(প্রিয়.কম) গত বছরের আগস্ট মাসের কথা। মুখোমুখি দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ঢাকা মোহামেডান ও ঢাকা আবাহনী। ঢাকার ডার্বিখ্যাত সেই লড়াই দেখতে সেদিন বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে হাজির হয়েছিলেন হাজার তিনেক দর্শক। সবার সামনে চোখ ধাঁধানো ফুটবলই উপহার দিচ্ছিলেন দুই দলের খেলোয়াড়রা। আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ; সবই ছিল। কিন্তু মুহুর্মুহু আক্রমণের মাঝেও মিলছিলো না কাঙ্খিত গোলের দেখা। নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষে তখন চলছিলো তিন মিনিট ইনজুরি টাইমের খেলা। সবাই ধরে নিয়েছিলো, ড্রই হতে যাচ্ছে মৌসুমের প্রথম ঢাকা ডার্বি। 

এ সময় হঠাৎ গোল! ৯২ মিনিটে এমেকার হেড থেকে নবীব নেওয়াজ জীবনের কাছ থেকে বল পেয়ে ডানপ্রান্ত দিয়ে রুবেল মিয়ার প্লেসিং শট গোলরক্ষক মামুন খানকে পরাস্ত করে জড়িয়ে যায় জালে। উৎসবে মাতে গ্যালারি। গোলদাতা রুবেলকে কোলে তুলে নেন অভিভূত সতীর্থরা। কিছুক্ষণ পর রেফারি শেষ বাঁশি বাজাতেই ২২ বছর বয়সী এই ফুটবলারকে নিয়ে উৎসবে মেত ওঠে আবাহনী। ক্যারিয়ারের প্রথম ডার্বিতেই নায়কের ভূমিকায় ঢাকা আবাহনীর ফরোয়ার্ড রুবেল মিয়া

আবাহনীর হয়ে গোল করার পঅর সতীর্থদের উল্লাস। ছবি: সংগৃহীত

আবাহনীর হয়ে গোল করার পর সতীর্থদের নিয়ে রুবেল মিয়ার উল্লাস। ছবি: সংগৃহীত

গত এক বছর ধরে চোখ ধাঁধানো সব গোল করেছেন স্কুল ফুটবলের আবিষ্কার রুবেল। গত বছরের মে মাসে এএফপি কাপে ভারতের বেঙ্গালুরু এফসির বিপক্ষে প্রায় মাঝমাঠ থেকে অসাধারণ এক গোল করেছিলেন তিনি। দূরপাল্লার শটে সেই অবিস্মরণীয় গোলের পর রুবেলকে নিয়ে রীতিমতো হইচই পড়ে গিয়েছিল। তার আগে স্বাধীনতা কাপের ফাইনালে আবাহনীর বিপক্ষে বাইসাইকেল কিকের গোলে চট্টগ্রাম আবাহনীকে শিরোপা জিতিয়েছিলেন তিনি। এছাড়া ২০১৩ সালে ইরাকে অনুষ্ঠিত এএফসি অনূর্ধ্ব-১৯ চ্যাম্পিয়নশিপে শক্তিশালী কুয়েতের বিপক্ষে রুবেলের দর্শনীয় এক গোলে জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ।

দৃষ্টিনন্দন সব গোল করার সক্ষমতা দেখিয়ে ভক্তদের কাছে ইতিমধ্যে ‘ম্যাজিশিয়ান’ তকমা পেয়েছেন ২০০৯ সালে সিটিসেল স্কুল ফুটবল দিয়ে নিজের জাত চেনানো রুবেল। গাইবান্ধার প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক গ্রাম থেকে উঠে আসা এই তরুণই এখন দেশের ফুটবলের নতুন তারকা। এই ফুটবল তাকে দুহাত ভরে দিচ্ছে। তবে এই ফুটবলই কিন্তু রুবেলের কাছ থেকে একটি জিনিস কেড়েও নিয়েছে। আর তা হল তার নাম। তার আসল নাম রুবেল হোসেন। কিন্তু এই ফুটবলের কারণে তিনি এখন পরিচিত রুবেল মিয়া নামে!

এ প্রসঙ্গে প্রিয়.কমকে রুবেল বলেন, ‘২০০৯ সালে সিটিসেল স্কুল টুর্নামেন্টের রেজিস্ট্রেশনের সময় স্যাররা নামের শেষে ‘মিয়া’ লিখে দিয়েছিলেন। এরপর থেকেই আমার নাম হয়ে যায় রুবেল মিয়া। সেই নামেই এখন মানুষ চেনে আমাকে। অভ্যস্ত হয়ে গেছি এখন এই নামে। ভালোই লাগে।’

আবাহনীর ক্রোয়েশিয়ান কোচ দ্রাগো মামিচের সঙ্গে রুবেল মিয়া ও সাদ উদ্দিন। ছবি: সংগৃহীত

আবাহনীর ক্রোয়েশিয়ান কোচ দ্রাগো মামিচের সঙ্গে রুবেল মিয়া ও সাদ উদ্দিন। ছবি: সংগৃহীত

মাত্র চার বছর বয়সেই বাবাকে হারিয়েছেন রুবেল। যদিও অভাব কী, সেটা তাকে বুঝতে হয়নি। বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের হাল ধরেন বড় দুই ভাই। তাদের স্নেহ-ভালোবাসায় এতোট পথ পাড়ি দিতে পেরেছেন বলে মনে করেন রুবেল। এর মাঝেও কষ্ট আছে রুবেলের। আজ ফুটবল খেলে যে সাফল্য অর্জন করেছেন, তার কিছুই দেখে যেতে পারেননি তার বাবা, ‘এটাই সবচেয়ে বেশি পোড়ায়। আজ যতটুকুই সাফল্য পেয়েছি তার কিছুই দেখে যেতে পারলেন না বাবা। তিনি বেঁচে থাকলে আমার এমন সাফল্য দেখে নিশ্চয়ই খুব খুশি হতেন।’

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ থেকে উঠে এসে ঢাকার ফুটবল মাতিয়ে বেড়ানো রুবেল প্রতিনিধিত্ব করছেন জাতীয় দলের হয়েও। টিভিতে তার খেলা দেখেন গ্রামবাসী। বাড়িতে গেলেই সবাই তাকে ঘিরে ধরে। তাকে নিয়ে গর্ব করে। গ্রামের মানুষদের এমন গর্ব আর ভালোবাসাই জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া রুবেলের, ‘আমাকে এখন গ্রামের সবাই চেনে। বাজারের রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে বলে, ওই দেখ আমাদের রুবেল যায়। অন্যদের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলে, ও রুবেল, ঢাকায় ফুটবল খেলে বা জাতীয় দলের হয়ে খেলে। গ্রামের সবাই এমন গর্ব করে, ভালোবাসে। এর চাইতে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে।’  

এর আগে চট্টগ্রাম আবাহনীর হয়ে খেলেছেন ২২ বছর বয়সী প্রতিভাবান এই ফুটবলার। ছবি: সংগৃহীত

এরআগে চট্টগ্রাম আবাহনীর হয়েও খেলেছেন ২২ বছর বয়সী প্রতিভাবান এই ফুটবলার। ছবি: সংগৃহীত

অবিশ্বাস্য সব গোল উপহার দিয়ে চলেছেন রুবেল। এর মধ্যে সেরা বেঙ্গালুরু এফসির বিপক্ষে মাঝ মাঠ থেকে করা সেই গোলটি। এ প্রসঙ্গে রুবেলের ভাষ্য, ‘আমি ওই গোলটিকেই এগিয়ে রাখব। গোলটি নিয়ে অনেক বেশি আলোচনা হয়েছিলো। সবাই খুব প্রশংসা করেছিলো। এমন গোল আমার আরও আছে। তবে এটা তো আন্তর্জাতিক গোল। তাই এটাকেই এগিয়ে রাখব। আমি বারবারই এমন গোল করতে চাই। আমি জানি তার জন্য আমাকে আরও পরিশ্রম করতে হবে। তবে পরিশ্রম করতে ভয় পাই না। উপরওয়ালা চাইলে এমন অনেক গোল আগামীতে দেখবেন।’

স্কুল ফুটবলে ৪ ম্যাচে ১৪ গোল করেছিলেন। তার গোল করার সক্ষমতা পরের বছর তাকে সুযোগ করে দেয় অনূর্ধ্ব-১৭ জাতীয় দলে। এরপর যুবদলের হয়ে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন। অনূর্ধ্ব-১৯ দল ও অনূর্ধ্ব-২৩ দলের হয়ে খেলেছেন বঙ্গবন্ধু কাপ। গায়ে তুলেছেন জাতীয় দলের জার্সিটাও। মালদ্বীপের বিপক্ষে মালেতে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক ঘটে রুবেলের। রুবেল বর্তমানে খেলেছেন ঢাকা আবাহনীর হয়ে। সদ্য শেষ হওয়া প্রিমিয়ার লিগে দলকে শিরোপা জয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। এরআগে শেখ জামাল ও চট্টগ্রাম আবাহনীর হয়ে খেলেছেন প্রতিভাবান এই ফুটবলার।

প্রিয় স্পোর্টস/শান্ত মাহমুদ