির রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়ায়।

অধিকাংশ দুর্ঘটনার কারণ ফিটনেসবিহীন গাড়ি

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকা থেকে গাজীপুরে ‘অনাবিল’ ও ‘অনাবিল সুপার’ পরিবহন নামে দুটি কোম্পানির আড়াই শতাধিক বাস-মিনিবাস চলাচল করে। এর মধ্যে মাত্র ১২টি গাড়ির ফিটনেস আছে। তবে এই ১২টি গাড়ির কোনো চালকের লাইসেন্স নেই। বাকি গাড়িগুলোর চালকদের কথা তো বলাই বাহুল্য। একইভাবে দুটি পৃথক রুটে ঢাকা থেকে গাজীপুরে ‘বলাকা’ পরিবহনের ১২০০ গাড়ি চলাচল করে থাকে। এর মধ্যে মাত্র ৭২টি গাড়ির ফিটনেস থাকলেও বাকি গাড়িগুলো ফিটনেসবিহীন চলাচল করছে। অতিসম্প্রতি গাড়ির চাকায় পিষ্ট করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আবরারকে হত্যা করে সুপ্রভাত পরিবহনের একটি বাস। এই সুপ্রভাত কোম্পানির গাড়ির সংখ্যা সাড়ে তিন শতাধিক। এর মধ্যে মাত্র ২০টি গাড়ির ফিটনেসসহ কাগজপত্র ঠিক থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। ফিটনেস সার্টিফিকেটবিহীন, চলাচলের সম্পূর্ণ অনুপযোগী, রুট পারমিট ছাড়া গাড়িগুলো রাজপথ দাপিয়ে বেড়ালেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো উপায় নেই। অবৈধ গাড়ির বেআইনি চলাচলের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে গেলে পরিবহনের মালিক সমিতি, চালক ইউনিয়ন, শ্রমিক ফেডারেশনসহ নানা সংগঠনের ব্যানারে মুহূর্তেই হরতাল, অবরোধ, ধর্মঘটের সীমাহীন নৈরাজ্যের সৃষ্টি করা হয়। তাই তো দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা আইন প্রয়োগের পরিবর্তে মাসোয়ারার বিনিময়ে গাড়িগুলোর চলাচল নির্বিঘ্ন রাখাকেই ঝুঁকিমুক্ত কৌশল বলে মনে করেন। সেই সুযোগে পরিবহন-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের পৃষ্ঠপোষকতা ও গাড়ির মালিকদের দাপটে চালক-হেলপাররা আবারও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। তারা ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা করছেন না, লেন মানছেন না কেউ। যাত্রীবোঝাই বাস-মিনিবাস নিয়ে বিপজ্জনক ওভারটেকিংয়ের মাধ্যমে তারা মরণঝুঁকির প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছেন প্রায়ই। এতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে, যাত্রীরা হাত-পা খোয়াচ্ছেন, পথচারীরাও প্রাণ হারাচ্ছেন গাড়ির চাপায়।

প্রিয় সংবাদ/কামরুল