(প্রিয়.কম) সময় ঠিক দুপুর তিনটে। আমি, সানজিদ, পরাগ, সাইফ এই চার জন হাজির হলাম ফার্মগেট। গন্তব্য ঢাকা সদরঘাট। সেদিন আবার আমাদের প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরছেন বলে তাঁর জন্য সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছিল তাই ৪ টার পরে অনেক রাস্তাই বন্ধ হয়ে যাবে, তাই আগে ভাগেই সদর ঘাট যাত্রা। গুলিস্তানের একটা বাসে উঠলাম, যথারীতি বাসে প্রচন্ড ভীড়, অসহনীয় গরম আর পুরো বাসে আমাদের চার জনের মুখেই শুধু হাসি। ঠিক বিকেল ৪ টায় নামলাম গুলিস্তান, সেখান থেকে সদরঘাট যাবার বাসে উঠলাম আবার। বিকেল ৪.৩০ এ নামলাম বাস থেকে। সেখান থেকে হেঁটে চলে গেলাম সদরঘাট। অনেক লঞ্চই দাড়িয়ে ছিলো পটুয়াখালী যাবার জন্য কিন্তু আমরা যাবো ঈগল-৩ লঞ্চে করে কারণ এই লঞ্চটাই ছিলো সবচাইতে বড় লঞ্চ। এই লঞ্চ খুজঁতে খুঁজতেই বেজে গেলো প্রায় পৌনে ছয়টা, অবশেষে জানলাম লঞ্চটাই এখনো আসেনাই সদরঘাটে। ৬ টার সময় লঞ্চের আগমনে আমাদের চার জনের হাসিমুখ ফিরে এলো আবার। আমি হতবাক এত বড় লঞ্চ দেখে। লঞ্চে উঠে গেলাম আমরা, উঠেই এসি কেবিন এর টিকেট কেটে ফেললাম তিনতলাতে। টিকেট করে কেবিন এর চাবি নিয়ে চলে গেলাম তিনতলায়। রুম খোলার পর সবার মনে হলো আহ কত সুন্দর কেবিন, আর আমার মনে হলো আমি যদি আর একটু শুকনো হতাম তাহলে কতই না ভালো হতো। লঞ্চ ছাড়বে ৭ টার সময়, তার আগেই আমরা লঞ্চের চার পাশ ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। দেখলাম এক লোক চার তলা ছাদে দাড়িয়ে আছে। আমরা জিজ্ঞেস করলাম ভাই ছাদে কিভাবে উঠলেন? উনি বললো যে তিন তলা থেকে ছাদে উঠা যায় না, ছাদে উঠতে হলে একদম নীচ তলা থেকে সিড়ি দিয়ে সরাসরি চার তলায় উঠতে হবে। আমি আর সানজিদ একটু অলস হওয়াতে আমরা তিন তলার পিছন দিকে হাটঁতে গেলাম আর সাইফ এবং পরাগ ছাদে উঠার সংকল্পে নীচ তলায় নেমে চার তলার ছাদে উঠবে বলে ভাবলো। আমরা যখন তিন তলার পিছনে গেলাম তখন দেখি তিন তলা থেকে ছাদে উঠার সিড়ি আমাদের সামনেই স্বসম্মানে দাড়িয়ে আছে, আমি আর সানজিদ একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসলাম আর পরাগ-সাইফ এর জন্য অপার চাহনিতে অপেক্ষায় রইলাম।

একটা কথা না বললেই নয়, সন্ধ্যার সময় বুড়িগঙ্গা টাকে অসাধারন লাগে, যারা দেখেননি তাদের বোঝানো বড্ড দায়। তারাও একটু পরে এসেই বোকা বনে গেলো। যাই হোক একটু পরে আমরা সবাই কেবিনে গেলাম, গিয়ে দেখি দুপাশে ছোট্ট দুটো খাট যার মধ্যে আমাদের মতো ছোট্ট মানুষগুলোর জায়গা হবে তাই ভাবছিলাম। একটু পরেই লঞ্চ ছাড়লো, লঞ্চ এর কি গতি! আমরা ভাবলাম একটু লঞ্চের সামনে থেকে ঘুরে আসা যাক, যেই ভাবা সেই কাজ, সামনে গিয়ে দেখি লঞ্চের চালক ও সামনেই দাঁড়িয়ে আছে, ভাবলাম উনি এখানে কেন? উনি একটু পর নিজ থেকেই বলছে " আমাগো লঞ্চের হেড লাইট টা গেছেগা, তাই সামনে দাঁড়াইছি" দেখলাম উনি নিজে দাঁড়িয়েই দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন কিভাবে অন্ধকারে লঞ্চটা চালিয়ে নিতে হবে। সাইফ এর আবার ঘুম ঘুম ভাব, সে চলে গেলো কেবিনে রেস্ট নিতে। আমরাও তার পিছু নিলাম, গিয়ে দেখি সাইফ আমাদের কেবিনের টিভির ডিশ লাইন ঠিক করাতে ব্যস্ত, একটু পরই টিভি অন হলো কিন্তু সমস্যা বাধঁলো অন্য জায়গায়, টিভির চ্যানেল চেন্জ করার জন্য যতই বাটন এ ক্লিক করি চেন্জ হয় না, কি ব্যাপার তা আবিষ্কার করার জন্য আমাদের প্রযুক্তিবিদ সাইফ দেখতে লাগলো টিভির খুটিনাটি। লঞ্চে উঠে সবারই পানির পিপাসা পেলো, পানি কিনতে যেতে হবে নিচ তলায়, আমি, সানজিদ আর পরাগ বের হবো বলে ভাবলাম, সাইফ বললো আমিও যাবো। কি আর করা সবাই মিলে কেবিন লক করে রওয়ানা দিলাম "মিশন মিনারেল ওয়াটার" এ। যাবার সময় সব কেবিনেই দেখি সবাই একই চ্যানেল দেখছে, সবার মধ্যে কত্ত মিল, দোতলাতেও একই অবস্থা সবাই এক চ্যানেলেই বুদ হয়ে আছে, নিচতলায় ডেকের বড় টিভিতেও ওই চ্যানেল। অবশেষে আবিষ্কার করলাম সেই ধ্রুব সত্য, পুরো লঞ্চেই এক চ্যানেল আর তা লঞ্চের থেকেই চলছে। হাসি ছাড়া মুখে আর কিছুই এলো না। ২৫ টাকার পানি ৪০ টাকায় কিনে আমরা চলে এলাম তিনতলায়, সাইফ ঢুকলো রুমে আর আমরা বারান্দায় বসে অপেক্ষা করছি কখন লঞ্চ নারায়ণগঞ্জ এর ফতুল্লায় ভিড়বে, পাচঁ ছয় মিনিটের মধ্যেই উত্তর মিললো।

লঞ্চ ফতুল্লায় ভিড়বার পর দেখি আরেক কান্ড! আমরা যখন লঞ্চে উঠি তখন ডেকের ভাড়া ছিলো ২০০ টাকা, লঞ্চ ছাড়ার আগে ডেকের ভাড়া হয় ১০০ টাকা, ফতুল্লাতে এসে ভাড়া ৫০ করে দিলো তারা, এ কি করে সম্ভব! আমাদের এ সম্ভাবনা কে উড়িয়ে দিয়ে আমাদের পাশের লঞ্চ এম ভি জামান-৫ ডেকের ভাড়া ২০ টাকা করে দিলো পটুয়াখালী পর্যন্ত। পুরোই হতবাক। ঠিক ৬ মিনিট পর আমাদের লঞ্চ যাত্রা শুরু করলো আবার, ঘড়িতে তখন রাত ৮ টা। এখন আর থামাথামি নেই। আমরা সবাই কেবিনে ঢুকলাম। আড্ডা দিলাম, লঞ্চে উঠার আগে কেনা জলখাবার গুলো সাবাড় করলাম....আহা! কত কি ই না করলাম। রাত ৮.৪৫ যখন বাজে তখন এশার নামাজটা শেষ করে আমি, সানজিদ, পরাগ চলে গেলাম একেবারে লঞ্চের সামনে, গিয়ে দেখি আমাদের লঞ্চের হেড লাইট ঠিক হয়ে গেছে। আমাদের লঞ্চের দুপাশ দিয়েই অনেক লঞ্চ ছুটে চলেছে আমরাও ছুটছি দূর্বার গতিতে। কিছুক্ষণ পর সাইফ এর কল, টিকেট চেকার এসেছে। আমি গেলাম। একটু পর পরাগ সানজিদ আসলো, বারান্দায় বসে আড্ডা দিলাম সবাই। ঘড়িতে যখন রাত ১০ টা তখন আমরা খাবার খেতে কেন্টিনে গেলাম নিচ তলায়, কেন্টিনে ঢুকে প্রথম মনে হলো এখানকার খাবার আর কেমন হবে। ভাত, ভর্তা, মুরগী আর ডালের চচ্চরি নিলাম। এক লোকমা মুখে দেবার পর যে অনুভূতি হলো, বিশ্বাস করুন আর নাইবা করুন অনেক ভালো মানের রেস্টুরেন্ট এ খেলেও আপনার এ অনুভূতি হবেনা। অনেক দিন পর আঙ্গুল চেটেপুটে খেলাম, সুস্বাদ কাকে বলে তা বুঝলাম। আহা! এসময় ফিরে আসুক বারে বার। খাওয়া দাওয়া শেষ করে আমরা পুরো লঞ্চ টা ঘুরেফিরে অবশেষে চলে গেলাম তিনতলায় লঞ্চের একদম সামনে। চারদিক অন্ধকার, আকাশের একপাশে হালকা করে বিজলী চমকাচ্ছে। আর মাথার উপর খোলা আকাশ, তারা ভরা আকাশ। আমরা চারজন ডেকে শুয়ে পড়লাম, আর দুচোখ দিয়ে দেখতে লাগলাম সৃষ্টিকর্তার অপার সৃষ্টি, তারা ভরা আকাশ যে এতটা সুন্দর হতে পারে তা কেউ না দেখলে বুঝতে পারবেন না, সত্যি বলছি পারবেনই না। আমার মোবাইল এ মৃদু সাউন্ড এ চলছে "মেরে দিল ভি কিতনা পাগল হ্যায়" এর মতো পুরনো আরও অনেক গান, আর রাত কাটছে অবিরাম, তারা ভরা রাতের সৌন্দর্যের কাছে যেন সবকিছুই ম্লান হয়ে যাচ্ছে।

রাত যখন ১২ টা, তখন আমাদের সবার চোখেই ভর করেছে ঘুম কারণ সারাদিন অনেক খাটুনি গিয়েছে। সবাই মিলেই ঘুমিয়ে গেলাম রুমে, রাত যখন ৪ টা তখন আমার ঘুম ভাঙ্গলো, দরজা খুললাম, বারান্দায় গিয়ে বসলাম, কি অপরূপ নিস্তব্ধতা, কি অনাবিল ছুটে চলা, এ পথ যদি শেষ না হতো... একটু পর হাজির হলো পরাগ, দুজন মিলে একটু হাঁটাহাঁটি করে আবার শুয়ে পড়লাম, চোখ মেলে দেখি লঞ্চ দাঁড়িয়ে আছে, চারদিকে ভোরের আলো, নিষ্পাপ প্রকৃতি মোহময়তায় নিবিড় হয়ে ছিলাম আমরা চারজন। এ কেমন জায়গা, পাখিদের কলরব আর সূয্যি মামার আগমন, নেই কোনো কোলাহল, কি করে ফেলে যাবো এই মুহূর্ত টাকে একলা করে। তারপরও যেতে হবে। সকাল ৭ টায় আমরা লঞ্চ থেকে নামলাম পটুয়াখালীর মাটিতে। কুমিল্লাতে থাকি বলে বলছিনা, সেখানকার সুযোগ সুবিধা আর আমাদের এখানকার সুযোগ সুবিধায় আকাশ পাতাল ব্যবধান। একটা অটো ঠিক করলাম পটুয়াখালী বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত, কারন পটুয়াখালী থেকে বাসে করে যেতে হবে কুয়াকাটাতে। অটো তে করে পটুয়াখালীর প্রকৃতি দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম বাসস্ট্যান্ড। বাসস্ট্যান্ড থেকে কুয়াকাটার বাসে উঠে পড়লাম, আর সময় গুণতে লাগলাম কুয়াকাটা পৌঁছাবার জন্য। পথে যেতে যেতে দেখলাম পথের দু ধারের মায়াময় প্রকৃতি, যা শুধু ডাকছে আর বলছে আমি কি তোমায় মুগ্ধ করেছি, করতে পেরেছি। হ্যাঁ, সত্যিই মুগ্ধ হয়েছি, তোমার অপরূপ রূপে। সকাল ৯ টায় বাস আমাদের কে ঠিক কুয়াকাটা সি বিচ এর পাশেই নামিয়ে দিলো, বিচ এর পাশেই একটা রেস্টুরেন্ট এ সকালের নাশতা সেরে নিলাম।

নাশতা করে ছুটে গেলাম সাগরের কাছে, তাকে এক নজর দেখার জন্য, দেখেই মন ভরে গেলো। বিশালতার সরলতার কাছে আমরা সবাই বন্দী হয়ে গেলাম, কুয়াকাটা সি বিচ এর সবচেয়ে সুন্দরতম বৈশিষ্ট্য হলো এর খোলা আকাশ যা আর কোনো সমুদ্র সৈকতে নেই। ঠিক করলাম, সাগরের পাশেই থাকতে হবে আর তাই শুরু হলো " মিশন হোটেল খোজাঁখুজিঁ "। হোটেল তাজ এ উঠে পড়লাম, মোটামুটি মানের হোটেল, সেখানে ভালো হোটেল নেই বললেই চলে। হোটেল রুমে ঢুকে ফ্রেশ হলাম, একটু রেস্ট নিলাম। সকাল ১১ টা যখন ঘড়ির কাঁটায় তখন বের হলাম সমুদ্র স্নানে, এর আগে অবশ্য পরদিন সন্ধ্যা ৭ টার বাসের টিকেট কেটে নিলাম। কুয়াকাটার সমুদ্র সৈকতটাতে গোসল করা টা একটু নিরাপদ মনে হলো আমার কাছে, কারণ কক্সবাজার বা ইনানী সি বিচ এ যেটা দেখলাম যে সেখানকার সাগরের নিচে মাটির স্তরটা একটু ঢালু যার কারনে একটু দুরে গেলেই পানি গলা পর্যন্ত চলে আসে ফলে ঢেউ আসলে পায়ের তলায় আর মাটি থাকেনা কিন্তু কুয়াকাটাতে ভিন্ন চিত্র দেখলাম, সেখানে অনেক দূর পর্যন্ত গেলেও মাটি পায়ের নিচেই থাকে। যদিও সব কিছুই মহান সৃষ্টিকর্তার হাতে। আমরা সবাই সাগরে গোসল করলাম তবে বেশি দূরে গেলাম না। দুপুর ১ টায় হোটেল রুমে ফিরে এসে গোসল করে সবাই একটু ঘুমিয়ে নিলাম। ঘুম থেকে উঠে দেখি দুপুর আড়াইটা বাজে, হুড়মুড়িয়ে সবাই উঠে পড়লাম, দুপুর এর খাবার খেতে হবে। আমাদের হোটেল এর বিপরীত পাশেই একটা রেস্টুরেন্ট ছিলো সেটাতেই সেরে নিলাম দুপুরের খাবার টা, মেন্যুতে ছিলো সামুদ্রিক মাছ, ভাত আর ডাল। তৃপ্তির ঢেকুর তুলে খাবার শেষ করতে করতে দুপুর সাড়ে তিনটে। এবার কি করবো, ভাবছিলাম, চিন্তা করলাম সবাই মিলে হাটঁতে থাকি। রাস্তায় বেরুতেই অনেক মোটরসাইকেল চালক রা আমাদের কুয়াকাটার বিভিন্ন স্পট ঘুরে দেখার প্রস্তাব জানালো, আমরাও তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে করতে হাটঁতে লাগলাম। হঠাৎ করেই মেঘ সরে গিয়ে কড়া রোদ ঠিক আমাদের মাথার উপর। আমরাও ছায়া খোজাঁর জন্য সাগরের পাড় এর দিকের গাছ গুলোর দিকে হাঁটা শুরু করলাম আর নীল আকাশের নীচে সেলফি তুলতে লাগলাম। একটু পর একটা ডাবের দোকান পেয়ে গেলাম সাথে সুনিবিড় ছায়া। চারজনে মিলে দুটো ডাব কিনলাম, ডাবের পানি এত বেশি ছিলো শেষই হচ্ছিলো না, তাও শেষ করলাম। এরপর আবার সাগরের পাড় ধরে হাঁটা, হাটঁতে হাটঁতে একটা খাট পেয়ে গেলাম সাগরের পাড়েই আর উপরে গাছের সুন্দর ছায়া, ভাবলাম কেনো এত সুন্দর একটা জায়গা এখনও খালি পড়ে আছে? আমরা অতি দ্রুত গিয়ে খাটের একাকীত্ব দূর করলাম। খাটও আমাদের সাদরে গ্রহন করলো আর সহ্য করলো ঠিক বিকেল সাড়ে পাচঁটা পর্যন্ত, এই সময়ে শুধু সাগরের বিশালতার দিকেই চেয়ে রইলাম, আর ভাবলাম সাগরটার কোনো অহংকার নেই আর আমরা মানুষ একটু বড় হলেই অহংকার অহংকারী রূপে আমাদের উপর ভর করে।

পৌনে ছয়টা বাজলে সূর্য ডুববে তাই সূয্যি মামার কাছাকাছি চলে গেলাম এর আগেই, গিয়ে দেখি সূয্যি মামা বিদায় নেবার জন্য মেঘ গুলোকে রাঙ্গিয়ে দিয়ে যাচ্ছে আর বলে যাচ্ছে রাত টাকে দেখে রাখিস কিন্তু। পৌনে ছয়টা যখন বাজলো দেখলাম আর সাক্ষী হলাম জীবনের সেরা সূর্যাস্তের দৃশ্যের, হলফ করে বলছি, এরকম দৃশ্য আর কোথাও পাবেন না। সূর্য তার পুরো বৃত্ত নিয়ে ডুবে যাচ্ছে, আহা সে দৃশ্য চাইলেও ভোলা সম্ভব না, সেই সাথে আলোটাও ধীরে ধীরে লুকিয়ে পড়ছে আমাদের অজান্তেই। সাইফ আমাকে একটা মোটরসাইকেলে করে নিজে চালিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে এলো সাগরপাড়ে, সেই মোটরসাইকেল চালকের সাথে পরদিন সকালের সূর্যোদয় সহ আর কয়েকটা স্পট ঘুরে দেখবার জন্য কথা বলে নিলাম। একটু পরই রাত নেমে এলো, আমরা সাগরের পাড়ে রাখা মাছের দোকান গুলো ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম, অনেক মাছ ছিলো সেখানে। আমাদের একটা টুনা মাছ পছন্দ হলো, দাম ৩০০ টাকা চাইলো, আমরা পরে আসবো কথা দিয়ে সামনে হাটঁতে লাগলাম। হাটঁতে হাটঁতে ক্লান্ত হয়ে এক কাপ চা খেয়ে আমরা এবার সাগর পাড়ে রাখা বেঞ্চ গুলোতে বসলাম। প্রতি ঘন্টা ৩০ টাকা করে, এক বুড়ো চাচা এই বেঞ্চের দায়িত্বে ছিলেন, আমাদের বসিয়ে দিয়ে তিনি কোথায় যেনো হাটঁতে গেলেন। আমরা সবাই বেঞ্চে শুয়ে সাগরের গর্জন শুনছি। সাইফ তার আইফোনে বাংলাদেশ-আফগানিস্তান এর খেলা চালু করলো, আমরাও কিছুক্ষণ ধরে খেলা দেখলাম। আধা ঘন্টা পরে আমরা সবাই উঠে পড়লাম, কিন্তু সমস্যা বাধঁলো অন্য জায়গায়, যে লোকটা বেঞ্চ ভাড়া দিলো সে লোকটা নাই, টাকা কাকে দিবো বুঝতে পারলাম না। পরদিন দিবো ভেবে সেখান থেকে চলে গেলাম আর পাশের চা দোকানি কে বলে গেলাম। একটু পর গেলাম সেই মাছের দোকানে, গিয়ে তো পুরোই হতবাক, ৩০০ টাকার মাছটা ৪৫০ টাকা চেয়ে বসলো সে। আমরাও ছাড়ার পাত্র না, শেষমেষ ৩০০ টাকা দিয়েই মাছ খাবো বলে ঠিক করলাম। মাছ ভাজি করা চলছে, আর আমরা অপেক্ষা করছি ভোজন এর। হঠাৎ করেই আমাদের পিছনে শুরু হলো গান, লোক গান, সাগর যেন নিজেই সুর দিচ্ছে সে গানে। কিছুক্ষণ এর মধ্যে মাছ চলে এলো। মাছ খাওয়া, গান শোনা, সাগরের গর্জন আর নিরুত্তর আকাশের তারার সাথে সময়টা কাটলো দারুণ।

রাত যখন ১০ টা তখন আমরা রুমে ফিরলাম, একটু পর চলে গেলো কারেন্ট, জেনারেটর চালু করলো কিন্তু গরমের কারনে টিকতে না পেরে আমরা হাজির হলাম ছাদে। ছাদ থেকে সমুদ্র দেখছি কিন্তু মন ভরছে না তাই আবার রাত ১১ টায় চলে গেলাম সাগরের কাছে, এখন সাগর আরো কাছে এসে পড়েছে, ঢেউ গুলো পায়ে এসে লাগছে, ভালোই লাগছে, লাগতেই হবে, রাত ১২ টায় কারেন্ট আসার পর আমরা রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম কারন পরদিন ভোরে উঠতে হবে সূর্যোদয় দেখার জন্য। পরদিন ভোরে কল এলো মোবাইলে আমাদের গাইডের, আমরাও উঠে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। সকালের ঠান্ডা বাতাসে বের হলাম আমরা। আমি আর সাইফ একটা মোটরসাইকেলে আর সানজিদ - পরাগ আরেকটাতে, রওয়ানা দিলাম সাগরের পাশ দিয়ে গঙ্গামতির চরের উদ্দেশ্যে। ভোরবেলা সাগরের দৃশ্যটা অসাধারণ লাগে। সাগর দেখতে দেখতে ঠিক সাড়ে পাচঁটায় আমরা পৌছে গেলাম গঙ্গামতির চরে। পাঁচটা বেজে সাতচল্লিশ মিনিটে সূর্য তার নিজ মহিমায় উদ্ভাসিত হতে লাগলো, "গতকাল যাকে দিয়েছিনু বিদায় সেই আজ ফিরছে আলোক ছায়ায়" এই গান গাইতে গাইতে সূর্য তার পরিপূর্ণ রূপে ফিরে এলো। ভুলবোনা এই মুহূর্তটাকে। স্মৃতিতে থাকবে অমলিন হয়ে। পরবর্তী যাত্রা কাউয়ার চরে এজন্য মোটরসাইকেল সহ নৌকা দিয়ে পেরোতে হবে গঙ্গামতির লেক। তাই হলো মোটরসাইকেল সহ আমরা নৌকা দিয়ে পার হলাম লেক এরপর বনের ভিতর দিয়ে আবার ছুটে চলা একটু পরই চলে এলাম কাউয়ার চরে, সেখানে নৌকার পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে রওয়ানা দিলাম ক্র্যাব আইল্যান্ড এর উদ্দেশ্য। ক্র্যাব আইল্যান্ডে পৌঁছে লাল কাকড়ার দল দেখে তো আমরা পুরোই হতবাক, লাখ লাখ লাল কাকড়া সাগরের পাড়ে ছুটছে আর ছুটছি আমরাও, পাশেই ছিলো ঝাউবন, ঝাউবন এ গিয়ে ছবি তুলে ফিরে এলাম আমরা তখন সকাল ৭ টা। এরপর এর গন্তব্য মিশ্রিপাড়া রাখাইন পল্লীর উদ্দেশ্য। রওয়ানা দিলাম এক গ্রামের ভিতর দিয়ে, কাঁচা রাস্তা, আকাঁবাকাঁ পথ, পাখির কলকাকলি সব মিলিয়ে দারুন সময় কাটছিলো, পথে এক আজব ভয়ংকর ভাঙ্গা ব্রীজ পের হলাম আমরা, এই ব্রীজ এ উঠলে যে কারো হার্ট বিট বেড়ে যেতে বাধ্য। ব্রীজ এক পাশের এর অর্ধাংশ ছিলোইনা। সকাল ৮ টায় আমরা পৌঁছালাম মিশ্রিপাড়া রাখাইন পল্লীতে, সেখানে গিয়ে সকালের নাস্তা সেরে নিলাম গরম গরম পরোটা আর ভাজি দিয়ে, নাশতার পর চা খাওয়ার জন্য পাশের দোকানে গেলাম। চা দোকানদার একদম বুড়ো মানুষ, চার কাপ চা বানাতে তিনি সময় নিলেন ঠিক ১৫ মিনিট, কিন্তু তার চা বানানোর পদ্ধতিটা সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিলো, কারণ টা বুঝলাম না। আমাদের অপেক্ষার বাধঁ ভেঙ্গে যাবার আগেই আমরা চা পেলাম, চা টা মুখে দেবার সাথে সাথেই বুঝলাম কেনো চা বানানোর পদ্ধতিটা আলাদা, এই চা আর কোথাও বানাতে পারবে কিনা আমার সন্দেহ আছে, এতটাই ভালো ছিলো চা টা।

চা খেয়ে আমরা রাখাইনদের ৩৬ ফুট উচুঁ বৌদ্ধ মন্দির দেখতে গেলাম আর তার পাশেই ছিলো একটা কুয়ো, সেটাও দেখে ঢুকলাম রাখাইন পল্লীতে। রাখাইনদের জীবনযাপন একটু আলাদা। তাদের জীবিকার প্রধান উৎস তাঁত শিল্প, আমরা তাদের হাতে তৈরী বিভিন্ন চাদর, পান্জাবী, ফতুয়া আরও অনেক কিছুই দেখলাম। আমি আর সাইফ এক রাখাইন তরুণীর দোকানে গেলাম গিয়ে দেখি সে চাদর বানাচ্ছে আর আমাদের দেখা মাত্রই সরে গেলো, তারা সাধারণ মানুষের সামনে চাদর তৈরী করে দেখায় না, তারপরও আমাদের স্মার্ট বয় সাইফ এর অনুরোধে রাখাইন তরুণীটি চাদর তৈরী করে দেখালো। রাখাইন পল্লী ঘুরার পরে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য কুয়াকাটা জিরো পয়েন্ট আর কুয়াকাটার বিখ্যাত কুয়া দেখা। সকাল ৯ টায় আমরা কুয়াকাটার সেই বিখ্যাত কুয়ার সামনে চলে গেলাম, গেইট বন্ধ থাকায় কুয়োর ভিতরটা দেখতে পারলাম না। সেখানে টুকিটাকি ছবি তুলে রওয়ানা দিলাম সুন্দরবনের এক পাশ দেখে আসার জন্য, সাথে দেখবো লেবুর চর ও। সাগরের পাশ দিয়ে চলছি আমরা, একটা বাধঁ এর সামনে দাড়িয়ে কিছু ছবি তুলে আমরা কিছুক্ষণ এর মধ্যেই পৌছে গেলাম সুন্দরবনের এক পাশে, সেখানে সুন্দরবন এর দৃশ্য দেখলাম, যদিও খুব ভালো করে দেখতে পারলাম না, সেখানে তিন নদীর মোহনাও ছিলো, আর আমরা তখন বাংলাদেশের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে দেখছি দূর নীলিমার সৌন্দর্য। সেখান থেকে আমরা আসলাম লেবুর চরে, সেখানে বনের ভিতরে জোয়ারের পানি ঢুকছে আর পুরো বন পানিতে ছলছল করে উঠছে। সময় কাটালাম সেখানেও কিছুক্ষণ। অবশেষে ফিরে আসবার পালা, হোটেলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম আমরা। আসার সময় আরেক অপরুপ মুহূর্তের সাক্ষী হলাম আমরা , বৃষ্টি মুহূর্ত, সেখানে মোটরসাইকেলের এক পাশে মুষুলধারে বৃষ্টি, আর অন্য পাশে কড়া রোদ। সারাজীবনের জন্য মনে রাখার মতো স্মৃতি।

সকাল সাড়ে দশটায় আমরা ফিরে এলাম হোটেল রুমে, সেখানে একটু রেস্ট নিয়ে সকাল এগারোটায় বের হলাম সমুদ্রস্নানে, রৌদ্রজ্জ্বল দিনে সমুদ্রে সময় কাটিয়ে দুপুর ১ টায় ফিরলাম রুমে, গোসল সেরে আমরা খাবার খাওয়ার জন্য বেরুলাম, সেদিন পরাগ বিরিয়ানী খেতে চাইলো তাই বিরিয়ানীর খোঁজে বেরুলাম আমরা, পেয়েও গেলাম কিছুক্ষণ এর মধ্যে, কিন্তু রেস্টুরেন্ট দেখে বিরিয়ানী কেমন হবে তা ধারণা করে ভাত ই খেয়ে নিলাম আমরা, ভালোই লাগলো। সানজিদ মিষ্টি খেতে চাইলো কিন্তু সেখানে ভালো মিষ্টি নেই, একজন বললো লেবুখালী ফেরি ঘাটে রয়েছে বিখ্যাত মিষ্টির দোকান, কিন্তু লেবু খালী ফেরী ঘাটে বাসে করে যেতেই লাগে তিন ঘন্টা। আমরা এ কথা শুনে আবার হাটঁতে লাগলাম, ছায়ার খোঁজে। হাটঁতে হাটঁতে আমরা এক দোকানে গিয়ে আইসক্রীম খেতে গেলাম, গিয়ে দেখি ছোট্ট একটা আইসক্রীমের দাম ১০ টাকা, আমরা বললাম এটা কি কোনো স্পেশাল আইসক্রীম? দোকানদার বললো, হ্যাঁ, উনার কথায় ভরসা করে আইসক্রীমটা কিনলাম, কিনে মুখে দিতেই যে অনু সাগরের পাড়ে বিকেলটা কাটিয়ে আমরা গেলাম শপিং করতে, শপিং শেষ করে সাগর পাড়ে শেষ সূর্যাস্ত দেখতে হাজির হলাম, সূয্যি মামা শেষ বারের মতো বিদায় জানালো আমাদের, আর বলে গেলো আবারো হবে দেখা কোনো এক গোধূলী লগনে। আমরাও সেই অপেক্ষায় রইলাম। রাত সাতটায় আমাদের বাস, পৌঁছে গেলাম ঠিক সাড়ে ছয়টায় বাস কাউন্টারে। বাসের নাম সুরভী পরিবহন, একদম ঝকঝকে নতুন বাস, সন্ধ্যা সাতটায় ছাড়লো বাস। বাস ছাড়ার পরই শুরু হলো গতির খেলা, অসাধারণ দক্ষতায় ড্রাইভার বাস চালাচ্ছিলেন, আমাদের কুমিল্লা চাদঁপুর এর সরু রাস্তার মতো রাস্তায় তিনি রাতের বেলা ১০০-১১০ স্পিডে বাস চালাচ্ছিলেন, যা আমরা সাইফের আইফোনের বদৌলতে জানতে পেরেছিলাম। রাত ৯ টায় আমরা পটুয়াখালী পার হয়ে পৌঁছাই লেবুখালী ফেরিঘাটে। সেখানে কাউকে কিছু না বলে আমি বাস থেকে নেমে যাই মিষ্টি কেনার জন্য, লেবুখালীর সে বিখ্যাত মিষ্টির দোকান খুজেঁ বের করতে খুব একটা কষ্ট হলো না, বাস ফেরিতে উঠার আগেই ফিরে এলাম আমি, মিষ্টি পেয়ে সানজিদ এর মুখে হাসি। আমিও খুশি। আমাদের বাস ফেরি পার হলো, কিন্তু সমস্যা বাধঁলো অন্য জায়গায়, আমাদের বাসের সুপারভাইজার রয়ে গেছেন নদীর ওপারেই, অগত্যা উনার জন্য আবারো অপেক্ষায় রইলাম আমরা, একটু পর তিনি এলেন আর আমরাও ছুটে চললাম দুর্দান্ত গতিতে। বরিশাল, বরগুনা, ঝালকাঠি পেরিয়ে আমরা রাত একটায় পৌছুলাম রাজবাড়ি জেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে। সেখানে গিয়ে বাধঁলো মহা বিপত্তি, বাস নড়ছেই না। ঠিক ছয় ঘন্টা জ্যাম শেষে সকাল ৭ টায় আমরা ফেরিতে উঠতে পারলাম, ফেরি পেরোতে লাগলো আধা ঘন্টার মতো, সেখান থেকে আবারো ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা। মানিকগন্জ পেরিয়ে আমরা সকাল ১০ টায় পৌঁছালাম ঢাকার টেকনিক্যালে , গুলিস্তানে সকালের নাশতা সেরে নিয়ে দুপুর বারোটায় কুমিল্লার বাসে উঠলাম। দুপুর দুটোয় পৌছুলাম কুমিল্লাতে। কুমিল্লাতে পা রাখার সাথে সাথেই শেষ হলো অনেক দিনের স্মৃতি হতে যাওয়া এ ভ্রমণ। মহান আল্লাহ তায়ালা অশেষ রহমতে আমরা আমাদের ভ্রমণ সম্পন্ন করেছি। মনে থাকবে কুয়াকাটা ট্যুরটা, সূর্যাস্তের বিদায়, সূয্যি মামার ঘুম থেকে জেগে উঠা, লাল কাকঁড়ার অবাধ বিচরণ, সুন্দরবন, লেবুর চর, বৃষ্টিক্ষন, সমুদ্রস্নান, সবকিছুই মনে রবে চিরকাল। ধন্যবাদ।

 

ভ্রমণ নিয়ে আপনার যেকোনো অভিজ্ঞতা, টিপস কিংবা লেখা পোস্ট করুন আমাদের সাইটে আর জিতে নিন একজন সঙ্গী নিয়ে ঢাকা-কক্সবাজার-ঢাকা বিমান টিকেটসহ দুই রাত, তিন দিন অভিজাত হোটেলে থাকার ব্যবস্থা।
আপনাদের মতামত জানাতে ই-মেইল করতে পারেন [email protected] এই ঠিকানায়।