কাগজের ঠোঙ্গা তৈরি করে ভাগ্য বদল করেছেন লক্ষ্মীপুরের মাহফুজ আলম। ছবি: সংগৃহীত

কাগজের ঠোঙ্গায় ভাগ্য বদল লক্ষ্মীপুরের মাহফুজের

অর্থের অভাবে পড়াশুনা বেশিদূর না করলেও সংসার সামলিয়ে গড়ে তোলেন ভিন্নধর্মী এক প্রতিষ্ঠান। আর তা হলো মাহফুজের প্যাকেজিং কারখানা।

মো. সোহাগ
কন্ট্রিবিউটর, লক্ষ্মীপুর
প্রকাশিত: ০৬ নভেম্বর ২০১৭, ১৯:২৪ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ২৩:১৬
প্রকাশিত: ০৬ নভেম্বর ২০১৭, ১৯:২৪ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ২৩:১৬


কাগজের ঠোঙ্গা তৈরি করে ভাগ্য বদল করেছেন লক্ষ্মীপুরের মাহফুজ আলম। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দালাল বাজার ইউনিয়নের পশ্চিম লক্ষ্মীপুর গ্রামের মাহফুজ আলম দারিদ্র্যতাকে হার মানিয়ে নিজ চেষ্টায় ভাগ্য বদল করেছেন। সদর উপজেলার পশ্চিম লক্ষ্মীপুর গ্রামের দরিদ্র পিতা মৃত নুরুজ্জামানের ঘরে জন্ম নেয়া মাহফুজ প্রতিষ্ঠিত হতে পরিশ্রম করে এগিয়ে চলেছেন। অর্থের অভাবে পড়াশুনা বেশিদূর না করতে পারলেও সংসার সামলিয়ে গড়ে তোলেন ভিন্নধর্মী এক প্রতিষ্ঠান। আর তা হলো মাহফুজ প্যাকেজিং কারখানা। লক্ষ্য অর্জনে নানা প্রতিকূলতার মাঝেও অক্লান্ত পরিশ্রমই তাকে এনে দিয়েছে এই সাফল্য।

মাহফুজ আলম জানান, আমার বাবা মো. নুরুজ্জামান দালালবাজার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ধর্মীয় শিক্ষক ছিলেন। চার ভাই আর দুই বোনকে ভাত-কাপড় দিতেই বাবার খুব কষ্ট হতো। তাই পড়ালেখা কেউই বেশিদূর করতে পারেনি। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল পরিবারকে নিয়ে একটা কিছু করব। শিক্ষকতার পাশাপাশি মাত্র ৫ হাজার টাকার পুঁজিতে বাবা ১৯৯০ সালের শুরুতে দালাল বাজার বেলতলী এলাকায় ছোট্ট পরিসরে গড়ে তোলেন প্যাকেজিংয়ের কাজ স্থানীয়ভাবে যা ঠোঙ্গা নামে পরিচিত। ছোট্ট বেলায় দিনে স্কুলে আর রাতে ঠোঙ্গা বানাতে বাবাকে সহযোগিতা করতাম। রাত দুইটা থেকে তিনটা পর্যন্ত আমি আর বাবা এ কাজ করতাম। দারিদ্র্যতার কষাঘাতে পুঁজির অভাবে ঠোঙ্গা বানানোর কাজ ২ বছরের মাথায় বন্ধ করে দেন বাবা। পরিবারের আমি বড় সন্তান হওয়ায় দায়িত্ব ছিল বেশি। দালাল বাজার এনকে উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করে ছোট ভাই-বোনদের আর সংসার চালাতে পড়ালেখা বন্ধ করে বাবার বন্ধ ব্যবসা ৫ বছর পর আবার চালু করার উদ্যোগ নিই। স্থানীয়ভাবে ঋণ নিয়ে নিজেই ঠোঙ্গা বানানোর কাজ শুরু করি। এতে করে ব্যবসার পরিধি বাড়াতে থাকে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে মিষ্টির প্যাকেট, বিরিয়ানির প্যাকেটসহ নানা ধরনের প্যাকেজিংয়ের কাজ শুরু করি।

নিজের প্যাকেজিং কারখানায় মাহফুজ আলম। ছবি: সংগৃহীত

শহরের মাদাম জিরো পয়েন্ট ও দালালবাজার খোয়া সাগর দীঘি সংলগ্ন বেলতলী নামকস্থানে প্যাকেজিংয়ের প্রতিষ্ঠান ও শহরের উত্তর তেমুহনীতে গোডাউন গড়ে তুলি। আমার এসব প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে সাত জন শ্রমিক কাজ করেন।

তিনি বলেন, প্লাস্টিক পণ্যের পাশাপাশি আমাদের দেশীয় কাগজের প্যাকেট (ঠোঙ্গার) ঐতিহ্যকে ধরে রেখে প্যাকেজিংয়ে নতুন বৈচিত্র্যে এনে সঠিক সময়ে দোকানিদের কাছে প্যাকেটটি পেীঁছে দেয়ার চেষ্টা করি। লক্ষ্মীপুরে প্যাকেট তৈরির কাটিং মেশিন ও ভালো ছাপা অফসেট প্রেস না থাকায় কাজে খুব বেগ পেতে হয়। এ ছাড়া প্যাকেট তৈরির মিল্লাত বোর্ড, সাইজিং কাগজ ও কৃষ্ণা বোর্ড ঢাকা থেকে এনে বিভিন্ন খরচ দিয়ে ব্যবসা করা কষ্টসাধ্য। দেশি কাগজের মান ভালো না হওয়ায় প্যাকেট তৈরিতে ঝুঁকতে হচ্ছে বিদেশি কাগজের উপর। এ ছাড়া চা দোকানে আড্ডা দিলেও এসব কাজে আগ্রহী শ্রমিক পাওয়া যায় না। প্যাকেট তৈরির পণ্য নগদে ক্রয় করে প্যাকেট বাকিতে বিক্রি করায় প্রায় ২০-২৫ লাখ টাকা দোকানিদের কাছে বকেয়া থাকায় ব্যবসার পরিধি বৃদ্ধি করতে আমার অসুবিধা হচ্ছে। 

মাহফুজ আরও বলেন, বর্তমানে প্লাস্টিক শিল্পের কারণে কাগজের ব্যবহার অনেকাংশে কমে গেলেও এখনো মানুষ ফল, মিষ্টিসহ বিভিন্ন পণ্য কিনলে কাগজের প্যাকেট দোকানির নিকট চায়। এজন্য ভালো মানের প্যাকেট তৈরি করতে আমরা দক্ষ শ্রমিক নিয়ে কাজ করছি। ভালো মানের ১শত কাগজের প্যাকেট তৈরি করতে দুই-তিন ঘণ্টা সময় লাগে। প্রতি পিছ প্যাকেট বিক্রি হয় ৫-১০টাকা। মাসে আমার এখানে ২০-২৫ হাজার প্যাকেট তৈরি করে থাকি। আগামীতে আমি ব্যবসার প্রসার ঘটাতে উন্নতমানের প্যাকেজিংয়ের জন্য কাটিং মেশিন ও দোকানিদের নামে প্যাকেট বানাতে ছাপাখানা বা অফসেট প্রেস দেয়ার পরিকল্পনা আছে। নতুন উদ্যোক্তাদের পরামর্শ দিই তারা যাতে ব্যবসা করলে কর্মচারী নির্ভর না হয়ে নিজে তদারকিতে ব্যস্ত থাকে। কারণ শ্রমিকের চিন্তা একমুখী আর তা হলো শ্রমের বিনিময়ে অর্থ। আর মালিককে শ্রমিকের শ্রমটা সঠিকভাবে বুঝে নিতে হবে। কেননা ব্যবসার পরিচালকের চিন্তা ( শ্রমিকদের বেতন, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস বিল, পণ্যের চাহিদাসহ) বহুমুখী হতে হয়।

এ ব্যাপারে দালাল বাজার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান সোহেল জানান, মাহফুজ কাগজের ঠোঙ্গা বিক্রি করে আজ সেই স্বাবলম্বী। বিষয়টি আমি জেনেছি। তার মতো পরিশ্রমী মানুষ পাওয়া সমাজে অনেক কঠিন।

প্রিয় সংবাদ/কামরুল

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...