ছবি সংগৃহীত

বাংলা ওসিআর বিতর্কের নেপথ্যে

ভাষা আন্দোলনের দেশে বাংলা ভাষার ডিজিটালাইজেশনের জন্য সাড়ে ৬ কোটি টাকা দিয়ে কেনা হয়েছিল 'বঙ্গ' নামের ওসিআর। এই ওসিআর বিতর্কের নেপথ্যে কী আছে?

এম. মিজানুর রহমান সোহেল
জেষ্ঠ্য প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২ মার্চ ২০১৭, ০৬:২৫ আপডেট: ১৯ আগস্ট ২০১৮, ১৪:০০
প্রকাশিত: ০২ মার্চ ২০১৭, ০৬:২৫ আপডেট: ১৯ আগস্ট ২০১৮, ১৪:০০


ছবি সংগৃহীত

বাংলা ওসিআর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টিম ইঞ্জিন ও আইসিটি বিভাগের লোগো। ছবি: সংগৃহীত। 

(প্রিয়.কম) বাংলা ভাষায় হাতে লেখা, টাইপ করা ও ছাপার অক্ষরের লেখাকে যন্ত্রে পাঠযোগ্য লেখায় রূপান্তর এবং বাংলা প্রকাশনাকে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করার জন্য সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকা খরচ করে কিনেছিল বাংলা অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিকগনিশন বা ওসিআর। ২০১৪ সালে এই সফটওয়্যারটি ক্রয় করা হলেও এর কোন রকম ব্যবহার হচ্ছে না। সফটওয়্যারটি কোথায় আছে, কার দায়িত্বে আছে, কে ব্যবহার করছে, এখন পর্যন্ত এই সফটওয়্যার দিয়ে কি কি কাজ করা হয়েছে এর কোন উত্তর কারও জানা নেই! তবে প্রিয়.কমের অনুসন্ধানে বের হয়েছে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য। বিস্তারিত জানাচ্ছেন এম. মিজানুর রহমান সোহেল। 

বাংলা ওসিআর-এর শুরুর কথা 

টিম ইঞ্জিন নামে বাংলাদেশি একটি প্রতিষ্ঠান ‘পুঁথি’ নামে বাংলা ওসিআর সফটওয়্যার উন্মুক্ত করে ২০১৪ সালের ৭ আগস্ট। তখন জানানো হয়েছিল ১৯৬৯ সালে মুনীর কীবোর্ড আবিস্কার, ১৯৭৩ সালে বাংলা টাইপরাইটার প্রবর্তন, ১৯৮৬ সালে শহীদলিপির আত্মপ্রকাশ, ১৯৮৮ সালে বিজয় কীবোর্ড প্রকাশ এবং ২০০৩ সালে ইউনিকোডভিত্তিক অভ্র কীবোর্ড প্রকাশের পর বাংলা ভাষার তথ্যপ্রযুক্তিতে নতুন মাইলফলক এই বাংলা ওসিআর ‘পুঁথি’। বিশ্বের ১৯৪টি দেশের মধ্যে মাত্র ৩৬টি দেশে ওসিআর চালু আছে। সে হিসেবে ৩৭তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশে ওসিআর পুঁথি উন্মুক্ত করা হয় বলেও জানানো হয়। রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সফটওয়্যারটি উন্মোচন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, তৎকালীন আইসিটি সচিব নজরুল ইসলাম খান, অধ্যাপক ড. জাফর ইকবাল, প্রযুক্তিবিদ মোস্তফা জব্বার, টিম ইঞ্জিনের সিইও সামিরা জুবেরী হিমিকা, অ্যামটবের মহাসচিব টিআইএম নুরুল কবীরসহ আরো অনেকে। অনুষ্ঠানে জানানো হয়েছিল, ২০১৪ সালের ১৫ আগস্ট টিম ইঞ্জিন এই ওসিআর সবার জন্য বিনামূল্যে উন্মোচন করবে। তবে কিছুদিন পরেই ‘পুঁথি’ নামের সফটওয়্যারটি কাস্টমাইজ করে ‘বঙ্গ’ নামে সরকারের কাছে ৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকা মূল্যে বিক্রি করে দেওয়া হয়। তথ্যপ্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বার বলছেন, সফটওয়্যারটি স্ক্যান করা মূল টেক্সটের ৯৬ শতাংশ নির্ভূলভাবে প্রদর্শন করবে বলে জানানো হলেও মন্ত্রণালয়ের কাছে ৮৭ শতাংশ কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চুক্তি করা হয়। ওসিআর কেনার জন্য সরকার টেন্ডার ডাকলেও শেষ পর্যন্ত টেন্ডার বাতিল করে অবৈধভাবে টিম ইঞ্জিনকে বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে ‘বঙ্গ’ ওসিআর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টিম ইঞ্জিনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সামিরা জুবেরী হিমিকা বলছেন, টিম ইঞ্জিনের সাথেই প্রথমে চুক্তি হয়েছিল। এরপর টেন্ডার ডাকা হলে তাদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে টেন্ডার বাতিল করে তাদের বরাদ্দ দেওয়া হয়। এটুআই-এর ইনোভেশন ফান্ড বিভাগের মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন প্রিয়.কমকে জানিয়েছেন, এটুআই-এর ইনোভেশন ফান্ড থেকে ২৩ লাখ টাকা দিয়ে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সি প্রথম ওসিআর সফটওয়্যার তৈরি করে। তবে হিমিকা বলছেন তাদের পুঁথিই দেশের প্রথম বাংলা ওসিআর সফটওয়্যার।  

বাংলা ওসিআর নিয়ে যে স্বপ্ন ছিল

১৭৭৮ সালের পরবর্তী মুদ্রিত বাংলা বিষয়বস্তুকে ডিজিটাল যুগে সংযুক্ত করার জন্য বাংলা ওসিআর একটি বড় হাতিয়ার হতে পারতো। ১৭৭৮ সালে হলহ্যাডের বাংলা ব্যাকরণের মুদ্রণ, পঞ্চানন কর্মকারের ছেনিকাটা হরফ, উইলকিন্সের ডিজাইন, বাংলা শীশার হরফ, বাংলা লাইনো-মনো, ফটোটাইপসেটার, ফিয়োনা রসের বাংলা হরফমালা এবং কম্পিউটার ও অন্যান্য ডিজিটাল যন্ত্রের হরফমালার সাথে ওসিআরের সম্পর্ক রয়েছে। সম্পর্ক আছে ৩৫ কোটি বাংলা ভাষাভাষীর হাতের লেখার সাথে। অহমিয়া বা পূর্ব ভারতীয় ভাষাগুলোতেও এটি কাজে দেওয়ার কথা। কারণ তারাও বঙ্গলিপি ব্যবহার করে। বর্তমানের হাতের লেখা, পুথিঁর হস্তলিপি, প্রাচীন বাংলার অক্ষরসমষ্টিসহ বাংলা মুদ্রণের সাথে যুক্ত সকল প্রকারের টাইপোগ্রাফি এবং বাংলা বর্ণমালার বিভিন্ন রূপ ও বৈশিষ্ট্য, যুক্তাক্ষর গঠনের পদ্ধতি, পাঠ্যবইয়ের স্পষ্টীকরণ, শীশার হরফ ও আসকি-ইউনিকোড ফন্টসমূহের যাবতীয় বৈচিত্র সবই ওসিআর এক ডিজিটাল সংস্করণে সংযুক্ত করতে পারতো। বাংলা ওসিআর দিয়ে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে নতুন-পুরনো বই, নথি ডিজিটালাইজড করার স্বপ্ন ছিল। এতে এসব বই, নথি একেবারে হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার স্বপ্ন ছিল। বই, নথি, কাগজের স্তুপ থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করে যেন কোনো তথ্য খুঁজে বের করতে না হয় এবং ওয়েবে থাকলে সার্চ দিলেই সব তথ্য যেন পাওয়া যায়। এ ছাড়া ই-গভর্নেন্স ও কাগজ-ফাইলবিহীন অফিসের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতে পারতো বাংলা ওসিআর। এর মাধ্যমে পুরনো সব কাগুজে ফাইল নথিপত্র ডিজিটাল ফরম্যাটে ওয়েব বা সার্ভার কিংবা কম্পিউটারের হার্ডডিস্কে সংরক্ষণ করে ডিজিটাল রিসোর্স তৈরি করা যেত। তবে সফটওয়্যারটি নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়ার কারণে বাংলা ভাষায় ওসিআর ব্যবহারের স্বপ্ন অঙ্কুরেই মারা গেছে।  

আইন ভেঙ্গে সফটওয়্যার ক্রয় করে সরকার! 

খাত সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করে বলেছেন, কোন প্রকার টেন্ডার না ডেকে, খ্যাতিমান সব ডেভেলপারদের বঞ্চিত করে পাবলিক প্রসিকিউরমেন্ট আইন লঙ্ঘন করে ‘টিম ইঞ্জিন’ থেকে সফটওয়্যার ক্রয় করে সরকার। অথচ টেন্ডারের মাধ্যমে ওসিআর সফটওয়্যারটি কিনলে সরকারের কম খরচ হতো। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে থাকা অ্যাক্সেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রকল্পটিতে ওসিআর সফটওয়্যারটি আইসিটি মিনিস্ট্রি নিলেও খরচ কমে যেত। ২০১৫ সালের প্রথম দিকে আইসিটি বিভাগ টিম ইঞ্জিন থেকে ৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকায় তিনটি সফটওয়্যার প্যাকেজ ক্রয় করে। এই তিনটি সফটওয়্যার প্যাকেজের মধ্যে ওসিআর এবং টেক্সট-টু-স্পিচ কনভার্সনের দুটি সফটওয়্যার ছিল। এর আগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অবজ্ঞা করে ওপেন টেন্ডার বাতিল করে আইসিটি ডিভিশন। অথচ ওই টেন্ডারে দেশের চার খ্যাতিমান সফটওয়্যার ফার্ম অংশ নিয়েছিল। যদিও টিম ইঞ্জিন নামের প্রতিষ্ঠানটি থেকে সফটওয়্যারটি কেনা হলেও তারা টেন্ডারে অংশ নেয়নি। এ ব্যাপারে বরাদ্দ পাওয়া প্রতিষ্ঠান টিম ইঞ্জিনের সিইও প্রিয়.কম-কে বলেন, ‘আমাদের সাথে সরকারের আগে থেকেই এমওইউ করা হয়েছিল। এরপর হঠাৎ করে টেন্ডার ডাকা হয়। আমরা আমাদের সকল ডকুমেন্ট সাবমিট করে অভিযোগ জানানোর পর ওপেন টেন্ডার বাতিল করে সিঙ্গেল সোর্সিং হিসেবে আমাদের থেকেই সফটওয়্যার ক্রয় করে সরকার।’ 

টেন্ডার নিয়ে জলঘোলা

বিভিন্ন কাগজপত্র অনুযায়ী, সরকার ২০১৪ সালের ২ ডিসেম্বর ‘বাংলা করপাস, বাংলা ওসিআর এবং টেক্সট-টু-স্পিচ সফটওয়্যার প্রোসিউরমেন্ট’ প্রোগ্রামের জন্য ৮ কোটি ৬০ লাখ টাকার টেন্ডার নোটিশ প্রকাশ করে। তার আগে ২০১৪ সালের ৬ আগস্ট আইসিটি ডিভিশন এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্টের (ইওআই) জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে আমন্ত্রণ জানায়। আইসিটি বিভাগ তখন গ্রামীণ সল্যুশন, বাংলা ফোন লিমিটেড, সিস্টেম রিসোর্সেস লিমিটিড এবং আইবিসিএক্স প্রাইমেক্স সফটওয়্যার (বিডি) লিমিটেডের কাছ থেকে সাড়া পায়। এই চারটি প্রতিষ্ঠান মূলত ব্যাপারটিতে আগ্রহ দেখায়। টিম ইঞ্জিন সে সময় কোন ইওআই জমা দেয়নি। অর্থ মন্ত্রণালয় তার মধ্যে ৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকার প্রোগ্রামটি সংশোধন করে। মন্ত্রণালয়টি জানায়, সফটওয়্যার কেনার জন্য ওপেন টেন্ডার আবশ্যক। এ ব্যাপারে আইসিটি ডিভিশনের সচিব শ্যাম সুন্দর শিকদার জানান, চুক্তির ব্যাপারে কোন অনিয়ম ছিল না। আর ওপেন টেন্ডার বাতিল করার সম্পূর্ণ অধিকার তাদের রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা যেকোন সময় যেকোন টেন্ডার বাতিল করার সম্পূর্ণ অধিকার রাখি এবং একটি মাত্র উৎসে যেতে পারি। আইন সে কথা বলে।’ কিন্তু পাবলিক প্রোসিউরমেন্ট আইনের কথা বলা হলে, আইসিটি বিভাগের একজন জৈষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, অন্য কোন প্রতিষ্ঠান আগ্রহ না দেখালে পরে আমরা একটিমাত্র উৎসের কথা বিবেচনা করতে পারি। টেন্ডার কেন বাতিল করা হলো তা সচিবের কাছে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘প্রক্রিয়া চলাকালে আমি এখানে ছিলাম না। সেক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া সম্বন্ধে আমি কোন মন্তব্য করতে পারব না।’ আইসিটি বিভাগ প্রণীত কাগজপত্রে দাবী করা হয়েছে, বাংলাদেশে টিম ইঞ্জিনই একমাত্র প্রতিষ্ঠান যারা এ ধরণের সফটওয়্যার নির্মাণ করে। 

'বঙ্গ' ওসিআর দেখতে যেমন। ছবি: প্রিয়.কম। 

এটুআই-এর বাংলা ওসিআর সফটওয়্যার

কাগজপত্রে আইসিটি ডিভিশন দাবি করেছে যে, টিম ইঞ্জিনের ডেভেলপ করা ওসিআর সফটওয়্যার বিশ্বের ৩৭তম। যার অর্থ দাঁড়ায় বাংলাদেশে এ ধরণের সফটওয়্যার প্রথম। অথচ মাত্র ২৩ লাখ টাকায় এটুআইয়ে ওসিআর সফটওয়্যার ডেভেলপ হয়েছে। আইসিটি সচিব শ্যাম সুন্দর শিকদারকে এটুআইয়ের ওসিআর সফটওয়্যারের কথা বলা হলে তিনি জানান, এটুআইয়ের এ ধরণের সফটওয়্যার আছে তা তিনি জানতেন না। কিন্তু এটুআই কর্মকর্তারা বলছেন, সচিবের বিষয়টি অজানা থাকার কথা না। কারণ তাঁর ডিভিশন থেকে অনেক কর্মকর্তাই এটুআই প্রকল্পে জড়িত। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের অধীনে থাকা এটুআই প্রকল্পের এক জ্যৈষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘কিভাবে একজন সচিব বলেন যে, তার এটুআইয়ের ওসিআর সম্বন্ধে কোন ধারণা নেই? প্রধানমন্ত্রী নিজে আমাদের ওসিআর উদ্বোধন করেছেন।’ এদিকে এটুআই এবং আইসিটি মন্ত্রণালয়ের একই সফটওয়্যার ভিন্ন জায়গা থেকে নেওয়া প্রসঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বার প্রিয়.কম-কে বলেছেন, ‘একই সফটওয়্যার এটুআইতে থাকার পরেও আবার আইসিটি মিনিস্ট্রিতে কেনার যে ডুপ্লিকেট ঘটনা তা শুধু সফটওয়্যারের ক্ষেত্রেই নয় বরং অনেক ক্ষেত্রেই হচ্ছে। যে ট্রেনিং এটুআই দিচ্ছে, সেই ট্রেনিং আবার অর্থ মন্ত্রণালয় বা হাইটেক পার্কও নানান নামে নানানভাবে দিচ্ছে। এটা আসলে সমন্বয়ের অভাব।’ তবে হিমিকা বলছেন, ‘এটুআই আমাদের আগে নয় বরং পরে করেছিল। দুটোর ফিচার এক নয়, ক্যাপাসিটিও এক নয়। আমি যতটুকু জানি এটুআই-এর ওসিআর সফটওয়্যার শুধুমাত্র একটি ফন্টের ওপর করা হয়েছে। আর আমাদেরটা ৪০-৫০টা ফন্ট রিকোগনাইজ করতে পারে। তাছাড়াও অনেক ফিচারের ও টেকসই টেকনোলজির দাম এক হয় না। ‘বঙ্গ’ ওসিআর একটি এড্ভান্সড সফটওয়্যার।'

বাংলা ওসিআর সফটওয়ারের মূল্য কত? 

আইসিটি বিভাগের কাছে টিম ইঞ্জিন বাংলা ওসিআর ৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকায় বিক্রি করলেও অনেকেই জানতে চেয়েছেন এই সফটওয়্যারের আসলে মূল্য কত? উত্তরে বাংলাদেশের শীর্ষ সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বিজনেস অটোমেশনের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার আবদুল্লাহ আল মতিন প্রিয়.কম-কে বলেন, ‘এটা আসলে ডিপেন্ড করে। তবে বাংলা ওসিআর-এর সফটওয়্যারের যে মূল্য ধরা হয়েছে তা আকাশ কুসুম কল্পনার মতো। নতুন করে ডেভেলপ করলেও এর মূল্য কয়েক লাখ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। তবে বড় কোন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করালে এটার মূল্য ১০ লাখের বেশি যাবে না।’ এদিকে প্রতিবেশি দেশ ভারতেও রয়েছে বাংলা ওসিআর সফটওয়্যার। সেখানে খোঁজ নিয়ে জানা গেল ‘রেডিফ’ নামের একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান বাংলা, হিন্দি, তামিল ও ইংরেজি ওসিআর সফটওয়্যার একত্রে বিক্রি করছে মাত্র ১৫০০ রুপিতে। প্রতিষ্ঠানটি রীতিমত অনলাইনে এই ঠিকানায় বাংলা ওসিআর সফটওয়্যারটি বিক্রি করছে। এদিকে গুগল বাংলা ওসিআর সেবা দিচ্ছে বিনামূল্যে। এছাড়া http://banglaocr.software.informer.com, http://www.i2ocr.com/free-online-bengali-ocr, http://open-bangla-ocr.soft112.com, এবং এই ঠিকানা থেকে বিনামূল্যে বাংলা ওসিআর সফটওয়্যার পাওয়া যাচ্ছে। এদিকে বাংলাসহ ৬২টা ভাষা সাপোর্ট করে এমন ওসিআরও ওপেন সোর্স পাওয়া যাবে এখানে। বাংলা ওসিআর-এর জন্য এই ওয়েবসাইটটিও অনেক জনপ্রিয়। 

কোথায় আছে বাংলা ওসিআর ‘বঙ্গ’? 

প্রশ্নটির উত্তর জানতে প্রথমে যোগাযোগ করা হয় তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সিস্টেম অ্যানালিস্ট নবীর উদ্দিনের কাছে। উত্তরে তিনি প্রিয়.কম-কে বলেন, ‘বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলকে আমরা টেস্ট করার জন্য দিয়েছি। সাংস্কৃতিক বিষয়ক মন্ত্রণালয় আমাদের বড় স্টেক হোল্ডার। তাদের আমরা ট্রেনিং দিয়েছি ব্যবহার করার জন্য। ন্যাশনাল আর্কাইভ, ন্যাশনাল গ্রন্থগারকে আমরা দিয়েছি ব্যবহার করার জন্য। তাদের অনেক পুরান ডকুমেন্ট যেন স্ক্যান করে রাখতে পারে। তারা ব্যবহার করছে এবং কিছু ফিডব্যাক পাওয়া যাচ্ছে এবং সেগুলো আমরা ঠিক করছি।’ এখন কার দায়িত্বে আছে এই সফটওয়্যার? জানতে চাইলে তিনি জানান বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক এস এম আশরাফুল ইসলামের দায়িত্বে আছে। 

প্রিয়.কমের টিম যায় আশরাফুল ইসলামের কাছে। ওসিআর-এর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয় আমাদের ওসিআর কিছুটা ব্যবহার করছে। আমরা সবগুলো মন্ত্রণালয়কে দিয়েছি। তবে এটার খুব বেশি ব্যবহার নেই। আমারা তাদের সফটওয়্যার দিয়েছি কিন্তু আমরা তো তাদের ব্যবহার করে দিতে পারবো না। তাছাড়া ওসিআর ওই লেভেলের ব্যবহার করার সুযোগ নেই; কারণ এটা শতভাগ সঠিক রেজাল্ট দিচ্ছে না। কেউ এটা স্ক্যান করার পর যদি আবার এডিট করতে হয় তাহলে কিভাবে হবে?’

বাংলা ওসিআর-এর ব্যবহার দেখতে চাইলে কোথায় যেতে হবে? উত্তরে আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলা একাডেমি, পাবলিক লাইব্রেরি বা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করতে পারেন। ওরা ব্যবহার করছে বলে আমাদের রিপোর্ট করেছে। আমরা তো আর গিয়ে দেখতে পারবো না। আমরা এটা সব মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি এবং সাইটে তুলে দিয়েছি।’ ওসিআর-এর বাজেট এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানান। এমনকি আইসিটি মন্ত্রণালয়ে কার দায়িত্ব এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছিল সেটাও তিনি বলতে পারেননি। 

টিম ইঞ্জিনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সামিরা জুবেরী হিমিকা। ছবি: সংগৃহীত। 

তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে কী ওসিআর ব্যবহার হচ্ছে? জানতে চাইলে আশরাফুল বলেন, ‘আমাদের ওসিআর ব্যবহার করার সুযোগ নেই। কারণ আমরা তো কোন কিছু ডিজিটাইজ করছি না। এখানে তো কোন কিছু করার থাকতে হবে। ধরুন আপনি সংবাদপত্র ডিজিটাইজ করবেন। সেটা তো এখন পত্রিকাগুলো নিজেরাই করছে। মূলত পুরাতন বই বা নথিপত্র ডিজিটাইজ করার জন্য এটা ব্যবহার হয়। সে রকম কোন কাজ তো আমাদের নেই।’ এটার বাজেট কেমন ছিল? উত্তরে তিনি বলেন, ‘এটা কত আমার জানা নেই। মিনিস্ট্রি জানে। আমাদের শুধু চেক করে নিতে বলা হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী আমাদের টিম এটা চেক করে নিয়েছিল।’ আইসিটি মিনিস্ট্রিতে বাজেট বা অন্যান্য বিষয়ে কার সাথে কথা বলতে পারি? উত্তরে বলেন, ‘এটাও আমার জানা নেই। আপানকে খুঁজে নিতে হবে। যে পিডি ছিল সে বলতে পারে অথবা মিনিস্ট্রির প্ল্যানিং বিভাগ বলতে পারবে হয়তো।’ 

এদিকে আশরাফুল ইসলামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বাংলা একাডেমিতে বাংলা ওসিআর ব্যবহারের কোন সত্যতা পাওয়া যায়নি। বাংলা একাডেমির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শাহাদাত হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে এ বিষয়ে আমার কোন কিছু জানা নেই। আমি জানতাম ওসিআর হওয়ার কথা। এটা মনে হয় এটুআই করছে। আমাদের দিলে আমি অন্তত জানতাম। আমাদের মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। উনি ছাড়া আর কারও জানার কথা না।’ পরে বাংলা একাডেমি মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রিয়.কম-কে বলেন, ‘ওসিআর বাংলা একাডেমিতে ব্যবহার হচ্ছে না। আর হয়ে থাকলেও এটা আমি তাৎক্ষণিকভাবে বলতে পারবো না।’ দেশে অনেক উৎসাহ নিয়ে বাংলা ওসিআর ক্রয় করা হলেও শেষ পর্যন্ত এর ব্যবহার শুরু না হওয়া প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আক্ষেপ করে বেসিস সভাপতি মোস্তাফা জব্বার প্রিয়.কম-কে বলেন, ‘পরবর্তী টাস্কফোর্সের মিটিং এ আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলবো, আমাদের জন্য যে বরাদ্দ দেওয়া হয় সেটা যেন মনিটরের ব্যবস্থা করা হয়।’ 

আইসিটি মন্ত্রণালয়কে ওসিআর ফেরত পাঠিয়েছে টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়

বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক এস এম আশরাফুল ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী প্রিয় টিম কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছে ওসিআর সফটওয়্যার সকল মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে ডকুমেন্ট স্ক্যান করার কাজ অনেকেই করতে পারছেন না বলে মন্ত্রণালয়গুলো থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের প্রধান প্রোগ্রামার মো. জিয়া প্রিয়.কমকে বলেন, ‘আমরা বঙ্গ নামের একটি ওসিআর সিডি তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় থেকে পেয়েছি। কিছুদিন এটা ব্যবহার করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু স্ক্যান করার পর এটা আবার এডিট করতে হয় দেখে আমরা এই সফটওয়্যার ব্যবহার করার পক্ষে নই। এ জন্য এই সফটওয়্যারটি ‘অসম্পূর্ণ’ লিখে আমরা আমরা একটি চিঠিসহ ওসিআর সিডি তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছি।’

যে কারণে বাংলা ওসিআর সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়

কোটি টাকা ব্যায় করে কেনা বাংলা ওসিআর কেন ব্যবহার হচ্ছে না? উত্তরে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক এসএম আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘এটা ইউজার ফ্রেন্ডলি না। এটার একিউরিসিটি ৮৭ শতাংশ মাত্র। এটা যথেষ্ট না। ওসিআর ৯৯ শতাংশ না হলে এটা ব্যবহার করা কঠিন।’ টিম ইঞ্জিন এটা ৯৯ শতাংশ করে দিতে পারবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘টিম ইঞ্জিনের সাথে আমাদের কন্ট্রাক্ট শেষ। তারাও বলেছে এটা ৮৭ শতাংশের বেশি করতে পারবে না এবং তাদের সাথে আমাদের চুক্তিই ছিল ৮৭ শতাংশ করার জন্য।’ তিনি জানান, ‘ওসিআর মানুষ তখনই ব্যবহার করবে যখন তার আর কোন পরিশ্রম করতে হবে না। ১৩ শতাংশ যদি আপনাকে সংশোধন করতে হয় তাহলে তো বিরক্ত হয়ে যাবেন।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসিসের সভাপতি মোস্তাফা জব্বার প্রিয়.কম-কে বলেন, ‘আমি টিম ইঞ্জিনের ওসিআর উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে ছিলাম। সেখানে আমাদের জানানো হয়েছিল এই ওসিআর ৯৬ শতাংশ সঠিক কাজ করে। কিন্তু এখন জানতে পারছি এটা ৮৭ শতাংশ কাজ করে। তখন এটা নিয়ে মিথ্যাচার করা হয়েছিল। আর কেনই বা এই মিথ্যাচার করা হলো তা আমার বোধগম্য নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি একই অনুষ্ঠানে ইউনাইটেড ইউনিভার্সিটির ওই ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন এটা ৯০ শতাংশের বেশি কাজ করে না। আমার এক অর্থে মনে হয়েছিল উনি সৎ লোক। কারণ সে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। আর টিম ইঞ্জিনে আগের ডেভেলপাররা নেই। সুতরাং তাদের শতভাগ সঠিক কাজ করার সেই ক্যাপাবিলিটি নাই।’ মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘আমার একটা ব্যাপার খটকা লেগেছিল, উদ্বোধনের দিন রিয়েল ডেমনস্ট্রেশন দেখানো হয়নি। তারা সেদিন প্রি রেকর্ডেড একটি ভিডিও দেখিয়েছিল। এরপর আমি বহুবার এটার রিয়েল টাইম সফটওয়্যার দেখতে চেয়েছি। কিভাবে কাজ করে জানতে চেয়েছি। কিন্তু সেটা আর সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে দেখলাম এটা সরকার কিনেছে। কিন্তু আমার জন্য খুব হতাশাজনক লেগেছে এ কারণে যে; না এটা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে; না এটা সরকার ব্যবহার করছে। এই সফটওয়্যারটি সরকারের কোথাও ব্যবহার হচ্ছে না। সফটওয়্যারটি উদ্বোধনের পর থেকে এখন পর্যন্ত এটার কার্যকর অবস্থায় দেখিনি।’

শতকরা ৯৮ শতাংশের নিচে যে ওসিআর কাজ করে তাকে ওয়ার্কেবল বলা যায় না উল্লেখ মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘৮৭ শতাংশ কাজ করে এমন যন্ত্র আমাদের কেন কিনতে হবে? তাও আবার বিনা টেন্ডারে! আসলে চুক্তিতেই গলদ করা হয়েছে।’ সব শেষে তিনি রম্য করে বলেন, ‘আইসিটি মন্ত্রণালয়ের যে কর্মকর্তার সাথে ৮৭ শতাংশ কাজ করার জন্য চুক্তি হয়েছিল তাঁকে ফাঁসিতে দেওয়া উচিৎ। যে সফটওয়্যার কাজে লাগবে না সেটা নিয়ে লাভ কি?’ 

বাংলা ওসিআর নিয়ে প্রিয়.কমের সাথে কথা বলছেন মোস্তাফা জব্বার। ছবি: প্রিয়.কম। 

বাংলা ওসিআরের নতুন প্রকল্প শুরু হচ্ছে শিগগির

টিম ইঞ্জিনের দেওয়া ‘বঙ্গ’ সঠিকভাবে কাজ না করার কারণে তাদের সোর্স কোর্ড দিয়ে নতুন একটি প্রকল্প শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক এসএম আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, ‘আমরা আরও একটি বাংলা কম্পিটিশন প্রজেক্ট করছি। তখন আমাদের এই ওসিআর আরও বেশি ডেভেলপ হবে।’ নতুন এই ডেভেলপমেন্টে কি কি থাকবে? উত্তরে তিনি বলেন, ‘সামনে আমাদের নতুন প্রজেক্ট বাংলা ওসিআর নিয়ে কাজ করবে। এটা আমরা রিডেভেলপ করবো।’ পরের প্রজেক্টটি কবে করতে চান? উত্তরে আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘খুব কাছাকাছি সময়েই এটা হবে। নতুন প্রজেক্টে ফন্ট ভেঙ্গে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না। ভয়েস টেক্সট পাঠানো যাবে। সিআরডিআর লাইব্রেরি তৈরি হবে। ইন্টারফেস হিসেবে সরাসরি ইংরেজি থেকে বাংলা ট্রান্সলেশন হতে পারে। এ ধরণের ১৬টি টেকনোলজি আমরা ব্যবহার করবো।’ 

প্রিয় সংবাদ/মিজানুর রহমান