১৪২৮ বঙ্গাব্দ, আলীপুরদুয়ার

চৈত্রের দিন ফুরিয়ে যায়নি তখনো। করিডোর পেরিয়ে ‘আলো’ নামীয় মানসিক হাসপাতালের মাঠে বসে গেলাম দুজনে সূর্যমুখী হয়ে, নয়ন ঢাকতেই এবার মনে পড়তে লাগল সেইসব দিনের কথা। হা

সকাল রয়
শব্দচিত্রকর
১৫ এপ্রিল ২০১৮, সময় - ২০:৪৫

প্রতীকী ছবি

(প্রিয়.কম) ওই যে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে মাথা উঁচু করা চোখে পর্বতসমান ভাবনা নিয়ে গগনমুখী হয়ে আছে যে জন, তিনি এক সময়কার কবি, নাম বললেই চিনতে পারবেন। এভাবেই কথা ছুড়ে দিচ্ছিলেন ফেলো ডাক্তার, ফিরছিলাম আলীদুয়ারপুর পাগলা গারদ থেকে। কবিগণ পাগল হয় জানতাম, তাই বলে খ্যাতির চূড়ায় উঠে একেবারে পাগলা গারদে।

আমরা সিঁড়ি ধরে নামছিলাম। প্রতিটি ধাপে ধাপে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখে থাকা মানুষগুলোর আত্মপ্রলাপ বাজছে তখন। ফেলো ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ক্যামন যেন চেনা মনে হচ্ছিল মুখটা, কোনজন ইনি, বলুন তো?’

‘জাদুর বাক্সের সনেট নিশ্চয়ই শুনেছেন, নাগরিক কবি। তিনি একাধারে বেশ কিছু পদক লুফে নিয়েছিলেন। কণ্ঠমণ্ডলে রাজনীতির কবচ ছিল, চিনতে পেরেছেন কী এবার?’-কথাগুলো বলে থেমে গেল ফেলু ডাক্তার।

চৈত্রের দিন ফুরিয়ে যায়নি তখনো। করিডোর পেরিয়ে ‘আলো’ নামীয় মানসিক হাসপাতালের মাঠে বসে গেলাম দুজনে সূর্যমুখী হয়ে, নয়ন ঢাকতেই এবার মনে পড়তে লাগল সেইসব দিনের কথা। হারপুন মেরে তিমিকে ঘায়েল করার চেয়ে লেখালেখি করে তখন বঙ্গসাহিত্যে উঠে আসাটাই সহজ ছিল। পিছলে পড়া রাজার নীতি নিয়ে দাপুটে এক কবি, একদিকে নির্ধারক হয়ে পদক বিলিয়ে দিতেন একদল কচুরিপানার মাঝে, আবার অন্যদিকে ধূমকেতুর মতো যখন লেখক ধ্বংসযজ্ঞ হচ্ছিল, তখন হাতগুটিয়ে কলার উঁচিয়ে খরগোশ হয়ে ঝোঁপের আড়ালে থাকতেন।

গা চকচকে দিন ছিল সে সময়। আমি তখন কমিউনিস্ট করি, ১৪০৯ বঙ্গাব্দ, উত্তাল তরঙ্গে সমাজ বদলে দেওয়ার রাজপথে নেমেছি মাত্র। কিন্তু আর এগোতে পারিনি।

স্রোতের বিপরীতে সবাই নাবিক হতে পারে না। স্বার্থের নদীতে হাবুডুবু খেয়ে কবি আজ পাগলা গারদে রোদ পোহাচ্ছে। আর আমি সেখানে দর্শক। দিন কেটে যায়, কিন্তু সময় বোধহয় কাউকেই ক্ষমা করে না।

ভাবতে ভাবতে উঠে দাঁড়ালাম। দুর্বার বুকে রেখে পা মাথা গলিয়ে শেষ দেখা দেখে নিলাম কবিকে। প্রলাপরাজা হয়ে দেয়ালের সাথে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। যখন আমি গেট পেরিয়ে বড় রাস্তায় উঠছি, পেছনে তখন বাজছে শেকল ভাঙার গান।

প্রিয় সাহিত্য/আজহার