গণপিটুনির প্রতীকী ছবি।

ছেলেধরা গুজবে গণপিটুনি নাকি হত্যা?

এখন পর্যন্ত সারা দেশে ৬ জন হত্যার শিকার হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৫ জন। মামলা হয়েছে ৯টি। জিডি হয়েছে ১৫টি।

মোক্তাদির হোসেন প্রান্তিক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৩ জুলাই ২০১৯, ২২:৪৯ আপডেট: ২৩ জুলাই ২০১৯, ২২:৪৯
প্রকাশিত: ২৩ জুলাই ২০১৯, ২২:৪৯ আপডেট: ২৩ জুলাই ২০১৯, ২২:৪৯


গণপিটুনির প্রতীকী ছবি।

(প্রিয়.কম) সারা দেশে ছেলেধরা গুজব যেন প্রকট আকার ধারণ করেছে। ছেলেধরা গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনি দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েকজনকে ইতোমধ্যে হত্যা করা হয়েছে। সে জন্য ছেলেধরা গুজব রোধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে গণসচেতনতামলূক প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

ছেলেধরা গুজব রোধে পুলিশের মাইকিং

সাতক্ষীরা জেলার পাটকেলঘাটা থানা এলাকায় মঙ্গলবার সকাল থেকে মাইকিং করা হচ্ছে। বর্তমানে ছেলেধরা সন্দেহে সাতক্ষীরা জেলার কোথাও কাউকে গণপিটুনি দেওয়া হয়েছে খবর পাওয়া যায়নি। তবে গত দেড় মাস আগে সাতক্ষীরা জেলায় ছেলেধরা গুজব প্রকট আকার ধারণ করে। জেলার বিভিন্নস্থানে ১৬ জন নারী-পুরুষ গণপিটুনির শিকার হয়। পরে গণপিটুনির হাত থেকে তাৎক্ষণিক সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ তাদের উদ্ধার করে। যাচাই-বাছাই করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, গণপিটুনির শিকার হওয়া প্রত্যেকেই মানসিক ভারসম্যহীন।

এ বিষয়ে পাটকেলঘাটা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রেজাউল ইসলাম রেজা জানান, ছেলেধরা গুজব ছড়িয়ে কাউকে গণপিটুনি না দেওয়ার জন্য প্রশাসনের উদ্যোগে জনসাধারণকে সতর্ক করতে মাইকিং করা হচ্ছে। এ ছাড়াও জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে গুজব রোধে জেলার আটটি থানা এলাকায় জনসাধারণকে সচেতন করতে ফেসবুক প্রচারণাসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পদ্মা সেতুর জন্য মাথা ও রক্ত লাগবে এ ধরনের গুজব নিরসনে বিশেষ সভা ও মাইকিংয়ের মাধ্যমে জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

ছেলেধরা সন্দেহে নৃশংসতায় জড়িতদের কঠোর শাস্তি পেতে হবে

ছেলেধরার বিষয়টিকে নিতান্তই গুজব উল্লেখ করে আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। তিনি বলেন, ‘যারা গুজব ছড়িয়ে নৃশংস হত্যায় মেতে উঠছেন, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। হত্যাকাণ্ড ১ জনে করেন আর ১০০ জনে সংঘটিত করেন। সকলের জন্য একই হত্যা মামলা দায়ের করা হচ্ছে। কেউই রেহাই পাবেন না।’

২৩ জুলাই, মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে ছেলেধরার গুজব ছড়িয়ে নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানোর বিষয়ে সরকারের কঠোর নির্দেশনা জানাতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন মন্ত্রী।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘কাউকে সন্দেহ হলে কোনোভাবেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না। নিকটস্থ থানায় বা ৯৯৯ নাম্বারে কল করে জানান। এ ধরনের নৃশংসতা আর দেখতে চাই না। যারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়াচ্ছেন, তাদের শনাক্ত করতে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করা হবে।’

প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যারা এগুলো করছে তারা সরকারকে অস্থিতিশীল করতে চাচ্ছে কি না, এর সঙ্গে রাজনৈতিক কোনো ইন্ধন আছে কি না, তা খুঁজে দেখা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বসে নেই। গুজব ছড়িয়ে যারা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে গণপিটুনি দিচ্ছে, নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে, তারা সংখ্যায় যতজনই হোক সবাইকে আইনের আওতায় এনে দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করা হবে। কঠোর শাস্তি থেকে কেউই রেহাই পাবেন না।’

ছেলেধরা গুজবের নেপথ্যে কুচক্রী মহল : ডিবি

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেলেধরা ও মাথাকাটার গুজব ছড়ানো কুচক্রী মহলটি বড় ষড়যন্ত্রের অংশ বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মো. মাহবুব আলম। ২২ জুলাই, সোমবার ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা জানান তিনি।

মাহবুব আলম বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেলেধরা গুজবকে ভিত্তি করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নির্যাতন ও খুনের ঘটনা ঘটেছে। গুজব ছড়িয়ে এমন অপকর্মের নেপথ্যে একটি চক্র কাজ করতে পারে। তাদের বড় একটি ষড়যন্ত্রের অংশ এ ছেলেধরা গুজব। তারা গুজব রটিয়ে বিশেষ ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করছে।’

কুচক্রী মহলকে রুখে দিতে পুলিশ সজাগ রয়েছে উল্লেখ করে ডিবির এ যুগ্ম কমিশনার বলেন, ‘সারা দেশে গুজব রটনা ও অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ কাজ করছে। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে তাদের গ্রেফতারও করা হচ্ছে।’

গণপিটুনি নাকি হত্যা

গণপিটুনিতে অপরাধী ব্যক্তিদের পাশাপাশি অনেক সময় নিরপরাধী ব্যক্তিরা নিহত হন। অভিযোগ রয়েছে, অনেক সময় হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকেও গণপিটুনি বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। 

ছেলেধরা আতঙ্কে গণপিটুনি এড়াতে করণীয়

ছেলেধরা সন্দেহে সম্প্রতি কয়েকটি হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এতে বেশ কয়েকজন নিরীহ মানুষের প্রাণহানী হয়েছে। মানসিক প্রতিবন্ধী, অসুস্থ, ভিক্ষুকসহ নানা শ্রেণির মানুষ হয়রানির শিকার হয়েছেন। ছেলেধরা আতঙ্কের মধ্যে এমন অমানবিক গণপিটুনি এড়াতে সতর্ক থাকতে হবে। আসুন জেনে নিই গণপিটুনি এড়ানোর উপায়-

১. কিছুদিন অপরিচিত এলাকায় যাওয়া থেকে বিরত থাকুন। ২. অপরিচিত এলাকায় কোথাও দাঁড়িয়ে এদিক-সেদিক উদ্ভ্রান্তের মতো তাকানো থেকে বিরত থাকুন। ৩. কাউকে খুঁজতে গেলে তার সাথে আগেই যোগাযোগ করে নিন। ৪. কাউকে সারপ্রাইজ দিতে কিংবা কোনো কারণেই না জানিয়ে সেখানে যাবেন না। ৫. নিজের বাচ্চাকে তার মাকে ছাড়া কোথাও নিয়ে যাবেন না। ৬. বাচ্চা যদি ছিচকাঁদুনে হয় কিংবা বায়না ধরে, তাদের নিয়ে একা একা বেশি দূরে যাবেন না। ৭. চাকরিজীবী হলে প্রতিষ্ঠানের পরিচয়পত্র সাথে রাখুন, অপরিচিত এলাকায় গেলে গলায় ঝুলিয়ে রাখুন।

৮. কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে থতমত খাবেন না, আত্মবিশ্বাসের সাথে সহজভাবে উত্তর দিন। অযথা ভাব নিবেন না। ৯. পথে-ঘাটে কারো সাথে উটকো ঝামেলায় জড়াবেন না। ১০. এ ধরনের ঘটনা দেখলে নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে পুলিশকে জানান। ১১. গণপিটুনির মতো পরিস্থিতি দেখলে তখনই ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিন। ১২. যদি কোনো এলাকায় নতুন হোন (যদি কেউ না চেনে), তাহলে কর্মক্ষেত্র থেকে সরাসরি বাসায় চলে যান। 

হত্যা-আহত-মামলা-জিডি

২৩ জুলাই সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, এখন পর্যন্ত সারা দেশে ৬ জন হত্যার শিকার হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৫ জন। মামলা হয়েছে ৯টি। জিডি হয়েছে ১৫টি। বাড্ডার ঘটনাসহ ভিডিও ফুটেজ দেখে এ পর্যন্ত ঘটা সব ঘটনায় মোট ৮১ জনকে আটক করা হয়েছে।

কোনোক্রমেই যাতে এ ধরনের নৃশংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়, সে জন্য সারা দেশের প্রশাসন বিশেষ করে ডিসি এসপিদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাদের জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে স্কুল এবং ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতে প্রচারণা চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়ছে বলেও জানান মন্ত্রী।

সাড়ে আট বছরে গণপিটুনিতে নিহত ৮২৬

২০১১ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন ঘটনায় গণপিটুনি দিয়ে সারা দেশে হত্যা করা হয়েছে ৮২৬ জনকে। ২০১৮ সালে সারা দেশে গণপিটুনিতে ৩৯ ও ২০১৭ সালে ৫০ জন লোক মারা গেলেও চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই নিহত হয়েছেন ৩৬ জন। আর চলতি মাসের দুই সপ্তাহে ছেলে ধরা সন্দেহে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে ১১ জনকে। এসব ঘটনায় মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন আরও অর্ধশতাধিক।

গণপিটুনির এসব ঘটনায় মানবাধিকারকর্মী ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচারহীনতায় আইনের প্রতি মানুষের যখন আস্থা কমে যায় তখন মানুষ নিজ হাতে আইন তুলে নেয়। তাই আস্থা বাড়িয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কাজ করে যেতে হবে। ছোট বড় প্রত্যেকটি ঘটনার জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তবেই গণপিটুনির মতো অপরাধ থেকে মানুষ সরে আসবে।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সাল থেকে ২০১৯ সালের জুন মাস পর্যন্ত মোট সাড়ে আট বছরে সারা দেশে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে ৮২৬ জনকে। এর মধ্যে ২০১১ সালে ১৩৪জন, ২০১২ সালে ১২৬জন, ২০১৩ সালে ১২৮জন, ২০১৪ সালে ১২৭ জন, ২০১৫ সালে সবচেয়ে বেশি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। ওই বছর সারা দেশে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয় ১৩৫ জনকে। এ ছাড়া ২০১৬ সালে ৫১ জন, ২০১৭ সালে ৫০ জন, ২০১৮ সালে ৩৯ জন ও জুন ২০১৯ পর্যন্ত গণপিটুনি দিয়ে ৩৬ জনকে হত্যা করা হয়েছে।

আসকের দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে আরও জানা গেছে, এই সাড়ে আট বছরে গণপিটুনির সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে ঢাকা অঞ্চলে। এই সময়ে ঢাকা অঞ্চলে গণপিটুনির শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ৩৫০ জন। এর পরই রয়েছে চট্টগ্রামের অবস্থান। এই সময়ে চট্টগ্রামে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ১৯৬ জন, খুলনায় ৯৫জন, রাজশাহীতে ৭৫ জন, বরিশালে ২৯জন, রংপুরে ২৩জন ও সিলেটে ২১জন।

গণপিটুনি থামাতে হবে এখনই

গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনি, খুনের মতো নৈরাজ্যকর কর্মকাণ্ডে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্টজনরা। এখনই এই অবস্থা থেকে উত্তরণের পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে করণীয় হচ্ছে সাধারণ জনগণের মাঝে জনসচেতনতা তৈরি করা। এ ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধি, সরকারের বিভিন্ন বাহিনী, বিশেষ করে আইশৃঙ্খলা বাহিনী, সাধারণ মানুষকে বলা, সচেতন করা এবং তাদের মাথায় ঢুকানো যেন সন্দেহভাজন ব্যক্তির গায়ে হাত না তুলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। নিজেদের একটু সচেতন থাকা, টেলিভিশন, বিভিন্ন অনুষ্ঠান, পত্রপত্রিকা, লিফলেট, মসজিদের ইমাম, উঠান বৈঠক ইত্যাদির মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি এবং বৃদ্ধি করা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোকে মনিটরিং করতে হবে। মূল ধারার মিডিয়ার এক্ষেত্রে বড় একটি ভূমিকা বা দায়িত্ব আছে। তাদের উচিৎ হবে সঠিক তথ্যটি উপস্থাপন করা। আইশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা বা তৎপরতা আরো বেশি করে বাড়ানো দরকার। এসব ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষক সবাই মিলে সমন্বিতভাবে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন তুলতে হবে।

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, ‘এটা আসলে অনুসন্ধান করা দরকার। এমনও হতে পারে কারো সাথে কারো একটু মতবিরোধ বা শত্রুতা আছে। কয়েকজন মিলে কাউকে ছেলেধরা গুজবে ফাঁসিয়ে দিলো। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। এ ক্ষেত্রে পুলিশকে খুব সতর্কতার সঙ্গে তদন্ত করে, যারা এর সঙ্গে জড়িত এবং কেন এসব করছে এটা খুঁজে বের করা উচিৎ। তা না হলে যে কেউ যে কোনো কারণে শত্রুতা থাকলে এটাকে ব্যবহার করতে পারে।’

মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, ‘সমাজে যখন মানুষের ভেতর অস্থিরতা এসে যায়, মানুষ যখন কোনো কিছুতে বিশ্বাস করতে পারে না, অস্বাভাবিক প্রতিযোগিতায় নেমে যায় তখন তাদের মূল্যবোধের অবক্ষয় হয়। তখন এই ধরনের ঘটনা ঘটে। এখন মানুষতো অসুস্থ হয়ে গেছে। কোনো কিছু সহ্য করতে পারছে না। এর কারণ হচ্ছে, মানুষ দেখতে পাচ্ছে অপরাধীরা চোখের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অন্যায় করে তারা পার পেয়ে যাচ্ছে। অতএব আমরা আইন নিজের হাতে তুলে নিই। এবং পরবর্তীতে তারা একটি অসহিষ্ণু আচরণ করে সন্দেহজনক ও বেপরোয়াভাবে একজন মানুষকে মেরে ফেলে। দলবদ্ধভাবে হত্যা করে। এটা হচ্ছে একটি হত্যাযজ্ঞ এবং অপরাধ। আরেকটি বিষয় হচ্ছে ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মানুষকে আক্রান্ত করতে বা সমাজে অস্থিরতা তৈরি করতে গুজব তৈরি করে থাকে। এ ক্ষেত্রে অনেকগুলো মোটিভ কাজ করে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন বলেন, ‘এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ এখন সাধারণ মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নেয় এবং বিচার করে। এটা তাদের করার কথা না। একজন প্রকৃত ছেলেধরা হলেও তাকে পিটানোর অধিকার আমাদের নেই। গণহারে একজন মানুষকে পিটানোর অর্থ দাঁড়ায় এই যে আমার মধ্যে কোনো ভয় নেই। এটা করলে আমার কোনো কিছু হবে না। ঘটনার সময় চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো কতোটা বিবেকহীন। তারা কেউ বাধা দেয় না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মানুষজন আশপাশে থাকলেও তারা কেউ এগিয়ে আসে না। এসকল কারণেই ঘটনাগুলো ঘটে। প্রকৃত ঘটনা ভেরিফাই না করে কোনো একটি একশনে যাওয়া এটা তখনই মানুষ করতে পারে যখন তার আইনশৃঙ্খলার প্রতি কোনো শ্রদ্ধা, মানবিক মূল্যবোধ এবং বিচারের প্রতি কোনো আস্থা থাকে না।’

অপরাধ বিজ্ঞানী তৌহিদুল হক বলেন, ‘আমাদের দেশে অতীতেও উন্নয়ন কেন্দ্রীক প্রকল্পকে সামনে রেখে অনেক গুজব ছড়িয়েছে। একই সাথে আমাদের সামাজিক অনেকগুলো উপাদানের মধ্যে গুজবের একটি জায়গা আছে। আমাদের সমাজের সর্বস্তরের মানুষের গুজব কেন্দ্রীক রূপকথা শোনার অভিজ্ঞতা আছে। এই পরিস্থিতিতে মানুষের মধ্য একধরনের অনুভূতি কেন্দ্রীক ক্ষোভ এবং অসন্তোষ তৈরি হয়। দেখা গেছে, কোনো একটি এলাকায় কোনো একটি শিশুকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। অথবা তার মাথা পাওয়া গেছে। অথবা তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। ফলে ওই এলাকার মানুষের মধ্যে এক ধরনের ক্ষোভ তৈরি হয়েছে এবং দীর্ঘদিন হয়তো সেটা তারা লালনও করেছে। ফলে এই ধরনের ঘটনা যখন সামনে পায় তখন সেই মানুষগুলো একধরনের হিংস্র আচরণ করে। ব্যক্তিটিকে নির্যাতন করে। একটা সময় ছিল তাকে মানসিকভাবে নির্যাতন এবং গালিগালাজ করে পুলিশের হাতে তুলে দিতো। এখন কিন্তু তার বিপরীত হয়েছে।’

পুলিশের সাবেক আইজি ও সংসদ সদস্য নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘স্বাধীনতা উত্তরকালে আমরা এই ধরনের গুজব শুনেছি। এ ক্ষেত্রে আমার মনে হয় কেউ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই গুজবটা ছড়াচ্ছে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য। সম্প্রতি প্রিয়া সাহার বক্তব্য এবং এই ছেলেধরা গুজবের ঘটনা আমার মনে হয় একইসূত্রে গাথা।’

প্রিয় সংবাদ/রুহুল