বিভিন্ন সময় পুলিশ প্রহরায় উল্টো পথে যেতে দেখা যায় ‘ভিআইপি’দের। ফাইল ছবি

ক্ষমতার অপব্যবহারের নাম ‘ভিআইপি সংস্কৃতি’

দেশের সড়কে চলাচলে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ছাড়া আর কেউ ভিআইপি সুবিধার কোনো বিধান বা ব্যবস্থা নেই। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার জন্য চলাচলের ১৫ মিনিট আগে সড়কের একপাশ ফাঁকা করে দেওয়া হয়।

তানজিল রিমন
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ৩১ জুলাই ২০১৯, ২১:৪৩ আপডেট: ৩১ জুলাই ২০১৯, ২১:৫৪
প্রকাশিত: ৩১ জুলাই ২০১৯, ২১:৪৩ আপডেট: ৩১ জুলাই ২০১৯, ২১:৫৪


বিভিন্ন সময় পুলিশ প্রহরায় উল্টো পথে যেতে দেখা যায় ‘ভিআইপি’দের। ফাইল ছবি

(প্রিয়.কম) সম্প্রতি সরকারের উচ্চপদস্থ একজন কর্মকর্তার জন্য একটি ফেরি ছাড়তে তিন ঘণ্টারও বেশি সময় অপেক্ষা করে। আর এ সময় ঢাকামুখী একটি অ্যাম্বুলেন্সকেও সেখানে অপেক্ষা করতে হয়। আইসিইউ সংবলিত ওই অ্যাম্বুলেন্সে তিতাস ঘোষ নামের ষষ্ঠ শ্রেণির এই শিক্ষার্থী মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিল। নড়াইল থেকে ঢাকায় উন্নত চিকিৎসার জন্য আসার পথে ভিআইপি-বাধার সম্মুখীন হয়। তার সঙ্গে থাকা আত্মীয়রা অনেক অনুরোধ করলেও ফেরি ছাড়েনি। তাদের বলা হয়, একজন ভিআইপি আসছেন, ‍যিনি যুগ্ম সচিব পদে কর্মরত রয়েছেন; তিনি না আসলে ফেরি ছাড়া যাবে না। তিন ঘণ্টা অপেক্ষার পর ভিআইপি এলে ফেরি ছাড়া হয় এবং ফেরি মাঝ নদীতে থাকাকালে তিতাসের মৃত্যু হয়।

বাংলাদেশে ‘ভিআইপি সংস্কৃতি’ নতুন নয়। সাধারণ মানুষের মাঝে এটি একটি যন্ত্রণার নাম। ফেরি ঘাটসহ সারা দেশেই ভিআইপিদের জন্য দুর্ভোগে পড়তে হয় মানুষদের। যানজটের শহর ঢাকায়ও ভিআইপিদের চলাফেরায় প্রায়ই সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর এর প্রভাব পড়ে আশপাশের সব সড়কে। যানজট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। কখনো কখনো ভিআইপিদের প্রটোকল থেকে সাইরেনও বাজানো হয়। সড়ক ফাঁকা করতে সঙ্গে থাকা পুলিশও উদ্যোগী হন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের মতো একটা দেশে ভিআইপি সংস্কৃতি বন্ধ করা জরুরি। এটা অসাংবিধানিক, ক্ষমতার অপব্যবহার।

স্কুলছাত্র তিতাসের মৃত্যুর ঘটনায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক বিবৃতিতে বলেছে, ভিআইপিদের অযাচিত সুবিধা দিতে গিয়ে কারো মৃত্যুর ঘটনা কোনো গণতান্ত্রিক দেশের চর্চা হতে পারে না। সংবিধানে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা রয়েছে, কাজেই কোনো বিশেষ শ্রেণির নাগরিকের জন্য বিশেষ সুবিধা বৈষম্যমূলক ও অসাংবিধানিক আচরণ। আর এটি বন্ধ করতে না পারাটা কলঙ্কজনক। 

ভিআইপি সুবিধার নামে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ঝুঁকি ও হয়রানি বন্ধের জন্য ভিআইপির সুবিধা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণে মন্ত্রিপরিষদ, সচিবালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতি আহ্বান জানায় দুর্নীতি বিরোধী সংস্থাটি।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রিয়.কমকে বলেন, ‘মানুষের মৌলিক অধিকার খর্ব করে কেউ কখনো বাড়তি সুবিধা নিতে পারে না। কাজের মধ্য দিয়ে ভিআইপির সম্মান অর্জন করতে হয়, এটা জোর করে আদায় করা যায় না। কেউ যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকেন, তখন তিনি তার ক্ষমতা দেখাতে চান। আর এই কাজ করতে গিয়েই তিনি মানুষের সমস্যা সৃষ্টি করেন।’

পাবলিক সার্ভিস নিতে গেলে সবাইকে সমানভাবে সেবা নিতে হবে; সেখানে একজনকে বাদ দিয়ে ভিআইপির নামে বাড়তি সুবিধা নেওয়া যাবে না এবং অন্যদের অসুবিধা সৃষ্টি করা যাবে না বলে জানান তিনি। 

‘রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্বে থাকাদের আমরা ভিআইপি বলে থাকি এবং তারা নিরাপত্তা ও নির্দিষ্ট কার্যালয়, বাড়ি, গাড়ি পেয়ে থাকেন; তাদের বিশেষ এই সুবিধা নিয়ে কিন্তু কারও কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু তাদের এখতিয়ারের বাইরে গিয়েও বিভিন্ন সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন, নিয়ে থাকেন। এমনকি তাদের আশপাশের লোকজনও এই কাজ করে থাকেন, তখনই প্রশ্ন ওঠে, আপত্তি ওঠে। কারণ মানুষকে বিপদে ফেলার এখতিয়ার কারও নেই’, যোগ করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক।

ভিআইপির সংজ্ঞাটাও পরিষ্কার নয় জানিয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘কে কোন ধরনের ভিআইপি এবং তারা কেমন সুবিধা পাবেন, সেটাও সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত না। এ কারণে অপব্যবহারের সুযোগটা বেশি এবং তারা ধরেই নেয় যে, এসব তাদের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে।’

সরকারি কর্মকর্তাদের এই প্রবণতা কেন, এমন প্রশ্নে টিআইবি পরিচালক বলেন, ‘যাদের হাতে ক্ষমতা থাকে, তারা ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ পায়, অনিয়ন্ত্রিতভাবে ক্ষমতা ব্যবহারের উপায় থাকে। ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে কোনো দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহিতা নেই। জবাবদিহিতার কোনো ব্যবস্থা না থাকার ফলে এই সুযোগ বেড়ে যায়।’

তিনি মনে করেন, যদি ভিআইপিরা ন্যায্যভাবে তাদের সুবিধার জন্য ক্ষমতা প্রয়োগ করেন, তাহলে কোনো আপত্তি থাকার কথা না। কিন্তু সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার খর্ব করে তা হতে পারে না।

যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘ভিআইপি এবং তাদেরকে দেয় সুবিধাদি বিষয়ে বিস্তর আলোচনা শুনতে শুনতে আমার মনে একটা প্রশ্ন জাগল, একটি গণপ্রজাতন্ত্রে ভিআইপি আক্ষরিক অর্থে “ভেরি ইম্পরট্যান্ট পার্সন” তো পাঁচজন হলেই যথেষ্ট—নির্বাহী বিভাগের প্রধান (রাষ্ট্রপতি), আইন বিভাগের তিনটি শীর্ষস্থানীয় পদাধিকারী (নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, নির্বাচিত বিরোধী দলীয় প্রধান, সংসদের স্পিকার) এবং বিচার বিভাগের প্রধান (প্রধান বিচারপতি)। বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ আদালতের সদস্যরা বিবেচিত হবেন সন্মানীয় বলে। রাষ্ট্র ও সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাকিরা হয় প্রজাতন্ত্রের “কর্মচারী” নতুবা নাগরিকদের “প্রতিনিধি”। রাষ্ট্রের মালিক জনগণের কিংবা গণপ্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের এরচেয়ে বেশি “ভিআইপি” কি আদৌ দরকার?’

দেশের সড়কে চলাচলে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ছাড়া অন্য কারও ক্ষেত্রে ভিআইপি সুবিধার কোনো বিধান বা ব্যবস্থা নেই। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার জন্য চলাচলের ১৫ মিনিট আগে সড়কের একপাশ ফাঁকা করে দেওয়া হয়। অন্য যারা ভিআইপি রয়েছেন, নিরাপত্তা প্রকোটল পেলেও সড়কে যাতায়াতের জন্য তাদের কোনো বাড়তি সুযোগ নেই। সাধারণ নিয়মের মধ্যে থেকেই তাদের চলাচল করতে হবে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার মফিজ উদ্দিন আহমেদ প্রিয়.কমকে বলেন, ‘মাননীয় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর চলাচলের সময় নিরাপত্তা প্রটোকল রেড বুক অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এই সুবিধা মন্ত্রী বা অন্য কেউ পাবেন না। অন্যরা নিরাপত্তা প্রটোকল পাবেন, কিন্তু চলাচল করতে হবে সাধারণের মতোই।’

একজন ভিআইপির অপেক্ষায় থাকা ফেরি সময়মতো না ছাড়ায় মারা যান তিতাস ঘোষ। ছবি: সংগৃহীত

ভিআইপি পরিচয় দিয়ে উল্টোপথে যাওয়া বন্ধ করতে পুলিশ কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানান ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার। তিনি বলেন, ‘এখন আপনি দেখবেন, উল্টোপথে যাওয়ার পরিমাণ কিন্তু নেই বললেই চলে। আমরা কাউকে ছাড় দেইনি। এ বিষয়ে ট্রাফিক বিভাগ খুবই কঠোর হয়েছে।’ 

তবে কখনো কখনো ভিআইপি ব্যক্তির কাজের গুরুত্ব বুঝে হয়তো কিছুটা সুবিধা দেওয়া হয়। কিন্তু এজন্য কোনো নিয়ম নেই, কাজ ও ব্যক্তির গুরুত্ব অনুযায়ী কখনো এটা হয়ে থাকে। তবে এটাও এখন খুব একটা হয় না বলে দাবি করেন মফিজ উদ্দিন আহমেদ।

রাজধানীর সড়কে এখন ভিআইপির সুবিধা নিতে চাইলেই কেউ সেই সুবিধা পান না। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জায়গায় ভিআইপির নামে যে সুবিধা নেওয়া হয় এবং সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হয়, এ বিষয়টি কীভাবে দেখছেন? এমন প্রশ্নে মফিজ উদ্দিন মনে করেন, প্রতিটি ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, এমন কোনো কাজ করা যাবে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চাইলেই মানুষের চলাচল নির্বিঘ্ন করা সম্ভব।

ভিআইপি সংস্কৃতি বন্ধে সবাইকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে বলে মনে করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তিনি মনে করেন, ভিআইপির সংজ্ঞা, তারা কোন ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাবেন এবং কোনটা পাবেন না, তা সুনির্দিষ্ট করতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি পরিষ্কার করতে হবে।

ভিআইপি কারা

‘দ্য স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স, ১৯৮৬’ আইনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান এবং বাইরের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান ব্যক্তি ভিআইপি হিসেবে গণ্য হবেন। এ ছাড়া সরকার কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে ভিআইপি হিসেবে ঘোষণা করলে, সেই ব্যক্তিও এর আওতাভুক্ত হবেন।

এ বিষয়ে পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোখলেছুর রহমান একটি টেলিভিশন টকশোতে বলেন, ‘রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধান ভিআইপি। যদি অন্য কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান বাংলাদেশে আসেন, তিনিও ভিআইপি। সরকার মনে করলে গেজেটের মাধ্যমে কাউকে ভিআইপি ঘোষণা করতে পারে। এর বাইরে কেউ ভিআইপি নন।’

তিনি মনে করেন, ভিআইপি বিষয়টি সামাজিকভাবে সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। অনেকেই ক্ষমতা প্রদর্শন করে থাকেন, তারা সম্মান পেয়ে থাকেন, বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এভাবেই ভিআইপি হয়ে গেছেন। কিন্তু এর কোনো আইনি সংজ্ঞা নেই। 

৩১ জুলাই, বুধবার হাইকোর্ট এক আদেশে বলেছে, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ছাড়া আর কেউ ভিআইপি নন। অন্য সবাই রাষ্ট্রের কর্মচারী।

প্রিয় সংবাদ/কামরুল

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...