(প্রিয়.কম) ধর ধর, চোর চোর করে সবাই তাড়া করছিল ছেলেটিকে। ধরার পর ছেলেটিকে ধুমধাম ঘুষি-লাথি। কিল-ঘুষিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ায় ছেলেটি কারো পা ধরে মাফ চাওয়ার সুযোগ পাচ্ছিল না। এর মধ্যে কয়েকজন লোক ছেলেটিকে এভাবে না মেরে পুলিশে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করে। এই সুযোগে ছেলেটি থর থরভাবে কাঁপতে কাঁপতে সবার পা ধরে মাফ চাইতে থাকে।

১৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর শাহবাগে দুপুর পৌনে ২টার দিকের ঘটনা এটি। মার খাওয়া ছেলেটি মো. মেহেদি হাসান রবিন।

সে চলন্ত বাস থেকে একটি চেক থাবা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় মানুষ তাড়া করে তাকে ধরে ফেলে। তারপর এই  ধোলাই। তবে কিছু মানুষের সহযোগিতায় এবারের মতো প্রাণে বেঁচে যায় রবিনের জীবন। রবিন জানায়, বোনকে কেজি স্কুলে ভর্তি করতেই সে আজ থাবা দিতে এসেছিল।

যেসব লোক ছেলেটিকে মেরেছে তাদের মধ্যে একজন মো. দুলাল। তিনি বলেন, ‘কার জানি কী থাবা দিছিল। কী, সঠিক আমিও জানি না। সবাই দৌড়াতেছিল, পিছে পিছে আমরাও দৌড়াইছি। ওইখান থেকে যাত্রীর কিছু থাবা দিছিল, মোবাইল বা অন্য কিছু। পরে মাইরাঠাইরা পাঠাই দিছি।’

যারা ছেলেটিকে গণধোলাইয়ের হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন, তাদের একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএর শিক্ষার্থী মো. সাদিক। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি দেখলাম যে, লোকজন চোর চোর করে দৌড়াচ্ছিল। একটি ছেলেকে ধরার চেষ্টা করছিল লোকজন। শেষ পর্যন্ত ছেলেটি নিজেই ধরা দেয়। তারপর কয়েকজন মিলে তাকে মারছিল।’

সাদিক বলেন, ‘‘আমি চলে যাচ্ছিলাম। ভাবছিলাম যে, মারুক। পরে দেখলাম, পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। পরে আমি যারা ছেলেটিকে মারছিল তাদেরকে থামানোর চেষ্টা করলাম। সবাই বকা দিচ্ছিল। বলছিল, ‘কেন আটকাচ্ছ?’ আমি বললাম, মেরে তো ফেলা যায় না। পুলিশে দেন এই বলে আটকালাম। তারা বলল, ছেড়ে দিলে এক ঘণ্টা পরে সে তো আবার সেই কাজই করবে। আমি বললাম, ছেলেটি কথা দিক সে কাজ করে খাবে। তখন সবাই ছেলেটিকে কান ধরালো। পরে পুলিশে না দিয়ে তাকে ছেড়ে দেয়।’’

কেন আটকালেন জানতে চাইলে সাদিক বলেন, ‘আমি মারতে দিতে চাইলাম না কারণ গণমাধ্যমে আমরা প্রায়ই দেখতে পাই, চোরদের মারতে গিয়ে একেবারে মেরেই ফেলে। ওই অভিজ্ঞতা থেকেই আটকিয়েছি যেন মারা না পরে। যদিও আমাদের অভিজ্ঞতা বলে ছেলেটি আবারও সেই কাজ করবে। তাই বলে তো আর তাকে মেরে ফেলা যায় না।’

ঢাকা মেডিকেল রোডে মা আর এক বোনের সঙ্গে থাকে রবিন। তার বাবা অনেক আগে মারা গেছেন। মা ইট ভেঙে সংসার চালান। সম্প্রতি রবিন ‘থাবা দেওয়ার’ কাজে নেমেছে। এর আগে দুইটা সেট থাবা দিয়ে নেয় সে। যার একটি থাবা দিয়ে নেওয়ার পর লুকিয়ে রাখলে অন্য কেউ নিয়ে যায়। আরেকটি দুই হাজার পাঁচশ টাকা বিক্রি করে সে। যার কিছু টাকা মায়ের হাতে তুলে দেয়, যা দিয়ে মায়ের ঋণ শোধ করে। বাকি কিছু নিজে খরচ করে বলে জানায় রবিন।

নেশা করে কি না জানতে চাইলে নিসংকোচে রবিন বলে, ‘গাঁজা খাই। গাঁজার টেকা ২০ টেকা অইলেই অইয়া যায় গা। ওই টেকার লাইগ্যা থাবা দেওন লাগে না।’

রবিন বলে, ‘চলতি বাসে তে চেক আত থেইক্যা থাবা দিয়া লইছিলাম। অইডা পাইলে একটা ভদ্র মানুষরে কইতাম আমার চেকটা কিনবেন নাকি। আমারে যহন ধরছে, তার আগেই চেক ফিককা মাইরা দিয়া দিছি। পরে খাড়াইয়া গেছি। যেই লোকের চেক ওই লোক আমারে ছাইড়া দিছে। পরে অন্য মাইনষে মারছে।’

চুরির কারণ ব্যাখ্যা করে রবিন বলেন, ‘আমার বোনের সামনে পরীক্ষা তো। আমার ছোডো।  ভর্তি করমু নিমতলী স্কুলে। আইজক্যা আইতাম না। আইছি, বইনডারে ভর্তি করুম টেকা নাই।’

‘চিন্তা করছি, ওই টেহা দিয়া আমার বইনের ভালো একটা কাম অইব। আমি মাইর খাইলে তো খামুই। আমি খারাপ হইছি, আমার বইনডারে কী খারাপ করমু? আপনি কী কন? বইনরে খারাপ অইতে দিমু না। রক্ত যে পর্যন্ত আছে খারাপ অইতে দিমু না। নিজে খারাপ অইয়া যামু।’

বিক্রমপুরে গ্রামের বাড়ি রবিনের। মো. রফিক নামে বন্ধুবান্ধবরা চেনে তাকে। রবিন বলে, ‘টেকার কারণেই এডি করতাছি। টেকা থাকলে কী এডি করতাম, কন? মানুষের যদি বিপদ না থাকে তাইলে কী চুরির কাম করবো, কন? আমি আমার মায়েরে যতটুক ভালোবাসি তার চেয়ে বেশি বইনেরে ভালোবাসি। আমার বইন খুশি অইলে সব খুশি। আমি আসতে আসতে অরলাইগা জান দিয়া দিমু।’

অন্তহীন কষ্টের কথা রবিন বলে, ‘এই দুনিয়াত থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো। অনেক কষ্টে এই কাম করছি। কী কমু আপনারে। আমার কষ্টডা যদি আপনি বুঝতেন, তাইলে কইতেন আমিও মইরা যাওনের লেইগা রাজি আছি।’

প্রিয় সংবাদ/হিরা/