উত্তর মেরুর দেশগুলো সবেচেয়ে উষ্ণতম গ্রীষ্ম পার করছে। ছড়িয়ে পড়েছে ভয়াবহ দাবানলও। ছবি: সংগৃহীত

আক্ষরিক অর্থেই পুড়ছে পৃথিবী

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আবহাওয়া ঠান্ডা বা শীতল বলে এখন আর অবশিষ্ট কিছু নেই। প্রতিদিনই তাপমাত্রা বৃদ্ধির নতুন রেকর্ড হচ্ছে এবং অবস্থার অবনতি হচ্ছে।

রুহুল আমিন
জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ২৩ জুলাই ২০১৯, ২২:০৯ আপডেট: ২৩ জুলাই ২০১৯, ২২:০৯
প্রকাশিত: ২৩ জুলাই ২০১৯, ২২:০৯ আপডেট: ২৩ জুলাই ২০১৯, ২২:০৯


উত্তর মেরুর দেশগুলো সবেচেয়ে উষ্ণতম গ্রীষ্ম পার করছে। ছড়িয়ে পড়েছে ভয়াবহ দাবানলও। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) তাপমাত্রা-বিষয়ক স্বস্তিদায়ক কথার জন্য আবহাওয়া নির্ভরযোগ্য উৎস ছিল বলে কি আপনি মনে করেন? লিফটে অন্যদের সঙ্গে গা ঘেষাঘেষি করে দাঁড়িয়ে যখন কোনো সহকর্মীকে বলতেন ‘আজকে খুব গরম, তাই না?’ তখন এমনভাবে উত্তর দিত যেন বাগানটার জন্য একটু বৃষ্টির প্রয়োজন ছিল। তারপর একে অন্যকে উপেক্ষা করতেন। মোটকথা সেই সময়ে আবহাওয়া নিয়ে কথা বলা ছিল বিতর্কেরও অতীত। আবহাওয়া ছিল নিরাপদ। ঠান্ডা ছিল।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আবহাওয়া ঠান্ডা বা শীতল বলে এখন আর অবশিষ্ট কিছু নেই। প্রতিদিনই তাপমাত্রা বৃদ্ধির নতুন রেকর্ড হচ্ছে এবং অবস্থার অবনতি হচ্ছে। গত জুন ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণতম মাস, জুলাইয়ে সেই রেকর্ডও ভাঙতে চলেছে।

উত্তর মেরুর দেশগুলো সবেচেয়ে উষ্ণতম গ্রীষ্ম পার করছে। ছড়িয়ে পড়েছে ভয়াবহ দাবানলও। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুসারে, এই দাবানলের কারণে যে পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন হচ্ছে তা পুরো সুইডেনের এক বছরের সমান।
সুমেরু বা উত্তর মেরু অঞ্চলের অধিকাংশ দেশ এতে আক্রান্ত এবং প্রধান শহরগুলো উত্তপ্ত অবস্থায় আছে। আমি নিউ ইয়র্কে থাকি, শহরটি এত বেশি উত্তপ্ত হয়েছে যে এখানকার মেয়র ‘স্থানীয় জরুরি অবস্থা’ জারি করেছেন। এই শহরের অবকাঠামো বা ভবনগুলোর অবস্থান এমন যে চুইংগাম বা ইঁদুরের বিষ্ঠা একটি আরেকটির সঙ্গে সংযোগ করে দেয়। আর ১০ লাখের মতো এসি লাগানো এই শহরের ৪৬ হাজার বাসিন্দা গত রবিবার বিদ্যুৎহীন ছিলেন।

এখন ইউরোপের উত্তপ্ত হওয়ার সময়। আবহাওয়া অফিস বলেছে, বৃহস্পতিবার লন্ডনের তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। এই ভয়াবহ আবহাওয়া আমাদেরকে সেটাই উপলব্ধি করায় যে, আমরা নিজেদের সঙ্গেই এটা (জলবায়ুর ক্ষতি) করেছি। জলবায়ু সংকট তাপ প্রবাহের নতুন স্বাভাবিকতা তৈরি করেছে। অর্থাৎ এটাই যেন স্বাভাবিক। ফলে ব্যাপারটি নিয়ে না ভেবে এবং চূড়ান্ত কিছু না ঘটলে এখন আর সহকর্মীর দিকে তাকিয়ে বলা লাগবে না, ‘গরম, তাই না?’ কারণ দিন দিন তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সুইজারল্যান্ডের ক্রাউথার ল্যাবের বিজ্ঞানীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০৫০ সালে প্রায় ৮০ ভাগ শহর নাটকীয় জলবায়ু পরিবর্তনের কবলে পড়বে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, লন্ডনকে বার্সেলোনা মনে হবে।

এদিকে জাকার্তা ও সিঙ্গাপুরের মতো শহরগুলি আশ্চর্যজনক এক জলবায়ু পরিস্থিরির মুখে পড়বে। সেখানে দেখা যাবে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও তীব্র খরা।

জলবায়ু সংকটের এই প্রভাব উপেক্ষা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কারণ আমাদের অনেকের কাছে তা এখন খুব ভয়াবহ হয়ে উঠছে। জলবায়ুর এই পরিস্থিতি কেবল এই গ্রহটিকে ধ্বংসই করছে না, এটা আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে- যাকে আমরা ‘পরিবেশগত উদ্বিগ্নতা’ বলে থাকি। ২০১৫ সালে আলেকজান্দ্রিয়া হ্যারিস তার ‘ওয়েদারল্যান্ড’ বইয়ে লিখেছেন, ‘পরিচিত জায়গার ছোট পরিবর্তনই আমাদেরকে খারাপ জায়গার চেয়ে বেশি ভোগাতে পারে।’

শৈশবে প্রতিটি গ্রীষ্মে আমি কর্নিশ সমুদ্র সৈকতে গেছি এবং ইংল্যান্ডের তাপপ্রবাহে আমি কখনো মাথা পুরোপুরি ঢাকতে পারিনি। এখন ইংল্যান্ডের জন্য আমার দুঃখ হচ্ছে কারণ পরিচিত সেই দৃশ্যটা নাই হয়ে গেছে। জলবায়ুর কারণে যেখানে আমি বেড়ে উঠেছি সে জায়গাটি আমার কাছে ভিন্ন জায়গা মনে হচ্ছে। হ্যারিস তার বইয়ে এটাও লেখেছেন, ‘সেই বছরটি আসছে… যা সম্ভবত ইংলিশ আবহাওয়ার শেষ বছর।’ তিনি বলেন, আবহাওয়ার স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য ‘বিশাল গুদামঘর’ নির্মাণের এখনই সময়।

যে আবহাওয়া আসছে তার জন্য আবহাওয়া স্মৃতি সংরক্ষণাগারের চেয়ে আরও বেশি কিছু করা দরকার আমাদের। আমাদের আচরণের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দরকার এবং আরও গুরুত্ব দিয়ে আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন দরকার। কারণ মোটের উপরে মাত্র ১০০টি কোম্পানি বিশ্বের ৭১ ভাগ ধোঁয়া নির্গমনের জন্য দায়ী। ইতোমধ্যে আমরা এসব জানি। কিন্তু আমাদের রাজনীতিবিদরা বলার মতো কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। ব্যবসার সঙ্গে বরাবরের মতোই পুঁজিবাদকেও বহন করা হচ্ছে। এই বিশ্ব আক্ষরিক অর্থেই পুড়ছে এবং যখন পুড়ছে তখন আমাদের ভাবখানা এমন যে ছোট্ট কোনো একটা কাগজ পুড়ছে।

লেখক: আরওয়া ম্যাহদাউই। তিনি গার্ডিয়ানের একজন কলামিস্ট

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

প্রিয় সংবাদ/কামরুল