ড. শরিফা খাতুন। ছবি: শাহরিয়ার তামিম, প্রিয়.কম

(প্রিয়.কম) বসন্তের গোধূলির আলোতে মলিনতার ছোঁয়া। এরই মধ্যে সূর্যটা ডুবে গেল পশ্চিমে। নামলো সন্ধ্যা। ধানমন্ডি লেকের পাড় ঘেষে হাঁটছি। লেকের পানিতে নানা রঙের আলো থই থই করছে। এই আলোর খেলা দেখতে দেখতেই চলে আসি গন্তব্যে। চোখে পড়ল ‘অবন্তরী’ নামের একটি বাড়ি। এখানে বসবাস করেন ভাষাসৈনিক অধ্যাপক শরিফা খাতুন। যিনি ভাষা আন্দোলনে সাহসী ভূমিকা রাখেন।

সেই সময় বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে বাংলা ভাষার পক্ষে কথা বলেন তিনি। স্কুলের ছাত্রীদের সংগঠিত করেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ইডেন কলেজ প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে দেয়াল টপকে চলে আসেন আমতলায়, অমান্য করেন ১৪৪ ধারা। এবারের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সন্মাননা একুশে পদক পেয়েছেন তিনি। তার এই পদক প্রাপ্তি ও জীবনের নানা অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেছেন তিনি প্রিয়.কমের সঙ্গে।

ছয়তলা বাড়ির পঞ্চম তলায় শরিফা খাতুন থাকেন। গেস্ট রুমের সোফায় বসে অপেক্ষায় আছি। রুম ভর্তি বই আর এলোমেলো লেখার টেবিল। একটা মিষ্টি গন্ধ। রজনীগন্ধা ও গোলাপের। যা রুমটিকে একেবারে প্রাণবন্ত করে তুলছে বারবার। এই সব ভাবনার মুহূর্তগুলোকে শরিফা খাতুন এসে ভেঙ্গে দিলেন। ধীরগতিতে তিনি আমাদের সঙ্গে এসে বসলেন এবং বললেন ‘এসেছো তোমরা! তোমাদের জন্যই এতক্ষণ অপেক্ষা করছিলাম। হাসিমুখে শুরু হলো আমাদের কথোপকথন।

প্রিয়.কম: আপনি ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন...

শরিফা খাতুন: মাতৃভাষার দাবি পাকিস্তান সরকার মুছে ফেলার চেষ্টা করেছিল, তারা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করবে এই ভেবে। আর দেশভাগের পর জিন্নাহ সরকার ৪৮ সালে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেন। তখন আন্দোলনটা সারাদেশে একে একে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। নোয়াখালীতে তখন মিছিল হয়েছিল বাংলা ভাষার পক্ষে। আমরা স্কুলের ছাত্রীরা সে মিছিলে অংশ নিয়েছি। মূল আন্দোলন ঢাকায় হলেও ওই সময় বাংলা ভাষার ব্যাপারে আমাদের মধ্যে একটা চেতনা তৈরি হয়েছিল। ভাষার জন্য আমরা আন্দোলনে নেমেছিলাম। আর আমাদের আন্দোলনে ফলে বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে পেয়েছি। সেটাই আমাদের বড় পাওয়া।

প্রিয়.কম: ভাষা আন্দোলনে আপনি সরাসরি জড়িত হলেন কীভাবে?

শরিফা খাতুন: আমি ১৯৫১ সালে আমি ইডেন গার্লস কলেজে ইন্টারে ভর্তি হই। আমি মফস্বল থেকে এসেছি। এরপর হোস্টেলে সিট পেয়ে গেলাম। হোস্টেলের রিডিং রুমে বিভিন্ন পত্রপত্রিকা আসত। আমরা বান্ধবীরা সেগুলো পড়তাম। এরপর ১৯৫২ সালের জানুয়ারি শেষের দিকে খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকা এলেন। তিনি পল্টনের জনসভায় ঘোষণা দিলেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। তিনি কিন্তু রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের চাপে বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারে গণপরিষদে বলবেন বলে কথা দিয়েছিলেন। তিনি তার প্রতিশ্রুতি রাখলেন না। ছাত্ররা প্রতিবাদে ফেটে পড়ল।

সে প্রতিবাদের প্রভাব আমাদের হোস্টেলে এসে পড়ল। আমরা বিস্তারিত জানলাম। তখন ছাত্ররা ধর্মঘট ডাকল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ৩০ জানুয়ারি ধর্মঘট আহ্বান করে। এরপর ঢাকা বার লাইব্রেরিতে সর্বদলীয় সভা হয়। সভায় ২১ ফেব্রুয়ারি প্রদেশব্যাপী অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানে হরতালের ডাক দেওয়া হয়। গঠিত হয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় সভা ডাকে। আমরা ইডেন গার্লস কলেজে ছাত্রীরা সে সভায় অংশগ্রহণ করেছি।

প্রিয়.কম: তখন থেকেই সরাসরি নেমে গেলেন ভাষা আন্দোলনে?

শরিফা খাতুন : তার আগেও তো সচেতন ছিলাম। সব খবর রাখতাম আমরা হোস্টেলের মেয়েরা। ওই সময় চিঠির যে খাম ছিল, তাতে উর্দু ও ইংরেজি লেখা ছিল। কোনো বাংলা লেখা ছিল না। খুব খারাপ লাগত। ৪ ফেব্রুয়ারি যে সভাটা হয়, সেখানে আমি গিয়েছি।

প্রিয়.কম: বর্তমান প্রজন্ম ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে যেটা শুনে কিংবা পড়ে বড় হচ্ছে, আর আপনি সেই সময়গুলো দেখেছেন...

শরিফা খাতুন: বাইরে থেকে যারা ইডেন কলেজে আসত তারা ঘোড়ার গাড়িতে করে আসত। যাদের আর্থিক অবস্থা ভালো না; তারা রিকশায় করে আসত। এরকম পরিবেশ আর কি। আমরা সাধারণত অতো বেশি চলাফেরা বাইরে করতাম না। আর গেলেও হোস্টেল সুপারের অনুমতি নিয়ে বাইরে যেতাম।

আর ভাষা আন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে যেসব মিটিং ডাকা হতো তার আগে সংবাদ পাঠানো হতো। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভা হবে ওখানে আমাদের থাকতে হবে। ছাত্রী সংসদ আমাদেরকে খবর দিতো। কলেজে ক্লাস থাকলে আমরা ক্লাস শেষ করে পোস্টার নিয়ে বেরিয়ে যেতাম। আর ২১ তারিখে আমরা; সেদিন একটু অসুবিধা কারণ সেদিন হোস্টেলের গেটে তালা লাগানো। তখন আমরা প্রথম বর্ষে পড়ি।

কিন্তু তার আগের দিন রাতে মিটিং শেষে আমাদের জানিয়েছে আমরা যেন পরেরদিন সবাই সেই মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করি। সে হিসেবে সকালবেলা প্রস্তুতি নিয়েছি আমরা যাবো। আমাদের গেট তো তালাবদ্ধ। তখন আমরা সিনিয়র ছাত্রীরা সিদ্বান্ত নিলাম দেয়াল টপকে যাবো। সেসময় দেয়াল টপকে ২০-৩০ জন ছাত্রী সে মিছিলে যোগ দিয়েছিলাম। সেদিন যেহেতু ১৪৪ ধারা জারি আছে। দু-চার জন ছাড়া বাইরের ছাত্রীরা আর আসতে পারেনি। তবে অন্য সময় আমরা যখন মিছিলে যেতাম তখন আমাদের বাধা দিতো না।

প্রিয়.কম: সে সময় আপনারা যে উদ্দেশ্য নিয়ে মিছিলে গিয়েছিলেন, তখন কী ভেবেছিলেন এখনকার বাংলাদেশের অবস্থার মতো হবে?

শরিফা খাতুন: না। তখন এতো চিন্তা মাথায় ছিল না। তবে একটা বিষয়ই ভাবনার মধ্যে থাকত আমাদের মাতৃভাষাকে রক্ষা করতে হবে। তা না হলে আমরা তো বড় ধরনের সংকটের মধ্যে পড়ে যাবো। তখন এর তাৎপর্য কী হতে পারে-এতো গভীরে উপলব্ধি করি নাই। তখন যে বাংলাদেশ আলাদা একটা রাষ্ট্র হবে এটাও ভাবি নাই। এটা ভাবার প্রশ্নও আসার কথা নয়। ওই আন্দোলনকে দমন করতে গিয়ে বিষয়টা এমন হয়েছে আমরা আরও বাধ্য হয়েছি আমাদের অধিকার আদায়ের জন্য। স্বাধীন একটা রাষ্ট্র গঠন করব এটা তাদের অত্যাচার থেকেই চলে আসছে।

প্রিয়.কম: আপনি এবারের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সন্মাননা ‘একুশে পদক (ভাষাসৈনিক)’ পেয়েছেন, ভেবে কেমন লাগছে? 

শরিফা খাতুন: আমি মনে করি যে, একুশে পদক পাওয়ার মতো এত বড় কাজ করি নাই। সরকার আমাকে এতো বড় সম্মাননায় ভূষিত করেছেন, এটা একটা বিরাট প্রাপ্তি। এটা কিন্তু আশা করি নাই। কারণ আমার হাজবেন্ড গতবার পেয়েছেন। আরেকজন না পেলেও কোনো চিন্তা নেই। তবে সত্যি কথা বলতে, এ সম্মান পাওয়াতে আপনারা যেমন খুশি হয়েছেন, আমিও অনেক খুশি হয়েছি।

প্রিয়.কম: সময়ের সঙ্গে ভাষায় এক ধরনের পরিবর্তনও হয়েছে। সেই সাথে ভাষার এক ধরনের বিকৃতিও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?

শরিফা খাতুন: আমিও আসলে বুঝতে পারছি না। একই বাক্যে ইংরেজি এবং বাংলার ব্যবহার প্রবল আকার ধারণ করছে। আমরা যে বাসায় থাকছি সেটার নামও আগে ইংরেজিতে ছিল। পরে দেখছি আবার বাংলায় লেখা হয়েছে। আমরা কিছু বলিওনি। আর আমরা যে ভাষা সংগ্রামী তখন তারা তা জানেও না। আমরা অনেক খুশি হয়েছি। আমারও মাথায় আসছে না এতো ইংরেজির প্রচলন কেন? আমরা যে ভাষাটা ব্যবহার করছি এটা কারও নির্দেশে করছি না। ইচ্ছা কিংবা অনিচ্ছাকৃতও করছি না।

প্রিয়.কম: বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে মাতৃভাষার প্রতি টানটা কেমন দেখতে পান?

শরিফা খাতুন: এই প্রজন্মের সঙ্গে আমার তেমনটা যোগাযোগ নেই। আমি যতটুকু দেখি দেশের প্রতি তাদের ভালোবাসা আছে। যে যাই বলুক। এই দেশে তারা বাস করছে তো। আবার দেশের বাইরে বিভিন্ন কারণে গেলেও তারা চলে আসছে। দেশের প্রতি তাদের একটা মায়া, মমত্ববোধ আছে। আর ভাষার সঙ্গে তো আমাদের সংস্কৃতিও জড়িত। নানা ধরনের যে উৎসব রয়েছে সেটি তো ভাষাকেই কেন্দ্র করে।

ভাষার প্রেক্ষাপটেই আমাদের সংস্কৃতিটা এগিয়ে যাচ্ছে। ভাষার সঙ্গে শুধু আমাদের লেখাপড়ার সম্পর্ক না। আমাদের নাড়ী, নক্ষত্র ও পরিবেশের সম্পর্ক, সামাজিক কিংবা ধর্মীয় উৎসবের সম্পর্ক। আমার মনে হয় না যে বাংলা ভাষার গুরুত্ব কমে যাবে। বরং আরও উন্নত হবে। কারণ এটা এমন একটি রাষ্ট্র যেটা ভাষাকেন্দ্রিক রাষ্ট্র। এ ভাষার চর্চা অনেক জ্ঞানী ব্যক্তিরা করছেন। আর ভাষার মান সংরক্ষণের জন্য যাদের কাজ করার কথা তারা করছেনও। আমার মনে হয় না, কোনো একটা সময় গিয়েও বাংলা ভাষা তার গুরুত্ব হারাবে। বরং তা আরও বৃদ্ধি পাবে।

প্রিয়.কম: বইমেলা প্রসঙ্গ; এবার আপনার যাওয়া হয়েছে?

শরিফা খাতুন: না। এখন হাঁটতে কষ্ট হয়। দুই বছর আগে গিয়েছিলাম। তখন মেলা শেষে গিয়েছিলাম। ভিড় কম ছিল। এবার শেষের দিকে যাবো কী না বলতে পারছি না। যদি কেউ আসে তাহলে শেষের দিকে যাবো। আর এখন তো আমি হাঁটতেই পারব না।

প্রিয়.কম: আপনি তো বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন, নতুন কোনো বই লিখছেন?

শরিফা খাতুন: ভাবছি একটা ইউটিপিও লিখবো ছোট-খাট (গবেষণাধর্মী বই)। দু-তিন বছর লেগে যাবে।

প্রিয়.কম: আপনার বর্তমান ব্যস্ততা?

শরিফা খাতুন:  বর্তমানে আমি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার উপর কাজ করছি। আর বই লেখার কাজও চলছে।

প্রিয়.কম: এখন আপনার অবসর কাটে কীভাবে?

শরিফা খাতুন: লেখালেখি করেই দিনের বড় একটা সময় কাটছে। আর বাসার বাইরে খুব একটা যাওয়া হয় না। আমি জীবনী লিখতে চেষ্টা করছি। প্রায় অর্ধেক লিখেছি।

প্রিয়.কম: জীবনের অপ্রাপ্তি সম্পর্কে কিছু বলুন? 

শরিফা খাতুন: আমার এক জীবনে যা পাওয়ার তা পেয়ে গিয়েছি। আর এ নিয়ে আমার তেমন কোনো অতৃপ্তি নেই। শিক্ষক হয়েছি। প্রশাসনে ছিলাম। বই লিখেছি। ভাষার জন্য অনেক সম্মাননা পেয়েছি। আমি মনে করি; যতটুকু পাওয়ার জায়গা তা পেয়ে গিয়েছি। আমার মনে কোনো অতৃপ্তি নেই।

প্রিয়.কম: জীবনবোধ নিয়ে কখনও ভাবেন?

শরিফা খাতুন: না, আমার এখন তেমন কোনো ভাবনা নেই। নেই মৃত্যু ভাবনাও। মৃত্যু হলে তো হবেই। দরজা বন্ধ করে রাখলাম এজন্য মৃত্যু হবে না, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। জীবন তো তার সরল গতিতে চলবেই।

প্রিয়.কম: সময় দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ।

শরিফা খাতুন: তোমাকে এবং প্রিয়.কমকেও।

[ইন্টারভিউটি নিয়েছেন কুদরত উল্লাহ আর লিখেছেন মিঠু হালদার]

সম্পাদনা: শামীমা সীমা / ফারজানা রিংকী