(প্রিয়.কম) রহস্যঘেরা কিছু ইস্যুকে কেন্দ্র করে হঠাৎ সৌদি আরবের নেতৃত্বে বেশ কিছু মুসলিম দেশ কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয়। তাদের সবার অভিযোগ- কাতার মূলত সন্ত্রাসবাদে মদদ দিচ্ছে। এই অভিযোগকে আমলে নিয়ে কাতারের বিরূদ্ধে অবরোধও আরোপ করা হয়।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিস্যেপ তায়্যিপ এরদোগানের অবরোধ প্রত্যাহারের আহবান, কুয়েতের আমির শেখ সাবাহ আল আহমাদ আল জাবের আল সাবাহর সংকট সমাধানের চেষ্টা এবং পাকিস্তানের নাওয়াজ শরিফসহ আরও অনেকের অনেক চেষ্টা-প্রচেষ্ঠাকে বুরো আঙ্গুল দেখিয়ে গত ৫ জুন থেকে এখনও বলবৎ রয়েছে সেই অবরোধ। কিছুটা নমনীয়তা প্রদর্শন করে অবরোধ তুলে নেওয়ার জন্য টেলিভিশন চ্যানেল আল-জাজিরা বন্ধ ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের সীমারেখা টানাসহ সৌদি আরবের নেতৃত্বে থাকা জোটের পক্ষ থেকে ১৩টি শর্ত প্রদান করা হয়। কিন্তু শুরু থেকে এখন পর্যন্ত কাতার তার নিজের অবস্থানে অটল। দেশটির অর্থমন্ত্রী আলী শরিফ আল-ইমাদি জানিয়েছেন, ‘কাতার তার প্রতিবেশীদের আরোপিত অবরোধ মোকাবেলা করতে সক্ষম।’ খবর রয়টার্স ও বিবিসির।

এ ছাড়া ‘সৌদি জোটের দেওয়া ১৩ শর্ত মানা অসম্ভব’- এই মর্মে নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে জবাব দিয়েছে কাতার। কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল রহমান আল থানি কুয়েতে সংক্ষিপ্ত সফরে গিয়ে ১৩টি শর্তের জবাবও হস্তান্তর করেছেন।

চলমান এমন সব নাটকীয়তাকে হার মানিয়ে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র-কাতার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এরই মধ্যে এবং চুক্তি সম্পাদনার সফরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন বলেন, ‘আমি মনে করি, প্রতিবেশীদের সঙ্গে চলমান সংকটের বিষয়ে কাতারের অবস্থান স্পষ্ট এবং তা যৌক্তিক।’

চলমান কাতার অবরোধে কেমন আছেন কাতার প্রবাসী বাংলাদেশীরা? এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। শুধু একটি প্রশ্নই নয়- এই একটি অংকের হিসাব কষতে কষতে বাংলাদেশের হাজার পরিবারে আজ রাতের ঘুম প্রায় হারাম। বর্তমানে কাতারে প্রায় ৪ লাখ বাংলাদেশি বসবাস করেন। মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন, নির্মাণ শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীসহ আরও বিভিন্ন পেশা এবং নানাবিধ কাজে জড়িত রয়েছেন তারা। কাতারে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের মোটা দাগে দুটি ভাগে বিভক্ত করা যায়।

এক. উচ্চবিত্ত পর্যারের বাংলাদেশি। দুই. মধ্যবিত্ত ও নিম্মমধ্যবিত্ত পর্যারের বাংলাদেশি। উচ্চবিত্ত পর্যারের বাংলাদেশি বা যাদের আর্থিক অবস্থা ভালো এই অবরোধ তাদের জীবন যাত্রায় কোনো প্রকার প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়নি। কারণ অবরোধের কারণে মূলত আমদানি নির্ভর পণ্য-সামগ্রীর কিছুটা সংকট সৃষ্টি হয়েছে এবং মূল্য বেড়েছে। যেসব বাংলাদেশিরা কাতারে উৎপাদিত খাদ্য গ্রহণ বা পণ্য-সামগ্রী ব্যবহারে অভ্যস্ত তাদেরও কোনো সমস্যাই হচ্ছে না- এমনটাই জানান কাতারে অবস্থানরত একজন বাংলাদেশি।

কাতার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চাকরি করেন তামীম রায়হান। তিনি জানান, ‘এই অবরোধে কারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং তারা কী পরিমান ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন, এর নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান জানতে সময় লাগবে। তবে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের মধ্যে যারা আরব আমিরাত ও সৌদিআরবের পণ্য আমদানিকারক ছিলেন, তারা আপাতত কিছুটা সংকটে রয়েছেন। তবে কাতার কর্তৃপক্ষ খুব শিগগিরই এর বিকল্প বাজার সৃষ্টি করছে। ফলে এই সাময়িক সংকট কেটে যাবে। কারণ, কাতারের সঙ্গে প্রতিবেশি দেশগুলোর অবস্থা স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসলেও বাণিজ্যিকভাবে কাতার হয়তো ওইসব দেশের কোম্পানিকে আর সুযোগ দেবে না।’

তামীম রায়হান আরও বলেন, ‘কাতারে যেসব বাংলাদেশি আছেন, তারা এই সংকটকালে কোনো গুজবে কান না দিয়ে নিজেদের কাজ করে যেতে পারেন। কাতার কোনোভাবেই কারও চাপে মাথা নত করবেন না। ফলে খুব বেশি ভীত হওয়ার কোনো কারণ নেই।’

কঠিন সমস্যায় ভুগছে বাংলাদেশ থেকে সবজি ও কাঁচামাল আমদানিকারক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো এবং সঙ্গে সঙ্গে সমস্যায় রয়েছেন বাংলাদেশি খাবার ও পণ্য ব্যবহারে অভ্যস্তরা। কাতারে সবজি আমদানিকারক ব্যবসীয় মাসুদ শেখ বলেন, ‘অবরোধ শুরু হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে।’

এ ছাড়া আল ফাতে ট্রেডিংয়ের ব্যবস্থাপক বদিউল আলম জানান, ‘প্রতি একদিন পর পর আমরা সবজি ও কাচামাল আমদানি করি। আগে প্রতি চালানে প্রায় ৫০০ কেজি সবজি আসতো আর এখন আসে এক/দুই টন।’

এদিকে অবরোধের কারণে কাতাবে অবস্থিত বাংলাদেশি রেস্তোরাগুলোতে কোনো খাবারের দাম বৃদ্ধি করা হয়নি। রেস্তোরা মালিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘আমরা আশা করি এই সংকট সাময়িক। সাময়িক এই সমস্যার সময় আমরা দেশি ভাইদের সুবিধার কথা চিন্তা করে কোনো খাবারের দাম বৃদ্ধি করিনি।’

কাতারের মাইজারে অবস্থিত মসজিদে শায়খ জাসেম বিন আলী আবদুল্লাহ আল থানি মসজিদের বাংলাদেশি ইমাম কামরুজ্জামান বিন ফয়সাল আহমদের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি কখনো উপলদ্ধি করিনি যে কাতারে অবরোধ চলছে। গত ২২ বছর ধরে কাতারে যেভাবে অবস্থান করছি, মোটামুটি সেভাবেই এখনও আছি। অবরোধ চলার কারণে আমদানিতে সমস্যা হওয়ার কিছু পণ্যের মূল্য কিছুটা বেড়েছে। তবে এটা একদমই সামান্য। আমরা আশাবাদী খুব শীঘ্রই এই সমস্যার সামাধন হবে, ইনশাআল্লাহ।’

কাতারে অবস্থিত একটি জার্মানি কোম্পানি চাকরিজীবী বাংলাদেশি মুফিজুল ইসলাম হৃদয় জানান, ‘চাকরিজীবীদের তেমন এমন সমস্যা হচ্ছে না। তবে নির্মাণ শ্রমিকদের খুব সমস্যা হচ্ছে। বিশেষত দুবাই ও সৌদি আরব থেকে পণ্য আমদানি নির্ভর কোম্পানিগুলোর কাজ একেবারেই বন্ধ বলা যায়। অন্য দেশের সঙ্গে যে সব কোম্পানির আমদানি সম্পর্ক রয়েছে তারা তেমন সমস্যায় নেই। এটা নিয়ে কাতারে বসবাসরত বাংলাদেশি মাঝে যে পরিমাণ ভয় কাজ করছে; তার চেয়ে বেশি ভয় বা চিন্তা কাজ করছে দেশে থাকা আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে।’

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো- চলমান অবরোধকে কেন্দ্র করে বিমানের রূটে বিভিন্ন পরিবর্তন আসার কারণে গন্তব্যে পৌছানোর সময়ে কিছুটা বেশি কম হয়েছে। তবে বিমান বাংলাদেশসহ কাতার থেকে বাংলাদেশে এবং বাংলাদেশ থেকে কাতার রুটে চলাচলকারী কোনো বিমান সংস্থাই তাদের ভাড়া বৃদ্ধি করেননি। অবরোধ চলাকালীন সময়ে ছুটিতে বাংলাদেশে আসা এক বাংলাদেশি জানান, ‘এক বছর পূর্বে যে ভাড়া দিয়ে বাংলাদেশে এসেছি। অবরোধ চলাকালীন সময় একই ভাড়া দিয়ে এসেছি। শুধু সময় একটু বেশি লেগেছে।’

কাতারে বেশ কিছু বাংলাদেশি রয়েছেন যারা বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত। তারা জানান, ‘চলমান এই অবরোধ কোনো ব্যবসা-বাণিজ্যেই তেমন কোনো প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়নি। তবে কাতার প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি শ্রেণি বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে বিভিন্ন রিপোর্টে উঠে এসেছে। আর সেই শ্রেণিটি হলো- মধ্যবিত্ত ও নিন্মমধ্যবিত্ত নির্মাণ শ্রমিক। আর তাদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মূল কারণ একটাই- আমদানি নির্ভর বাংলাদেশি পণ্য-সামগ্রী নির্ভরতা।

এতো কিছুর পরও কাতার সরকার কর্তৃপক্ষ অবরোধকালীন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহযোগিতার জন্য বিশেষ কিমিটি গঠন করেছে। কাতারের এ্যার্টনি জেনারেলকে প্রধান করে বেশ জোরালোভাবে কাজ করছে এই কমিটি- এমনটাই জানিয়েছেন কাতার কর্মরত একজন সাংবাদিক। কাতার-সৌদির এই টানাপোড়ানকে কেন্দ্র করে একটি সংকটময় অবস্থার বিরাজ কূটনৈতিক পাড়ায়। কাতার-বাংলাদেশ সম্পর্কে ভবিষ্যত অবস্থা নিয়ে এখনই বেশ চিন্তিত কূটনৈতিক কোরের আমলাগণ। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের কর্মযজ্ঞকে সামনে রেখে কাতারে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অংশ গ্রহন দিন দিন বেড়েই চলছিল। সৌদি-কাতার দ্বন্ধে কিছুটা হলেও শ্লথ হয়েছে সেই গতি। ভবিষ্যতে এই গতি কোনদিকে মোড় নেয় সেটাই এখন বিরাট প্রশ্ন!

প্রিয় সংবাদ/কামরুল