সন্তানকে কোলে নিয়ে ফুল বিক্রি করছেন এক নারী। ছবি: সংগৃহীত

যেভাবে দেহ ব্যবসায় জড়াচ্ছে তারা

গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে সমাজের নিম্নস্তরে সামাজিক মূল্যবোধের অধঃপতনের কারণে প্রায় ২০ লাখ মেয়ে বাধ্য হয়ে যৌন পেশায় জড়িয়ে পড়েছেন।

শেখ নোমান
সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ২৬ মে ২০১৮, ১৬:২৫ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ০৭:০০


সন্তানকে কোলে নিয়ে ফুল বিক্রি করছেন এক নারী। ছবি: সংগৃহীত

(ইউএনবি) মাত্র আট বছর বয়সে বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছিলেন আঁখি আক্তার (ছদ্মনাম)। সত্তরের দশকের মাঝামাঝির ঘটনা। সৎ মায়ের অত্যাচার থেকে নিস্তার পেতে ছোট মেয়েটি ঘর ছেড়ে অজানার উদ্দেশে পাড়ি দেয় শহরে। এরপর রাস্তায় আবর্জনা থেকে বিভিন্ন জিনিস সংগ্রহ করে সেগুলো বিক্রি করে, এমনকি ভিক্ষা করে চলত তার জীবন। তবে প্রায়ই নানা হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়েছে আঁখিকে।

একসময় পুলিশ আঁখিকে কাশিমপুর আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যায়। সেখান থেকে এক সমাজকর্মী তার বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজের জন্য নিয়ে যায় তাকে। তবে আবারও নির্যাতনের মুখে পড়ে বাধ্য হয়ে পালিয়ে পথশিশুর জীবন বেছে নেয়। একদিন শখের বসে মিরপুরে চিড়িয়াখানা দেখতে যায় আঁখি। সেখানে গণধর্ষণের শিকার হয় সে।

দুর্ভাগ্যের শেষ হয় না আঁখির। এরপর চাকরি দেওয়ার কথা বলে এক লোকের প্রতারণার শিকার হয় সে। তাকে সদরঘাটের কুন্দপট্টি যৌনপল্লিতে বিক্রি করে দেয় ওই লোকটি। এভাবেই যৌনকর্মী হয়ে যায় অসহায় মেয়েটি।

জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় ঘোরাফেরা করা আরেক ভ্রাম্যমাণ যৌনকর্মী জাহানারা (২৭)। তার জীবনকাহিনিও আঁখির মতোই। ছোটবেলায় নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়ে ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে দেহ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন তিনি।

গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে সমাজের নিম্নস্তরে সামাজিক মূল্যবোধের অধঃপতনের কারণে প্রায় ২০ লাখ মেয়ে বাধ্য হয়ে যৌন পেশায় জড়িয়ে পড়েছেন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) ২০১৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৫ লাখ পথশিশু রয়েছে, যার এক-চতুর্থাংশ তরুণী। এদের অধিকাংশই দেহ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। কারণ ফুল বিক্রি, ভিক্ষা, আবর্জনা সংগ্রহ করে যথেষ্ট আয় করা যায় না। তাদের বেশির ভাগই মৌলিক চাহিদা (যেমন: নিরাপদ বাসস্থান, পুষ্টিকর খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, স্যানিটেশন সুবিধা ও বিনোদন) থেকে বঞ্চিত।

২০১২ সালে বেসরকারি সংস্থা উন্নয়ন অন্বেষণের এক গবেষণায় দেখা যায়, ৭০ শতাংশ পথশিশু (কন্যা) যৌন নির্যাতনের শিকার হয় ও ১৯ শতাংশ ১১ বছর বয়স থেকেই যৌনকর্মী হিসেবে জীবিকা নির্বাহ শুরু করে।

যৌনকর্মী নেটওয়ার্কের ২০১৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ১০ লাখ ২০ হাজারের বেশি যৌনকর্মী রয়েছে, যাদের মধ্যে ২৯ হাজারই অপ্রাপ্তবয়স্ক। তাদের রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় (যেমন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, কারওয়ান বাজার, চন্দ্রিমা উদ্যান, হাইকোর্ট মাজার, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল, সদরঘাট ও কমলাপুর রেলস্টেশন) সক্রিয় থাকতে দেখা যায়।

উন্নয়ন অন্বেষণ ও ইউনিসেফের ২০১২ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, তরুণীদের দেহ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার প্রধান কারণ হলো পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, দারিদ্র্য, শারীরিক ও যৌন নির্যাতন।

যৌনকর্মীদের জন্য কাজ করা এনজিও ‘দুর্জয়’-এর সাবেক সভাপতি শাহনাজ বেগম বলেন, ‘পরিবারের সদস্য দ্বারা নির্যাতিত বা প্রেমিক থেকে প্রতারিত মেয়েরা পতিতালয়ে বিক্রি হয়েছে, এখনো হচ্ছে। অনেক পুরুষ তাদের স্ত্রীদের ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেয়।’

মেয়ে ও নারী বেচাকেনা এবং তাদের পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা মানবপাচার আইন-২০১২ অনুসারে অপরাধ হিসেবে গণ্য হলেও এসব ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ খুব কম দেখা যায়।

বাংলাদেশ পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যান অনুসারে, এই আইন প্রণয়ন করার পরে সারা দেশের প্রায় তিন হাজার ৫০০টি মামলা করা হয়।

পথের অসহায় মেয়েদের দিন বা রাত বা উভয় সময় আশ্রয়দানের জন্য দেশের বেশ কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি কেন্দ্র রয়েছে। তবে কম ধারণক্ষমতার কারণে অনেক মেয়ে সেগুলোর সুবিধা নিতে পারে না।

সারা দেশে পথশিশু ও জরুরি আশ্রয় দেওয়া অন্তত ২০০ কেন্দ্র পরিচালনাকারী এনজিও অপরাজেয় বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ওয়াহিদা বানু বলেন, ‘যদি এসব মেয়েদের ভালো ভবিষ্যতের জন্য একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা যায়, তাহলে তাদের দুর্ভাগ্য এড়ানো যেতে পারে।

আমাদের এনজিও কয়েক বছর ধরে প্রকল্পভিত্তিক কাজ করছে, তবে ব্যক্তিগত প্রকল্পগুলো তাদের (যৌনকর্মী) জীবনে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারেনি। এর চেয়ে বরং সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার দ্বারা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং ফলোআপ করে একটি মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে তাদের সাহায্য করা যেতে পারে।’

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় রাস্তায় থাকা মেয়েদের জন্য কিছু কাজ করছে। এ ছাড়া নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় ২০১৩ সাল থেকে তাদের জন্য কিছু কর্মসূচি নিয়েছে।

এ বিষয়ে সমাজকল্যাণমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘তার মন্ত্রণালয়ের পথশিশুদের জন্য কিছু নিরাপদ ঘর ও আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। শিশুরা যাতে অসামাজিক বা অপরাধমূলক কার্যক্রমে জড়িত না হয়, সে জন্য আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।

নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মেয়েদের পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করেছে। তবে এখনো সরকারি সুবিধা যথেষ্ট নয়। এই সমস্যা সমাধানে সরকার অত্যন্ত আন্তরিক ও রাস্তার মেয়েদের ভালো জীবন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিদ্যমান কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণ করবে।’

প্রিয় সংবাদ/আজহার

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
জাফরুল্লাহর বিরুদ্ধে আরও এক মামলা
আবদুল কাইয়ুম ২৪ অক্টোবর ২০১৮
টেকনাফে ‘গোলাগুলিতে’ নিহত ১
শেখ নোমান ২৪ অক্টোবর ২০১৮
আজ শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা
শেখ নোমান ২৪ অক্টোবর ২০১৮
সিলেটে মাজার জিয়ারত করলেন ঐক্যফ্রন্ট নেতারা
মোক্তাদির হোসেন প্রান্তিক ২৪ অক্টোবর ২০১৮
ভোটারের তথ্য বেহাত হচ্ছে?
প্রদীপ দাস ২৪ অক্টোবর ২০১৮
স্পন্সরড কনটেন্ট
বাসায় ফিরলেন রাশেদ খান মেনন
বাসায় ফিরলেন রাশেদ খান মেনন
বাংলা ট্রিবিউন - ৩ মাস আগে
ট্রেন্ডিং