(প্রিয়.কম) ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে থাকতে পারবেন একই পরিবারের চার সদস্য। এ বিধান রেখে প্রবল সমালোচনা আর আপত্তির মুখে পাস করা হয়েছে ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) বিল-২০১৮। একে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ব্যাংক মালিক সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, এতে লাভবান হবে ব্যাংকিং খাত। তবে এ দাবির সঙ্গে একমত হতে পারেননি অর্থনীতিবিদরা। বরং তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, সংশোধিত ব্যাংক আইনে ঝুঁকির মুখে পড়বে দেশের অর্থনীতি। ব্যাংকিং খাতে বিদ্যমান সংকট আরও বাড়বে।

একটি বিশেষ মহল কিংবা গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার জন্যই ব্যাংক আইন সংশোধন করা হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।     

সদ্য পাস হওয়া সংশোধিত ব্যাংক আইনে ব্যাংকিং খাতে সংকট আরও বাড়াবে বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ও অর্থনীতিবিদ খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ। তিনি প্রিয়.কম-কে বলেন, ‘এই সংশোধনী ব্যাংকিং খাত এবং অর্থনীতি উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা পরিবারতন্ত্রের দিকে ধাবিত হবে। সেই সঙ্গে বঙ্গবন্ধু যে ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন, এটা তার সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন বৈষম্যহীন একটি সমাজ। এ জন্য তিনি পাকিস্তান আমলে ২২ পরিবারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিলেন।’ 

ব্যাংক আইন সংশোধন করে পরিচালনা পর্ষদে চার জনকে রাখার সুযোগ দিয়ে বাংলাদেশে ‘২২ পরিবার’ তৈরির বীজ রোপিত হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদ। 

তবে ব্যাংক আইন সংশোধন করায় সরকারকে সাধুবাদ জানিয়ে প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সদস্য ডা. এইচবিএম ইকবাল প্রিয়.কম-কে বলেন, ‘ব্যাংক আইন সংশোধন সরকারের একটি সুন্দর এবং যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত। এর মাধ্যমে পরিচালকরা আরও বেশি দায়বদ্ধ হবেন। একই পরিবারের অধিক সদস্য ব্যাংকে থাকলে এর প্রতি তাদের মায়া আরও বেশি গাঢ় হবে। কখনোই কেউ চায় না যে নিজের ছেলের ক্ষতি হোক। তবে এর ফল পেতে কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।’

অন্যদিকে প্রবল সমালোচনার পরও পাস হওয়া এই সংশোধনীর কারণে এ খাতে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ বাড়ার সাথে সাথে সুশাসনের ঘাটতি দেখা দেবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম

প্রিয়.কম-কে তিনি বলেন, ‘এটা স্বাভাবিক যে পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের চার জন সদস্য থাকার কারণে এর ওপর ওই পরিবারের নিয়ন্ত্রণ আরোপ হবে। এতে ঋণদান এবং ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে সঠিক মানদণ্ড বজায় না থাকার আশঙ্কার সৃষ্টি হবে। এমনিতেই বর্তমানে ব্যাংকিং খাত নানা সমস্যায় জর্জরিত। এ খাতে সুশাসনের অনেক ঘাটাতি। এর মধ্যে এই সংশোধনীর কারণে সংকট আরও বাড়বে।’

তাহলে কাদের কথা বিবেচনা করে ব্যাংক আইনে সংশোধনী আনল সরকার? এমন প্রশ্নের জবাবে সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, ‘সরকার কিন্তু সেই ব্যাখ্যা দেয়নি। কোনো নির্দিষ্ট কারণও তারা দেখাতে পারেনি। বিলটি পাস হওয়ার সময় সংসদেও কিন্তু কোনো আলোচনা করতে দেওয়া হয়নি।’

তবে ভিন্ন মত এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংক অব বাংলাদেশ লি. (এক্সিম) পরিচালক হাবিবুল্লাহ ডনের। তার মতে, এতে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ আরও শক্তিশালী হবে। প্রিয়.কমকে তিনি বলেন, ‘একই পরিবারের অধিক সদস্য থাকার মধ্যে নেতিবাচক কিছু নেই। সময়ের সাথে অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়। কোনো মালিক চায় না যে তার ব্যাংকের ক্ষতি হোক। আর যদি কেউ দুর্নীতি করতে চায় তাহলে একজনই যথেষ্ট। আইনে এই সংশোধনীর ফলে স্বচ্ছতা আরও বাড়বে।’

সরকারি ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি না থাকলেও সেখানে কেন অর্থ কেলেঙ্কারি বিষয়টি ঘটে থাকে, এ প্রশ্নও তোলেন এক্সিম ব্যাংকের এই পরিচালক।

গত ১৬ জানুয়ারি, মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে পাস হয় ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) বিল-২০১৮। এতে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে থাকতে পারবেন একই পরিবারের চার সদস্য। আগে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের দুইজন সদস্য থাকতে পারবেন। এ ছাড়া সংশোধিত আইনে একজন পরিচালক ছয় বছরের স্থলে নয় বছর দায়িত্বে থাকতে পারবেন।

প্রিয় সংবাদ/আজাদ চৌধুরী/শান্ত