আইনজীবীদের সঙ্গে শিশু ধ্রুব ও লুব্ধ। ছবি: সংগৃহীত

তাদের কান্না দেখে কাঁদলেন বিচারপতিও

কলেজজীবনেই একজন আরেকজনের সঙ্গে পরিচয় ও মন দেওয়া-নেওয়া। একপর্যায়ে প্রেম। এরপর বিয়ে। অবশেষে বিচ্ছেদ।

আমিনুল ইসলাম মল্লিক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৫ জুন ২০১৮, ২০:৪৬ আপডেট: ১৯ আগস্ট ২০১৮, ২০:৩২


আইনজীবীদের সঙ্গে শিশু ধ্রুব ও লুব্ধ। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) কামরুন্নাহার মল্লিকা ও মেহেদী হাসান দম্পতি। কামরুন্নাহার মল্লিকার বাড়ি রাজশাহীতে আর মেহেদী হাসান মাগুরার ছেলে। দুজনেই স্টাডি করেছেন রাজধানীতে। কলেজজীবনেই একজন আরেকজনের সঙ্গে পরিচয় ও মন দেওয়া-নেওয়া। একপর্যায়ে প্রেম। এরপর বিয়ে। অবশেষে বিচ্ছেদ। কিন্তু এই দম্পতির দুই সন্তান ধ্রুব ও লুব্দকে ফিরে পেতে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন মা কামরুন্নাহার মল্লিকা। ১২ বছরের ধ্রুব ও ৯ বছরের শিশু লুব্ধ আদালতের এসে কাঁদল, ভিজল বিচারপতি, আইনজীবী, সাংবাদিকসহ উপস্থিত থাকা সকলের চোখ।

২৫ জুন, সোমবার বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের হাইকোর্ট বেঞ্চে এ রকম চিত্র দেখা যায়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মল্লিকা ঢাকায় গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজে এবং মেহেদী ঢাকা কলেজে পড়াশোনা করেছেন। পড়ালেখা করা অবস্থায় দুজনের পরিচয়। পরিচয় থেকে প্রেম। অতঃপর দুই পরিবারের সম্মতিতে ২০০২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে। এরপর তাদের সুখী দাম্পত্য জীবন শুরু। মল্লিকার কোল আলো করে পৃথিবীতে আসে শিশু ধ্রুব ও লুব্ধ। তাদেরকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয়। পড়ালেখা শেষ করে বাবা একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন, মা চাকরি নেন একটি প্রাইভেট স্কুল অ্যান্ড কলেজে।

চাকরির সুবাদে মল্লিকা ও মেহেদী দম্পতি আর্থিকভাবেও সচ্ছল। ভালোই চলছিল তাদের সংসার জীবন। একপর্যায়ে দুজনের মধ্যে মনোমালিন্য ও ঝগড়ার সৃষ্টি হয়। ২০১৭ সালে তাদের সংসার ভেঙে যায়। স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার এক সপ্তাহ আগে মেহেদী হাসান দুই সন্তানকে গ্রামের বাড়ি মাগুরাতে পাঠিয়ে দেন। শিশু দুটি তাদের ফুফুর তত্ত্বাবধানে মাগুরার জেলা শহরের একটি স্কুলে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা করছে। বাবা থাকেন ঢাকার উত্তরাতে।

বিচ্ছেদের পর এক বছর পার হয়ে গেলেও শিশু দুটিকে তাদের মা দেখতে পারেননি। মা কামরুন্নাহার মল্লিকার অভিযোগ, সব রকম চেষ্টা করেও শিশু দুটির ফুফুর কারণে তাদের সঙ্গে দেখা করতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত সন্তানদের নিজের হেফাজতে নেওয়ার জন্য হাইকোর্টের শরণাপন্ন হন তিনি।

গত ২৯ মে সন্তানদের দেখতে এবং নিজ হেফাজতে নেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন। শুনানি শেষে সেদিন আদালত শিশু দুটিকে হাইকোর্টের হাজির করতে সংশ্লিষ্ট পুলিশ ও শিশু দুটির বাবাকে নির্দেশ দেন। ২৫ জুন তাদের হাজির করতে বলা হয়। একই সঙ্গে সন্তানকে কেন মায়ের হেফাজতে দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন আদালত। সেই নির্দেশ মোতাবেক শিশু দুটিকে আজ আদালতে হাজির করে পুলিশ। এ ছাড়া শিশু দুটির বাবা-মা, মামা, নানি ও ফুফুসহ আত্মীয়-স্বজনরা আদালতে হাজির হন।

সোমবার সকালে এ বিষয়ে শুনানি শুরু হয়। শুনানির একপর্যায়ে শিশু দুটির বক্তব্য জানতে চায় আদালত। দুই শিশুর মধ্যে বড় সালিম সাদমান ধ্রুব আদালতকে বলে, ‘আমরা আর কিছু চাই না, বাবা-মাকে একত্রে দেখতে চাই।’

শিশু দুটির বক্তব্য শুনে আদালত ফের আইনজীবীদের বক্তব্য শোনে। সে সময় মায়ের পক্ষের আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল আদালতকে বলেন, ‘একটা বছর ধরে মা তার সন্তানকে দেখতে পাচ্ছেন না। আজকে যখন কোর্টে হাজির করা হয়েছে, তখনো শিশুর ফুফু মায়ের সঙ্গে কথা বলতে বাধা দিয়েছে। এ সময় তিনি সন্তানদের সঙ্গে মায়ের কথা বলার সুযোগ চান। পরে আদালতের অনুমতি পেয়ে ছেলেদের কাছে এগিয়ে যেতেই মা দুই ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করেন। এ সময় ছেলেরাও দীর্ঘদিন পর মাকে পেয়ে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে থাকে।

বড় ছেলে তখন হাত বাড়িয়ে বাবাকেও  ডাকতে থাকে। ছেলে বলতে থাকে, বাবা, তুমি এসো। তুমি আমার কাছে আসো। আম্মুকে সরি বলো। এ সময় বাবাও এগিয়ে এলে আদালতের ভেতর এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। বাবা-মা এবং তাদের সন্তানদের একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কান্নার দৃশ্য দেখে বিচারক, আইনজীবী, সাংবাদিকসহ সকলের চোখে পানি চলে আসে। দীর্ঘ এক বছর পর বাবা-মাকে একসঙ্গে পেয়ে ছেলেদের কান্না সকলের বিবেককে নাড়া দেয়।’

এ সময় আদালতের জ্যেষ্ঠ বিচারক আবার ওই শিশুদের ডেকে নেন। সঙ্গে মাকেও কাছে ডাকেন। আদালত বলে, ‘এ দৃশ্য দেখেও কি আপনাদের মন গলে না? আপনারা কি সন্তানের জন্যও নিজেদের স্বার্থ ত্যাগ করতে পারবেন না? সামনে তাকিয়ে দেখেন, আপনাদের এ দৃশ্য দেখে সকলের চোখেই পানি  চলে আসছে।’

এ সময় আদালতে উভয় পক্ষের আইনজীবীসহ শতাধিক আইনজীবী দাঁড়িয়ে সমস্বরে সন্তানদের বিষয়টি চিন্তা করে বাবা-মাকে একে অপরকে মেনে নেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে সন্তানদের চাওয়া অনুযায়ী, তাদের দাম্পত্য জীবন যাতে বজায় থাকে, সেরকম একটি আদেশ দেওয়ার দাবি জানান।

পরে আদালত দুই শিশু এবং তাদের বাবা-মা, নানি ও ফুফুকে আদালতের এজলাসের কাছে ডেকে নেন। এ সময় একে একে প্রত্যেকের বক্তব্য শোনেন। পরে আরও বিস্তারিত জানতে চেম্বারে ডেকে নিয়ে বাবা ও মায়ের একান্ত বক্তব্য শোনেন। তাদের বক্তব্য শুনে আদালত মধ্যাহ্ন বিরতির পর আদেশ দেয়।

আদালত আদেশে বলে, আগামী ৪ জুলাই পর্যন্ত শিশু দুটি মায়ের হেফাজতে থাকবে। তবে এই সময়ে পিতা শিশু দুটির দেখাশোনা করার অবারিত সুযোগ পাবেন। আগামী ৪ জুলাই পরবর্তী দিন ঠিক করে শিশু দুটিকে হাজির করার নির্দেশ দিয়ে বিষয়টি মুলতবি করেন।

প্রিয় সংবাদ/শান্ত  

পাঠকের মন্তব্য(১)

মন্তব্য করতে করুন


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

Amar to ei likhata read korei chokher pani chole ashlo. Apnara ek hoe jan bacchader kotha chinta kore.

আরো পড়ুন
পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ায় ফেরি চলাচল ব্যাহত
ইতি আফরোজ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮
এটাই কি বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর বিমানবন্দর?
আশরাফ ইসলাম ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮
মেজর পরিচয়ধারীসহ ৮ প্রতারক আটক
মোস্তফা ইমরুল কায়েস ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮
চার হাসপাতালকে ১৫ লাখ টাকা জরিমানা, বন্ধ ৪ হাসপাতাল
মোস্তফা ইমরুল কায়েস ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮
ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চান ইমরান খান
প্রিয় ডেস্ক ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮
স্পন্সরড কনটেন্ট
ট্রেন্ডিং