সূর্য গ্রহণের সময় সূর্যের দিকে তাকালে স্থায়ীভাবে চোখ ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। ছবি: সংগৃহীত।

সূর্য গ্রহণের দিকে তাকালে কী চোখ অন্ধ হয়ে যায়?

সত্যিই কী সূর্য গ্রহণের দিকে তাকালে মানুষ অন্ধ হয়ে যেতে পারে?

সাবেরা খাতুন
লেখক
প্রকাশিত: ০৩ জুলাই ২০১৭, ১৯:০৯ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ১৭:০০
প্রকাশিত: ০৩ জুলাই ২০১৭, ১৯:০৯ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ১৭:০০


সূর্য গ্রহণের সময় সূর্যের দিকে তাকালে স্থায়ীভাবে চোখ ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। ছবি: সংগৃহীত।

(প্রিয়.কম) আগস্টের ২১ তারিখ সূর্য পুরোপুরি কালো হয়ে যাবে ২ মিনিট ৪ সেকেন্ডের জন্য এবং চাঁদেরও একটি অংশ ঢাকা পড়ে থাকবে ৩ ঘন্টার জন্য। আমরা ছোটবেলায় শুনেছি যে, সূর্য গ্রহণের দিকে তাকাতে নেই, কারণ এতে চোখ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সত্যিই কী সূর্য গ্রহণের দিকে তাকালে মানুষ অন্ধ হয়ে যেতে পারে? চলুন তাহলে বিষয়টি সম্পর্কে জেনে নিই।

অন্টারিও এর অয়াটার লু বিশ্ববিদ্যালয়ের অপটোমেট্রি এর সম্মান ও উপাধিসহ অবসরপ্রাপ্ত  অধ্যাপক বি রালফ চৌ বলেন, ‘যদিও এটা শুনতে পুরনো দিনের কথা মনে হতে পারে, তবে সূর্য গ্রহণের ফলে স্থায়ীভাবে চোখ ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে এবং অনেক মারাত্মক অবস্থা হওয়ার মত শতাধিক ঘটনা ঘটার প্রমাণ আছে’। তিনি বলেন, ‘এই ধরণের ক্ষতি হওয়াকে সোলার রেটিনোপ্যাথি বলে, তবে  এর ফলে মানুষ সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে যায় না’।

চৌ লাইভ সায়েন্সকে বলেন, সবশেষে আপনার চোখের এমন ক্ষতি হতে পারে যার কারণে আপনি হয়তো অনেক বেশি ছোট কোন জিনিস দেখতে পাবেন না।

তিনি বলেন, এর ক্ষতির পরিমাপ করা আসলেই খুব কঠিন। যেহেতু সূর্য গ্রহণের ফলে অন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে অল্প কিছু গবেষণা হয়েছে। যদিও অন্ধ হয়ে যাওয়া এড়ানোর খুব সহজ একটি উপায় আছে,  আর তা হল সূর্য গ্রহণের দিকে তাকানোর সময় প্রতিরক্ষামূলক চশমা পরা।

চোখের জ্যামিতি

সূর্য গ্রহণের সময় সূর্যের দিকে তাকানো এবং  সাধারণ দিনে সূর্যের দিকে তাকানোর মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নেই। পার্থক্য শুধু এটাই যে, আমাদের বেশীর ভাগেরই সূর্যের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর মুখ ফিরিয়ে নেয়ার একটি প্রাকৃতিক প্রবণতা থাকে। সাধারণত মানুষ সূর্যের দিকে তাকানোর পরক্ষণেই দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নেয়।

চৌ বলেন, আমাদের মস্তিষ্ক অনেক অনেক বেশি উজ্জ্বল আলোকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্যই প্রোগ্রাম করা।

তিনি বলেন, সম্পূর্ণ সূর্য গ্রহণের মত বিরল ঘটনা ঘটার সময় মানুষ জানে যে, তারা বিশেষ কিছু দেখছে এবং এটি তাদেরকে তাকানোর জন্য বাধ্য করে।  

যখন মানুষ সূর্যের দিকে তাকায় তখন সূর্যের আলো চোখে এসে আঘাত করে এবং চোখের পেছনে অবস্থিত ফোভিয়া নামক অংশে ফোকাস করে। আলো সংবেদী কোষ – কোণ কোষ  ফটোরিসেপ্টরের মাধ্যমে আলো শোষণ করে এবং সংকেতকে বৈদ্যুতিক স্পন্দনে রূপান্তরিত   করে মস্তিস্কে পাঠায় এবং দৃশ্যমান সংকেত হিসেবে অনুভূত হয়।  

কিন্তু সূর্য গ্রহণের সময় অনেক বেশি আলো ওই কোষগুলোকে অনেক বেশি আঘাত করে যা  আসলেই আলো সংবেদী কোষগুলোর অংশ বিশেষের ক্ষতি সাধন করতে পারে, যা স্নায়ু সংকেত পাঠানোর জন্য দায়ী।

ক্ষতিকর প্রভাব

যদি এই কোণ কোষের বিপাকীয় সক্রিয়তা যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্থ হয় তাহলে এই কোষগুলো কাজ করা  বন্ধ করে দিবে। অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হলে কোষগুলো মারা যাবে। টেলিস্কোপ বা অন্য কোন অপটিকেল এইড এর মাধ্যমে যদি দীর্ঘক্ষণ সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকা হয় তাহলে থার্মাল ড্যামেজ হবে। অতিরিক্ত তাপে কোষগুলো সিদ্ধ হয়ে যায় বলে মারা যায়। কিছু মানুষের চোখ অর্ধচন্দ্রাকারে পুড়ে যায় যা সূর্য গ্রহণের অনুরূপ।

চৌ বলেন, শিশুরা যখন ম্যাগনিফায়িং গ্লাস বা আতশ কাঁচ দিয়ে আলোকে ফোকাস করে ঘাস বা পিঁপড়াকে পুড়ায় ঠিক একই রকম অবস্থা হয় যখন মানুষের থার্মাল ড্যামেজ হয়। ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালের ১৯৯৯ সালের গবেষণা অনুযায়ী, টেলিস্কোপ বা অন্য অপটিক্যাল এইড এর মাধ্যমে সূর্যের দিকে তাকানোর ফলে যে থার্মাল বার্ন হয় এতে রেটিনায় ১৮ থেকে ৪৫ ডিগ্রী ফারেনহাইট বা ১০ থেকে ২৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রা উঠতে পারে।

চৌ বলেন, সূর্যের দিকে তাকানোর ফলে যাদের চোখের ক্ষতি হয় তাদের কোন বস্তুকে ভালোভাবে দেখতে অসুবিধা হয়, যদিও তারা তাদের এই আঘাতের বিষয়টি ১ দিন পরে বুঝতে পারে। এ ধরণের আঘাতের সময় কোন ব্যথা হয়না এবং কয়েক ঘন্টা পর্যন্ত দৃষ্টি শক্তি স্বাভাবিকই থাকে, ক্ষতিগ্রস্থ কোষগুলো আস্তে আস্তে বন্ধ হতে থাকে।

তিনি রোগীদের বলতে শুনেছেন যে, পরদিন সকালে পত্রিকা পড়তে গিয়ে বা শেভ করতে যেয়ে তারা উপলব্ধি করেন যে তারা স্পষ্ট কিছু দেখতে পারছেন না। কারো কারো ক্ষেত্রে এই প্রভাব অস্থায়ী হয় আবার কারো ক্ষেত্রে স্থায়ী হতে পারে। এমন কোন পরীক্ষা নেই যার মাধ্যমে নির্ধারণ করা যায় যে, কারা কোন দলে পড়বেন। তিনি বলেন, তুরস্কে ১৯৭৬ সালের সূর্য গ্রহণের পর হওয়া এক গবেষণায় জানা যায় যে, এ ধরণের আঘাতের অনেক দিন পরে ১০ শতাংশ মানুষ যাদের চোখ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিলো, তারা এখনো ২৫ গজ বা ২৩ মিটার দূরের অক্ষর পড়তে পারেন না।

যদিও সূর্যের দিকে তাকানোর ফলে চোখে আঘাত লাগতে পারে, কিন্তু আসলে কতজন মানুষের মধ্যে এ ধরণের প্রভাব দেখা যায় তা জানা বেশ কঠিন। ১৯৭৯ সালে চৌ অপথেলমোলজিস্ট এবং  অপটোমেট্রিস্টদের বলেন তার কাছে রিপোর্ট পাঠানোর জন্য যে, ওই বছর সূর্য গ্রহণের সময় কতজন মানুষের চোখ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিলো। তিনি খুব কম রিপোর্টই পেয়েছিলেন।  

একইভাবে ১৯৯৯ সালের সূর্য গ্রহণের সময়ও ইউরোপে একটি জরিপ করা হয়, সোলার ট্রমার শুধুমাত্র মুষ্টিমেয় কিছু রিপোর্ট পাওয়া যায় ব্রিটিশ চক্ষু বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে।

আপনার চোখকে সুরক্ষিত রাখুন

যদি আপনি সম্পূর্ণ সূর্য গ্রহণের অঞ্চলে থাকেন তাহলে চোখে কোন সুরক্ষা ব্যবস্থা না নিয়ে সূর্য গ্রহণ দেখলে আপনার চোখে ক্ষতি হতে পারে।

চৌ বলেন, এর জন্য সাধারণ রোদচশমা পর্যাপ্ত নয়। সোলার একলিপ্স মাস্ক বা চশমা চোখে  আলো পৌঁছানো ২,‌৫০,০০০ গুণ কমায়, যা আলোর তীব্রতাকে কমিয়ে নিরাপদ পর্যায়ে রাখে।  

এই ডিভাইসটি সঠিকভাবে ব্যবহার করা প্রয়োজন। এটি চোখের সামনের দিকে পরে আপনি সূর্যের দিকে তাকাবেন। যতক্ষণ না চাঁদ সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলে ততক্ষণ এই ফিল্টারটি চোখ থেকে সরাবেন না। এই ফিল্টারটি খুবই গাড় বলে সূর্য ছাড়া আর অন্য কিছুকে অদৃশ্য মনে হবে।

মনে রাখবেন – চাঁদ যখন সূর্যকে আংশিকভাবে ঢেকে রাখবে তখন সরাসরি সূর্যের দিকে তাকাবেন না, এর ফলে চোখের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে বা আপনি অন্ধ হয়ে যেতে পারেন। চোখের সুরক্ষা না নিয়ে কখনোই আংশিক সূর্য গ্রহণের দিকে তাকাবেন না।

সূত্র: লাইভ সায়েন্স

সম্পাদনা: কে এন দেয়া