(কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার শাহপরীর দ্বীপ থেকে) মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো নৃশংস-বর্বর অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিশ্বের বিভিন্ন দেশগুলোর পাশাপাশি সরব হয়ে উঠেছে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা। এরপরও বন্ধ হচ্ছে না রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচার। প্রতিদিনই ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়ার পাশাপাশি, কুপিয়ে হত্যা করা তাদের।

তবে মিয়ানমার সরকার দাবি, রোহিঙ্গারা নিজেরাই ঘরবাড়িতে আগুন দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। এরকম দুটি ছবিও সাংবাদিকদের সরবরাহ করে দেশটি। কিন্তু এ অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। তারা স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত ছবি বিশ্লেষণ করে বলেছে, ‘রোহিঙ্গাদের গ্রামে আগুন দিয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী। তবে যেসব গ্রামে রোহিঙ্গা এবং রাখাইনরা পাশাপাশি বাস করে, সেখানে রাখাইন বাড়িগুলো আগুনের হাত থেকে বেঁচে গেছে।‘ 

জাতিসংঘ বলছে, চলতি বছরের ২৪ আগস্ট রাতে রাখাইনের পুলিশ পোস্টে হামলার পর কথিত সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে নামে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এর প্রেক্ষিতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গা নিজেদের জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এ ধারা যদি অব্যাহত থাকে তবে বছর শেষে এর সংখ্যা ১০ লাখে ঠেকতে পারে।

এদিকে কক্সবাজার জেলার টেকনাফের কুতুপালং এলাকায় আশ্রয় নিয়েছেন সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গা। তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয় প্রিয়.কমের এই প্রতিবেদকের। তারা জানিয়েছেন, মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের নিজ এলাকা থেকে পালিয়ে আসার কারণ। সেনাবাহিনী ও দেশটির বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা তাদের ওপর যে নির্যাতন চালাচ্ছে, তা বর্ণনা করেছেন।

পালিয়ে আসা একজন নারী প্রিয়.কমকে বলেন বলেন, ‘রাখাইন থেকে আমাদেরকে কোথাও বের হতে দেওয়া হচ্ছিল না। যাওয়া-আসার ক্ষেত্রেও বাধ্যবাধকতা ছিল সবসময়। পালিয়ে আসার সময় দেখেছি, অনেক মানুষকে একসঙ্গে বোটে (নৌকা) তুলে তা ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা অনেক কষ্ট করে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছি। ওখানে তারা (রাখাইনরা) কিছু অবশিষ্ট রাখেনি। ওখানে ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে, মানুষকে কুপিয়ে হত্যা করছে প্রতিদিন।’

পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা ‍তাদের দুর্দশার কথা বর্ণনা করেন।

পাশ থেকে আরেকজন নারী অনুনয়ের সুরে বলেন, ‘ওখান থেকে আরও মানুষ আসার চেষ্টা করছে। তারা আসতে না পেরে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। অনেকের বোট ভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য নেই বলে আসতে পারছেন না।’

রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের শোচনীয় অবস্থার প্রসঙ্গ তুলে ধরে একজন মধ্যবয়সী পুরুষ বলেন, ‘যে যার যার মতো করে আমরা পালিয়ে এসেছি। দিনে আসার কোনো সুযোগ নেই বললেই চলে। আমি গভীর রাতে পালিয়ে এসেছি। এসময়ও অনেকজনকে মগে (মিয়ানমারের অধিবাসী) ধরে নিয়ে গেছে।’

নিজের চোখের সামনে পরিবার-পরিজনকে হারিয়ে দিশেহারা অবস্থায় পালিয়ে বাংলাদেশে চলে আসা একজন বলেন, ‘সেখানে (রাখাইনে) আমাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আমাদের অত্যধিক অত্যাচার করেছে তারা। খুন করেছে অনেককে। কারও সন্তানও মারা গেছে। আমার স্ত্রীকে মেরে ফেলা হয়েছে। আমি দৌড়ে পালিয়ে এসেছি বলে বাঁচতে পেরেছি। দৌড়াতে দৌড়াতে আমার অবস্থা কাহিল হয়ে গেছে। ভাত-পানি কিছু খেতে পারিনি। স্ত্রী-সন্তান সব মারা গেছে সেনাবাহিনীর আক্রমনে।’

যাকেই সামনে পাচ্ছে তাকেই কুপিয়ে, গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা। একজন নারী বলেন, ‘বেশি অত্যাচার করা হয়েছে আমাদের ওপর। বলতে গেলে দশজনের মধ্যে নয় জনকেই তারা মেরে ফেলেছে। বাঁচতে পেরেছে মাত্র এক জন।’

তিনি আরও বলেন,‘তারা গুলি করছে, পুড়িয়ে দিচ্ছে, মেরে ফেলছে আমাদেরকে। মানুষ মারা যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। আমার চোখের সামনেই পাঁচজনকে মরতে দেখেছি। বেঁচে থাকার সুবাদে এখানে আসতে পেরেছি। আমাদের পাড়া পুরোপুরি জ্বালিয়ে দিয়েছে।’

স্বজন হারানো মোহাম্মদ আমিন তাদের গ্রামের পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘ওখানে পাড়ার চারপাশে মিলিটারিরা ঘিরে ফেলে গুলি করে, কুপিয়ে, আগুনে পুড়িয়ে মানুষদের হত্যা করে। আমরা তাদের হাত থেকে রক্ষা পেতে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছি। এসময় কারও মা, বোন মৃত্যুবরণ করেছেন তার ইয়াত্তা নেই। দেশ ছেড়ে পালানোর সময় যে যা পেয়েছি তা নিয়েই পালিয়ে এসেছি আমরা। কোনো বাড়ি থেকে একজন, কোনো বাড়ি থেকে দুইজন এভাবে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি। বাকিরা মগদের (বার্মিজ) হাতে মৃত্যুবরণ করেছে।’

প্রসঙ্গত, গত ২৪ আগস্ট রাতে রাখাইনে বেশ কিছু পুলিশ পোস্টে হামলার প্রেক্ষিতে মিয়ানমারের নিরাপত্তাবাহিনী নজিরবিহীন নৃশংস অভিযান পরিচালনা করে। খুন, কুপিয়ে-পুড়িয়ে হত্যা, ধর্ষণসহ নানাভাবে রোহিঙ্গাদের নির্যাতন অব্যাহত রাখে দেশটির নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যরা। এতে নিহত হয় প্রায় ৩ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা। জীবন বাজি রেখে পালিয়ে বাংলাদেশে চলে এসেছে ৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। ফলে জনশূন্য হয়ে গেছে রাখাইন রাজ্যের প্রায় ১৭৬ টি গ্রাম। 

এদিকে এই নৃশংসতা বন্ধের দাবিতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কাছে ড. মোহাম্মদ ইউনূসসহ ১২ জন নোবেল বিজয়ী ও বিশ্বের ১৮ জন বিশিষ্ট নাগরিক একটি খোলা চিঠি লিখেছেন। এ ছাড়া যুক্তরাজ্য ও সুইডেনের অনুরোধে নিরাপত্তা পরিষদে বসেছিল জরুরি বৈঠক। এতে অংশ নিয়ে ১৫টি দেশ রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে মিয়ানমারকে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে আহ্বান জানায়। 

মিয়ানমার সরকারের নিপীড়নমূলক আচরণ বন্ধ না করলে ‘শাস্তি’র হুমকি দিয়েছে জঙ্গিগোষ্ঠি আল কায়েদা। দেশটির সরকারেরও দাবি ছিলো রাখাইনে জঙ্গিগোষ্ঠির তৎপরতা বিদ্যমান। কিন্তু এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে দ্য আরাকান রোহিঙ্গা সলভেশন আর্মি’র (এআরএসএ)। তারা একটি বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘দ্য আরাকান রোহিঙ্গা সলভেশন আর্মি (আরসা) আল-কায়েদা, ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক অ্যান্ড লেভান্তে (আইসআইএস), লস্কর-ই-তায়েবা অথবা বৈশ্বিক কোনো জঙ্গিগোষ্ঠির সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নয়।’ একই সঙ্গে ‘রোহিঙ্গা মুসলিমদের নাগরিত্ব প্রদান এবং অধিকার প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত লড়াই অব্যাহত থাকবে বলে’ ঘোষণা দেয় এআরএসএ।

উল্লেখ্য, রোহিঙ্গা একটি নৃগোষ্ঠীর নাম যাদের শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ ইসলাম (প্রায় ৮ লক্ষ) ও ১০ ভাগ হিন্দু ধর্মাবলম্বী। রোহিঙ্গাদের আদি আবাসস্থল মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য। শত শত বছর ধরে রাজ্যটিতে বাস করা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি না দিয়ে মিয়ানমার সরকার এ জাতিগোষ্ঠীকে নির্মূল করতে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ চালাচ্ছে।

১৯৪৮ সালে মিয়ানমারের স্বাধীনতার সময়ও রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি ছিল। ১৯৬২-তে সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখল করার পর নতুন করে সংকটের মুখে পড়ে রোহিঙ্গারা। ১৯৭৪ সালে সামরিক জান্তা ‘বিদেশি’ আখ্যা দেওয়ার পর ১৯৮২ সালে প্রণোয়ন করা হয় নাগরিকত্ব আইন। আর এই কালো আইনের মাধ্যমে অস্বীকার করা হয় রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব। নাগরিকত্ব হরণ করে তাদের অস্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে পরিচয়পত্র দেওয়া হয়। সাদা কার্ড নামে পরিচিত ওই পরিচয়পত্রের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের দেওয়া হয় সীমিত কিছু নাগরিক অধিকার।

জাতিসংঘের সহায়তায় ২০১৪ সালে পরিচালিত আদমশুমারিতে রোহিঙ্গা চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাধার মুখে পড়তে হয় রাখাইনের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের। তাদের শুমারি বয়কটের ঘোষণার মুখে সামরিক জান্তা সিদ্ধান্ত দেয় রোহিঙ্গা হিসেবে নিবন্ধিত হতে গেলে অবাঙালি হতে হবে। ২০১৫ সালে সাংবিধানিক পুনর্গঠনের সময়ে আদমশুমারিতে দেওয়া সাময়িক পরিচয়পত্র বাতিল করে সামরিক জান্তা।

পদ্ধতিগতভাবে রোহিঙ্গাদের বঞ্চিত করা হয় মৌলিক অধিকার থেকে। চলাফেরা, বাসস্থান নির্মাণ, শিক্ষা, চিকিৎসা, এমনকি চাকরির অধিকার থেকে আইনসিদ্ধভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে তাদের।

প্রিয় সংবাদ/আদিল/রাকিব