প্রয়াত নায়ক সালমান শাহ্‌। ছবি: সংগৃহীত 

হাফিংটন পোস্টের শিরোনামে সালমান শাহ্‌ হত্যার বিচার দাবি...

সালমান শাহ্‌য়ের চার বছরে ক্যারিয়ার নিয়ে বিদেশি গণমাধ্যম হাফিংটন পোস্টে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যা লিখেছেন কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির গণিতের শিক্ষক রাশিদুল বারি। তার কথায় আজ আমরা জানবো সালমান শাহ্‌ তার জীবনে কেমন প্রভাব বিস্তার করেছিলেন।

রাশিদুল বারি
A doctoral student at Columbia University, teaches mathematics at Bronx C. Community College
প্রকাশিত: ২০ আগস্ট ২০১৭, ১৩:৫৬ আপডেট: ১৮ আগস্ট ২০১৮, ০২:৩২
প্রকাশিত: ২০ আগস্ট ২০১৭, ১৩:৫৬ আপডেট: ১৮ আগস্ট ২০১৮, ০২:৩২


প্রয়াত নায়ক সালমান শাহ্‌। ছবি: সংগৃহীত 

(প্রিয়.কম) আজ থেকে ২১ বছর আগে পৃথিবী থেকে বিদায় নেয় এক নক্ষত্র। জ্বলে উঠার আগেই নিভে যায় যার জীবন প্রদীপ- তিনি বাংলা সিনেমার অন্যতম মেধাবী নায়ক সালমান শাহ্‌। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মাত্র ২৫ বছর বয়সের সালমান শাহ্‌কে পাওয়া যায় তার ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায়। 

৯০ দশকের শ্রেষ্ঠ নায়ক ছিলেন সালমান শাহ্‌। তার চলচ্চিত্রে মেধাবী অভিনয় কেড়ে নিয়েছিল সব ধরণের দর্শকের মন। বিত্তবান দর্শক থেকে শুরু করে গ্রামের কৃষক শ্রেণির জনপ্রিয় অভিনেতা ছিলেন একমাত্র সালমান শাহ্‌। তিনি যেন বাংলা সিনেমার ভাষাই পরিবর্তন করে ফেলেছিলেন। যে কারণে অসংখ্য ভক্ত পেয়ে যান তিনি। মাত্র চার বছরের অভিনয় জীবন তার। একটি চলচ্চিত্রেও ব্যর্থ হননি তিনি। সালমান শাহ্‌য়ের চার বছরে ক্যারিয়ার নিয়ে বিদেশি গণমাধ্যম হাফিংটন পোস্টে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যা লিখেছেন কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির গণিতের শিক্ষক রাশিদুল বারি। তার কথায় আজ আমরা জানবো সালমান শাহ্‌ তার জীবনে কেমন প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। প্রিয় নায়ক সালমান শাহ্‌কে নিয়ে লেখা তার প্রতিবেদনটি পাঠকদের জন্য অনুবাদ করে দেয়া হল।

‘যদি সালমান শাহ্‌য়ের সিনেমা দেখেন, তাকে শাহরুখ, আমির কিংবা সালমান খানের সঙ্গে তুলনা করতে পারবেন না। বলতে হবে আপনারা দেখেছেন হলিউডের লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওকে। নাহ, তাও যথার্থ নয়। তিনি ডিক্যাপ্রিও নন, তার চাইতেও বড় মাপের অভিনেতা সালমান শাহ্‌। আমাদের দৃষ্টিতে সালমান শাহ্‌ একজন মেগাস্টার।’- একথাটি প্রকাশিত হয়েছে হাফিংটন পোস্টের বিশেষ প্রতিবেদনে। সালমান শাহ্‌য়ের একনিষ্ঠ দর্শক হিসেবে রাশিদুল বারির অভিমত এমন করেই তুলে ধরা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।

সালমান শাহ্‌ অভিনীত প্রথম ছবিটি বাংলাদেশে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করে, যা এর আগে আর কেউ করতে পারেননি। তার প্রথম ছবি ১৯৯৩ সালের ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’, যা বলিউড সিনেমা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলায় নির্মাণ করা হয়। লাখো তরুণ ভক্ত তৈরি করতে এই একটি ছবিই যথেষ্ট ছিলো সালমান শাহ্‌য়ের জন্য। মাত্র চার বছরের ক্যারিয়ারে তিনি অভিনয় করেন ২৭টি সিনেমায়। এবং প্রতিটি সিনেমা সফল। এই নায়ক নিজের আলাদা একটি স্টাইল নিয়ে পর্দায় এসেছিলেন, যা বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এখনও বিরল।

তার একার এই চার বছরের সাফল্য তাকে হলিউডের ডিক্যাপ্রিওর পরের স্থানে বসানোর জন্য যথেষ্ট। সালমান শাহ্‌য়ের এই ছোট্ট ক্যারিয়ার তাকে এই সম্মান এনে দিয়েছে। তার অভিনয় এতই প্রাণবন্ত ছিল, যে কারণে তাকে গ্রহণ করতে দর্শকদের সময় ব্যয় করতে হয়নি। শেক্সপিয়রের রোমিও চরিত্রের মতো তাকে রাজ চরিত্রে অভিনয় করতে দেখেছি আমরা। যে কিনা তার প্রেমিকা রেশমির মৃত্যুর পর নিজেকে ছুরির আঘাতে হত্যা করে। ঠিক যেন জুলিয়েটের মৃত্যুর পর রোমিও করেছিল। কিন্তু কেউ ভাবেনি তার জীবনের পরিণতিও ঠিক এমন হবে। ক্যারিয়ারের চার বছরের মাথায় আকস্মিক মৃত্যু তার ভক্ত দর্শকদের হৃদয়ে গভীরভাবে আঘাত করে। 

সালমান শাহ্‌য়ের মৃতদেহ তার ঘরের সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। প্রাথমিক ধারণা হিসেবে একে আত্মহত্যা বলে অভিহিত করে পুলিশ ও ডাক্তার। কিন্তু এর মধ্যেও দ্বিধা থেকে যায়। আত্মহত্যা না খুন- এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সন্দেহের তীর গিয়ে ঠেকে তার স্ত্রী সামিরা, সামিরার প্রেমিক মোস্তাক ওয়াহিদ, রাবেয়া সুলতানা রুবি, আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুসি, রিজভি আহমেদ এবং আশরাফুল হক ডনের দিকে। এরমধ্যে আজিজ মোহাম্মদ ভাই, যে কিনা একটি হোটেলে সবার সামনে সালমান শাহ্‌য়ের স্ত্রী সামিরাকে চুমু খেয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। এই ঘটনার জেরে সালমান ক্ষিপ্ত হয়ে আজিজকে কিছু বলার কারণে তাকে ষড়যন্ত্র করে হত্যা করা হয় বলে অনেকের অনুমান। তবে সামিরার মতে সালমান শাহ্‌ করেছিলেন আত্মহত্যা। 

এদিকে সালমানের পিতামাতা কামারুদ্দিন ও নীলা চৌধুরীর দাবি, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যা। এমন কি তার ছোট ভাই শাহারান ইভানের মতেও এই মৃত্যু একটি ষড়যন্ত্র ছাড়া কিছুই নয়। তাদের দাবি, মৃত্যুর সমস্ত আলামত ও তথ্যসূত্র গোপন করা হয়েছে। রুবি চৌধুরীর ছোট ছেলে এ সমস্ত তথ্য অপসারন করে বলে দাবি করেন সালমানের পরিবার। তাই তারা খুনের মামলা দায়ের করেন থানায়। কিন্তু ময়নাতদন্ত ও পুলিশের রিপোর্টে বলা হয় এটি সাধারণ আত্মহত্যা। কারণ, তারা হত্যার কোন আলামত খুঁজে পাননি। তবে গত ১৩ আগস্ট একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে রুবি প্রকাশ করেন, আত্মহত্যা নয়, সামিরা সালমানকে খুন করিয়েছে। এবং তা করানো হয়েছে রুবির ভাই ও অন্যান্যদের সহায়তায়।

সালমানের শুধু অভিনয় নিয়ে কথা বলতে গেলে বলতে হয়, তার অভিনয় বাংলাদেশে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলো। কি কি এমন যোগ্যতা দেখিয়েছেন, যে কারণে সবার থেকে আলাদা তিনি? উত্তর হলো, তিনি দেশিয় সিনেমার ইতিহাসে আমুল পরিবর্তন এনেছেন, যা খুব কম সংখ্যক অভিনেতা করে দেখাতে পেরেছেন। তার স্টাইল ছিল সবার চেয়ে আলাদা। নিজের আলাদা ফ্যাশন স্ট্যান্ডার্ড দাঁড় করিয়েছিলেন তিনি। তার ডায়ালগ ডেলিভারি ও পোশাক নির্বাচন তাকে অন্যদের থেকে ভিন্ন করে। এমন কি, তার চুলের স্টাইলও ছিল সবার থেকে আলাদা। 

১৯৯৪ সালের শেষের দিকে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ ফ্যাশন ও চলন-বলনে সালমান শাহ্‌কে অনুসরণ করা শুরু করে। এমনকি এই প্রতিবেদনের লেখক নিজেও এই স্টাইল অনুসরণ করা শুরু করেন। এক পর্যায়ে দেখা যায়, প্রতিটি অভিনেতা নিজের অজান্তেই সালমানের অভিনয় অনুসরণ করা শুরু করে দিয়েছে। একই অভিনয়, একই বাচনভঙ্গি, একই ফ্যাশন। সালমানের একটি নিজস্বতা ছিল, যা অন্য অভিনেতাদের অভিনয়ে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। তখন অভিনেতারা বলিউড তারকাদের নকল করাও ভুলে গিয়েছিলেন। এক কথায়, সালমান শাহ্‌য়ের এমন কিছু নেই, যা মানুষের ভালো না লাগার মতো ছিল না। যে কারণে তার প্রেমে পড়াটা ছিল খুব স্বাভাবিক। আর তাই বাঙালির হৃদয়ে ও দৃষ্টিতে সালমান শাহ্‌ লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর চেয়ে কোন অংশে কম নয়।

'বাংলাদেশের একজন সাধারণ বালক হিসেবে আমিও আমির খান ও শাহরুখ খানের সিনেমা দেখে বড় হয়েছি। আমি তাদেরকে দেখা বন্ধ করিনি, কিন্তু আমার দৃষ্টিতে সালমান শাহ্‌ তাদের চেয়ে কোন অংশে কম ছিলো না। আমার জন্য সালমান একজন অভিনেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি প্যাকেজ। তার অভিনয় আমার ভেতর আশা জাগায়। বাংলাদেশ একটি দরিদ্র দেশ হিসেবেই পরিচিত। আমাদের প্রাকৃতিক খনি হয়ত তেমন নেই। তাই বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য একজন নায়ক প্রয়োজন ছিল, যা সালমান শাহ্‌ অনায়াসে পূরণ করতে পারতেন। তার সিনেমাগুলোর অন্যরকম শক্তি ছিল, যা তিনি নিজেও জানতেন। আর তাই হয়ত তিনি নিজেকে বাংলাদেশের ডিক্যাপ্রিও ভেবে গর্ব করতে পারতেন। এবং এটি যে শুধুই বলার জন্য বলা- তা নয় সেটি সবাই জানে। এখানেই রয়েছে ভিন্নতা। এক- যারা শুধু অভিনয় করেন, এবং দুই- যারা অভিনয়ে অন্য মাত্রা যোগ করেন। এটাকেই বলে রুপান্তর, যা করে দেখিয়েছিলেন সালমান শাহ্‌।'

'১৯৯৩ সালে আমি যখন প্রথম তার ছবি ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ দেখি, আমি তাকে নিজের দৃষ্টিতে অন্যদের সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করি। না, তিনি ডিক্যাপ্রিওর মতো সুদর্শন ছিলেন না। কিন্তু ডিক্যাপ্রিওর মতো ব্যক্তিত্ব তার ছিল। যা আমাকে আকর্ষণ করেছিল। মজার ব্যাপার, সেসময় আমার ঘরের দেয়ালে তার পাঁচটি পোষ্টার ছিল।'

'প্রতিটি সিনেমায় সালমান যেন নিজেকে নতুন করে গড়েছেন, ভেঙেছেন- যা তাকে একজন সেরা অভিনেতা বানিয়েছে। ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ ছবিতে তিনি তার পোশাকে পরিবর্তন আনেন। নতুন ফ্যাশনের প্রবর্তন করেন। এগুলোই তাকে ধীরে ধীরে লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও বানানো শুরু করেছিল। আপনি যখন তার সিনেমা দেখবেন, তখন আপনার মনে হবে, এই অভিনেতা আপনার সঙ্গেই কথা বলছিলেন। একজন কিশোর হিসেবে আমিও প্রথমে তেমনই ভাবতে শুরু করি। এটিই আমার মস্তিস্কে পুরোপুরি গেঁথে যায়। এভাবেই আমি জীবন অনুভব করেছিলাম, যতদিন আমি বাংলাদেশে বসবাস করতাম। আমার সুপ্ত বাসনা ছিল, আমি একদিন সালমান শাহ্‌ হব। কারণ তিনি ছিলেন অসাধারণ। যে কারণে বাঙালি তরুণ যদি নিজেকে সালমান শাহ্‌ ভাবতে কিংবা গড়তে চায়, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।'

'আমি যখন তরুণ ছিলাম, আমি সালমান শাহ্‌য়ের একেকটি সিনেমা অনেকবার দেখতাম। কারণ আমার মা ‘মায়ের অধিকার’ ছবিটি প্রতিদিন দেখতেন ও কাঁদতেন। একটি দৃশ্য তাকে কাঁদাত, তা হচ্ছে সালমান শাহ্‌ যখন তার মাকে সম্মান দিয়ে ঘরে তোলেন। এই ঘটনার অনেক বছর পর আমি আবিস্কার করলাম, আমার স্ত্রীও সালমান শাহ্‌য়ের একজন ভক্ত। সে নাকি সপ্তাহে কয়েকবার ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবিটি দেখত। কিন্তু একটি জিনিসের পার্থক্য আমি বুঝি নি, যতদিন পর্যন্ত আমি তার অভিনীত ‘সত্যের মৃত্যু নেই’ ছবিটি দেখিনি। আমি একনাগাড়ে প্রায় ১০ বার ছবিটি দেখেছি। আমি অনুভব করেছি, কেন আমার মা ও আমার স্ত্রী তার অসম্ভব ভক্ত। তিনি যখন সংলাপ বলতেন, তখন তার কথায় ব্যক্তিত্ব প্রকাশ পেত। যখন তিনি কোন ইংরেজি সংলাপ বলতেন, তা হতো খুবই শুদ্ধ উচ্চারন। আপনি তাকে তখন আপনার একদম নিকটে অনুভব করতে বাধ্য হবেন। তিনি যেন আপনার সঙ্গেই কথাটি বলেছিলেন, এমন মনে হবে আপনার।'

'সালমান শাহ্‌ জ্বরে আক্রান্ত ছিল যেন গোটা বাংলাদেশ। আক্ষেপ থাকবে, বাংলাদেশ থেকে অস্কার সম্মাননা হয়ত পেতে পারতেন আমাদের নায়ক সালমান শাহ্‌। কিন্তু সময়ের কাছে আমরা পরাজিত হয়েছি। আমরা- পুরো জাতি হারিয়েছি একটি সম্পদ। অনেক তরুণ জানতেও পারলো না, শাহরুখ খান ও আমির খানের চেয়ে বড়মাপের অভিনেতা আমদের কাছেও ছিল। সালমান শাহ্‌ হতে পারতেন বিশ্বের একজন অসাধারণ ও অন্যতম অভিনেতা। কিন্তু তিনি এসব পেতে ব্যর্থ হয়েছেন শুধুমাত্র তার ব্যক্তিগত জীবনে ব্যর্থ হওয়ার কারণে। সেই কারণ ছিলেন তার স্ত্রী সামিরা।'

'সেদিন ছিল ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। সকালে আমার বাবা আমাকে ঢাকায় অবস্থিত আমেরিকান অ্যাম্বেসিতে যেতে বলেন। কিন্তু আমি মানা করি। কারণ জানেন? আমি আমার বাবাকে বলেছিলাম, ‘আমি আমেরিকা যাব না। কারণ সেখানে সালমান শাহ্‌ নেই।’ সেদিন সকালে আমার বাবা আমার কথা শুনে হেসেছিলেন। কিন্তু সেদিন বিকেলেই আমরা দুজন একসঙ্গে কেঁদেছিলাম যখন আমরা শুনলাম, সালমান শাহ্‌ এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। এই ঘটনার কয়েকদিনের মধ্যে বাংলাদেশের তরুণ সমাজে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। অন্যদের মতো আমি খেতে পারিনি, ঘুমুতে পারিনি। আমি আমার জীবন উপভোগ করতে পারছিলাম না। কেউই তার অকাল মৃত্যু মেনে নিতে পারেন নি। আমিও না। আমি এই তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেই। আমি আমার বাবাকে জানিয়েছিলাম, আমি দেশ ছাড়তে চাই। সালমান শাহ্‌ মারা গেছেন বলে নয়। আমরা তাকে বাঁচাতে পারিনি বলেও নয়। আমি দেশ ছাড়ছি শুধুমাত্র এই কারণে, কারণ আমি তার হত্যাকারীদের শাস্তি দিতে পারছি না।'

'এই ঘটনার পর ২০ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু সালমানের হত্যাকারীরা আজও মুক্ত ঘুরে বেড়াচ্ছে। কারণ তাদের সেই শক্তিটুকু আছে। কিন্তু আমি কোন না কোনভাবে জানতাম, একদিন সত্য প্রকাশ পাবে। সেদিন ৯ আগস্ট আমি আমার ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস নিচ্ছিলাম। ক্লাসের মাঝখানে আমি আমার স্ত্রীর মেসেজ পাই। ‘সালমান যা কিছু তার সিনেমায় দেখিয়েছেন, তা নিয়ে তোমার কিছু লেখা উচিত।’ এরপর আমি ক্লাস শেষে আরেকটি মেসেজ পাই। তাতে লেখা, ‘সালমান আত্মহত্যা করে নি। তাকে হত্যা করা হয়েছে। এবং রুবি সেটি একটি ভিডিও বার্তায় স্বীকার করেছে।’ আমি ভিডিওটি দেখলাম। সঙ্গে সঙ্গে কলম ধরার সিদ্ধান্ত নিলাম। কারণ সেখানে রুবি বলেছিল, এতে তার নিজের ভাই জড়িত ছিল এবং তাকেও হত্যা করা হয়েছে। 

'১৩ আগস্ট টেলিভিশনে সাক্ষাৎকারে রুবি আরও জানায়, সালমান শাহকে হত্যার জন্য ১২ লাখ টাকার চুক্তি করেছিলেন সালমানের স্ত্রী সামিরার মা লাতিফা হক। সালমান শাহ হত্যা মামলার আসামি রিজভী ১৯৯৭ সালের জুলাইয়ে ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দিতেই এই কথা জানিয়েছিলেন। রিজভীর মতে, সালমানকে হত্যা করতে সামিরার মা লাতিফা হক, ডন, ডেভিড, ফারুক, জাভেদের সঙ্গে ১২ লাখ টাকার চুক্তি করেন। উল্লেখ করা হয়, সালমানকে শেষ করতে কাজের আগে ৬ লাখ ও কাজের পরে ৬ লাখ দেয়া হবে। হত্যার ঘটনা সম্পর্কে আসামি রিজভি জানায়, সালমানকে ঘুমাতে দেখে তার ওপর ঝাপিয়ে পড়ে ফারুক পকেট থেকে ক্লোরোফোমের শিশি বের করে এবং সামিরা তা রুমালে দিয়ে সালমানের নাকে চেপে ধরে। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে মামলার তিন নম্বর আসামি আজিজ মোহাম্মদ এসে সালমানের পা বাধে এবং খালি ইনজেকশন পুশ করে। এতে সামিরার মা ও সামিরা সহায়তা করে। পরে ড্রেসিং রুমে থাকা মই নিয়ে এসে, ডনের সাথে আগে থেকেই নিয়ে আসা প্লাস্টিকের দড়ি আজিজ মোহাম্মদ ভাই সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলায়। এছাড়া জবানবন্দিতে ডন, ডেভিড, ফারুক, জাভেদ ও আসামি রিজভি ছাড়াও ছাত্তার ও সাজু নামে আরো দু'জনের নাম উল্লেখ করা হয়। কিন্ত প্রত্যক্ষ আসামির এই জবানবন্দির পরও যাদের নাম পাওয়া যায় তারা সবসময়ই ছিল ধরাছোঁয়ার বাইরে। সকল প্রমাণ তারা গায়েব করে ফেলেছিলেন।'

'আমি সবসময় জানতাম, সালমান শাহ্‌ আত্মহত্যা করেননি। দড়িটা নিজে পরেছেন নাকি তাকে কেউ পরিয়ে দিয়েছে, সেই বিতর্ক আদালতপাড়া পর্যন্ত গড়িয়েছে। দীর্ঘ ২১ বছর ধরে সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী নিজের সন্তানের ‘হত্যা মামলা’ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি মনে করেন তার ছেলেকে হত্যা করে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু ফাঁসির দড়ির ছবি নয়, মৃত্যুর পর দিন সালমান শাহর বাসা থেকে আরো যেসব আলামতের ছবি তোলা হয়েছিল সেসব ছবিও ভাইরাল হয়। সালমান শাহর শরীরে আত্মহত্যার আলামত পাওয়া যায় নি। তার মৃত্যুর পর সালমানের ব্যক্তিগত সহকারি আবুল ও বাসার কাজের মেয়ে ডলি ও মনোয়ারাকে সামিরার পরিবার আশ্রয় দেয়। আমি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানাই, সালমান শাহ্‌য়ের মৃত্যু রহস্য অচিরেই সমাধান করা হোক। সত্য সামনে আসুক, এবং সালমান শাহ্‌ যেন ন্যায় বিচার পান।'

এছাড়া আমি কয়েকটি বিষয়ে আলোকপাত করতে চাই-

১. সুইসাইড নোটটি কি আসল ছিল?

২. সালমানের মৃতদেহ এত দ্রুত কেন ঝুলন্ত অবস্থা থেকে মুক্ত করা হলো?

৩. মৃতদেহ হাসপাতালে পাঠাতে দেরি করা হয়েছিল কেন?

৪. সামিরা কেন সালমানের পরিবারকে তার মৃত্যু সংবাদ আগে দেন নি?

৫. কেন সামিরা সালমানের মৃত্যুর একদিন আগে সিডাটিভ আনিয়েছিলেন?

৬. লাগেজের ভেতর রাখা কাপড় কেন ভেজা ছিল?

৭. সালমানের হত্যাকারী রুবির ভাই রুমিকে কেন হত্যা করা হলো?

৮. সামিরা কেন রুবির ছেলেকে দিয়ে ক্রাইম সিন পরিস্কার করিয়েছিল?

৯. সামিরা কেন সালমানের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নেন নি?

১০. সালমানের মৃত্যুর কয়েক মুহূর্ত পর সামিরা কোথায় গায়েব হয়ে গিয়েছিলো?

সালমান শাহ্‌ এই পৃথিবীতে নেই। কিন্তু তার অভিনীত সিনেমা আছে, থাকবে। অনেক বাংলাদেশি তরুণের শৈশব সালমানের স্মৃতি নিয়ে বড় হয়েছে। সালমানের জন্য আমরা আমাদের দেশকে ভালোবাসি। সালমানের কারণে বিশ্বের একজন বিখ্যাত বালক তার গালে অঙ্কন করিয়েছে একটি বাক্য। সেখানে লেখা ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি সালমান।’ এতটুকুই লাখো বাংলাদেশি দর্শকের চোখে অশ্রু আনতে যথেষ্ট। একটি বারের জন্য যদি সালমান জানতে পারতেন, তাকে আমরা সবাই কতোটা ভালোবাসি... এখনও। ভিডিওটি একটিবারের জন্য দেখুন। সালমান শাহ্‌য়ের জন্য, তাকে স্মরণ করার জন্য, তাকে ভালোবাসেন, এই কারণে ভিডিওটি একটিবারের জন্য হলেও দেখুন-

 

লেখক রাশিদুল বারির কাছ থেকে বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে লেখাটি অনুবাদ করে প্রকাশ করা হয়েছে।

অনুলেখক: শামীমা সীমা

সূত্র: হাফিংটন পোস্ট 

প্রিয় বিনোদন/সিফাত