গ্রামীণ ব্যাংক ভবন। ছবি: সংগৃহীত

গ্রামীণ ব্যাংকে নতুন পরিচালক নিয়োগ হবে কবে?

ব্যাংকটিকে নিজের কবজায় নিতে সরকার আইনকানুন বদলালেও বাস্তবায়ন করতে পারছে না কিছুই। একেকবার একেক পদক্ষেপ নিয়ে তা থেকে আবার সরে আসছে।

আশরাফ ইসলাম
সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ০৮ আগস্ট ২০১৭, ২০:০৭ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ০৭:১৬
প্রকাশিত: ০৮ আগস্ট ২০১৭, ২০:০৭ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ০৭:১৬


গ্রামীণ ব্যাংক ভবন। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) গ্রামীণ ব্যাংকের সংকট দিন দিন বেড়েই চলেছে। যত দিন যাচ্ছে পুরানো সংকটের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন সংকট। নোবেল বিজয়ী এ প্রতিষ্ঠানে সময়মতো কোনো পর্ষদ সভা হয় না। পর্ষদের নির্বাচিত সদস্যদের মেয়াদ শেষ হলেও নির্বাচন করা যাচ্ছে না। ব্যাংকটিকে নিজের কবজায় নিতে সরকার আইনকানুন বদলালেও বাস্তবায়ন করতে পারছে না কিছুই। একেকবার একেক পদক্ষেপ নিয়ে তা থেকে আবার সরে আসছে।

২০১৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে সদস্যদের নির্বাচিত ৯ প্রতিনিধির মেয়াদ শেষ হয়। এত দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এখনও কোনো নির্বাচন কমিশন গঠন না হওয়ায় পরিচালক নির্বাচন করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রাই আড়াই বছর হয়ে গেলেও ব্যাংকটির কোনো পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ এখনো নির্বাচন হয়নি। তাহলে ব্যাংকটিতে নতুন পরিচালক নিয়োগ হবে কবে?

এ সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে, তিনি ব্যাংকটিতে কবে নতুন পরিচালক নিয়োগ হবে সে সম্পর্কে তার অবহিত নেই বলে প্রিয়.কমকে জানান।

জানা গেছে, আড়াই বছর পার হওয়ার পর গত ১৬ জুলাই গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন বিষয়ে অর্থমন্ত্রীকে একটি চিঠি দিয়েছেন সরকারের নিয়োজিত বোর্ড চেয়ারম্যান খন্দকার মোজাম্মেল হক। চিঠিতে তিনি বলেন, একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ সময় পূর্ণাঙ্গ বোর্ড না থাকায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আটকে আছে। একই সঙ্গে সার্বিক কার্যক্রম সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনায় ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ সময়েও যেহেতু গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালক নির্বাচন বিধিমালা-২০১৪ প্রয়োগ হচ্ছে না, সে কারণে ওই বিধিমালার কিছু বিধি, উপবিধি সংশোধন বা সংযোজন করে বিদ্যমান সমস্যার নিরসনের পরামর্শ দেন।

সে ক্ষেত্রে ওই বিধিমালার ২(২০), ও ৬(১) ক, ৬(১) খ, ৬(১) গ, ৭ (১), ৭(২), ৯ (১), ১০(২), ২৯ (২), ৩০ ও ৩১ নম্বর বিধি ও উপবিধি সংশোধন বা সংযোজনের প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। প্রস্তাবটি বর্তমান বিধির পাশাপাশি রাখা হয়েছে। এসব বিধি, উপবিধির সংশোধন ও অনুমোদন হলে দ্রুততম সময়ে পরিচালক নির্বাচন করা যেতে পারে বলে উল্লেখ করেন গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান। এর ফলে পরিচালক নির্বাচনের মাধ্যমে ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠিত হবে। একই সঙ্গে আদালতে চলমান মামলার গুরুত্বও হ্রাস পাবে।

এ বিষয়ে মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান খন্দকার মোজাম্মেল হককে পাওয়া যায়নি। 

তবে গ্রামীণ ব্যাংকের অফিসে ফোন করলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিনিয়র অফিসার প্রিয়.কমকে জানান, গত আড়াই বছর ধরে গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালক নির্বাচন হচ্ছে না। এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকও এই নির্বাচনের উদ্যোগ গ্রহণ করে তা করতে ব্যর্থ হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এত বড় পরিসরের নির্বাচন আগে কখনও করেননি।

পরিচালক নির্বাচন সম্পর্কে তিনি আরও জানান, অর্থ মন্ত্রণালয় এখন কোনো হাইকোর্টের বিচারপতি অথবা জেলা ইনচার্জকে দিয়ে এই নির্বাচন করার চেষ্টা করছে। তবে কবে নাগাদ এই নির্বাচন হবে সে সম্পর্কে ওই কর্মকর্তা কিছু বলতে পারেননি।

জানা গেছে, গত ৬ আগস্ট রোববার রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সচিব ইউনুছুর রহমান ও গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের সঙ্গে সভা করেন অর্থমন্ত্রী। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, পরিচালক নির্বাচনের বিধিমালা সংশোধন নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের মতামত নেওয়া হবে। পরে সেই মত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালক নির্বাচন বা নতুন নিয়োগ কেন? এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ও অর্থনীতিবিদ ইব্রাহীম খালিদ প্রিয়.কমকে বলেন, ‘গ্রামীণ ব্যাংকের নির্বাচন পদ্ধতি সরকার পরিবর্তন করায় এতদিন পরিচালক নির্বাচনে সমস্যা হচ্ছিল। শিগগিরই সরকার আগের নিয়মে গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালক নির্বাচন করার সম্ভাবনা রয়েছে।

ইতোমধ্যে ব্যাংকটির পরিচালক নির্বাচন বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

গ্রামীণ ব্যাংকের পর্ষদ সদস্যসংখ্যা ১২। এর মধ্যে এত দিন ৯ জন নির্বাচিত হয়ে আসছিলেন ব্যাংকটির সদস্যদের মধ্য থেকেই। বাকি ৩ জন সরকারের নিয়োগ করা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গ্রামীণ ব্যাংক আইন-২০১৩ অনুযায়ী নির্বাচিত ৯ পরিচালকের মেয়াদ শেষ হয়েছে। চিঠি পাঠিয়ে এ বিষয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। কিন্তু তারা এটি মানতে রাজি নয়। সরকারের আদেশের বিরুদ্ধে একজন নির্বাচিত নারী পরিচালক মামলা করেছেন। এ অবস্থায় বোর্ড কার্যত অচল। ফলে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না। সরকারের এই আদেশের বিরুদ্ধে মামলা করে গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের এক সদস্য। এদিকে পরিচালক পদে নির্বাচনের জন্য সরকার কমিশনও গঠন করতে পারেনি। কবে নাগাদ কমিশন গঠন বা নির্বাচন হবে, তা-ও বলতে পারছে না কেউ। সব মিলিয়ে গ্রামীণ ব্যাংক পরিচালনায় অচলাবস্থা বিরাজ করছে।

২০১২ সালের ১২ জানুয়ারি নির্বাচনে ৯ নির্বাচিত পরিচালক ৮ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেন। নিয়ম অনুসারে তাদের মেয়াদ ৩ বছর পূর্ণ হয় ২০১৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পরিচালক নির্বাচনে কমিশন গঠন করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু কমিশন গঠিত না হওয়ায় গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন সম্ভব হচ্ছে না। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ২০১৪ সালের ১ এপ্রিলের প্রজ্ঞাপন দ্বারা গ্রামীণ ব্যাংক আইন-২০১৩ (২০১৩ সালের ৫৬ নম্বর আইন)-এর উদ্দেশ্য পূরণে গ্রামীণ নির্বাচিত পরিচালকদের মেয়াদ কত দিন, তা নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে। ২০১৩ সালের গ্রামীণ ব্যাংক আইনের ১১(১) উপধারা অনুযায়ী, নির্বাচিত পরিচালকদের কার্যকাল সর্বোচ্চ তিন বছর। অন্যদিকে ২০১৪ সালের পরিচালক বিধিমালার ৫(১) উপবিধির একটি অংশে বলা হয়েছে, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যমান নির্বাচিত পরিচালকদের পদ শূন্য হয়েছে বলে গণ্য হবে।

উক্ত বিধিমালা অনুসারে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিচালক নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়ায় বিধিমালার ৫(১) এবং ৬ (১) উপবিধি সংশোধন করে ২০১৪ সালের ২৭ অক্টোবর প্রজ্ঞাপন জারি করে। কিন্তু এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়নি।

যেহেতু এখনো নির্বাচন কমিশন গঠন করে তফসিল ঘোষণা করা হয়নি; তাই এই উপবিধি অনুযায়ী এখনো নিজেদের সদস্যপদ বহাল আছে দাবি করে ২০১৫ সালে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন করেন নয়জন পরিচালক, যা এখনও বিচারাধীন রয়েছে।

প্রিয় সংবাদ/রিমন