(প্রিয়.কম) মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সেনা অভিযানে ৮৬ জন হিন্দু রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশ গুপ্ত। ৩ সেপ্টেম্বর রোববার বিকেলে কক্সবাজারের কুতুপালংয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া হিন্দু ধর্মাবলম্বী রোহিঙ্গাদের দেখতে গিয়ে তিনি এ তথ্য জানান।

রানা দাশ গুপ্ত উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, রাখাইন রাজ্যের মংডু চিকন ছড়ি গ্রামে ৪৮৯ জন হিন্দু নারী, পুরুষ ও শিশু বসবাস করত। সেনা অভিযান শুরু হলে ৮৬ জন হিন্দু রোহিঙ্গাকে হত্যা ছাড়াও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে হিন্দু রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর এবং লুট করা হয়েছে তাদের সব সম্পদ। ফলে নির্মম সহিংসতার শিকার হয়ে রাখাইন থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে ৫১৮ রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশু। এর মধ্যে কুতুপালংয়েই এসেছে ৪৯৩ জন।

কক্সবাজারের একটি রোহিঙ্গা শরনার্থী শিবির। ফাইল ছবি

কক্সবাজারের একটি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির। ফাইল ছবি

রানা দাশ গুপ্ত বলেন, গ্রাম বা পাড়া ছোট হলে তাতে সংবদ্ধভাবে হানা দেয় ৭০-৮০ জনের হামলাকারী দল, আর গ্রাম বা পাড়া বড় হলে ৩০০-৪০০ জনের হামলাকারী দল হানা দিচ্ছে। হামলাকারীরা কালো পোশাকে আবৃত, তাদের মুখ কালো মুখোশে ঢাকা থাকে। আর তাদের হাতে থাকে ছুরি, বন্দুক, চাপাতি, খন্তা, লোহার পাইপ। 

তিনি জানান, পালিয়ে আসা হিন্দু রোহিঙ্গারা জানিয়েছে চিকন ছড়ি ছাড়াও ফকিরা বাজার, পুরান বাজার, সাহেব বাজার, লইট্টা পাড়ার হিন্দু রোহিঙ্গারা হামলার শিকার হয়েছে।

কুতুপালংয়ের আশ্রয় শিবির পরদর্শনের সময় রানা দাস গুপ্তের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি পরিমল কান্তি চৌধুরী, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার সাধারণ সম্পাদক তাপস হৌড়, কক্সবাজারের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক প্রিয়তোষ শর্মা চন্দন ও স্থানীয় ইউপি সদস্য বখতিয়ার আহমদ প্রমুখ। এ সময় ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে হিন্দু রোহিঙ্গাদের মাঝে কাপড় ও খাদ্য বিতরণ করা হয়।

উল্লেখ্য, গত ২৫ আগষ্ট রোহিঙ্গাদের বিষয়ে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি অনানের একটি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের দিন রাখাইনের বেশ কয়েকটি পুলিশ পোস্টে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। এর পরপরই ‘সন্ত্রাসীদের’ রুখতে রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযান শুরু করে মিয়ানমার। এ অভিযানে এখন পর্যন্ত ৪০০ জনকে হত্যা এবং ২৬০০ ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার কথা শিকার করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। যদিও সেখান থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বলছেন হত্যা ও ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার এ সংখ্যা আরও বহুগুণ বেশি। তাদের ভাষ্যমতে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী শিশুদের জবাই করছে, নারীদের ধর্ষণের পর হত্যা করছে, পুরুষদেরও বর্বরোচিত নির্যাতনের পর হত্যা করছে, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে।

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, স্যাটেলাইট চিত্রের মাধ্যমে তারা নিশ্চিত হতে পেরেছে যে রাখাইনে বহু গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে।

জাতিসংঘ জানায়, রাখাইন রাজ্যে নতুন করে সহিংসতা শুরুর পর প্রাণ বাঁচাতে প্রতিদিন হাজার হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমার ছেড়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। গত এক সপ্তাহে ৭৩ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বিপদসংকুল নদী ও সমুদ্রপথে পাড়ি দিতে গিয়ে এ পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

এর আগে, জাতিগত দ্বন্দ্বের জেরে ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে দেশটির সেনা বাহিনীর চালানো একই রকম অভিযানে কয়েকশত রোহিঙ্গা নিহত হয়। জ্বালিয়ে দেওয়া হয় হাজারো ঘরবাড়ি। ওই সময়ে দেশটির সেনা বাহিনীর বিরুদ্ধে হত্য-ধর্ষণ-অগ্নিসংযোগের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে জাতিসংঘসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলো। ওই অভিযানের বর্বরতায় বাধ্য হয়ে অন্তত ৮০ হাজার রোহিঙ্গা পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করে।

রোহিঙ্গা একটি নৃগোষ্ঠীর নাম যাদের শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ ইসলাম ও ১০ ভাগ হিন্দু ধর্মাবলম্বী। রোহিঙ্গাদের আদি আবাসস্থল মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য। শত শত বছর ধরে রাজ্যটিতে বাস করা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি না দিয়ে মিয়ানমার সরকার এ জাতিগোষ্ঠীকে নির্মূল করতে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ চালাচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে হত্যা-নির্যাতনের শিকার হয়ে ইতোমধ্যে কমপক্ষে ১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।  

প্রিয় সংবাদ/শান্ত