জুবায়ের হোসেন লিখন। ফাইল ছবি: প্রিয়.কম

কেমন আছেন লিখন

‘সাদা হাতি’র মতোই যত্নে রেখেছিল বোর্ড থেকে শুরু করে তৎকালীন জাতীয় দলের কোচ চান্দিকা হাতুরুসিংহে। কারণ দলে একজন লেগস্পিনারের মর্ম সবাই জানতো। দুর্ভাগ্য লিখনের। সবাই বুঝলেও নিজেরটা নিজেই বুঝতে পারেননি।

সামিউল ইসলাম শোভন
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৬ এপ্রিল ২০১৮, সময় - ২০:২২


জুবায়ের হোসেন লিখন। ফাইল ছবি: প্রিয়.কম

(প্রিয়.কম) বিসিবির একাডেমি মাঠটা পুরো ফাঁকা। রোদের তাপ অনেকটা গায়ে ফোস্কা পড়ার মতো। সরু লবিটা পেরিয়ে একা ঢুকলেন জুবায়ের হোসেন লিখন। শরীরটা দেখলেই বোঝা যায়, কতটা খাটছেন তিনি। মেদ তো একেবারেই নেই, সঙ্গে পরিশ্রমের সুতোই প্রতিটা দিন গেঁথে চলেছেন অপেক্ষা নামক ভাগ্যের চাদর। অদৃশ্যভাবে পাশে পাচ্ছেন বোর্ড আর জাতীয় দলের সতীর্থদের। আর বিশ্বাস সৃষ্টিকর্তার ওপর। এই তিনে মিলিয়ে আবারও লাল-সবুজ জার্সি গায়ে জড়ানোর চেষ্টায় লড়ছেন লেগস্পিনার লিখন।

জাতীয় দলে শেষবার খেলেছেন ২০১৫ সালে। গত তিন বছরে একাধিকবার মাশরাফি বিন মুর্তজা-সাকিব আল হাসানদের সঙ্গে প্রাথমিক দলে ডাক পেলেও মেলেনি সুযোগ। সেটা যতটা নিজের পারফরম্যান্সের কারণে, তার চেয়েও বেশি মানসিকতার পরিবর্তন আর ফিটনেসের অভিযোগে। এমনকি এসব কারণে ঘরোয়া লিগেও সুযোগ হয়নি লিখনের। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) দল পাননি। মাত্র শেষ হওয়া ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগে জায়গা হয়েছিল মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে। ওইটুকুই কেবল। ম্যাচ পাননি একটিও।

সবমিলিয়ে হতাশ হওয়ার কথা ছিল লিখনের। নিজের হাতে বাংলাদেশের লেগস্পিনারের ‘রেনেসাঁ’ গড়তে পারতেন। সুযোগটা ছিল, শুরুটাও সেভাবেই হয়েছিল। লিখনকে মূল্যবান সম্পদের মতোই যত্নে রেখেছিল বোর্ড থেকে শুরু করে তৎকালীন জাতীয় দলের কোচ চান্দিকা হাতুরুসিংহে। কারণ দলে একজন লেগস্পিনারের মর্ম সবাই জানতো। দুর্ভাগ্য লিখনের। সবাই বুঝলেও নিজেরটা নিজেই বুঝতে পারেননি। তাই এখন একাই লড়তে হচ্ছে তাকে।

লিখন প্রিয়.কমের সঙ্গে আলাপকালে জানিয়েছেন, খারাপ সময় কাটছে বলেই বুঝতে পারছেন তার কী করা উচিত।

লিখন বলেন, ‘খারাপ সময় না আসলে আপনাকে যে ভালো করতে হবে সেটা বোঝা যায় না। আমি এখন বুঝতে পারছি আমার কী করতে হবে। সেভাবেই এগোচ্ছি। আর জাতীয় দলের যার সাথেই দেখা হয় সবাই খুব ভালো বলে। হেল্প করে। লাস্ট খেললাম রিয়াদ (মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ) ভাইয়ের অধীনে। তিনি অনেক প্রশংসা করেছেন। বলেছেন আমার বলে পেস বাড়ছে, একুরেসিও বেড়েছে। আমার ফিটনেসও অনেক ভালো হয়েছে। এই জিনিসগুলো আমাকে অনেক মোটিভেট করেছে। আমি এদিক থেকে অনেক ভাগ্যবান। অন্যদের সমর্থন পাই আমি।’

লেগস্পিনার দলে রাখাটাও একরকম ‘ঝুঁকি’। রান খরচ হবেই। একইসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেটটাও তুলে নেবে। হাতুরুসিংহে একরকম আগলে রেখেছিলেন লিখনকে। দলে তার মূল্য বুঝতে পেরেছিলেন। জাতীয় দলে শুরুটাও সেভাবেই করেছিলেন ২২ বছর বয়সী লিখন।

২০১৪ সালে জাতীয় দলে অভিষেক করেন সাদা পোশাকের টেস্ট দিয়ে। সেখানে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দুই ইনিংসে দুটি উইকেট নিয়েছিলেন। অভিষেকটা সাড়া ফেলানো না হলেও নিজের তৃতীয় টেস্ট দিয়ে রাঙিয়েছিলেন দলকে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তিন ম্যাচ টেস্ট সিরিজের শেষ ম্যাচে প্রথম ইনিংসে তুলে নেন পাঁচ উইকেট। পরের ইনিংসে আরও দুটি। মোট ৬ টেস্টে নিয়েছেন ১৬ উইকেট। ওয়ানডে খেলেছেন তিনটি, উইকেট চারটি। একটিমাত্র টি-টোয়েন্টিতে দুই উইকেট পেয়েছেন।

সাকিব-মুশফিকদের সঙ্গে উদযাপনে জুবায়ের হোসেন লিখন। ছবি:এএফপি

সেই লিখন প্রায় হারিয়ে গিয়েছিলেন। তারপরও তাকে আগলে রাখার চেষ্টা ছিল সবার। কিন্তু নিজের প্রতি অবহেলা ছিল তার। সেই মাশুলই দিতে হচ্ছে তাকে। লিখন জানিয়েছেন, প্রতিদিন অন্তত ২০-২৫ ওভার বল করেন তিনি। কোচ হুমায়ূন কবির শাহীনের অধীনে নিজেকে প্রতিটা দিন একটু করে এগিয়ে নিচ্ছেন।

এই অবস্থার দায় হিসেবে নিজের ‘ম্যাচুরিটি’কে দায় দিচ্ছেন লিখন। বলেছেন, ‘আসলে আমার ম্যাচিউরিটিতে সমস্যা ছিল। এখন সেটা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি অনেকটা। আমি এখন অনেক আত্মবিশ্বাসী। এখন আমি জানি কোনটা আমার জন্য করা উচিত আর কোনটা না। আল্লাহর রহমতে আগে যেসব ভুল করেছি সেগুলো আর হবে না ইনশাআল্লাহ। চেষ্টা করছি সবকিছু নতুনভাবে শুরু করার।’

এতোকিছুর পরও কেন আলোচনায় নেই লিখন? উত্তরটা নিজেই দিলেন। মূলত, ঘরোয়া ক্রিকেটে সুযোগই হচ্ছে না তার। তাই প্রমাণও করা যাচ্ছে না। বোর্ড তার পাশে দাঁড়ালেও ক্লাবকে পাশে না পাওয়ার কারণই নিজের ক্যারিয়ারের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখছেন ২২ বছর বয়সী এই তরুণ।

এ প্রসঙ্গে লিখন বলেন, ‘আমি কিন্তু বসে নেই, চেষ্টা করে যাচ্ছি। একটা সুযোগের অপেক্ষায় আছি। যেভাবে যতটা করা যায় সেভাবেই করছি। খেয়াল করলেই দেখবেন আমি এইচপিতে ছিলাম। কিন্তু আমি ঘরোয়াতে খেলতে পারছি না, সুযোগ পাচ্ছি না দেখে পিছিয়ে গেছি। আমি যদি নিয়মিত ঘরোয়াতে খেলতে পারি ইনশাআল্লাহ কামব্যাক করব।’

ঘরোয়া ক্রিকেট নিয়ে লিখন আরও বলেন, ‘ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলতে পারলে আমার জন্য অনেক ভালো হতো। তারপরও যেহেতু আমার সুযোগ হচ্ছে না আমি আশেপাশে যেসব ম্যাচ পাচ্ছি, খেলার চেষ্টা করছি। যেভাবে কাভার করা যায় সেভাবে চেষ্টা করছি। এখন আল্লাহর রহমতে বোলিং অনেক ভালো হয়েছে আগের থেকে। আগে যেমন উলটাপালটা করে ফেলতাম এখন একুরেসি অনেক বেড়েছে আমার। পেসও বেড়েছে।’

কোচ-জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের কথা না বললেই নয়। যে সুযোগের অভাবের কথা শোনাচ্ছেন এই ক্রিকেটার, তাকে কাছে রাখতে সর্বাত্নক চেষ্টা করেছেন অনেক ক্রিকেটার। গত বিপিএলে দল পাননি দেখে এগিয়ে এসেছিলেন মাশরাফি বিন মুর্তজা। অন্তত লিখন যেন একটা অনুশীলনের জায়গা পায় সে কারণে রংপুর রাইডার্সের শিবিরে এনেছিলেন। কিন্তু এক-দুইদিন পর আর যাননি লিখন।

এ নিয়ে প্রশ্ন তুললেই নিজের আক্ষেপটা লুকানোর চেষ্টা করলেন না তিনি। বললেন, ‘মানুষের তো ভুল হয়। আমারও ভুল হয়েছে। আসলে সেই সময়ে যাওয়া উচিত ছিল। আমার অনেক বড় ভুল হয়ে গেছে। মাশরাফি ভাইয়ের সাথে পরে কথা বলেছি, তাকে সরি বলেছি।’

আবাহনী লিমিটেডের হয়ে জয়ের পর সতীর্থদের সঙ্গে লিখন (মাঝে)। ছবি: বিসিবি

তবে রংপুর রাইডার্সে ওই দুটি দিন অনেক প্রশংসা পেয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন লিখন। ব্রেন্ডন ম্যাকলালাম, কোচ টম মুডি তার বোলিংয়ের প্রসংসা করেছেন।

এ বিষয়ে লিখন বলেন, ‘ওখানে (রংপুর রাইডার্স) টম মুডি (কোচ) তো অনেক প্রশংসা করেছেন আমার। ম্যাকলালামকে বল করলাম অনেকক্ষণ নেটে। উনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন বিপিএলে আমি কয় উইকেট পেয়েছি। উনি বুঝেনই নাই, আমি দলে নেই। পরে মাশরাফি ভাই আমাকে ডাক দিলেন, বললেন দেখ এতো বড় বড় কিংবদন্তি তোকে কত ভালো বলছেন। তোর মধ্যে কিছু আছে। তুই সুযোগ পাচ্ছিস না ঠিক আছে। তুই পাঁচটা বছর চেষ্টা কর। তুই এভাবে চিন্তা কর যে তুই পাঁচ বছর খেলবিই না। পাঁচ বছর অনুশীলন কর। তোর তো অনেক সময় আছে এখনও। মেন্টালি এভাবে আমি সবার কাছ থেকে সমর্থন পেয়েছি।’

দিন শেষে বোর্ডের ব্যাপারটা সামনে আসছেই। এখন অনেকটা ছন্নছাড়া লিখন। সেক্ষেত্রে কতটা সাহায্য পাচ্ছেন তিনি বিসিবির কাছে? লিখনের উত্তর, শতভাগ পাশে আছে দেশের সর্বোচ্চ ক্রিকেট সংস্থাটি, ‘সবসময় সাহায্য পাচ্ছি (বোর্ডের)। এই যে আমি একডেমি মাঠে অনুশীলন করছি, বোর্ডের কারণেই সম্ভব হয়েছে। সবাইকে অনুশীলনের জন্য এই মাঠ দেওয়া হয় না। এখানকার জিমনেশিয়াম ব্যবহার করছি। এখানে যারা বোর্ড সদস্য আছেন তাদের কারণেই তো এইচপিতে আছি। তারা পজিটিভ বলেই আমি সুযোগ পাচ্ছি। ইনশাআল্লাহ আমি সুযোগটা কাজে লাগাতে পারব, বোর্ডও আমাকে সবসময় এমন সুযোগ করে দেবে।’

দলে একজন ভালো লেগস্পিনারের কদর বোর্ডও টের পাচ্ছে। তাই তো লিখনকে এখনও ছায়ায় রেখেছে তারা। হয়তো লিখনও বুঝতে পারছেন এখন। ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত হলেই ফিরবেন জাতীয় দলে, এই আত্মবিশ্বাস নিয়ে লড়ছেন। বলেছেন, ‘হয়তো ঘরোয়া লিগে যারা আছেন, তারা আমাকে খেলানোর সাহস পাচ্ছেন না। এই জিনিসটা আমাকেই পরিবর্তন করতে হবে যে ওদের মধ্যে সাহস আমাকেই আনতে হবে।’

লিখন এখন সাহসী। হয়তো সেই ধারাবাহিকতায় ক্লাবগুলোও তাকে সুযোগ দিয়ে সাহস দেখাবে।

প্রিয় খেলা/কামরুল 

 

 

 

 

 

 

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
গোলহীন জিরুডের বিশ্বকাপ জয়
ইব্রাহিম সোহান ১৬ জুলাই ২০১৮
মানজুকিচই প্রথম…
আনোয়ার হোসেন সোহাগ ১৬ জুলাই ২০১৮
৮৩২ কেজি ‘নেইমার কোকেন’ উদ্ধার!
সৌরভ মাহমুদ ১৬ জুলাই ২০১৮
‘ফ্রান্স কোনো ফুটবল খেলেনি’
আনোয়ার হোসেন সোহাগ ১৬ জুলাই ২০১৮
ট্রেন্ডিং