ছেলেধরা সন্দেহে পেটানো হচ্ছে একজনকে। ছবি: টাইমস অব ইন্ডিয়া

ভারতে হচ্ছেটা কী?

পাকিস্তানের সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওর জেরে ভারতে এমন ক্রমিক হত্যাকাণ্ডের সূচনা হয়।

প্রিয় ডেস্ক
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশিত: ০১ জুলাই ২০১৮, ১০:০৯ আপডেট: ১৯ আগস্ট ২০১৮, ২১:০০
প্রকাশিত: ০১ জুলাই ২০১৮, ১০:০৯ আপডেট: ১৯ আগস্ট ২০১৮, ২১:০০


ছেলেধরা সন্দেহে পেটানো হচ্ছে একজনকে। ছবি: টাইমস অব ইন্ডিয়া

(প্রিয়.কম) ভারতে ছেলেধরা সন্দেহে গত কয়েকদিনে অন্তত ১৪ জন মানুষকে রাস্তায় পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটেছে ত্রিপুরায়। ভারতের এ রাজ্যে দুইদিনে চারজনকে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ বলছে হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষিতে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে।

তবে গত দেড়মাসের ঘটনা পরিক্রমা লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এ গুজব সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে হোয়াটসঅ্যাপে। 

ত্রিপুরার পুলিশ বলছে ২৭ ও ২৮ জুন রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় ছেলেধরা সন্দেহে চারজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এদের মধ্যে সুকান্ত চক্রবর্তী নামের এক যুবকও রয়েছেন, যাকে ছেলেধরা গুজব রোধ করতে প্রচারণার দায়িত্ব দিয়েছিল সরকার। একজন নারীকেও ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে উত্তর প্রদেশ থেকে ত্রিপুরায় নানা জিনিস ফেরি করে বিক্রি করতে আসা এক ব্যাক্তিও। যারা আহত হয়েছিলেন তাদের মধ্যে একজন পরে হাসপাতালে মারা যান। ত্রিপুরা পুলিশের মুখপাত্র সহকারী ইন্সপেক্টর খিতিরঞ্জন দাস বলেন ‘গত কয়েকদিন যাবতই সোশ্যাল নেটওয়ার্কে বিভিন্ন ধরনের ছবি দেখাচ্ছিল- ছেলেধরা নিয়ে নিচ্ছে, কিডনি নিয়ে নিচ্ছে... ভয়াবহ ছবি কিছু আসছিল। এসব নিয়ে সবার উদ্বিগ্নতা বেড়ে যায়। ফলে যখন যেখানে যাকে সন্দেহ হচ্ছে, তাদেরকে মারা হচ্ছে। এ ধরনের ঘটনা এর অাগে ঘটেনি।’

তিনি বলেন ‘পুলিশ সবসময় সতর্ক রয়েছে। কিন্তু কোনো আইসোলেটেডেট প্লেসে কে কাকে দেখেছে, এটা সব সময় নজরদারি করা সম্ভব হয় না। সবার কাছে হয়ত গুজবের বার্তাটা পৌঁছায়নি।’

ত্রিপুরা পুলিশ মোবাইল ইন্টারনেট ও এসএমএস সেবা সাময়িক বন্ধ রেখেছে, যাতে গুজব না ছড়ায়। সামাজিক মাধ্যমের সৌজন্যে এই একই গুজব গত দেড় মাসে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।

মূলত পাকিস্তানের সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওর জেরে ভারতে এমন ক্রমিক হত্যাকাণ্ডের সূচনা হয়।

শিশু অপহরণকারীদের বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়াতে একটি প্রতীকী শিশু অপহরণের ঘটনার দৃশ্য পাকিস্তানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। পাকিস্তানের সামাজিক মাধ্যমে ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে যায়।
ভিডিওটিতে দেখা যায়, মোটরসাইকেলে করে দুই ব্যক্তি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি শিশুকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। এটিকে প্রথমে শিশু অপহরণ মনে হলেও আসলে তা নয়। একটু পরই ওই দুই ব্যক্তি শিশুটিকে আগের জায়গায় ফেরত দিয়ে যায় এবং সিসিটিভি বরাবর একটি কাগজ উঁচু করে ধরে। এ কাগজটিতে লেখা ছিল, ‘করাচির রাস্তা থেকে একটি শিশু অপহরণ করতে এক মুহূর্ত সময় লাগে।’

বোঝাই যাচ্ছে পাকিস্তানের নিরাপত্তাবিষয়ক সচেতনতা বাড়াতে কেউ একজন এ ভিডিওটি তৈরি করেছিল। কিন্তু ভারতে এর প্রভাব পড়ে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে।

ভারতের সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু করে মিডিয়াগুলো এ ভিডিওটির খণ্ডিত অংশ প্রচার করে। তারা ভিডিওটিতে থেকে পাকিস্তানের অংশটুকু বাদ দিয়ে দেয়। সামাজিক মাধ্যম ও বিভিন্ন আঞ্চলিক টেলিভিশনগুলোতে এ ভিডিওটি বারবার প্রচার হওয়ার কারণে জনমনে আবেগ ও উত্তেজনা তৈরি হয়। ভারতের সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে ভিডিওটি সত্য। তারা তাদের সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে।

দক্ষিণ ভারতে পাঁচ হাজার শিশু অপহরণকারী ঢুকে পড়েছে, একটি স্থানীয় টেলিভিশনে এমন সতর্কবার্তাও প্রচার করা হয়।

ভারতে ভুয়া খবর বা ছবির উৎস খুঁজে বের করে এমন একটি ওয়েবসাইট অল্ট নিউজের প্রতিষ্ঠাতা প্রতীক সিনহা বিবিসিকে জানান, ওই ভিডিওটির উৎস তারা খুঁজে পেয়েছেন। তিনি বলেন ‘যে ভিডিওটি ব্যবহার করে গুজব ছড়ানো হচ্ছে, সেটি পাকিস্তানে তৈরি। দেশটির একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা শিশু অপহরণের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করতে ভিডিওটি তৈরি করেছিল। কিছু ছবিও ছড়ানো হচ্ছে, যেগুলো নানা জায়গা থেকে জোগাড় করা হচ্ছে।’

প্রতীক সিনহা বলেন, ‘যেসব রাজ্যে এসব গুজব ছড়ানো হচ্ছে, সেসব রাজ্যে এভাবে গুজব ছড়ানো হচ্ছে যে কাছাকাছি এলাকায় এভাবে শিশু অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। সে রাজ্যের ভাষাতে এসব ভুয়া বার্তাগুলো অনুবাদ করেও প্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু এসব বার্তাগুলো সত্যি কিনা, সেটি কেউ যাচাই করছে না।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতে কোটি কোটি মানুষ মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো রকম বিশ্লেষণ করার ক্ষমতাই নেই। তারা যা দেখছেন সেটাই বিশ্বাস করছেন। আর এ বিপুল সংখ্যাক মানুষের ওপর নজরদারি কার্যত অসম্ভব।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব ঘটনা তদন্তেও বহু ধরনের জটিলতা রয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে সাইবার অপরাধের জন্য নিযুক্ত স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর বিভাষ চ্যাটার্জী বিবিসিকে বলেন ‘এই যে গুজব ও নেতিবাচক প্রচারণনাগুলো অনলাইনে ছড়ানো হচ্ছে... এগুলো যদি ফেসবুকে ছড়ানো হয়, তাহলে ইউআরএল ধরে ধরে কারা এগুলো ছড়াচ্ছে তাদেরকে ধরা সম্ভব। কিন্তু হোয়াটসঅ্যাপ বা টেলিগ্রামের মতো এনক্রিপ্টেড অ্যাপের মাধ্যমে যদি এসব ছড়ানো হয়, তাহলে এগুলো ধরা খুব মুশকিল। এখন শুধু ভারত নয়, ২০১৬ সালে যুক্তরাজ্যেও এ ধরনের ঘটনা দেখা গেছে। এসব তদন্তের ক্ষেত্রে অনেক সমস্যা রয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রামের মতো যেসব সার্ভিস প্রোভাইডরদের মাধ্যমে এসব গুজব ছড়ানো হচ্ছে, তারা তদন্তে কতটা সহায়তা করবে, সেটাও দেখার বিষয়।

ছেলেধরার গুজব ছড়িয়ে একের পর এক গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনা এখন সামনে এলেও আগেও ভারতে এসব ঘটনা ঘটেছে। ১৯৮২ সালে কলকাতার বালিগঞ্জে ছেলেধরা সন্দেহে ১৭ জন আনন্দমার্গী সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসীনীকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল। ১৯৯০ সালে কলকাতার কাছে বানতলাতে ছেলেধরা সন্দেহে গণধর্ষণ করা হয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একজন নারী কর্মকর্তাসহ তিনজন নারী সরকারি কর্মকর্তাকে। যাদের মধ্যে একজন পরে মারা গেছেন।

প্রিয় সংবাদ/মিজান/আশরাফ

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...