(প্রিয়.কম) বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের শূন্য রেখায় জন্ম নিয়েছে চার শতাধিক নবজাতক। যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান এই হিসাব দিয়ে বলেছে, গত ১৫ দিনে রাখাইন রাজ্যে অব্যাহত সহিংসতার মুখে পালিয়ে আসা চার লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে যোগ হচ্ছে এসব শিশু।

রোহিঙ্গারা পড়েছে ফাঁদে। সহিংসতার জন্য মিয়ানমার সেনাবাহিনী বিদ্রোহীদের দায়ী করছে। জাতিসংঘ পরিস্থিতিকে ‘মানবিক বিপর্যয়’ হিসেবে অভিহিত করেছে আর সাহায্য সংস্থাগুলো ‘বিহ্বল’ হয়ে পড়েছে। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ৮০ শতাংশই নারী আর শিশু। আর পালানোর মুখে জন্ম হচ্ছে নতুন নবজাতকের।

এসব নতুন মায়েদের একজন ২৫ বছরের সুরাইয়া সুলতান। সীমান্তের শুন্য রেখায় তার প্রসব বেদনা উঠলে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) তাকে একটি নৌকায় নিয়ে যায়। আয়েশা নামে আরেক নারী শাড়ির আড়ালে তাকে সন্তান প্রসব করতে সাহায্য করেন। অসুস্থ আর বিধ্বস্ত হয়ে পড়া মা ও নবজাতককে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় কাছের নয়াপাড়া রোহিঙ্গা শিবিরে। ওই শিবিরের কর্মকর্তা মো. মইনুল হক গার্ডিয়ানকে বলেছেন, ‘এরকম পরিস্থিতে পড়া আরও অনেককেই তারা পেয়েছেন। তাদের অনেকের অবস্থাই বেশ গুরুতর।’

তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের সর্বাত্মক সাহায্যের চেষ্টা করছি কিন্তু পরিস্থিতি আমাদের সামর্থের বাইরে।’ সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যাচ্ছেন মা, আবার মা অসহায় হয়ে দেখছেন সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুর অসুস্থতা কিংবা ক্যাম্পের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মারা যাচ্ছে নবজাতক।

রোহিঙ্গা শিশু

জীবন হাতে নিয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শিশু। 

আরেক রোহিঙ্গা নারী মাসুম বাহাদুর। ২৮ বছরের এই তরুণী হারিয়েছেন তার সন্তান। তিনি বলেন, জ্বরে আক্রান্ত হয়ে কাঁপুনি উঠল তিন দিন বয়সী ছেলেটার। ওর বাবা আবু বকর (৩৫) ওকে নিয়ে ছুটে গেল সাহায্যের আশায় কিন্তু ফিরল মৃত সন্তানকে বুকে নিয়ে।’ আশেপাশের এলাকায় কোনো গোরস্থানও নেই। সব জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে শরণার্থীরা। বাধ্য হয়ে আবু বকর তার সন্তানকে জঙ্গলের মধ্যে ছোট একটি গর্তে সমাহিত করেন।

আরেক নারী জানতেন না তার মৃত সন্তানকে নিয়ে কী করবেন। দুই দিন ধরে তাকে নিয়ে হেঁটে বেড়ানোর পর বাধ্য হয়ে ছুড়ে ফেলেছেন নাফ নদীতে। গার্ডিয়ানকে এই গল্প বলার সময় তার দুচোখ গড়িয়ে নামে অশ্রুধারা। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মন্জুর কাদের আহমেদ বলছিলেন, ‘পর্যাপ্ত খাদ্যা আর পানির অভাবে মা সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারছেন না।’

জাতিসংঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের কর্মকর্তা ভিভিয়ান তান বর্ণনা করছিলেন, একজন রোহিঙ্গা বিধ্বস্ত হয়ে নয়াপাড়া ক্যাম্পের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছেছিলেন। তিনি আমাদের নিয়ে বাইরে গেলেন, কম্বলে ঢাকা ছোট একটি ঝুড়ির মুখ খুললে বেরিয়ে এলো সদ্য জন্ম নেওয়া দুটি অপুষ্ট শিশু।

তিনি জানান, পালিয়ে আসার পথে তার স্ত্রী সন্তান দুটিকে জন্ম দিয়েছেন। ওই কর্মকার্তা পরীক্ষা করে দেখলেন মারা গেছে তাদের একজন।

ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক অ্যান্থনি লেক বলেন, সীমান্তের দুই পারের নারী ও শিশুদের জরুর ভিত্তিতে সাহায্য দরকার। বাংলাদেশ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেও রাখাইনের উত্তরাঞ্চলীয় এলাকাগুলোতে চিকিৎসা কর্মীদের যেতে বাধা দিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমার সরকার। সেখানে প্রচুর শিশু এবং গর্ভবতী অসহায় অবস্থায় রয়েছে।

প্রসঙ্গত, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গত ২৫ আগস্ট থেকে নতুন করে সেনা অভিযান শুরু হয়। এ অভিযানের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা এবার ৩ লক্ষ ৭০ হাজার ছাড়িয়েছে বলে ধারণা করছে জাতিসংঘ। 

২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার শিকার হয়ে তারা ধাপে ধাপে পাঁচ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেন বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র ভিভিয়ান তান।

এর আগে জাতিগত দ্বন্দ্বের জেরে ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে দেশটির সেনাবাহিনীর চালানো একই রকম অভিযানের বর্বরতায় বাধ্য হয়ে অন্তত ৮০ হাজার রোহিঙ্গা পার্শ্ববর্তী বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করে।

প্রিয় সংবাদ/রিমন