মূর্তি তো মূর্তিই। সমস্যা রয়েছে একে চিহ্নিত করার আগে ‘দেব’ বা ‘দেবী’ শব্দ প্রয়োগে। শিল্প যদি ধরেন, তাহলে মোনালিসার ছবিকে মোনালিসাই বলুন, ভেনাসের ছবিকে ভেনাস। শিল্পের বিপত্তিটা তখনই ঘটে যখন ভেনাস ‘দেবী’ অভিধায় অভিসিক্ত হন। এটুকু বুঝলেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। আর ইসলামের মূর্তি বিরোধিতার অনেকটা কারণও পরিষ্কার হয়। ইসলামের মূর্তি বিরোধিতার গূঢ়তা বুঝতে হলে, শিল্প আর ধর্মের পার্থক্যটা বুঝতে হবে। সাথে বই আর মূর্তির মাঝের ফারাকটাও বোঝা উচিত। ছোটবেলায় যেকোনো বইয়ের ওপর পা পড়লে বুকে জড়িয়ে চুমু খেতাম, পরিবার এটা শিখিয়েছিল, শিখিয়েছিল বিদ্যাকে সম্মান করতে। বই মানে জ্ঞান, জ্ঞান হলো মানুষের পরিপূর্ণতা। পুতুল বা ঘোড়ার মূর্তিতে পা লাগলে চুমু খেতে কেউ বলেনি। কারণ মূর্তিতে মানুষ পরিপূর্ণ হয় না। জ্ঞান মূর্ত কিন্তু ‘মূর্তি’ নয়। 

লেখাটার শুরু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বিতর্ক নিয়ে। বলি আর না বলি ‘উইম্যান চ্যাপ্টার’ নিয়ে আলোচনা হয়ই। ‘উইম্যান চ্যাপ্টারে’ যারা লিখেন তারা বোঝে অথবা খ্যাত হবার ইচ্ছায় লিখেন কিনা জানি না, তবে স্বল্প হলেও তাদের একটি ‘ভোকাল’ ফ্যান-ফলোয়ার গোষ্ঠী রয়েছে, সামাজিকমাধ্যম তো বটেই গণমাধ্যমেও তারা উচ্চকণ্ঠ। সেই চ্যাপ্টার প্রধানের সাথে তারই নিজ ঘোষিত সদ্যসাবেক সহকর্মীর বাকযুদ্ধই এই লেখার উপজীব্য। তাদের সেই বাকযুদ্ধ মূলত বাথরুমকে ঘিরে। অনেকটা ভারতের মতো, যেখানে এখন ছবির নাম হয় ‘টয়লেট’। খোলা মাঠে ‘হাগা’ বন্ধ করা নিয়ে তাদের নানা রকম কর্মকাণ্ড চলে। সেই বাথরুম নিয়েই শুরু হয়েছে এই দুইয়ের বাহাস। বাহাসটিও মজার। বিষয়, ‘বাথরুমে শিল্প চর্চা’। সাথে এমন শিল্প চর্চার অনুষঙ্গ হিসাবে বাথরুমে কোন মূর্তি রাখা যাবে, কোনটা যাবে না, তা নিয়ে। 

বাথরুমের কথায় আসি। বাথরুম কোনো শিল্প-সাহিত্য চর্চার জায়গা নয়। অন্তত সাহিত্য-শিল্প সামগ্রী রাখার স্থান নয়। এসবের জন্য লাইব্রেরি রয়েছে, স্টুডিও রয়েছে। এগুলোকে পুষ্ট না করে, বাথরুমকে পরিপুষ্ট করা কেন! বাথরুম নোংরা পরিত্যাগের জায়গা। নোংরার কথা বলতে গিয়ে মনে পড়ল ‘ব্ল্যাক আর্টে’র কথা। যা দেশে দেশে পরিচিত পিশাচ বিদ্যা, ডাকিনি বিদ্যা, কালো যাদু ইত্যাদি নামে। ইসলামের ভাষায় কুফুরি বিদ্যা। এই বিদ্যা হলো শুভ্রতা, পবিত্রতার বিপরীত। এই বিদ্যায় প্রয়োজন হয় নোংরামির, অশ্লীলতা আর বিকৃত যৌনতার। এমন ‘ইয়ে’র সাথে বাথরুমে শিল্প চর্চার কোথাও কী একটা অন্তর্গত অন্তমিল রয়েছে, যার গন্ধই কী ভাসছে এমন শিল্পের বাহাস থেকে?  

আস্তিক হোক বা নাস্তিক, অন্তত মানুষ হলে অন্যের চিন্তাকে সম্মান করার কথা। ক্ষতিকর নয় এমন বিশ্বাসকে অযাচিত আক্রমণ না করার কথা। অন্যের বিশ্বাসকে অপদস্ত না করার কথা। আর এটা করতে হলে শিল্প ও ধর্মের মধ্যে পার্থক্যটা ধরতে হবে। শিল্প হলো আনন্দের, ধর্ম হলো বিশ্বাসের। সুতরাং শিল্প থেকে ধর্মটা আলাদা করুন না। মোনালিসা রাখুন, ভেনাসকে বাদ দিন। আপনার পায়ের কাছে মোনালিসা থাকলে কেউ আহত হবেন না, কিন্তু ‘বুদ্ধ’ বা ‘লক্ষী’ থাকলে হবেন। কারও বিশ্বাসকে আহত করার অধিকার আপনাকে দেওয়া হয়নি, দেওয়া উচিতও নয়। ইসলাম সম্ভবত এ কারণেই মূর্তিকে ধর্ম থেকে আলাদা করতে চেয়েছিল এবং তা করেছিল এমন ‘কনফ্লিক্টে’র চিন্তা থেকেই।

বাথরুম বিতর্কে ‘কোরআন’কে টেনে আনা হয়েছে। মূর্তির বিপরীতে ‘কোরআন’ রেখে কথিত নাস্তিকতার প্রমাণ রাখতে বলা হয়েছে সেই বাকযুদ্ধে। একে আমি কারও কারও ভাষায় ‘ধৃষ্ঠতা’ বলব না, ‘মূর্খতা’ও নয়। বলব ‘অবুঝ’, এরচেয়ে নরম অভিধা বোধহয় আর নেই। লেখার শুরুতে বলেছি, জ্ঞান হলো মূর্ত, ‘মূর্তি’ নয়। বই হলো জ্ঞানের ভান্ড, ‘মূর্তি’ হলো স্রেফ মাটি-ইট-কাঠের প্রতিকৃতি। এই প্রতিকৃতি সম্পর্কে জানতেও বইয়ের কাছে যেতে হয়। ‘কোরআন’ও বই, জ্ঞান আহরণের ভান্ড। ‘কোরআন’ নামক বইটিতে শুধু আধ্যাত্মিকতা নয়, ‘ইহ’ এবং ‘পর’ সব জাগতিক জ্ঞানের কথাই বলা হয়েছে। ধর্ম-দর্শন, জ্ঞান-বিজ্ঞান যাই বলুন সব কিছুকে লিখিত ফর্মে ধারণ করে বই-ই, মূর্তি নয়। সুতরাং যিনি মূর্তি আর বইকে ‘নিরপেক্ষতা’ প্রমাণে এক করতে চেয়েছেন তাকে ‘অবুঝ’ ছাড়া আর কী বলব। আরেকটি শব্দ রয়েছে ‘প্রতিবন্ধী’; তাকে ‘বুদ্ধি প্রতিবন্ধী’ বলা যায়, কিন্তু আহরিত শিক্ষা ও রুচি এমনটা বলতে বাধা দেয়, তাই ‘অবুঝ’ই বলি। আপনারা তো ‘চাইল্ড লাইক’ আর ‘চাইল্ডডিশে’র পার্থক্য বোঝেন-ই। 

এখানে বাথরুম বিষয়ক আরেকটি কথা ভুলে গিয়েছিলাম। এখন উচ্চবিত্তদের শিল্প চর্চার একটি ট্রেন্ড চলছে। কলকাতার ভানুর ‘হ’ আর ‘স’ নিয়ে একটি কৌতুক মনে আছে না। ‘লাগামু যখন সবখানেই লাগামু’, সেই লাগানোতে ‘হারমোনিয়ম’ হয়ে গিয়েছিল ‘সারমোনিয়ম’। উচ্চবিত্তদের হয়েছে সেই অবস্থা, টাকার অভাব নেই, তাই শিল্পের চর্চা করতে হলে সব জায়গাতেই করতে হবে। সুতরাং বাথরুমও বাদ যাবে কেন। তবে একটা কথা, বাথরুমে গাছপালা, মূতিটুর্তি রাখার পেছনে কোথাও ভারতীয় চিন্তা-চেতনা কাজ করছে না তো, অনেকটা খোলামাঠে ‘ত্যাগে’র পরিবেশ সৃষ্টির মতন, কে জানে!

পুনশ্চ: কথা উঠতে পারে, এমন শিল্পময় আলোচনাকে আমি ‘বাকযুদ্ধ’ বা ‘বাহাস’ বলছি কেন? বলা হতে পারে, আমার তো শিল্পসেন্স নেই, বোঝার ক্ষমতাও নেই। 

জানি, ‘বাকযুদ্ধ’ বা ‘বাহাসে’র সোজা অর্থ ‘ঝগড়া’। কিন্তু এমনটা কেন বললাম সেটা বোঝাতে শর্টকার্টে যাই, হেলাল হাফিজের স্মরণ নিই। আমার লেখা ‘বাথরুমে শিল্প চর্চা’র বাহাস বিষয়ে। বলতে পারেন কথিত ‘বাথরুম সভ্যতা’ নিয়ে। হেলাল হাফিজ মাত্র দু’লাইনে সমগ্রতাকে ধরেছেন তার ‘অশ্লীল সভ্যতা’য়। স্ট্রেইট বলে দিয়েছেন, ‘নিউট্রন বোমা বোঝ, মানুষ বোঝ না।’ 

লোহার কারখানাও শিল্প সংশ্লিষ্ট, ল্যুভ মিউজিয়ামের সংশ্লিষ্টতাও শিল্পে; দুটোর পার্থক্য বুঝতে হবে তো, বুঝতে হবে বাথরুম আর স্টাডিরুমের পার্থক্যও। না বুঝলে বলতে হবে, ‘বাথরুমে শিল্প বোঝ,  স্টাডিটা বোঝ না।’

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কম-এর সম্পাদকীয় নীতির মিল নাও থাকতে পারে।]