ছবি সংগৃহীত

জাতির মননচর্চার মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে তার প্রবন্ধ সাহিত্য: ড. মোরশেদ

ছোটবেলায় বই পড়ার খুব নেশা ছিল। বলা যায়, অন্য পাঁচজনের মতো, সাহিত্য পাঠের মধ্য দিয়েই সাহিত্যচর্চার আগ্রহটা তৈরি হয়। লেখালেখির শুরুটা সেভাবেই।

শিবলী আহমেদ
সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ০৬:০৭ আপডেট: ১৯ আগস্ট ২০১৮, ২৩:১৬
প্রকাশিত: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ০৬:০৭ আপডেট: ১৯ আগস্ট ২০১৮, ২৩:১৬


ছবি সংগৃহীত

ড.মোরশেদ শফিউল হাসান। ছবি:সংগৃহীত।

(প্রিয়.কম) ড.মোরশেদ শফিউল হাসান। সম্প্রতি প্রবন্ধসাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য পেয়েছেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার। তার সমগ্র কর্মময় জীবনে তিনি রচনা করেছেন উল্লেখযোগ্য অসংখ্য বই। সাহিত্যে বিশেষ অবদান রাখা গুণী এ লেখকের সঙ্গে বেশ কিছু বাক্য বিনিময় হলো প্রিয়.কমের।

প্রিয়.কম: কেমন আছেন?

মোরশেদ শফিউল হাসান: ভালোমন্দ মিলিয়ে।

প্রিয়.কম: এবারের বই মেলায় গিয়েছেন কি?

মোরশেদ শফিউল হাসান: এ নিয়ে তিনদিন গিয়েছি। মেলা চলা পর্যন্ত আরও কয়েকদিন যাব নিশ্চয়ই। যেতে তো প্রতিদিনই মন চায়। এক সময় প্রায় রোজই যেতাম। ইদানীং নানা কারণে হয়ে ওঠে না। বিশেষ করে খুব ভিড়ের দিনগুলো এড়িয়ে চলি।

প্রিয়.কম: বই মেলার বিশেষ কোন দিকটি আপনার ভালো লাগে?

মোরশেদ শফিউল হাসান: মেলায় অনেক পুরনো বন্ধু, লেখক-প্রকাশকের সঙ্গে দেখা হয়। এমনিতে যাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ বা যোগাযোগ হয়তো ঘটে না। মেলা প্রাঙ্গনে বসে কখনো দীর্ঘ আড্ডা বা গল্পগুজবও হয়। পুরনো দিনের স্মৃতিচারণ, যারা নেই তাদের কথাও। আমার ছাত্রছাত্রী অনেকে মেলায় আসে। তাদের কেউ কেউ এখন লেখক, নিজেদের বই প্রকাশের খবর দেয়, নতুন বই উপহার দেয়। এ বিষয়টা বিশেষভাবে ভালো লাগে। বড় বা প্রতিষ্ঠিত লেখকদের নতুন বই প্রকাশের খবর তো নানাভাবেই জানা যায়। কিন্তু মেলায় না এলে নবীন বা তরুণ লেখকদের বই দেখার সুযোগ হয় না।

প্রিয়.কম: আপনি প্রবন্ধ ও গবেষণায় বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন, এ বিষয়ে আপনার অনুভুতি কী?

মোরশেদ শফিউল হাসান: এখানে একটা সংশোধনী দেওয়া দরকার। প্রায় সব পত্রপত্রিকায় ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ‘প্রবন্ধ ও গবেষণায়’ শিরোনামে সংবাদটা প্রচারিত হলেও, এবং আমিও প্রথমদিকে সেভাবেই বিষয়টা জানলেও, বাংলা একাডেমি আমাকে পুরস্কারটা দিয়েছে ‘প্রবন্ধসাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য’। গবেষণা শাখায় তারা এবার কাউকে পুরস্কৃত করেননি। হয়তো উপযুক্ত লোক পাননি বলে। যদিও এখন পর্যন্ত যাঁরা আমাকে পুরস্কারপ্রাপ্তিতে অভিনন্দন জানাচ্ছেন তাঁদের সবাই দেখছি, ব্যতিক্রমহীনভাবে, আমার একটি গবেষণাগ্রন্থের কথাই বিশেষভাবে উল্লেখ করছেন। পাঠক কিংবা যারা আমাকে পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দিয়েছেন তাদের কজন আমার প্রবন্ধের সঙ্গে পরিচিত, তা নিয়ে আমার নিজেরও সন্দেহ আছে।

অনুভূতির কথা যদি বলেন, পুরস্কার তো এক ধরনের স্বীকৃতি। অর্থমূল্য বাদ দিলেও, এর একটা প্রচার বা সামাজিক মূল্য আছে। যারা হয়তো আমাকে চিনতেন না, কিংবা পরিচিত যাঁরা এতকাল আমার লেখালেখিকে কোনো মূল্য বা গুরুত্ব দেননি, তারাও এই পুরস্কারপ্রাপ্তিতে আমাকে অভিনন্দিত করেছেন। আমি এ বিষয়টিকে উপভোগ করছি। তাদের কেউ কেউ যদি এবার বইমেলা থেকে আমার দু-একটি প্রবন্ধপুস্তক সংগ্রহ করতে আগ্রহী হন, তাকেই আমি পুরস্কারের প্রধান সার্থকতা বলে গণ্য করবো। তবে সে সম্ভাবনা কতোটা আমি জানি না।

প্রিয়.কম: তরুণরা সাহিত্য বলতে কেবল গদ্য কিংবা কবিতা লেখাকেই বুঝে থাকে। সাহিত্যে প্রবন্ধ বা গবেষণার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু?

মোরশেদ শফিউল হাসান: ‘গদ্য’ বলতে আপনি খুব সম্ভব কথাসাহিত্য অর্থাৎ গল্প-উপন্যাসের কথা বোঝাতে চেয়েছেন। প্রবন্ধও তো গদ্যেই লেখা হয়! তরুণ বয়সে একজন কবিতা বা গল্প দিয়ে সাহিত্যচর্চা শুরু করবেন, বা তার প্রতিই বেশি আগ্রহী হবেন, এটা খুব স্বাভাবিক। সব কালে সব দেশেই বোধহয় এমনটা ঘটে থাকে। আমার নিজের লেখালেখির শুরুও কিন্তু কবিতা ও গল্প দিয়ে। প্রবন্ধের জন্য অধ্যয়ন ও চিন্তাচর্চার দরকার। তরুণ মন হয় অনুভূতিপ্রবণ, নিজস্ব চিন্তা বা দৃষ্টিভঙ্গি তখন তৈরি হয় না। সে সময় প্রবন্ধ লিখতে গেলে তা সাধারণত হয় অন্যের পর্যবেক্ষণ ও চিন্তার পুনরাবৃত্তি, অর্থাৎ চর্বিত চর্বণ।

একটা জাতির চিন্তা বা মননচর্চার মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে তার প্রবন্ধসাহিত্য। আমি অবশ্য ডিগ্রি, চাকরি বা পদোন্নতির প্রয়োজনে লেখা তথাকথিত একাডেমিক প্রবন্ধের এক বড় অংশকে বাদ দিয়েই এই মন্তব্য করছি।

প্রিয়.কম: এবারের বই মেলায় আপনার নতুন কোনো বই এসেছে কি? বইয়ের নাম কি?

মোরশেদ শফিউল হাসান: ‘নজরুল জীবনকথা’ নামে আমি সম্প্রতি একটি বই লিখেছি। সবার পাঠোপযোগী করে নজরুলের একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু তথ্যবহুল এবং প্রামাণ্য বা নির্ভরযোগ্য জীবনী রচনার উদ্দেশ্য থেকেই এ বইটি লেখা। বইমেলার আগেই বইটি বাজারে এসে গেছে। এর প্রকাশক প্রথমা প্রকাশন। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ ও সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে লেখা আমার গোটা তিরিশেক প্রবন্ধ-নিবন্ধ নিয়ে অনুপম প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে ‘প্রসঙ্গ মুক্তিযুদ্ধ’ নামে একটি বই। আর বইমেলাকে সামনে রেখেই কিছুদিন আগে কথাপ্রকাশ থেকে দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে আমার ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’।

প্রিয়.কম: এবার আপনার ছোটবেলার কথা জানতে চাইব। আপনি সাহিত্যে এলেন কেন এবং কীভাবে?

মোরশেদ শফিউল হাসান: ছোটবেলায় বই পড়ার খুব নেশা ছিল। বলা যায়, অন্য পাঁচজনের মতো, সাহিত্য পাঠের মধ্য দিয়েই আমারও সাহিত্যচর্চার আগ্রহটা তৈরি হয়। লেখালেখির শুরুটা সেভাবেই। হয়তো ওই বয়সেই মনে হয়েছিল, চারপাশের মানুষকে আমার কিছু বলার আছে। আর সাহিত্যের মধ্য দিয়েই সর্বোত্তমভাবে তা বলা যায়। সেই সঙ্গে একরকম অমরত্বের বাসনাও হয়তো মনের কোণে কাজ করেছিল। এক সময় আমি থাকবো না, কিন্তু আমার কথাগুলো বইয়ের পাতায় বেঁচে থাকবে। মাঝে একটা সময় অবশ্য বিশ্বাস করতাম যে লেখালেখির দ্বারা জগৎ বা সমাজকে পাল্টানো যায়। আজ আর সে বিশ্বাসটা ততো প্রবলভাবে পোষণ করি না। তারপরও এখনও যে লেখালেখি করে যাচ্ছি তার কারণ, মনে হয়, আমার বলার কথা এখনও শেষ হয়নি। হয়তো এক কথাই বারবার বলছি, তবু যতদিন পারি বলে যেতে হবে। কিংবা হতে পারে এই একটা কাজই আমি কিছুটা পারি।

প্রিয়.কম: সাহিত্য নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

মোরশেদ শফিউল হাসান: পরিকল্পনা তো অনেকই করি। তার বেশিরভাগই শেষাবধি ভাবনার স্তরে রয়ে যায়। লেখালেখির ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে দুটি প্রধান পরিকল্পনা নিয়ে ভাবছি : (১) আমার ‘স্বাধীনতার পটভূমি : ১৯৬০ দশক’ বইটির পরবর্তী খণ্ড ‘স্বাধীনতার অভিমুখে’ লেখার কাজ অবিলম্বে শুরু করা। এ ব্যাপারে প্রকাশকের দিক থেকে তাগিদ আছে। (২) মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমার পরিকল্পিত ট্রিলজির দ্বিতীয় উপন্যাসটিও এ বছর লিখতে শুরু করব ভাবছি। নিজে তো ভেতর থেকে তাড়া অনুভব করছিই। তাছাড়া যে অল্পকিছু পাঠক ‘একাত্তর’ নামে আমার প্রথম উপন্যাসটা পড়েছেন, তাঁরাও মাঝে মাঝে মনে করিয়ে দেন। 

প্রিয়.কম: পাঠকদের উদ্দেশ্যে আপনার কিছু বলার আছে কি?

মোরশেদ শফিউল হাসান:  স্রেফ আনন্দ পাওয়া বা অবসর কাটানোর জন্য আজ আর কেউ বই পড়েন কিনা, কিংবা কতভাগ পাঠক পড়েন, জানি না। একে তো এখন মানুষের অবসর কম, তারপর আবার চিত্তবিনোদনের অজস্র উপায়-উপকরণ তার চারপাশে ছড়ানো। এমনকি পরীক্ষা পাশের জন্যও আজ আর বই পড়ার প্রয়োজন হয় না। এ অবস্থায়ও যারা বই পড়েন, নিশ্চয় তারা বইকে মননসঙ্গী হিসেবে পেতে চান। সেক্ষেত্রে পাঠককে অবশ্যই গ্রন্থ আর বাঁধানো ছাপা কাগজের মধ্যে পার্থক্য করতে পারতে হবে। প্রচার-প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হয়ে অজস্র বইয়ের মধ্যে সত্যিকার ভালো বইটি তাদের খুঁজে নিতে হবে। নবীন পাঠকদেরও তেমন বই পড়তেই উৎসাহিত করতে হবে যা তাদের মনকে আলোকিত, জীবনকে সত্যিকার অর্থে সমৃদ্ধ করবে। সর্বোপরি যে বই মনুষ্যত্ব বিকাশের সহায়ক হবে, প্রত্যক্ষ না হোক, পরোক্ষভাবে।

প্রিয়.কম: প্রিয়.কমের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ।

মোরশেদ শফিউল হাসান:  আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।

সম্পাদনা: শামীমা সীমা

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


loading ...