প্রতীকী ছবি

চাকরির বয়স: সরকারি অফিস কি মানুষের বয়স ধুয়ে পানি খাবে?

রাষ্ট্রপতি হতে হলে কমপক্ষে পয়ঁত্রিশ বছর বয়স হওয়া লাগে৷ সাংসদ বা মন্ত্রী হতে ন্যূনতম পঁচিশ বছর বয়স লাগে৷ এরপরে আর কোন বয়সের বাধা বিপত্তি নাই।

মাহবুব মানিক
গবেষক, মার্সেবুর্গ ইউনিভার্সিটি অব এপ্লায়েড সায়েন্স, জার্মানি
প্রকাশিত: ০৩ এপ্রিল ২০১৮, ১৩:০৮
আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ০০:৩২


প্রতীকী ছবি

যে কোন একটা বিষয় যখন যুগ যুগ ধরে চলে তখন আমরা তাকে প্রথা বলে থাকি৷ বর্তমান যুগ হচ্ছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগ৷ এখানে আবেগের বশে প্রথাগত বিষয়গুলো চলার থেকে বেশি জোর দেওয়া হয় বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক ব্যাখ্যার উপর৷ সেক্ষেত্রে প্রথা যুগোপোযোগি না হলে ভাঙা গড়ার কাজও করা হয়৷

বাংলাদেশে ত্রিশ বছর বয়সের পরে সাধারণত সরকারি চাকরি পাবার কোন যোগ্যতা থাকে না৷ এটিও এক রকম প্রথা৷ অন্যভাবে বললে এটি একটি তথাকথিত প্রথা৷ এটি বেশ অনড় ভাবেই যুগ যুগ ধরে চলে আসছে৷ সরকার ও এ প্রথা ভাঙতে অনাগ্রহী৷

বিষয়টা আমার আজও অজানা যে, সরকার ঠিক কোন দেশের পদ্ধতি অনুসরন করে এ প্রথা যুগের পর যুগ ধরে জিইয়ে রেখেছে৷ এটা কি শুধুই জেদ! যতদূর জানি প্রতিবেশি দেশগুলোতে বয়স সীমা চল্লিশ (ভারত) থেকে পয়তাল্লিশ (শ্রীলঙ্কা) বছর৷ সাধারণত সব অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের রোল মডেল হয় পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো৷ কিছুদিন পূর্বেই বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে৷ যদি দাবি করা হয় উন্নত দেশে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ সিস্টেম এভাবেই চলে৷ তাহলে তো সেটা হয় মহা ভুল৷ অন্তত আমি জার্মানির ক্ষেত্রে জানি যে যোগ্যতা সম্পন্ন চাকরি পাবার ক্ষেত্রে বয়স কোন বাধা নয়৷ মেধা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলে সবই সম্ভব৷

বাংলাদেশে সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী সকল সরকারি চাকরির জন্য আবেদনের ক্ষেত্রে ত্রিশ বছর বয়স সীমাবদ্ধ! কিন্তু কেন? কোন যৌক্তিক কারণ নেই৷ ঐ যে যুগ যুগ ধরে চলে আসছে৷ তাই এই প্রথা ভাঙা যাবে না৷ অনেকে বলতে পারে এতে করে চাকরি পাবার ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দীর সংখ্যা কমে যায়৷ সরকার কি আসলেই প্রতিদ্বন্দীর সংখ্যার ব্যাপারে চিন্তিত? নাকি প্রতেক্যের চাকরির নিশ্চয়তা বাস্তবে দিয়ে থাকে? সকলের চাকরি পাবার নিশ্চয়তা দেবার ব্যাপারটা এখনো ঐ খাতা কলমেই সীমাবদ্ধ৷ কাজেই মেধা ও মননে এগিয়ে থেকেই চাকরি বগলদাবা করতে হবে৷ এক্ষেত্রে বয়সের বাধা অযৌক্তিক৷

ব্যাপারটা এমন হয় যে, বয়স ত্রিশ হলেই সে যত বড় মহাপণ্ডিতই হোক না কেন হঠাৎ করেই সে রাতারাতি একটা নিরেট গাধা বা গরুতে রূপান্তরিত হয়৷ এরা প্রাইভেট চাকরিতে হাল চাষ করা ছাড়া কোন কাজের থাকে না৷ আবর্জনা মনে করে এদেরকে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়৷ 

আমাদের সমস্যা হচ্ছে, আমরা সোজা কাজের হিসাব জটিল করে ফেলি৷ সরকারি অফিস কি মানুষের বয়স ধুয়ে পানি খাবে? নিয়োগ প্রক্রিয়া দেখলে তো মনে হয় বয়স ধুয়ে পানি খাওয়ার উদ্দেশেই নিয়োগ দেওয়া হয়৷ আমাদের আসলেই কি দরকার? আমাদের দরকার শিক্ষিত ও অভিজ্ঞ লোক দিয়ে কাজ করানো৷ কে কত বয়সে ঢুকলো এটা কি সত্যিই আমার নজরদারী করার দরকার আছে? নতুনদের সুযোগ দিতে চাইলে অভিজ্ঞ বা অনভিজ্ঞ দুই ক্যাটাগরিতেই মেধাবী লোক নিয়োগ দিতে পারে৷ বয়স কেন একটা চাকরি পাবার ক্ষেত্রে বাধার কারণ হবে?

কারো যদি যোগ্যতা থাকে সে বাইশ বছর বয়সে চাকরি পাবে৷ কেউ যোগ্য হলে পয়তাল্লিশ বছর বয়সেও চাকরিতে ঢুকতে পারে৷ অথবা কেউ যোগ্য হলে পঞ্চাশ বছর বয়সেও ঢুকতে পারে৷ আবার কেউ হয়তো পঞ্চান্ন বছর বয়সে চাকরিতে ঢুকলো চার বছর চাকরি করে ঊনষাট বছর বয়সে রিটায়ার্ড করলো৷ এখানে সরকারের সমস্যা ঠিক কোন জায়গাতে? কে কত বছরে ঢুকলো এগুলো দিয়ে তার পেনশনসহ অন্যান্য অবকাঠামো সাজালেই তো কোন সমস্যা দেখি না৷ বিশ্বে একটি রোল মডেলই হবে আশা করা যায়৷

প্রত্যেকটা চাকরি শেষ করার একটা বয়স সীমা থাকবে, এটি ঠিক মানা যায়৷ কারণ একটা বয়সের পরে অনেকেরই আর কাজ করার মতো অবস্থা বা সামর্থ্য থাকে না৷ বৃদ্ধ হয়ে যায় হাত পা গুটিয়ে আসে মস্তিষ্ক অকার্যকর হতে শুরু করে, চোখে ছানি পড়ে৷ 

যদিও দেশে সাংসদ ও মন্ত্রী সভার সদস্যদের ক্ষেত্রে শর্ত আবার একটু আলাদা৷ ব্যাপারাটা এমন যেন বৃদ্ধ মানুষগুলো সাংসদ বা মন্ত্রী হলে জ্ঞান গরিমা ফেরত চলে আসে৷ এটা এক ধরনের সরকারি ধারণা! আবার রাষ্ট্রপতি হতে হলে কমপক্ষে পয়ঁত্রিশ বছর বয়স হওয়া লাগে৷ সাংসদ বা মন্ত্রী হতে ন্যূনতম পঁচিশ বছর বয়স লাগে৷ এরপরে আর কোনো বয়সের বাধা বিপত্তি নাই, অন্যদিকে অর্থাৎ বৃদ্ধ হবার দিকে অফুরন্ত সময়! যতদিন বাঁচবে ততদিনই এরা কর্মক্ষম থাকে৷ আবার এদের শিক্ষার বেলাতে নিরক্ষর হলেও চলে৷ ব্যাপারটা ঠিক দ্বিমুখী৷ জনপ্রতিনিধি বা চাকরি এই  দুটো ক্ষেত্রেই কর্মক্ষম, শিক্ষিত ও মেধাবী মানুষ খুব দরকার৷ একটি দেশ মাথা তুলে দাড়াবার জন্য খুব বেশি দরকার৷

একজন চাকরি প্রত্যাশী শিক্ষার্থী যদি এমনটি দাবি করে? জনপ্রতিনিধি (কমিশনার, চেয়ারম্যান, মেয়র, সাংসদ) হতে হলে সর্বোচ্চ বয়স হতে হবে ত্রিশ বছর! সরকারি চাকরিতে বয়স সীমা বেধে দেবার বিপরীতে এই দাবি কি অযৌক্তিক? আমি জানি এটি কখনোই সম্ভব হবে না৷ সাহস করে বললে ব্যাপারটা দাঁড়ায় সরকার এটি করবে না৷ সরকারি দল বা বিরোধী দল বলি৷ প্রার্থীগণ সবাই নিজ দলের লোকজন যে! ব্যাপার টা এমন যে নিজের বেলা আটি-সাটি পরের বেলায় চিমটি কাটি৷ অদ্ভুত দুনিয়ার অদ্ভুত সব নিয়ম কানুন৷

একটি জিনিসই কাম্য যে চাকরি পাবার প্রতিযোগিতা বাচ্চা-বুড়ো সবার জন্যই চলুক! একটি শ্রেণীর মানুষকে কেন উহ্য করা হয়? লাভ কী? অনর্থক যুক্তিতে কেন তাদের জীবনটাকে ফ্রাস্টেটেড করতে যাবো?

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কম-এর সম্পাদকীয় নীতির মিল নাও থাকতে পারে।]

প্রিয় মতামত/ ফারজানা/গোরা 

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


স্পন্সরড কনটেন্ট
সবসময় পাশে থাকবেন, সরকারি চাকুরেদের ইমাম
সবসময় পাশে থাকবেন, সরকারি চাকুরেদের ইমাম
বিডি নিউজ ২৪ - ১ দিন, ১ ঘণ্টা আগে

loading ...