(প্রিয়.কম) রাজধানীর কড়াইল বস্তির একটি দোকানের সামনে সোমবার বেলা ১১টার দিকে সংবাদপত্রে বিপিএলের খবর পড়ছিল মো. ইমরান ও মো. শিহাব।  ‘হালকা-হালকা’ বাংলা পড়তে পারা ইমরান পড়েছে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত। তাই ভালোভাবে আর রপ্ত হয়ে ওঠেনি তার বাংলা পড়াটা। কেন ছেড়েছে প্রশ্ন করতেই তার উত্তর ‘অভাবের লেইগা।’

পরে একসময় দর্জির কাজে যোগ দিয়ে তাতেও না পোষালে ছাড়তে হয় তা। এখন নতুন চাকরির সন্ধানে আছে ইমরান। তবে শিহাবের বাংলা পড়তে কোন সমস্যা হয় না। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে সে। কিন্তু ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া হয়নি।

শুধু ইমরান বা শিহাব নয়, রাজধানীর কড়াইল বস্তির এরকম হাজারো ছেলেমেয়ের প্রাথমিকের পর পড়াশোনা করার সুযোগ হয় না। এর পেছনে একদিকে যেমন রয়েছে দরিদ্রতা, অন্যদিকে রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব। কড়াইল বস্তিতে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে ১৫২টি। আছে এতিমখানা, মসজিদ ও মাদ্রাসাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমও। শুধু নেই একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, নেই কোনো কলেজ। ফলে প্রাথমিক শিক্ষাই তাদের কাছে সর্বোচ্চ শিক্ষা।

৯০ একর আয়তনের বস্তিতে বাস প্রায় এক লাখ মানুষের। প্রাক-প্রাথমিক আর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছড়াছড়ি থাকলেও মাধ্যমিক পর্যায়ের কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় ঝরে পড়তে হয় অধিকাংশ শিক্ষার্থীকেই।

পত্রিকা পড়ছে মো. ইমরান (বাঁয়ে) ও মো. শিহাব। ছবি : প্রিয়.কম

সংবাদপত্র পড়ছে মো. ইমরান (বাঁয়ে) ও মো. শিহাব। ছবি : প্রিয়.কম 

‘বস্তি শুমারি ও ভাসমান লোকগণনা ২০১৪’ অনুযায়ী বাংলাদেশে ৩৩ লাখ ৪৩ হাজার ২২৫ জন মানুষ বস্তিতে বাস করে। এর মধ্যে ঢাকায় ৭ লাখ ৩৭ হাজার ৩৯৭ জন। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের বস্তিতে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৩৪০টি খানা বা পরিবার রয়েছে। যাদের বড়ো অংশেরই বাস কড়াইলের এই বস্তিতে।

দুস্থ্য স্থাস্থ্য কেন্দ্র (ডিএসকে) ২০১৬ সালে ‘হাউজ হোল্ড সার্ভে’ পরিচালনা করে। সেই জরিপ অনুযায়ী, কড়াইল বস্তিতে২৬ হাজার ১১২টি খানা বা পরিবার রয়েছে। লোকসংখ্যা বের করতে ডিএসকে প্রতিটি খানায় ৩.৫ লোক হিসাব করে। সেই হিসাবে কড়াইল বস্তিতে লোক সংখ্যা ৯১ হাজার ৩৯২ জন।

কড়াইল বস্তির অনেক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পঞ্চম শ্রেণি পাশ করার পর মাধ্যমিক বিদ্যালয় না থাকায় প্রায় সবাই পড়াশুনা ছেড়ে দেয়। তবে কড়াইলে মাধ্যমিক বিদ্যালয় হলে এখানকার অনেক ছেলেমেয়ে উচ্চতর শিক্ষা লাভ করার সুযোগ পাবে। এক্ষেত্রে মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, সেই সঙ্গে বৃত্তির ব্যবস্থা করতে পারলে ছেলেমেয়েদের শিক্ষার হার আরো বেড়ে যাবে। তাই তাদের দাবি, কড়াইলে সরকারি ও বেসরকারিভাবে উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হোক।

কড়াইল উন্নয়ন কমিটি ও কড়াইল ১নং উত্তর ইউনিট আওয়ামী লীগের সভাপতি এসএম মাহামুদুল হাসান বলেন, ‘কড়াইলের জামাই বাজার (কড়াইল-১), বউ বাজার (কড়াইল-২), মোশারফ বাজার (কড়াইল-৩), বেলতলা (কড়াইল-৪), এরশাদ নগর (কড়াইল-৫), বেদে বস্তি (কড়াইল-৬) ও গোডাউন বস্তিতে (কড়াইল-৭) ছোট-বড়ো মিলিয়ে প্রায় ১৫২টি প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। তারপরও এখানে যে পরিমাণ শিশু রয়েছে, তাদের একটা অংশ প্রাথমিক বা প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তিরই সুযোগ পাচ্ছে না।’

মাহামুদুল হাসান আরও বলেন, ‘চলতি বছরের পিএসসি পরীক্ষায় কড়াইল থেকে প্রায় ১৩ শ শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করবে। পাশ করার পর এইসব শিক্ষার্থী বনানী, গুলশান, মহাখালীসহ আশপাশে ভর্তি হওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ ওইসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার ব্যয় যেমন বেশি, তেমনি আসন সংখ্যাও সীমিত। এরকম অবস্থায় অভিভাবকেরা শিশুদের বাসাবাড়ি, হোটেল বা অন্য কোনো কাজে দিয়ে দেয়। তারা তাদের সন্তানদের লেখাপড়া করাতে পারছে না, এক্ষেত্রে ছেলেমেয়েদের কাজে না দিয়ে দরিদ্র বাবা-মায়েরা কী করবে?’

কড়াইলের একমাত্র সরকারি স্কুল পল্লীবন্ধু এরশাদ প্রাথমিক বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা মাতোয়ারা বেগম প্রিয়.কমকে বলেন, ‘এখানকার অনেক শিশু কাজের ফাঁকে স্কুলে আসে। শিশুরা একবেলা কাজ করে, আরেক বেলায় স্কুলে আসে। সেজন্য এখানে অনেক বিদ্যালয় শিফট আকারে চালাতে হয়। আগের চেয়ে শিশুদের স্কুলে আসার প্রবণতা বাড়লেও এখনো অধিকাংশ ছেলেমেয়ে স্কুলেই আসে না।’ 

কড়াইল থেকে অল্পকিছু ছেলেমেয়ে বাদে অধিকাংশ শিশুরই লেখাপড়ার সুযোগ হয় না দাবি শিক্ষিকা মাতোয়ারা বেগমের। শিশুরা কীভাবে ঝরে পড়ে তার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, প্রথম শ্রেণি থেকেই শিশুরা ঝরে পড়তে শুরু করে। দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ শ্রেণিতে গিয়ে বড়ো একটা অংশ ঝরে পড়ে। যেসব শিশু একবেলা কাজ করে, একবেলা পড়াশোনা করে, তাদের অধিকাংশই একপর্যায়ে পড়াশোনা বাদ দিয়ে কাজকেই বেছে নেয়।

শিক্ষার্থীদের বড়ো একটা অংশ পঞ্চম শ্রেণি পাশ করার আগেই ঝরে পড়ার বিষয়টি আরো পরিষ্কার হয় ব্র্যাক পরিচালিত কড়াইলের লেক পাড়ের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা সুমি আক্তারের বক্তব্যে। তিনি বলেন, ‘ব্র্যাকের বিদ্যালয়ের সংখ্যা (বর্তমানে কড়াইলে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক মিলে মোট ৮৪টি) এখানে অনেক থাকলেও এ বছর পিএসসিতে অংশ নেবে মাত্র ৫টি বিদ্যালয়। বর্তমান বছরে মাত্র ৪টি বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণি পড়ানো হচ্ছে, যারা ২০১৮ সালে পিএসসিতে অংশ নেবে।’

কড়াইল বস্তির লেক পাড়ের ব্র্যাকের একটি বিদ্যালয়ে পড়ছে প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা। ছবিটি ১১ নভেম্বর-২০১৭ তোলা।  ছবি : প্রিয়.কম

কড়াইল বস্তির লেক পাড়ের ব্র্যাকের একটি বিদ্যালয়ে পড়ছে প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা। ছবিটি ১১ নভেম্বর-২০১৭ তোলা।  ছবি : প্রিয়.কম

এভাবে পড়াশোনা শেষেও কিছু শিক্ষার্থী কড়াইলের বাইরে যেসব মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে সেখানে গিয়ে ভর্তি হয়। তবে তাদের সংখ্যা খুবই অল্প বলে জানান মাতোয়ারা বেগম।

কড়াইলের ১৯ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. মফিজুর রহমান বলেন, ‘মাধ্যমিক বিদ্যালয় করার জন্য কড়াইলে আপাতত কোনো জায়গা নাই। তারপরও চিন্তা-ভাবনা করছি, পল্লীবন্ধু এরশাদ বিদ্যালয়ে (প্রাথমিক) একটি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শাখা খোলার জন্য।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) পরিচালক অধ্যাপক মো. আনসার উদ্দিন বলেন, ‘প্রায় এক লাখ মানুষের বসতিতে কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ থাকবে না, তা কল্পনা করা যায় না। এক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধি, কাউন্সিলর, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন এনজিওকে এগিয়ে আসতে হবে।’

কোনো বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় না থাকা প্রসঙ্গে মো. আনসার উদ্দিন বলেন, ‘বেশিরভাগ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করা হয় ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে। বস্তিবাসী তো টাকা দিতে পারে না, তাই সেখানে কেউ বিনিয়োগ করে না। এক্ষেত্রেও ওই এলাকার কাউন্সিলর বা স্থানীয় প্রতিনিধিদের দায়িত্ব বেশি। কাউন্সিলরা উদ্যোগ না নিলে সেখানে ব্যবসায়ীরা কেউ যাবে না।’

কড়াইল বস্তিতে মোট ১৫২টি বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৯টি বেতুনভুক্ত কিন্ডারগার্টেন এবং বাকি বিদ্যালয়গুলো বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা পরিচালিত। এই স্কুলগুলোর মধ্যে কয়েকটি কিন্ডারগার্টেনে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়। 

প্রাথমিক ও প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো হলো ব্র্যাক প্রি-প্রাইমারি স্কুল ৫২টি, ব্র্যাক প্রাইমারি স্কুল ৩৪টি, সুরভী বাংলাদেশ স্কুল ২৮টি, আনন্দ আরবান স্কুল ৭টি, আহ্সানিয়া মিশন স্কুল ৬টি, এডুকো পাঠশালা স্কুল ৪টি, এমএসএস (মানবিক সাহায্য সংস্থা) স্কুল ৩টি, জাগো ফাউন্ডেশন স্কুল, জাপান বাংলা স্কুল, কোরিয়ান বাংলা স্কুল, বিজয় বাংলা ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন স্কুল এবং আনন্দ আরবান স্লাম স্কুল। কিন্ডারগার্টেনগুলো হলো শিশু কানন কিন্ডারগার্টেন, বঙ্গবন্ধু শিশু কল্যান প্রাথমিক বিদ্যালয়, কড়াইল কিন্ডারগার্টেন স্কুল, সানরাইজ কিন্ডারগার্টেন স্কুল, আইডিয়াল কিন্ডারগার্টেন স্কুল, মায়ের দোয়া বিদ্যা নিকেতন স্কুল, মা মরিয়ম কিন্ডারগার্টেন স্কুল, জ্ঞানের আলো কিন্ডারগার্টেন স্কুল ও পল্লী মানব কিন্ডারগার্টেন স্কুল। আর সরকারি একমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়টি হলো পল্লীবন্ধু এরশাদ বিদ্যালয়।

কড়াইল বস্তির একমাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পল্লীবন্ধু এরশাদ বিদ্যালয়। ছবি : প্রিয়.কম

কড়াইল বস্তির একমাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পল্লীবন্ধু এরশাদ বিদ্যালয়। ছবি : প্রিয়.কম

কড়াইল-১ নম্বরে ১০টি মসজিদ ও মাদ্রাসা রয়েছে। এগুলো হলো নুরানী জামে মসজিদ, নুরানী হাফেজিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা, কড়াইল করবস্থান জামে মসজিদ, ফজলুল করিম দারুল উলুম হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা, দারুল আরকাম মুহাম্মদিয়া ইফতেদায়ী মাদ্রাসা, বাইতিুল আল-মামুন জামে মসজিদ ও মাদ্রাসা, আল মদিনা জামে মসজিদ ও মাদ্রাসা, বাইতুল মামুর জামে মসজিদ ও মাদ্রাসা, কড়াইল আদর্শ ইসলামি মাদ্রাসা মক্তব এবং আজিজিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসা। কড়াইল-১-এর মতো অন্য ৬টিতেও প্রায় একই রকম মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানা রয়েছে।

তবে কড়াইলের বিভিন্ন এনজিও পরিচালিত বিদ্যালয়গুলোও বর্তমানে হুমকির মুখে পড়েছে। কড়াইলের লেক পাড়ের ব্র্যাক প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা সুমি আক্তার বলেন, ২০১৬ সালে এখানে ব্র্যাকের যতগুলো বিদ্যালয় ছিল, এ বছর তার চেয়ে কম। ২০১৮ সালে ব্র্যাকের বিদ্যালয়ের সংখ্যা আরো কমতে পারে। শিক্ষা ব্যয় বাড়ায় এখন কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বেতনও নেওয়া হচ্ছে।

সরকার মধ্যম আয়ের দেশ ঘোষণা করায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শিক্ষার ওপর-এমন মন্তব্য করে কড়াইলের এডুকোর পাঠশালা স্কুলের শিক্ষক আক্তারুজ্জামান বলেন, সরকার বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ ঘোষণা করার পর বিদেশি সাহায্যপ্রদানকারী সংস্থাগুলো এদেশে শিক্ষা ক্ষেত্রে বিনিয়োগ কমিয়ে দিচ্ছে। এর আগে এডুকো থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাশ করা শিক্ষার্থীদের দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনার খরচ দেওয়া হতো। এ বছর অতি দরিদ্র দুই-একজন শিক্ষার্থী বাদে সবাইকে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে এডুকো।