রওশন এরশাদ ও জিএম কাদের। ছবি: সংগৃহীত

দেবর-ভাবির দ্বন্দ্বে জাপায় নতুন সংকট, ত্রি-ধারায় সিনিয়ররা

দলের প্রেসিডিয়ামের বেশিরভাগ নেতাই রওশন এরশাদের বিবৃতি এবং জিএম কাদেরের সংবাদ সম্মেলন এড়িয়ে চলছেন।

প্রিয় ডেস্ক
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশিত: ২৩ জুলাই ২০১৯, ২৩:১০ আপডেট: ২৩ জুলাই ২০১৯, ২৩:১০
প্রকাশিত: ২৩ জুলাই ২০১৯, ২৩:১০ আপডেট: ২৩ জুলাই ২০১৯, ২৩:১০


রওশন এরশাদ ও জিএম কাদের। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) চেয়ারম্যান পদকে কেন্দ্র করে জাতীয় পার্টিতে (জাপা) নতুন করে সংকট দেখা দিয়েছে। এ কারণে দলের দুই কাণ্ডারি দেবর-ভাবির দ্বন্দ্ব আজ (২৩ জুলাই) প্রকাশ্যে এসে নতুন মাত্রা পেয়েছে। দলের সিনিয়র নেতারা জাপার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জিএম কাদের এবং সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদের দ্বন্দ্বের সুরাহার কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছেন না। এজন্য তারা দলের প্রধান দুনেতার মতবিরোধকে এড়িয়ে চলছেন। সিনিয়র নেতাদের বেশিরভাগই জিএম কাদেরের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থাকেননি এবং রওশন এরশাদের বিবৃতিতেও স্বাক্ষর করেননি।

জাতীয় পার্টির সিনিয়র নেতাদের কিছু অংশ রওশন এরশাদ ঘরানার, যারা আজ (২৩ জুলাই) জাপার চেয়ারম্যান হিসেবে জিএম কাদেরকে না মানার পক্ষে, রওশন এরশাদের বিবৃতিতে তাদের নাম রয়েছে। আবার রাজধানীর বনানীর দলীয় কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রওশনের বিবৃতিটি কাঁচা, বিশ্বাসযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন জিএম কাদের। এ সময় জাপার মধ্যম সারির কিছু নেতা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আবার গত ১৮ জুলাই সংবাদ সম্মেলন করে জিএম কাদেরকে চেয়ারম্যান ঘোষণাকালেও দলের প্রেসিডিয়াম সদস্যসহ অল্প কয়েকজন নেতা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দলের প্রেসিডিয়ামের বেশিরভাগ নেতাই রওশন এরশাদের বিবৃতি এবং জিএম কাদেরের সংবাদ সম্মেলন এড়িয়ে চলছেন। তারা এখন পর্যন্ত কারও পক্ষ অবলম্বন করছেন না।

রওশনের বিবৃতিটি কাঁচা, বিশ্বাসযোগ্য নয়: কাদের 

দলীয় চেয়ারম্যান হিসেবে জি এম কাদেরকে মানেন না বলে জতীয় পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ যে বিবৃতি দিয়েছেন তা ‘বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য’ নয় বলে মন্তব্য করেছেন কাদের। তার দাবি, জাপায় কোনো বিভেদ নেই। সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে রাজনৈতিক কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছেন। নেতৃত্ব নিয়েও কোনো দ্বন্দ্ব নেই।

২৩ জুলাই, মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর বনানী কার্যালয়ে সংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে কাদের বলেন, ‘রওশন এরশাদের পক্ষে যে বিবৃতি এসেছে তা হাতে লেখা ও কাঁচা।’

বিবৃতি প্রসঙ্গে জি এম কাদের বলেন, ‘হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আমাদের পরিবারে পিতৃতুল্য ছিলেন। সেই ভাবেই বেগম রওশন এরশাদ আমাদের মায়ের মতো।’

এ সময় উপস্থিত ছিলেন- পার্টির উপদেষ্টা আশরাফ উদ-দৌলা, ভাইস চেয়ারম্যান দেওয়ান আলী, মোস্তাকুর রহমান মোস্তাক, যুগ্ম মহাসচিব হাসিবুল ইসলাম জয়, মনিরুল ইসলাম মিলন, যুগ্ম দফতর সম্পাদক এম এম রাজ্জাক খান, কেন্দ্রীয় নেতা ফারুক শেঠ প্রমুখ।

জিএম কাদের জাপার চেয়ারম্যান নন: রওশন 

এর আগে জি এম কাদেরের চেয়ারম্যান পদ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে বিবৃতি দেন জাতীয় পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ।  

সোমবার (২২ জুলাই) দিবাগত রাতে রওশনসহ জাপার নয় নেতার নামে দেওয়া এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়। জি এম কাদেরের বিরুদ্ধে রওশনপন্থী একটি অংশ জাতীয় পার্টিতে সক্রিয় আগে থেকেই। ওই বিবৃতিতে দলের আটজন প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং দুজন এমপির নাম রয়েছে। তারা দলে রওশনপন্থী হিসেবে পরিচিত।

বিবৃতিতে বলা হয়, জিএম কাদের দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। পরবর্তী চেয়ারম্যান নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থাকবেন। সম্প্রতি জিএম কাদের নিজেকে দলের চেয়ারম্যান ঘোষণা করেছেন, তা আদৌ দলের যথাযথ ফোরামে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি।

বিবৃতিতে রওশনের স্বাক্ষর থাকলেও বাকিদের নামের পাশে স্বাক্ষর নেই। অন্য যাদের নাম রয়েছে তারা হলেন ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, দেলোয়ার হোসেন খান, ফখরুল ইমাম, সেলিম ওসমান, লিয়াকত হোসেন খোকা, রওশন আরা মান্নান, রত্না আমিন হাওলাদার, মাসুদা এম রশীদ চৌধুরী ও মীর আবদুস সবুর আসুদ।

যেভাবে জাপার চেয়ারম্যান হন জিএম কা‌দের

গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই) জাতীয় পার্টির বনানী কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ছোট ভাই ও জাপার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে দলটির চেয়ারম্যান হিসেবে নাম ঘোষণা করেন দলের মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা।

সংবাদ সম্মেলনে রাঙ্গা বলেন, ‘প্রয়াত চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পূর্বের ঘোষণা অনুযায়ী জিএম কাদের আজ (১৮ জুলাই) থেকে জাপার চেয়ারম্যান। এরশাদ জীবদ্দশায় দ‌লের গঠনত‌ন্ত্রের ২০ এর ১/ক ধারা অনুযায়ী ওনার অবর্তমানে জিএম কাদেরকে পার্টির চেয়ারম্যান ঘোষণা করে গেছেন।’

এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, সুনীল শুভ রায়, এসএম ফয়সাল চিশতী, মো. আজম খান, এটিইউ তাজ রহমান, মেজর (অব.) খালেদ আখতার প্রমুখ।

গত ১৪ জুলাই এরশাদ মারা যান। তবে এর আগে গত মে মাসে তিনি তার ছোটভাই জি এম কাদেরকে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগের ঘোষণা দেন। ছোট ভাইকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করায় দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের অনেকেই অখুশি হন। তবে এ নিয়ে আর বড় ধরনের কোনো দ্বন্দ্ব তৈরি হয়নি। এরশাদের মৃত্যু পর্যন্ত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ছিলেন কাদের।

ত্রি-ধারায় দলের সিনিয়র সদস্যরা

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দলের নেতৃত্ব নিয়ে এরশাদ-পত্নী রওশন এরশাদের সঙ্গেও শীতল সম্পর্ক চলছে জি এম কাদেরের। তাকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করার পর থেকেই সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন দলের কর্মসূচিতে আসছেন না। আর ১৮ জুলাই জিএম কাদের দলের চেয়ারম্যান নিযুক্ত করার আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, সুনীল শুভ রায়, এসএম ফয়সাল চিশতী, মো. আজম খান, এটিইউ তাজ রহমান, মেজর (অব.) খালেদ আখতার প্রমুখ।

আজ (২৩ জুলাই) জিএম কাদের যখন রওশনের বিবৃতিটি কাঁচা, বিশ্বাসযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তখন সেখানে জিএম কাদেরের সঙ্গে দলের সিনিয়র নেতারা উপস্থিত ছিলেন না। সেখানে দলের মাঝারি শ্রেণির (পার্টির উপদেষ্টা আশরাফ উদ-দৌলা, ভাইস চেয়ারম্যান দেওয়ান আলী, মোস্তাকুর রহমান মোস্তাক, যুগ্ম মহাসচিব হাসিবুল ইসলাম জয়, মনিরুল ইসলাম মিলন, যুগ্ম দফতর সম্পাদক এম এম রাজ্জাক খান, কেন্দ্রীয় নেতা ফারুক শেঠ প্রমুখ) কিছু নেতা উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে রওশন এরশাদ স্বাক্ষরিত ২৩ জুলাইয়ের বিবৃতিতে দলের ৪১ সদস্যের প্রেসিডিয়ামের আটজন সদস্য এবং জাপার দুজন সাংসদের নাম রয়েছে। অপরদিকে সাংবাদিকদের সঙ্গে জিএম কাদেরের বিফ্রিংয়ে সিনিয়র কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন। এর বাইরেও দলের প্রভাবশালী প্রেসিডিয়াম সদস্য আছেন যারা জিএম কাদেরের সংবাদ সম্মেলনেও উপস্থিত হননি, তেমনি রওশন এরশাদের বিৃবতিতেও নাম আসেনি।

এই প্রভাবশালী সিনিয়র নেতাদের মধ্যে রয়েছেন- প্রেসিডিয়াম সদস্য রুহুল আমীর হাওলাদার, জিয়া ‍উদ্দিন বাবলু, মুজিবুল হক চুন্নু, সালমা ইসলাম, মো. আবুল কাশেম, দিলারা খন্দকার প্রমুখ।  

প্রিয় সংবাদ/কামরুল/রুহুল