(কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার কুতপালং এলাকা থেকে) মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও স্থানীয় বৌদ্ধরা পশ্চিমাঞ্চলের রাখাইনদের বাড়ি-ঘর ধ্বংসস্তুপে পরিণত করেছে। তাদের এই বর্বরতা ও গণহত্যা থেকে বাঁচতে গত ১৫ দিনে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে দুই লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। তবে জাতিসংঘ বলছে, এ সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ। আরও দেড়লাখ রোহিঙ্গা প্রবেশের অপেক্ষায় আছে বলে অনুপ্রবেশকারীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে।

একটু শান্তি ও ভবিষ্যতের আশায় বাংলাদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন হাজারো রোহিঙ্গা। কক্সবাজার জেলার টেকনাফের কুতপালং এলাকার বখতিয়ার মেম্বারের পাহাড়ের পাদদেশে গত এক সপ্তাহে আশ্রয় নিয়েছে ত্রিশ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা। তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছে প্রিয়.কম। তারা জানিয়েছে, মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের নিজ এলাকা থেকে পালিয়ে আসার কারণ। সেনাবাহিনী ও দেশটির বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা তাদের ওপর যে নির্যাতন চালাচ্ছে, তা বর্ণনা করেছেন।

তাদেরই একজন মাওলানা আবদুল মালেক। তিন দিন আগে তিনি বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন। মিয়ানমারের ঘটনা সম্পর্কে তিনি প্রিয়.কমকে বলেন, ‘আমাদের ওখানে বেশি ঘর বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। মানুষ মেরে ফেলেছে, গুলি করেছে, আর জবেহ করেছে। নারীদের রেপ (ধর্ষণ) করেছে, বাচ্চা শিশুদের আগুনের মধ্যে পুড়িয়ে ফেলেছে।’

‘এরপরে আমাদের যে কিসিমের (পদ্ধতিতে) জুলুম করেছে, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার পর, নারীদের ধর্ষণের পর আমরা বাংলাদেশে এসে অনাহারে-অর্ধপেটে যতটুকু স্থান পেয়েছি। আমাদের যে তারা স্থান দিয়েছে তার জন্য বেশি শুকরিয়া (কৃতজ্ঞতা প্রকাশ) করছি।’

মালেক জানান, মিয়ানমারের সেনা সদস্যদের বর্বরতার শিকার হয়ে গত চারদিন আগে তিনি পরিবার-পরিজন নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন। যে নৃশংসতা চালিয়েছে, তা আসলে ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তিনি আসার পর থেকে সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো সহযোগিতা পাননি।

হুসেন আহমেদ নামে একজন জানান, তিনিও তিন দিন আগে পালিয়ে এসেছেন। সেখানের কি অবস্থা? জানতে চাইলে বলেন, ‘সেখানে আমাদের ঘর বাড়ি পুড়িয়ে ফেলেছে’।

রোহিঙ্গাদের একজন মা প্রিয়.কমকে বলেন, ‘ছেলে-মেয়েগুলো ফেলে আমি আসতে চাইনি। নৌকা নিয়ে পার করানো হচ্ছিল সেটাও করতে দিচ্ছিল, নৌকাও পার হতে দিচ্ছিল না। মানুষ মেরে মেরে প্যারাবনে ফেলে রাখা হচ্ছে। প্রায় পাঁচশ’র বেশি অস্ত্র পাওয়া গেছে ওখানে।

৩ নম্বর রিফিউজি ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া একজন রোহিঙ্গা বলেন, ‘আমাদের বাড়ির কাছেই খাল। কিছু মানুষ দেখলাম খালে ঝাঁপ দিলো। আমরা এ পরিস্থিতি দেখে আর অপেক্ষা করতে পারিনি। আসরের (বিকালের নামাজের সময়) কাছাকাছি সময় তখন। তখনই আমরা বের হয়ে পড়ি। খালের মধ্য দিয়ে যখন কাটা-ছেড়াগুলো (মরদেহ) আনা হচ্ছিলো তা দেখে আমরা আর সহ্য করতে পারিনি। তো, অন্ধকার হলেও হোক, যে রকম হবে হোক, আমরা বের হয়ে এসেছি।’

আপনারা আর মায়নমার (বার্মায়) ফেরত যাবেন কিনা? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমাদের তো অবশ্যই ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। তো, শান্তি যদি পাই তবে, যদি করে দেয়। না হয়, আমাদের ওখানে যাওয়ার কোনো ইচ্ছে নেই।’

সেখানে তারা (হামলাকারীরা) কী কী করেছে? জানতে চাইলে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা ওই ব্যক্তি বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে তারা ভালো আচরণ করছে না। মানুষকে তারা অর্ধেক অর্ধেক কেটে ফেলছে। তাহলে আমরা যারা আছি তাদেরও আরেকদিন কেটে ফেলতে কতক্ষণ? নিজের ঔরশজাত সন্তানদের নিয়ে আর এসব সহ্য হয় না।’

আরেকজন রোহিঙ্গা বলেন, ‘ইনসান (মানুষ) নয় তারা। অ বাজি (বাবারা), দেখুন, ছেলে-মেয়েগুলো কেমন হয়ে গেছে গরমে। বাচ্চাগুলো ভাত-পানি কিছুই পায়নি ঠিকমতো। এই মাত্র আসলাম। আজকে বের হয়েছি ১৪দিন হলো। এতদিন পর এখানে পৌঁছালাম। পাহাড় অতিক্রম করে করে এসেছি এখানে। দেখুন, পায়ের পুরো অংশ ছিড়ে-ফেড়ে গেছে পাথরের সঙ্গে হোঁচট খেয়ে খেয়ে। অসহ্য ব্যথা পেয়েছি।’

ওখানে আপনাদের কী (হামলাকারীরা) করেছে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সেখানে আমাদের পাড়ার ২৫০ মানুষ জবেহ করেছে চোখের সামনেই। ২৫০ মানুষ ফেলে ফেলে জবেহ করেছে। এগুলো দেখে আমরা সন্তানদের নিয়ে সাঁতার কেটে খাল পার হয়ে চলে এসেছি। আচ্ছা, আচ্ছা। কোনোমতে সন্তানদের জীবনটা বাঁচুক এ কথা চিন্তা করেই আমরা চলে এসেছি।’

‘তাড়িয়ে দেওয়ার পর থেকে এখনও কোথাও দাঁড়াতে পারছি না। দাঁড়ানোর জায়গাও নেই, খাওয়ার জন্যও কিছু নেই। বাসা একটা বানিয়েছিলাম তা ভেঙে সরিয়ে দিয়েছে। শিশু সন্তানগুলো কান্না করছে আমাদের তা সহ্য হচ্ছে না’, যোগ করেন তিনি।

কক্সবাজার এলাকায় রোহিঙ্গা

বাংলাদেশে প্রবেশ করছে রোহিঙ্গারা

মিয়ানমারের পূর্বদিকে ভুচিদং এলাকা থেকে জীবন নিয়ে পালানোর দশদিনের মাথায় বাংলাদেশ সীমান্তে প্রবেশ করেছেন একজন রোহিঙ্গা। তিনি বলেন, ‘ভুচিদং থেকে আমরা দশ দিনের দিন এখানে এসে পৌঁছেছি। গ্রামে আমাদের বাড়িঘর তারা পুড়িয়ে দিয়েছে।

আট দিন আগে আরাকানের কাওয়ার বিল থেকে আসা মোহাম্মদ জোহার বলেন, ‘সেখানে গ্রাম পুড়িয়ে দিচ্ছে, লোকজন ধরছে, দৌড়াচ্ছে। মারছে, কাটছে এরকম আরকি। অতিরিক্ত জুলুম করছে আমাদের ওপর। আমরা আর সহ্য করতে না পেরে চলে আসতে হয়েছে। একবারেই ৩ থেকে ৪/৫ শ লোক কেটে ফেলেছে। এরকম করে করে। কোথায় খাওয়া, কোথায় পানি, ভাত-পানি খেতে না পেরে কেয়ামত হয়ে যাচ্ছে।’

রোহিঙ্গাদের উন্নয়নে কাজ করে এমন একটি সংস্থা ‘হেলপ কক্সবাজার’। এর নির্বাহী পরিচালক আবুল কাশেম প্রিয়.কমকে বলেন, ‘মূলত আমরা রোহিঙ্গা নিয়ে আমরা আজ থেকে পাঁচ সাতবছর ধরে কাজ করছি। আমরা এখানে রোহিঙ্গাদের জিবিভি (জেন্ডার বেইজড ভায়োলেন্স) প্রকল্প নিয়ে আমরা কাজ করছি। এবং এখন আমরা যে কাজটা করছি সেটা হলো এমারজেন্সি রেসপন্স। অর্থাৎ যে সমস্ত রোহিঙ্গারা, নতুন রোহিঙ্গা আসছে ওদেরকে আমরা বিভিন্নধরণের সহায়তা দিচ্ছি আমরা। যারা বিশেষ করে আহত হয়েছে, গুলিবিদ্ধ হয়েছে এবং যে সমস্ত নারীদের স্বামী নেই ওদেরকে আমরা ননফুড আইটেম এবং ফুড আইটেম সহায়তা দিচ্ছি। তবে এখানে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা এত বেশি যে পুরোপুরি সবাইকে সহযোগিতা করা কোনো সংস্থার পক্ষ থেকে সম্ভব নয়।’

‘একই সঙ্গে আমরা এখন সরকারের কাছে আবেদন করেছি, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার কাছে আবেদন করেছি যে, যে সমস্ত রোহিঙ্গা এখন ভাসমান অবস্থায় রয়েছে তাদেরকে থাকার ব্যবস্থা করা এবং তাদের খাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা,’ যোগ করেন তিনি।

রোহিঙ্গাদের পাচারে একটি চক্র কাজ করছে বলেও জানান তিনি। অসহায় নারী ও শিশুদের সেখান থেকে ভারতে পাচার করা হচ্ছে জানিয়ে আবুল কাশেম বলেন, ‘আমরা মানবপাচার রোধে কাজ করছি। ইতোমধ্যে রোহিঙ্গাদের ভিতরে বাইরে এবং আমাদের গ্রামের কিছু দালালচক্র নতুন আসা উপযুক্ত নারী ও শিশুদেরকে পাচার করছে। এবং তাদেরকে বিক্রি করা হচ্ছে। তাদেরকে চট্টগ্রাম নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, কক্সবাজার নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আবার অনেকসময় দেখা যাচ্ছে তারা ভারতে পাচার করার জন্য তাদেরকে সংগ্রহ করছে। এ তথ্যটা আমাদের কাছে রয়েছে। আমরা ক্যাম্পের বিভিন্ন জায়গায়, আজকে যেমন এই মানুষদেরকে বলতেছি, আমরা বলছি- যদি কেউ আপনাদের আশ্রয় দিতে চায়, আপনারা জেনেশুনে আশ্রয় নিবেন।’

প্রিয় সংবাদ/আদিল/রিমন