প্রতীকী ছবি।

উন্নয়নের মন্ত্র যেখানে গবেষণা

এটা ভাবতে লজ্জা লাগে যে, বিদেশে কে, কী নিয়ে গবেষণা করছে, তার কোনো তালিকাও দেশে নেই। কিন্তু যখন কেউ সাফল্য দেখায় তখন নির্লজ্জের মতো চাপাবাজি করে, এ আমার দেশের সন্তান। আমার দেশের গর্ব, আমার দেশের অহংকার।

মাহবুব মানিক
গবেষক, মার্সেবুর্গ ইউনিভার্সিটি অব এপ্লায়েড সায়েন্স, জার্মানি
প্রকাশিত: ২৩ মার্চ ২০১৮, ১৮:১৬ আপডেট: ১৯ আগস্ট ২০১৮, ০৭:০০


প্রতীকী ছবি।

আমার গবেষণার সমস্ত খরচ জোগায় একটা গ্লিসারিন তৈরির কোম্পানি। খুবই সাধারণ মানের একটা কোম্পানি। সারা বিশ্বে এর খুব একটা নাম ডাকও নেই। তাদের কোম্পানিতে গবেষণার ক্ষেত্রটিও খুব একটা মজবুত না। কিন্তু তারপরেও তারা গবেষণায় থেমে থাকেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত অর্থায়ন করে যাচ্ছে। জার্মানিতে সিস্টেম হচ্ছে- কোনো কোম্পানি ইচ্ছা করলে জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অর্থায়ন করে তাদের উৎপাদিত পণ্যের মানোন্নয়নে গবেষণা চালিয়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে তাদের গবেষণাগারে আলাদা করে বিনিয়োগ করতে হয় না। আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে গবেষণা সংক্রান্ত গোপনীয়তা চুক্তিপত্রের মাধ্যমে সংরক্ষিত করা হয়ে থাকে।

এই গ্লিসারিনের কোম্পানি আসলে সরাসরি আমাকে কোনো টাকা দেয় না। তারা টাকা দেয় ইউনিভার্সিটিকে এবং ইউনিভার্সিটি টাকা দেয় আমাকে। আমি মূলত ইউনিভার্সিটির স্টাফ কিন্তু পরোক্ষভাবে বেতন দিয়ে থাকে ওই গ্লিসারিন কোম্পানি। শুধু আমি নই যারা জার্মানিতে গবেষণা করছে তার বেশিভাগ অর্থই জোগান দেয় এইসব ব্যক্তিগত মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। সরকারের কাজ শুধু সততার সঙ্গে সেই টাকা সুষ্ঠুভাবে গবেষকদের মাঝে বন্টন করা।

আমাদের ইউনিভার্সিটিতে যতগুলো গবেষণামূলক প্রজেক্ট চালু আছে তার মধ্যে প্রায় সবগুলোর অর্থই জোগান দেয় জার্মান প্রতিষ্ঠানগুলো। এগুলো যদিও পাবলিক কোম্পানি কিন্তু তারা গবেষণার অর্থ জোগান দেয় সরকার নিয়ন্ত্রিত বিশ্ববিদ্যালয়ে। দীর্ঘ বা স্বল্প মেয়াদে বিভিন্ন প্রজেক্টের মোড়কে এই গবেষণা চলতে থাকে৷ 

একটা জিনিস ভেবে পুলকিত হই যে, এই ধরনের উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মাপকাঠিই হচ্ছে গবেষণা। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানোন্নয়নে গবেষণার বিকল্প কিছুই নাই। একটা বিশ্ববিদ্যালয় কতটা উন্নত, সেটা নির্ভর করে তারা কতটা উন্নত পর্যায়ের গবেষণা করছে। সেই গবেষণালব্ধ ফলাফল কতটুকু বাণিজ্যিক উৎপাদনে কাজে লাগছে।

যেহেতু আমি রাবার নিয়ে গবেষণা করি, তাই সারা বিশ্বে রাবার সংক্রান্ত কাজের খোঁজ খবর নেওয়া আমার পেশাগত দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। মজার বিষয় হচ্ছে আমার কাজের কাছাকাছি কাজগুলোর বেশিভাগই হচ্ছে ভারত, মালয়েশিয়া ও চীনে। ইন্টারনেটে যত টপ রেটেড আর্টিকেল পাই তার সবগুলো কাজই হয়েছে ভারত ও চীনে। সেই সূত্র ধরেই ভারতের বিখ্যাত টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব খারাগপুর এবং ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব বোম্বের ওয়েবসাইটে মাঝেমধ্যে একটু ঢুঁ মারতে হয়। অবাক করা বিষয় হচ্ছে এখানে বর্তমানে চালু প্রায় সকল গবেষণার অর্থই যোগাচ্ছে রিলায়েন্স কোম্পানি ও টাটা। বুঝতে বাকি নেই অল্প কয়েক যুগের মধ্যেই ভারত ও চীন কী বিপ্লব ঘটাতে যাচ্ছে। আগেই বলেছি গবেষণার ক্ষেত্র প্রস্তুত ছাড়া উন্নয়নের কোনো বিকল্প নাই৷ উন্নত গবেষণা ছাড়া সারা জীবন আমাদের পরনির্ভরশীল থাকতে হবে। টেকনোলজিতে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারব না। যে দেশ যত গবেষণায় উন্নত তারাই আজ তত শক্তিশালী, তারাই প্টৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করছে। আমাদের জীবনযাত্রা আজ টেকনোলজি নির্ভর এবং এর সবটাই গবেষণার সফলতা। যদিও কষ্টের ব্যাপার হচ্ছে, আজও টেকনোলজি ধার করে আনতে হয় বহির্বিশ্ব থেকে।

জার্মানিতে প্রায় প্রতিটা ইন্ডাস্ট্রিতেই রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আর অ্যান্ড ডি) নামে আলাদা একটা সেক্টর থাকে। এখানে ধুন্দুমার গবেষণা বার মাসেই লেগে থাকে। গবেষণা সংক্রান্ত আর্টিকেল বিখ্যাত সব জার্নালে শুধু পাবলিশ নয়, গবেষণালব্ধ ফলাফল ব্যবসায়িক কাজেও বিনিয়োগ করা হয়। গবেষণার সফলতাও সারা পৃথিবীর মানুষ ভোগ করছে। যার জন্য শিল্প কলকারখানায় আজ এই বিপ্লব ঘটিয়েছে জার্মানি।

গবেষণার জন্য শুধু জার্মান কোম্পানি বা বিশ্ববিদ্যালয়ই ভরসা নয়। এখানে আছে বিশ্ববিখ্যাত সব গবেষণাগার। যার মধ্যে অন্যতম ফ্রাউন হোফার (The Fraunhofer-Gesellschaft), হেমহোল্টস অ্যাসোসিয়েশান অব জার্মান রিসার্চ সেন্টার (The Helmholts association of German Research Centers), ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইন্সটিটিউট (The Max planck institute), লাইবনিস অ্যাসোসিয়েশান (Leibniz association) ইত্যাদি।

এবারে একটু দেশে ফিরে আসি। বাংলাদেশে নাম করা যেসব কোম্পানি আছে, তারা গবেষণাখাতে কতটুকু অর্থায়ন করছে? তাদের আর অ্যান্ড ডি সেক্টর কতটা শক্তিশালী? নতুন কিছু কি তারা তৈরি করতে পারছে? নাকি বহির্বিশ্বের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে। আমার কাছে কোনো পরিসংখ্যান নেই। গুগলে সার্চ দিয়েও কোনো সন্তোষজনক পরিসংখ্যান পাইনি। পরিসংখ্যান থাকবে কি! তারা কার্যত কোনো অর্থায়নই করে না। এতটুকু খবর রাখি, যে কোনো গবেষণার প্রজেক্ট হাতে নিতে সরকারই একমাত্র ভরসা। সরকারি অর্থায়ন ছাড়া কোনো গবেষণা প্রজেক্ট দাড় করানো সম্ভব হয় না। সরকারের পক্ষে এত কিছুর মাঝে শুধু গবেষণায় এত খরচ জোগানো একটু দুঃসাধ্য ব্যাপারই বটে। বিকল্প হতে পারে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো।

এটাও সত্য বাংলাদেশি নামিদামি প্রতিষ্ঠানগুলো আছে নাচ-গান এবং সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অর্থায়নের জন্য। কোটি টাকা খরচ করে বিদেশ থেকে শিল্পী ভাড়া করে নাচ-গান করাতেও কৃপণতা দেখায় না। কৃপণতা দেখায় গবেষণায় অর্থ ব্যয় করতে। আমি বলছি না তাদের কাজটা খারাপ। সাংস্কৃতিক বিকাশে তাদের ভূমিকা উল্লেখ্যযোগ্য কিন্তু পাশাপাশি উদ্যোগী হয়ে গবেষণাতেও যদি অর্থ বিনিয়োগ করতো। দেশ বদলে যেতে পারতো। লাভবান যে তারাই হবে, সে ধারণা দেবার মতো দার্শনিক তাদের হয়তো নেই।

বাংলাদেশে গবেষণা প্রকল্পে খরচও হয় খুব সামান্য। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য বরাদ্দকৃত খরচ প্রকাশ করতেও লজ্জায় পড়তে হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাই ধরা যাক। এখানে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জন্য ৬৬৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে। যেখানে গবেষণার খরচ দেখানো হয়েছে মাত্র ১৪ কোটি টাকা। এটি মোট বাজেটের মাত্র ২ শতাংশ। বাকি টাকা শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন ভাতা ও কাঠামোগত উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় হবে। ২০১৫ সালে সরকারি ও বেসরকারি ১২৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৯টি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা খাতে একটি টাকাও ব্যয় করে নাই। যার মধ্যে ২৮টি বেসরকারি আর ১১টি সরকারি। আবার বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ধরনের পাবলিকেশন বা আর্টিকেল নেই।

তা ছাড়া বাংলাদেশে যেসব বিষয় নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, তা বহির্বিশ্বে বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই হয়ে গেছে। কিছু সফলতা আসলেও সেগুলো বাণিজ্যিকভাবে দাঁড় করানোর মতো সফলতা খুব একটা আসেনি। গবেষণার ক্ষেত্র প্রস্তুত মানে এই নয় জেলায় জেলায় গবেষণা কেন্দ্র খুললাম, গবেষক নিয়োগ দিলাম। তারা দৈনিক টেবিল চেয়ারে বসে ডিউটি করে বাড়িতে চলে গেল। গবেষণায় গুরুত্ব বাড়াতে হবে।

এটা ভাবতে লজ্জা লাগে যে, দেশ এখনো গবেষণার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে পারেনি। গবেষকদের বাংলাদেশ ঠাঁইও দেয় না। বিদেশে এরা কেমন আছে, কী করছে, এদের খোঁজখবরও রাখে না। বিদেশে কে, কী নিয়ে গবেষণা করছে, তার কোনো তালিকাও নেই। কিন্তু যখন কেউ সাফল্য দেখায় তখন নির্লজ্জের মতো চাপাবাজি করে, এ আমার দেশের সন্তান। আমার দেশের গর্ব, আমার দেশের অহংকার। 

একটা কথা পরিষ্কার যে, দেশের উন্নয়নে গবেষণার ক্ষেত্র প্রসস্তকরণের কোনো বিকল্প নাই। হোক সেটা সরকারি বা ব্যক্তিগত উদ্দ্যোগ।

 

গবেষক, মার্সেবুর্গ ইউনিভার্সিটি অব এপ্লায়েড সায়েন্স

হালে, জার্মানি। ইমেইলঃ [email protected]

 

[প্রকাশিত লেখা ও মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কম-এর সম্পাদকীয় নীতির মিল নাও থাকতে পারে।]

 

 

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
শেখ হাসিনা: বাংলার মা
মৌলি আজাদ ১৫ নভেম্বর ২০১৮
বিজনেস এথিকস বনাম ডাটা পাইরেসি
ইকবাল আহমদ ফখরুল হাসান ১৫ নভেম্বর ২০১৮
যে কারণে এখনো আপনি ‘সিঙ্গেল’ নারী!
কে এন দেয়া ১৫ নভেম্বর ২০১৮
ফেসবুকে দৈনিক কতটা সময় দিচ্ছেন আপনি?
কে এন দেয়া ১৩ নভেম্বর ২০১৮
স্পন্সরড কনটেন্ট
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে নিয়োগ
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে নিয়োগ
বাংলা ট্রিবিউন - ১ দিন, ৬ ঘণ্টা আগে
হিলি-ঘোড়াঘাট সড়কের উন্নয়নকাজ শুরু
হিলি-ঘোড়াঘাট সড়কের উন্নয়নকাজ শুরু
বণিক বার্তা - ১ week, ৬ দিন আগে
কিশোরগঞ্জে সৃজনে উন্নয়নে বাংলাদেশের উদ্বোধন
কিশোরগঞ্জে সৃজনে উন্নয়নে বাংলাদেশের উদ্বোধন
বণিক বার্তা - ২ সপ্তাহ, ৪ দিন আগে
ট্রেন্ডিং