(প্রিয়.কম) গত ১১ আগস্টে রাখাইন রাজ্যে সেনা মোতায়েনের পর মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অব্যাহত গণহত্যা ও ‘জাতিগত নিধন’ নিয়ে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় চলছে। আলোচনা ও সমালোচনার তুঙ্গে এখন রোহিঙ্গা ইস্যু। রাষ্ট্রের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যকে অস্বীকার করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এবং পুলিশ সীমান্তরক্ষীরা নির্বিচারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের হত্যা করছে, অগ্নিসংযোগ করছে, তাদের তাড়িয়ে দিচ্ছে জন্মভূমি থেকে।

অমানবিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে প্রাণ বাঁচাতে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে। এখনও সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে। এবারের নির্যাতন-নির্মমতা আগের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে। রোহিঙ্গাদের ওপরে দমন-পীড়নের তীব্র নিন্দার ঝড় উঠেছে বিশ্বজুড়ে। কিন্তু রোহিঙ্গা নির্যাতন যেন থামছেই না। এখনও প্রতিদিন হাজার হাজার রোহিঙ্গা বিভিন্ন পথ দিয়ে অনুপ্রবেশ করছে। তাদের মতে, এখনও গ্রাম পুড়িয়ে দিচ্ছে সেনাবাহিনীরা। চলছে নির্বিচারে অত্যাচার।

প্রাণ বাঁচাতে রোহিঙ্গারা ঢুকে পড়ছে বাংলাদেশে। গুলির মুখ থেকে বেঁচে এসে এদেশীয় মানুষের আপ্যায়নে মুগ্ধ তারা। এ দফায় আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা পাঁচ লাখেরও বেশি।  এসব রোহিঙ্গারা টেকনাফ-উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং গ্রামে গঞ্জে অবস্থান করছে। তাদের মুখে মুখে এখন শুধু এদেশের মানুষের ভালোবাসার কথা। সরকার প্রধান থেকে শুরু করে একেবারে প্রান্তীক জনগোষ্ঠী পর্যন্ত সবার ভালবাসা এবং আন্তরিকতা রোহিঙ্গাদের অনেকটাই অভিভূত করেছে।

বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা।

বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা। ফাইল ছবি

রোহিঙ্গারা বলছেন, বাংলাদেশের মানুষের ভালবাসা, আন্তরিকতা ও সহযোগীতার কথা তারা জীবনেও ভুলতে পারবেন না। আশ্রিত সব রোহিঙ্গারা অকপটে কৃতজ্ঞতার কথা স্বীকার করছেন। শরণার্থী ক্যাম্প, নদীর পাড়, সড়কের পাশে, বাসা-বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ এবং শিশু-কিশোরদের সাথে আলাপকালে স্থানীয়দের প্রতি তাদের ভালবাসা ও সহযোগীতার কথাই জানা গেছে।

স্থান সংকুলান না হওয়ায় রাতে ভালো করে ঘুমাতেও পারে না রোহিঙ্গারা। এর পরও চোখে মুখে যেন আনন্দের সুবাতাস। কেউ না কেউ এসে দিয়ে যাচ্ছে খাবার। চাহিদা না মিটলেও যে যেভাবে পারছে রোহিঙ্গাদের খাবারের যোগান দিয়ে যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞল থেকে প্রতিদিন বাস-ট্রাকে করে ত্রাণ আসছে প্রতিনিয়ত। স্থানীয়রা যে যেভাবে পারছে সেইভাবে তাদের থাকার খাবারের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। যে না পারে সে অন্তত কলসী মাথায় নিয়ে পানি খাওয়াচ্ছে তাদের। সহযোগীতার যেন অভাব হচ্ছে না রোহিঙ্গাদের।

মাতৃভূমি ছেড়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা এখন বাংলাদেশের মানুষের ভালবাসায় সিক্ত। রোহিঙ্গাদের সাথে প্রিয়.কম- এর এই প্রতিবেদকের কথা হলে উঠে আসে তাদের সুখ-দুঃখের কথা।

রোহিঙ্গা শরণার্থী।

বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা। ফাইল ছবি

কুতুপালং সি ব্লকে কথা হয় জুনাইদের সাথে। তিনি রাখাইনের বুথেডংয়ের জব্বারপাড়ার বাসিন্দা। তার কুড়েঘরে ঢুকতেই চট বিছিয়ে দিলেন। বসলাম তার পাশে। ওই সময় জুনাইদ মুড়ি এবং বিস্কুট খাচ্ছিলেন। তিনি বললেন, ‘এদেশের মানুষ অনেক ভালো। যেখানে আমাদের দেশের সরকার ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে, তাড়িয়ে দিয়েছে, নির্যাতন করেছে সেখানে এদেশের মানুষ আমাদের খেতে দিচ্ছে। এর চেয়ে ভালো আর কি হতে পারে!’

জুনাইদের সাথে কথা শেষ করে চলে আসার পথে দেখা হয় মংডু’র টাউনশিপের সিতরীক্ষা এলাকার শফিউল্লাহর ছেলে আবদুল মজিদের সাথে। তিনি বলেন, ‘তিনি (অং সান সুচি) আমাদের সব কিছু কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু এদেশের মানুষের ভালবাসা ও সহযোগীতা পেয়েছি। এখানে এসে নতুন করে জীবন পেলাম।’

পথ চলতে চলতে গিয়ে পৌঁছলাম বালুখালী। সেখানেতো রাস্তার পাশে পাহাড়ে যেদিকে চোখ যাবেই সেদিকেই শুধু রোহিঙ্গাদেরকেই চোখে পড়বে।

রাস্তার পাশে ঝুপড়ির এক কোণায় চোখে পড়ে শতবর্ষী এক বৃদ্ধ মহিলাকে। তার ডান হাতে একটি লাটি। বয়সের চাপ বহন করে ওই লাটি। মংডু’র হাচ্ছুরতা গ্রামের এই বৃদ্ধ মহিলাটির নাম আলফা বেগম। জানতে চাইলাম, কেমন আছেন? প্রথম প্রশ্নেই অনর্গল কথা বলতে লাগলেন বৃদ্ধা। তিনি বললেন, ‘অ বাজি এদেশের মানুষ এন ভালাদে ন, জাইনতাম। পর দেশ আইলেও নিজের দেশেতুন ভালা আছি। রাতিয়া থাকিয়ে হষ্ট আইলেও, খানাফিনাদ্যি ভালা আছি’।

রোহিঙ্গা ক্যাম্প।

বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা। ফাইল ছবি

যার অর্থ হলো- ‘এদেশের মানুষ এত ভালো তা জানতাম না। পর দেশ হলেও নিজের দেশ থেকে ভালো আছি। রাতে একটু কষ্ট হলেও খাওয়া দাওয়া নিয়ে কোন সমস্যা হচ্ছেনা।’ এভাবে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা জানালেন তাদের কথা। আর এ কারণেই বাঙ্গালীদের নিঃস্বার্থ ভালবাসায় মুগ্ধ হচ্ছেন এপারে আশ্রয় নেওয়া কয়েক লাখ রোহিঙ্গা।

এ বিষয়ে টেকনাফে রোহিঙ্গাদের ত্রাণ বিতরণ নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সমন্বয়কারী, সহকারী কমিশনার (ভুমি) প্রণয় চাকমা জানান, সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। যাতে রোহিঙ্গাদের কোন সমস্যা না হয়। বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা ত্রাণ সামগ্রীগুলো সবার মাঝে বন্টন করে দিচ্ছি। সবাই যাতে ঠিক মতো খাবার পায় সেদিকে লক্ষ্য রাখছি।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদ হোসেন ছিদ্দিক জানান, আমরা প্রতিনিয়ত মনিটরিং করছি। কোন বিশৃংখলা যাতে না হয়। তাদের ( রোহিঙ্গা) সমস্যা সমাধানে সরকার কাজ করছে। শৃংখলা বজায় রাখতে আমাদের পুলিশ বাহিনী রয়েছে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংক্রান্তে যাবতীয় কিছুতে সংশ্লিষ্ট লোকজন কাজ করলে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী আরো বেশী উপকৃত হবে।

প্রিয় সংবাদ/শিরিন/মিজান