মাহবুব মানিক। ছবি: লেখক

ছাত্র রাজনীতিতে জার্মানি এবং বাংলাদেশ

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে একেবারেই ছাত্র সংগঠন নেই, এমনটি বলছি না। এখানেও ছাত্র সংগঠন আছে। প্রতি সেমিস্টারে...

মাহবুব মানিক
গবেষক, মার্সেবুর্গ ইউনিভার্সিটি অব এপ্লায়েড সায়েন্স, জার্মানি
প্রকাশিত: ০৪ মে ২০১৮, ১৯:৪৪ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ২৩:০০


মাহবুব মানিক। ছবি: লেখক

জার্মানিতে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন আমি দেখিনি। সম্ভবত এসব দেশে শিক্ষার্থীদের রাজনীতিতে জড়ানো নিষেধ। তারা হয়তো আমাদের মতো এতটা মেধাবী নয় যে, রাজনীতি এবং লেখাপড়া একসঙ্গে চালাতে পারবে। সেই বিবেচনা থেকেই হয়তো শিক্ষার্থীদের রাজনীতি থেকে দূরে রাখা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে একেবারেই ছাত্র সংগঠন নেই, এমনটি বলছি না। এখানেও ছাত্র সংগঠন আছে। প্রতি সেমিস্টারে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বাড়তি কিছু অর্থও নেওয়া হয় ছাত্র সংগঠনটি চালাতে। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক বা তারা যেমন খুশি তেমন দিলো, এমনও নয়।

একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সেমিস্টার ফির সঙ্গেই দিতে হয়। অর্থের পরিমাণ যতদূর জানি বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে পাঁচ থেকে ১০ ইউরোর মতো হয়। টাকার অঙ্কে দাঁড়ায় ৫০০ থেকে এক হাজারের  মধ্যে। যদি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নির্দিষ্ট করেই বলতে হয়, সে ক্ষেত্রে আমাদের দিতে হতো ৭.৫ ইউরো। টাকার অঙ্কে সাড়ে ৭০০।

এই সাড়ে ৭০০ টাকা জলে ফেলে দিলাম, এমনটি ভাববার অবকাশ নেই। এই অর্থ পুঁজি করে ছাত্র সংগঠনটি শিক্ষার্থীদের জন্য নানা রকম উন্নয়নমূলক কাজ করে থাকে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মাসে একটি ম্যাগাজিন প্রকাশ করা। তবে সেটি জার্মান ভাষাতে হওয়ার কারনে বিস্তারিত পড়ে দেখার ইচ্ছা কখনো হয়নি। তবে শিরোনাম পড়ে বুঝেছি, সেখানে বিভিন্ন শিক্ষার্থীর লেখা প্রকাশ করে থাকে।

শিক্ষার্থীদের সমস্যা, মানোন্নয়ন, দুর্যোগ মোকাবিলা, নতুন গবেষণার কৃতিত্ব, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মতো বিষয়বস্তু ওই ম্যাগাজিনে স্থান পায়। নতুন কোনো শিক্ষার্থী শহরে এলে তাকে পথঘাট চেনানো, ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন এবং বাসা ঠিক করে দেওয়ার জন্য কিছু ভলান্টিয়ার নিয়োগ দেওয়া হয়। ছাত্র সংগঠনের অধীনে একটি দোকান ও পরিচালনা করা হয়, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো সংবলিত উপকরণ বিক্রয় করা হয়। এ ক্ষেত্রে ক্রেতা হয় সাধারণত দেশি-বিদেশি পর্যটক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচার-প্রসারের জন্য ওই পন্থা সহায়ক মনে করা হয়। বিক্রিত সামগ্রীর মধ্যে অন্যতম টি-শার্ট, মগ, ব্যাগ, ফুলদানি, বাৎসরিক বিভিন্ন ধরনের উৎসবের স্টিকার৷ বিক্রয়কৃত অর্থ ছাত্র সংগঠনের তহবিলে জমা করা হয়৷

জার্মানিতে অন্যতম একটি ব্যয়বহুল সমস্যা হচ্ছে অজান্তে বা অবহেলায় মামলা মোকদ্দমায় ফেঁসে যাওয়া। কীভাবে অজান্তে অবহেলায় মামলায় ফেঁসে যায়, সে ঘটনা পরের কোনো লেখাতে বলব। এখানে উকিলের ফি জোগানো, আদালতের পেছনে ছোটা খুবই ব্যয়বহুল। শিক্ষার্থীদের পক্ষে বহন করা শক্ত কাজই বটে।

আশার ব্যাপার হচ্ছে, ছাত্র সংগঠনটি কিছু উকিল বা পরামর্শদাতা নিয়োগ করে থাকে। যখন কোনো শিক্ষার্থী আইনি সমস্যায় পড়ে, তখন এই সংগঠন থেকে তাকে সব ধরনের সাহায্য করা হয়। পাস করার পর যদি চাকরি না হয়, তখন এই ছাত্র সংগঠন থেকে চাকরি পেতে সাহায্য করা হয়। কোনো শিক্ষার্থী যদি হঠাৎ অর্থনৈতিক বিপদে বা সংকটে পড়ে, তখন তাকে অনুদান দিয়ে বিপদ থেকে উদ্ধারে সহায়তা করা হয়।

আমাদের মতো বাংলাদেশিদের জন্য আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এখানে কোনো গ্রুপিং নেই, দলাদলি নেই, মারামারি নেই, ক্যান্টিনে ফ্রি খাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি নেই, টাকা পয়সা মেরে খাওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধান্দাবাজ নেই, চাঁদাবাজ নেই। এমনকি তেরটি থাপ্পড় দিয়ে টাকা উদ্ধারের মতো কোন সাহসী বীরও নেই।

সংগঠনে পদ পাওয়ার জন্য অনলাইনে নির্বাচন করা হয়। কয়েকজন ভোটে দাঁড়ায়। শিক্ষার্থীরা অনলাইন ভোটাভুটিতে যাকে মনোনয়ন করে, তাকেই পদায়ন করা হয়। যাকে ভোট দিয়ে দায়িত্ব দেয়া হলো, সে হঠাৎ বনবিড়াল থেকে বাঘ হয়ে গেলো, ব্যাপারটা এমন নয়। এরা অন্য সাধারণ ছাত্রের মতই ক্লাস করে, পরীক্ষা দেয়, ফেল করে, পাসও করে। আবার বাড়তি দায়িত্ব হিসেবে ছাত্র সংগঠনের পদাধিকার বলে প্রাপ্ত কাজটুকুও করে।

এবার নিজ দেশে ফিরে আসি। যদিও বলার প্রয়োজন নাই। কারণ দেশের পরিস্থিতি আমরা কম-বেশি সকলেই জানি৷ তারপরও লেখায় সম্পূর্ণতা আনার জন্য অল্পবিস্তর লিখতেই হয়। প্রথম কথা হচ্ছে, বাংলাদেশে অরাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন গঠন করা প্রায় অসম্ভব। সবই রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন। এর বাইরে ছাত্রসংগঠন তৈরি করতে গেলেই এসব সংগঠন বিশেষ করে সরকারি ছত্রছায়ায় লালিত ছাত্র সংগঠনের তোপের মুখে পড়তে হবে, পিটিয়ে ক্যাম্পাস ছাড়া করবে। রাষ্ট্রদ্রোহী বা সন্ত্রাসী বানিয়ে পুলিশের হাতেও তুলে দিতে পারে। যে কয়টি রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন আছে, এদের অবস্থা সবই উত্তর মেরু-দক্ষিণ মেরু। এদের কেউই অপর পক্ষের শিক্ষার্থীকে শিক্ষার্থী মনে করে না, মনে করে সন্ত্রাসী। সবাই সবার প্রতিপক্ষ। সাধারন শিক্ষার্থীদের পক্ষে কেউ থাকে না। আগে দল করো, তারপরে দেখব তোমার সমস্যায় কী করা যায়। কাজেই এগুলোকে ছাত্র সংগঠন বলার থেকে দলীয় সংগঠন বলাই শ্রেয়। আর বিস্তারিত বলার কিছু নাই। কয়েকটি প্রশ্ন রেখে যাব। উত্তর হয়তো সবারই জানা। 

ছাত্র সংগঠনের নেতা ক্লাসে যায় কি না? পরীক্ষা দেয় কি না? দলের বাইরে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়নের কথা ভাবে কি না? প্রভাবশালী মহলের ইন্ধনে চলে কিনা? চাঁদাবাজি করে কি না? শিক্ষকদের গায়ে হাত তোলে কি না? ক্যান্টিনে ভাত-তরকারি-চা খেয়ে বিল দেয় কি না? আচার-আচরণ, ব্যবহারে আর ১০টা শিক্ষার্থীর মতো কি না? চাওয়ালা-রিকশাওয়ালাদের সাথে সহনশীল কি না? সাধারণ ছাত্রদের কোনো ন্যায্য দাবিতে এদের সমর্থন পাওয়া যায় কি না? দলের বাইরে সাধারণ কোনো ছাত্র বিপদে পড়লে সংগঠন থেকে সাহায্য করে কি না? তাদের মতের বিপরীতে কথা বলা শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে কেমন আছে? সংগঠনের প্রধান সারির নেতাদের বয়স তার সংগঠনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না?

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কমের সম্পাদকীয় নীতির মিল না- থাকতে পারে।]

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
মায়ের গর্ভ থেকে বাবার হাসির শব্দ শুনতে পাই
মো. গোলাম মোস্তফা (দুঃখু) ২০ নভেম্বর ২০১৮
বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতির মেরুকরণ?
সাইমুম পারভেজ ১৯ নভেম্বর ২০১৮
শেখ হাসিনা: বাংলার মা
মৌলি আজাদ ১৫ নভেম্বর ২০১৮
বিজনেস এথিকস বনাম ডাটা পাইরেসি
ইকবাল আহমদ ফখরুল হাসান ১৫ নভেম্বর ২০১৮
স্পন্সরড কনটেন্ট