শহিদ মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি নাটোরের বাবুল

শহিদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বাবুলের সহযোদ্ধা ছাত্রনেতা রেজা, রঞ্জু, সেলিম স্বীকৃতি পেলেও বাবুলের ভাগ্যে তা আজও জোটেনি।

আয়েশা সিদ্দিকা শিরিন
সহ-সম্পাদক
১৬ এপ্রিল ২০১৮, সময় - ১৭:১৫

মুক্তিযোদ্ধা বাবুল। ছবি: বাসস

(প্রিয়.কম) মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে জনমত গঠন এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে শহিদ হয়েছেন নাটোরের তৎকালীন চার ছাত্রনেতা রেজা, রঞ্জু, সেলিম ও বাবুল। কলেজের স্মৃতিসৌধে, কবরের নামফলকে, স্যুভেনিরের পাতায়সহ নাটোরবাসীর মনে চিরজাগ্রত রয়েছেন এ চার মুক্তিযোদ্ধা। শহিদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বাবুলের সহযোদ্ধা ছাত্রনেতা রেজা, রঞ্জু, সেলিম স্বীকৃতি পেলেও বাবুলের ভাগ্যে তা আজও জোটেনি।

বাবুলের আত্মীয়-স্বজন এবং নাটোরের মুক্তিযোদ্ধারা বাবুলকে শহিদ মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি প্রদানের দাবি জানিয়েছেন বর্তমান সরকারের কাছে।

আমিরুল ইসলাম খান বাবুল মুক্তিযুদ্ধের সময়ে নাটোর নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক হিসেবে বাবুল ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয়। বাবুলের সহপাঠী অবসরপ্রাপ্ত প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক জালাল উদ্দিন বলেন, ‘বাবুল পড়াশোনার পাশাপাশি ছাত্র রাজনীতিতে ছিল অগ্রগামী।’

মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ও নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেন, ‘সদা হাস্যোজ্জ্বল ও সাহসী বাবুল দলের দেয়াল লিখন লিখতেন, হাতে লেখা পোস্টার তৈরি করতেন এবং সমাবেশের মাইকিং করতেন।’

২৫ মার্চ ঢাকায় অপারেশন সার্চ লাইট শুরু হওয়ার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি দল ঢাকা থেকে রাজশাহী সেনানিবাসে যাওয়ার পথে নাটোর ও পাবনার সীমান্ত এলাকায় মুলাডুলিতে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে পড়ে।

ছত্রভঙ্গ হয়ে সেনাবাহিনীর ৭টি গাড়ি বহর নাটোরের লালপুর উপজেলার আকন্দ সড়ক পথে ময়না গ্রামে ঢুকে পড়ে। খবর পেয়ে নাটোর ও লালপুরের মুক্তিযোদ্ধা, পুলিশ, আনসারসহ সর্বস্তরের মানুষ ময়না গিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের ঘিরে ফেলেন। শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ।

দীর্ঘ সময়ের এ অসম যুদ্ধে শহিদ হন অন্তত ৪০ জন বাঙালি। বাঙালিদের গড়ে তোলা প্রাণপণ এ প্রতিরোধে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় পাকিস্তান হানাদার বাহিনী। ময়নার যুদ্ধে নাটোর থেকে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বাবুল ছিলেন অন্যতম।

শেষে আরো সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে ভারত যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বাবুল। অসুস্থ মাকে নাটোর শহরের কানাইখালী মহল্লার বাসায় দেখতে এসে তিনি ধরা পড়েন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ফুলবাগানে স্থাপিত নির্যাতন কেন্দ্রে।

ছেলেকে উদ্ধার করতে ছুটে যান ট্রাফিক পুলিশে কর্মরত বাবা আব্দুর রশীদ খান। এরপর থেকে বাবাসহ বাবুল নিখোঁজ। ৩০ এপ্রিল তাদের দুজনকে হত্যা করে অন্য সব মুক্তিযোদ্ধাদের মতো ফুলবাগান বদ্ধভূমিতে লাশ ফেলে দেওয়া হয় বলে জানান যুদ্ধকালীন বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স, নাটোরের কমান্ডার শেখ মো. আলাউদ্দিন

নাটোর জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান, সাবেক সংসদ সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মজিবর রহমান সেন্টু বলেন, ‘ছাত্রলীগের নিবেদিত প্রাণ শহীদ বাবুল শুধু ময়নার যুদ্ধেই অংশগ্রহণ করেনি, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বর্তমান রাণী ভবানী সরকারি কলেজ মাঠে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণেও সে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করত।’

কানাইখালীতে শহিদ রেজা ও শহিদ রঞ্জুর কবরের সঙ্গে নওগাঁয় শহিদ সেলিম এবং নাটোরের ফুলবাগানে বাবুলের নামও প্রতীকীভাবে সংযুক্ত করা হয়েছে। এ ব্যাপারে উদ্যোক্তা নাটোর পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান কামরুল ইসলাম বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চার শহীদকে একইসাথে স্মরণ এবং এর আনুষ্ঠানিকতা পালনের জন্যে এ উদ্যোগ।’

একাত্তরের পরে নাটোর নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা কলেজের নির্বাচিত ভিপি কলেজ চত্বরে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে কলেজের পাঁচ শহিদ ছাত্রের স্মরণে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেন। এ স্মৃতিসৌধে রক্ত আখরে লেখা নাম তালিকায় আছেন শহিদ বাবুল।

বাবুলের ছোট বোন নার্গিস পারভীন বলেন, ‘১১ ভাই-বোনের মধ্যে বাবুল ছিল সবার বড়। স্বামী আর বড় ছেলেকে একই সাথে হারিয়ে আমার মা তখন পাগলপ্রায়, ছোট আমরাও দিশেহারা। আমরা ছিলাম কিংকর্তব্যবিমূঢ়।’

সম্প্রতি শহীদ বাবুলের আত্মীয়-স্বজন এক সংবাদ সম্মেলনে তাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদানের দাবি জানিয়েছেন। বাবুলের ভাগ্নি রোখসানা পারভীন তন্দ্রার ভাষায়, ‘আমরা তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা চাই।’

সূত্র: বাসস

প্রিয় সংবাদ/রিমন

জনপ্রিয়
আরো পড়ুন