(প্রিয়.কম) রাজধানীর তেজগাঁও থানা এলাকার পশ্চিম নাখালপাড়ার রুবি ভিলায় ১২ জানুয়ারি শুক্রবার র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-র‌্যাবের অভিযানে তিন ‘জঙ্গি’ নিহত হয়েছে। এর আগেও তিনবার এই বাড়িতে অভিযান চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। জঙ্গি সন্দেহে আটক করা হয়েছিল বেশ কিছু তরুণ ও যুবককে।

আজকের অভিযান নিয়ে ওই বাড়িতে তিনবার অভিযান চালিয়েছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। আর পুলিশ চালিয়েছে একবার। 

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রুবি ভিলায় র‌্যাব প্রথম অভিযান চালায় ২০১৩ সালে। এর পর অভিযান চালায় ২০১৬ সালে এবং সর্বশেষ ২০১৮ সালের ১২ জানুয়ারি। আগের অভিযানগুলোতে আটক ও গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে। তরে হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। ওই সময় আটক ও গ্রেপ্তার ‘জঙ্গিদের’ অনেকে ছাড়াও পেয়েছেন। 

রুবি ভিলার বাসার গলিতে ঢোকার আগেই গলির ডান পাশে একটি জেনারেল স্টোর। দোকানের নাম আনোয়ার স্টোর। এর মালিক আনোয়ার হোসেন প্রিয়.কমকে বলেন, ’গত বছরের পহেলা বৈশাখের আগের দিন ওই বাড়ি থেকে ৯/১০ জন ছেলেকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। তারা নাকি জঙ্গি ছিল। পরে শুনি, তাদের মধ্যে অনেককে আবার ছেড়ে দিছে। বাড়ি থেকে বাপ-মা গার্জিয়ান (অভিভাবক) আইস্যা থানা থেকে লিখিত দিয়ে ছেলেদের ছাড়ায় নিছে। তার আগেও কয়েকবার এই বাড়িত থ্যাইকা  র‌্যাব কয়েকজনকে ধইরা নিয়ে গেছে। এক বাড়িতে কত জঙ্গি থাকে? আমরা তো এলাকার লোক এই সব দেখে এখন ভয়ে আছি। আবার কোন বাড়ি থ্যাইকা জঙ্গি বের হয়।’

রুবি ভিলার ঠিক চারটি বাড়ি পরেই এক বাড়িতে বসবাসকারী জুয়েল মিয়া প্রিয়.কমকে বলেন, ’গত রাতে ১২ টার দিকে এই গলিতে র‌্যাবের ২টি গাড়ি এসে ঢুকেছিল। গাড়ির শব্দ পেয়ে জানালা খুলে দেখি র‌্যাবের লোক দাঁড়াইয়া আছে। মনে করছি, হয়তো কোন আসামি ধরতে আসছে। তাই আবার জানালা বন্ধ করে শুয়ে পড়ি। কিন্তু রাত আড়াইটার দিকে গুলির শব্দ শুনে ঘুম ভেঙ্গে যায়। এর কিছুক্ষণ পরেই বিকট এক শব্দ শুনি। চুপচাপ বাসার মধ্যে আমরা শুধু শব্দ শুনছিলাম। এর মাঝে মাইকের র‌্যাবের লোকজন বলছিল আপানার আত্মসমর্পণ করেন। সকালে জানতে পারি যে, ওই বাড়িতে তিন জঙ্গি মারা গেছে।’ 

তিনি আরো বলেন, ‘এর আগেও কয়েক বার ওই বাড়ী থেকে অনেক ছেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরে শুনি তারা জামাত-শিবির, জঙ্গি। বাড়ির মালিককে এলাকাবাসী অনেকেই বলেছেন যে ফ্যামিলি বাসায় ব্যাচেলর ভারা না দিতে। কিন্তু উনি বিমানে চাকরি করেন, তাও টাকার লোভে ব্যাচেলর ভাড়া দেয়।’

ওই ভিলার ঠিক পাশের বাড়ির আরেক বাসিন্দা সাজেদুল ইসলাম বলেন, ‘ওই বাসার মধ্যে কিছু ব্যাচেলর ছেলে ভাড়া থাকে। সবগুলো ফ্লাট মিলে ২০/২১ জন ছেলে ভাড়া থাকে মনে হয়। তাদের অনেকেই আমি চিনি। তবে নতুন করে, কোন ছেলেরা ওই ফ্ল্যাটে উঠেছে তা আমি শুনি নাই। কিন্তু আজ শুনলাম নতুন তিনজন নাকি ওই বাসার একটি রুমে ভাড়া উঠেছিল। আর তারাই আজ জঙ্গি অভিযানের সময় মারা গেছেন।’

নাখালপাড়ার রুবি ভিলার পাশেই প্রিয়.কমের সাথে কথা হয় ওই এলাকার ২৫ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কৃষিবিষয়ক সম্পাদক নাসির উদ্দিনের। তিনি বলেন,‘ রুবি ভিলা থেকে ২০১৬ সালের ১৪ আগস্ট আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে সন্দেহভাজন বেশ কয়েকজনকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। এর পরে আবারো শুনেছি, ওই বাড়ি থেকে পুলিশ কয়েকজন ছাত্রকে নাকি ধরে নিয়ে গেছে। এরপর আজকের এই ঘটনা মানুষের মনে এক আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এই বাড়িটির সবগুলো ফ্লাটেই পরিবার থাকে, তবে শুনেছি ছয়তলা ও পাঁচতলার একটা অংশে মেস ভাড়া দেয়া হয়। বাড়ির মালিক সাব্বির হোসেন স্ত্রী ও এক সন্তানকে নিয়ে বাড়ীর দ্বিতীয় তলায় থাকেন।’ 

এই বিষয়ে জানতে চাইলে তেজগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘গত বছর ওই বাসায় পুলিশ অভিযান চালিয়েছিল। তখন ওই বাসা থেকে জামায়াত শিবিরের তিন কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। আর তাদের বিরুদ্ধে নাশকতার মামলাও করা হয়েছিল।’

র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান সাংবাদিকের বলেন, ‘এর আগে ২০১৩ ও ২০১৬ সালে র‌্যাব আরও দুইবার অভিযান চালায় এই বাসায়। সে সময় কয়েকজন জেএমবির সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।’

মুফতি মাহমুদ খান জানান, ১২ জানুয়ারি নিহত তিনজনই জেএমবির সদস্য ছিল। গোপন সূত্রে খবর পাওয়া যায়, রাজধানীতে একটি সেল গঠন করে বিভিন্ন সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা হচ্ছে। এ তথ্যের ভিত্তিতে এই বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। 

এর আগে আজ সকাল সাড়ে নয়টায় র‌্যাব মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর আহমেদ ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, ভবনের ভেতরে তিনজনের মরদেহ পড়ে আছে। তিনজনই পুরুষ। তাদের বয়স ২০-৩০ এর মধ্যে। ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, অবিস্ফোরিত গ্রেনেড, সুইসাইডাল ভেস্ট (বোমা বাধার যন্ত্র) উদ্ধার করা হয়েছে। তারা পুরো রুমের ভেতর গ্যাস ছড়িয়ে দিয়ে গ্রেনেডটি চুলায় দিয়ে বিস্ফোরণের জন্য চেষ্টা করেছিল কিন্তু ভাগ্যক্রমে গ্রেনেডটি বিস্ফোরিত হয়নি। র‌্যাবের অভিযান সমাপ্ত হয়েছে। ঘটনাস্থলে বোমা নিস্ক্রিয়কারী ইউনিট কাজ শেষ করেছে। 

র‌্যাবের ডিজি আরও বলেন, ‘চলতি মাসের ৪ তারিখে জাহিদ নামে একজনের পরিচয়পত্র দিয়ে বাসাটি ভাড়া নেয়া হয়। তখন একই ব্যক্তির দুটি জাতীয় পরিচয় জমা দেয়া হয়। আসলের মতো দেখতে আইডি কার্ডটিতে জাহিদ এবং জমা দেয়া ফটোকপিতে সজিব নাম লেখা ছিল। আমরা সন্দেহ করছি জাতীয় পরিচয়পত্র দুটিই ফেক (ভুয়া) হতে পারে। কারণ একই ব্যক্তির ফটো সম্বলিত পরিচয়পত্রে দুটি নাম রয়েছে।’

প্রিয় সংবাদ/হিরা