বেসিক ব্যাংকের ৫ বছরে লোকসান ২ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা

গত চার অর্থবছরে বেসিক ব্যাংকে তিন হাজার ৩৯০ কোটি টাকা মূলধন জোগান দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

ফারজানা মাহাবুবা
সহ-সম্পাদক
১৬ মে ২০১৮, সময় - ০৯:৪১

বেসিক ব্যাংকের কারওয়ান বাজার শাখা। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) অনিয়ম ও দুর্নীতিতে বিপর্যস্ত বেসিক ব্যাংক লোকসান থেকে বেরোতে পারছে না। ২০১৩ সাল থেকে ধারাবাহিক লোকসানে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটির গত পাঁচ বছরে নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা।

ব্যাংকের গত কয়েক বছরের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০০৯ সালেও ব্যাংকটি প্রায় ৬৫ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছিল। পরে ২০১২ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র দুই কোটি ৭৮ লাখ টাকায়। পরের বছর থেকে মুনাফা নয়, বরং লোকসানের চক্রে আটকে যায় ব্যাংকটি।

বেসিক ব্যাংক ২০১৩ সালে ৫৩ কোটি, ২০১৪ সালে ১১০ কোটি, ২০১৫ সালে ৩১৪ কোটি ও ২০১৬ সালে এক হাজার ৪৯৩ কোটি টাকা নিট লোকসান করে।

একসময়ের আদর্শ বেসিক ব্যাংকের ক্রমবর্ধমান লোকসান মূলধন ঘাটতিও বেড়েছে।

২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় দুই হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা।

গত চার অর্থবছরে বেসিক ব্যাংকে তিন হাজার ৩৯০ কোটি টাকা মূলধন জোগান দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। চলতি অর্থবছরও ৩০০ কোটি টাকা জোগান দেওয়া হচ্ছে।

শুধু মূলধন ঘাটতি নয়, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) সংরক্ষণেও ব্যর্থ হচ্ছে ব্যাংকটি। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে বেসিক ব্যাংকে প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ তিন হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত এ ব্যাংকের লোকসান বেড়ে চলার মূল কারণ বিতরণকৃত ঋণ আদায় না হওয়া। জানা গেছে, ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের অর্ধেকের বেশি খেলাপির খাতায় চলে গেছে।

গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ৪১২ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে ৭ হাজার ৫৯৯ কোটি টাকার ঋণ। ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের ৫২ দশমিক ৭৩ শতাংশই এখন খেলাপি।

এ ছাড়া মন্দমানের খেলাপি হয়ে যাওয়ায় ৪৪৩ কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করেছে বেসিক ব্যাংক।

গত তিন বছর ব্যাংকটিকে টেনে তোলার চেষ্টা চলছে। বেসিক ব্যাংককে পুরোপুরি দাঁড় করাতে আরও বহু সময় প্রয়োজন। তা ছাড়া বিদ্যমান জনবল ও কাঠামো দিয়ে এটি সম্ভব হবে কি না—তাও ভাবতে হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

নজিরবিহীন লুটপাটের পর ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আলাউদ্দিন এ মজিদকে

আলাউদ্দিন এ মজিদ বলেন, ‘২০১৪ সালের জুলাই থেকে ব্যাংকটিকে টেনে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। গত দুই বছর বেসিক ব্যাংক পরিচালন মুনাফায় ফিরেছে। কিন্তু খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে গিয়ে বড় অঙ্কের নিট লোকসান গুনতে হচ্ছে। বেসিক ব্যাংকে যে মাত্রায় অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে, তা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে আরও সময় লাগবে। বিশেষ করে ব্যাংকের বিদ্যমান জনবল কাঠামোকে ঢেলে সাজানো দরকার। কিন্তু বিদ্যমান বাস্তবতায় তা সম্ভব হচ্ছে না।’

বেসিক ব্যাংকের শীর্ষ খেলাপিদের বড় অংশেরই কোনো খবর নেই ব্যাংকের কাছে। শুধু শীর্ষ ১৭ গ্রাহকের কাছেই ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৪২২ কোটি টাকা।

বেসিক ব্যাংকে ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর হাতে বিপর্যয়ের শুরু । ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৪ সালের ৬ জুলাই পর্যন্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। ওই সময়েই ঘটে বড় অঙ্কের ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা। ঋণের নামে লোপাট হয় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী মনে করেন পুরোপুরি পুনর্গঠন ছাড়া বেসিক ব্যাংকের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।

ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘ব্যাংকটিকে বাঁচাতে হলে জনবল, কাঠামোসহ পুরো প্রক্রিয়া পুনর্গঠন করতে হবে। পুরো ব্যাংকের অবয়ব পরিবর্তন করে নতুনভাবে শুরু করতে হবে। রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগিয়ে ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা দরকার। বর্তমানে দেশের কোনো ব্যাংকই ভালো পরিস্থিতিতে নেই। এ জন্য বেসিক ব্যাংককে অন্য ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করাও সম্ভব হবে না। কারণ শূন্যের সঙ্গে শূন্য যোগ করলে ফলাফল শূন্যই হবে।’

সূত্র: বণিকবার্তা 

প্রিয় বাণিজ্য/আজাদ চৌধুরী

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


স্পন্সরড কনটেন্ট
জনপ্রিয়
আরো পড়ুন