প্রতীকী ছবি

সাংবাদিকতায় ক্রম বিপন্ন মূলধারা

ফেসবুককে বলা হচ্ছে ‘ফেকবুক’। কিন্তু এই ব্যর্থতা কার, এই ব্যর্থতা মূলধারার।

কাকন রেজা
সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক
প্রকাশিত: ২৯ এপ্রিল ২০১৮, ১৮:১১ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০
প্রকাশিত: ২৯ এপ্রিল ২০১৮, ১৮:১১ আপডেট: ২০ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০


প্রতীকী ছবি

বেশ কিছুদিন ধরেই দেশের গণমাধ্যমের অবস্থা নিয়ে কথা বলছিলাম। আরেঠারে বোঝাতে চেয়েছি, দেশের গণমাধ্যমের দৈন্যদশার চিত্রটি। বলেছি, পেশা হিসাবে এদেশে সাংবাদিকতা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। এখানে এমন চ্যালেঞ্জিং পেশায় কাজ করার জন্য যে মানসিক প্রস্তুতি দরকার, তার অভাব রয়েছে এবং সে অভাব দৃষ্টিকটুভাবে দৃশ্যমান। সর্বোচ্চ থেকে সর্বনিম্ন সবক্ষেত্রে একই দৃশ্যময়তা। ফলে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে মানুষের চাহিদা পূরণের জায়গাটিতে ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে মূলধারার গণমাধ্যম। আর এ ব্যর্থতায় সঙ্গতই জায়গা করে নিচ্ছে সামাজিকমাধ্যমগুলো। বিশ্বাস ও গ্রহণযোগ্যতা ক্রমে হারানোর ফলে ‘সিটিজেন জার্নালিজমে’র উত্থান ঘটছে, যা ‘পিউর জার্নালিজমে’র ক্ষেত্রে এলার্মিং।

দক্ষিণ এশিয়ায় এমনিতেই গণমাধ্যম পশ্চাৎপদ। আর বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্নে। গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান ‘রিপোটার্স উইদাউট বর্ডার’ প্রকাশিত ২০১৮ সালের গণমাধ্যমের সূচক তা পরিষ্কার করে দিয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠান প্রকাশিত ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচক ২০১৮’-তে বাংলাদেশের অবস্থান সারা বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৪৬ নম্বরে। আর দক্ষিণ এশিয়ায় সবার পেছনে। লক্ষণীয় বিষয় বিশ্ব সূচকে আফ্রিকান দেশ উগান্ডাও আমাদের চেয়ে ২৯ ধাপ এগিয়ে আছে। উগান্ডার ক্রম ১১৭, আমাদের ১৪৬। আর দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে এগিয়ে থাকা দেশ ভুটানের অবস্থান ৯৪ নম্বরে।

বিবিসি ‘রিপোটার্স উইদাউট বর্ডার’-এর ‘স্টোরি’টা প্রকাশ করে কেন বাংলাদেশ পিছিয়ে, এ নিয়ে তিনটি কারণের কথা বলেছে। প্রথমত, তথ্যপ্রযুক্তি আইনের অপব্যবহার; দ্বিতিয়ত, সাংবাদিকতার সাথে সংশ্লিষ্টদের প্রতি অব্যাহত সহিংসতা এবং তৃতীয়ত, গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলার সাথে সংশ্লিষ্টদের সহজে রেহাই পাবার বিষয়টি। এ তিনটি কারণই দৃশ্যমান এবং অনস্বীকার্য। কিন্তু প্রতিটি দৃশ্যমানতার পেছনেই কিছু অদৃশ্য কার্য-কারণ থাকে। একটা পেইন্টিংয়ের পেছনে রয়েছে কাগজ, কালি এবং ক্যানভাসটিকে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য স্ট্যান্ড। এগুলোর সম্মিলিত কর্মযজ্ঞই হচ্ছে একটি ‘পেইন্টিং’। সুতরাং দৃশ্যমান ‘পেইন্টিং’কে স্বীকার করলে তার পেছনের উপকরণগুলোও মেনে নিতে হবে।

সাংবাদিকতা পেশা হিসেবে অনেকটা বাহিনী ধাঁচের, ঝুঁকিময়। বলা যায়, ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের মতন। এখানে প্রয়োজন তীক্ষ্ন বুদ্ধি তথা মেধার। এমন একটি পেশার সাথে অন্য ১০টা পেশা মেলানো হবে বোকামী। এ পেশায় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানসিক প্রস্তুতি। প্রয়োজন শক্ত নার্ভের মানুষ, যিনি সকল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবেন, ‘ব্যক্তিগত’কে ‘গত’ করে সাংবাদিকতার নীতিতে থাকবেন অবিচল। কিন্তু আমাদের সাংবাদিকতার অবস্থান কী এমন? উত্তর, না। মানসিক প্রস্তুতিহীন, দুর্বল কিছু মানুষের জন্যই মূলত দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে পেছনের অবস্থানে আমাদের সাংবাদিকতা।

অবশ্য বিবিসি’র আরেকটি খবর উদ্ধৃত করে এর উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করা যায়। অনেকে বলতে পারেন, ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ পশ্চিমা দেশগুলোতেও’ এমন ‘স্টোরি’ও তো করেছে বিবিসি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকেও সামনে আনতে পারেন এ প্রশ্নে। কিন্তু যারা এমন বলেন, তাদের যদি প্রশ্ন করা হয়, তারপরেও কী সেখানের গণমাধ্যমকর্মীরা থমকে গেছেন, পিছিয়ে গেছেন, নাকি ট্রাম্পের তোষামদে মনিটর গরম করে ফেলেছেন! না, এমনটা সেখানের গণমাধ্যমকর্মীরা করেননি। বরং তারা আরও বেশি উচ্চকিত হয়েছেন। বিপরীতে আমাদের অবস্থান কী?

যুদ্ধক্ষেত্রে রিপোর্টাররা গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন, এমন খবর অহরহ। ক’দিন আগেও ইসরায়েলিদের গুলিতে এক রিপোর্টার প্রাণ হারিয়েছেন। ইরাক যুদ্ধে দেখেছি; সিরিয়া, লেবানন, ইয়েমেন সবখানেই দৃশ্যমান হয়েছে গণমাধ্যমকর্মীদের সাহসিকতার এমন দৃশ্য। ইসরায়েলিদের গুলিতে সাংবাদিক নিহত হবার পর কি কোনো সাংবাদিক বলেছেন, ইসরায়েলিদের কোনো সংবাদ কভার করা যাবে না, তারা আমাদের গুলি করে। এমন চিন্তাও হাস্যকর এবং তা সাংবাদিকতার কোনো কনসেপ্টের সাথেই যায় না। যদি যায়, সেটা আর সাংবাদিকতা থাকে না। একটা কথা মনে রাখা দরকার সুবিধাবাদী, ভীতু আর লোভীর জায়গা যুদ্ধক্ষেত্র নয়, সাংবাদিকতাও না। যে পেশার আগে উচ্চারিত হয় ‘চ্যালেঞ্জিং’ শব্দটি, সে পেশার কর্মী বাছাইয়ের প্রক্রিয়াও তেমন হওয়া উচিত।

‘রিপোটার্স উইদাউট বর্ডার’ যে তিনটি কারণ উল্লেখ করেছে আমাদের সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তা হলো দৃশ্যমান একটি ‘পেইন্টিং’। তাতে ‘পেইন্টিং’ সৃষ্টির পেছনের কারণগুলো রয়ে গেছে অনেকটাই অনুচ্চারিত। বিশেষ করে সর্ষের ভূতের কথা আসেনি ‘স্টোরি’টির বিশ্লেষণে। বাঁধের কোনো একটা জায়গা দুর্বল থাকলে পানির তোড়ে পুরো বাঁধটাই ভেসে যায়। লোহার বাসরঘরের তৈরি ছিদ্র দিয়ে সাপ ঢুকে, দংশিত হয় লক্ষীন্দর। সুতরাং ‘আত্মসমালোচনা’টা হলো মূল। নিজেদের মানসিক প্রস্তুতি থাকলে, নার্ভ শক্ত হলে, সর্বোপরি পেশা সম্পর্কে শ্রদ্ধা থাকলে, উঁচু মাথাটা নিচু করা সহজ নয়। কিন্তু অপেশাদাররা হয় সুবিধাবাদী এবং এমনদের যদি মোটামুটি একটি সংখ্যা থাকে, তবে অন্যদের মাথা উঁচু রাখার বিষয়টি বেকার হয়ে পড়ে। আর আমাদের ব্যর্থতা কিংবা লজ্জাটা এখানেই।

মেইনস্ট্রিম জার্নালিজমের এমন ব্যর্থতার কারণেই সিটিজেন জার্নালিজমের প্রসার। আগেই বলেছি, জায়গা কখনো শূন্য থাকে না। তবে সিটিজেন জার্নালিজম এগিয়ে যাবার বিপদ কিন্তু ভয়াবহ। মেইনস্ট্রিম যখন একটি খবরকে এড়িয়ে যায় বা খণ্ডিতভাবে প্রকাশ করে, তখনই ঘটে বিপত্তি। মানুষের চাহিদা পূরণে সিটিজেন জার্নালিজমের মাধ্যমে সেই খবরটির সাথে ডালপালা যুক্ত হয়ে তা পরিণত হয় গুজবে। আর তা প্রচার করে, ‘অজ্ঞাত কুলশীল’ অদ্ভুত সব মাধ্যমসহ ফেসবুকের মতো সামাজিকমাধ্যমও। কিন্তু মূলধারা যদি সঠিক খবরটি প্রকাশ করত, তাহলে হয়তো বিকল্প মাধ্যমে তা নিয়ে বিতর্ক হতো, পক্ষে-বিপক্ষের আলোচনায় নির্ণিত হতে পারত খবরটির যৌক্তিক প্রয়োজনীয়তা।

আজকাল অনেকেই সামাজিকমাধ্যম ফেসবুকের বিরুদ্ধে বলছেন। ফেসবুককে বলা হচ্ছে ‘ফেকবুক’। কিন্তু এই ব্যর্থতা কার, এই ব্যর্থতা মূলধারার। একটি খবরের প্রকাশকে বাধগ্রস্ত করবেন, খণ্ডিত করবেন, আবার ফেসবুকের অতিরঞ্জনের সমালোচনা করবেন, তাতো হতে পারে না। ইদানীং যারা এসব নিয়ে উচ্চকন্ঠ তাদের জন্য করুণা হয়।

সামাজিকমাধ্যমের বিরোধিতা তাদের ব্যর্থতা ঢাকার ব্যর্থ চেষ্টা মাত্র। বাংলাদেশের এমন সবাই যদি ফেসবুকের বিপক্ষে যায় তবুও কী ফেসবুকটা বন্ধ হয়ে যাবে! চেষ্টাতো হয়েছিল, ফেসবুক কি বন্ধ ছিল? মেইনস্ট্রিম বন্ধ হলেও অলটারনেটিভ পথটা খোলা থাকে। সবকিছুতেই এমন হয়, মূলধারা বন্ধ হলে বিকল্পধারা খুলে যায়। এ প্রক্রিয়ায় লাভের চেয়ে লোকসানই বেশি হয়, উপরিতে মানুষ বিকল্পধারাটাও জেনে যায়। যেমন গেছে ফেসবুক চালানোর ভিপিএন পদ্ধতি।

আমি বারবার বলি, মূলধারাকে রুদ্ধ করার চেষ্টা বোকামি ছাড়া কিছু নয়। এর বিপরীতে যে বিকল্পধারার উদ্ভব হয়, তা অপরিশোধিত, ক্ষতিকর। এটা সুপেয় পানির বিকল্পে খাল-বিল-নালা থেকে তৃষ্ণা মেটানোর মতন। ডায়রিয়া, কলেরাকে ডেকে আনার মতন। এমন বিপদ কেন যে আমাদের দেশে ডেকে আনা হচ্ছে!

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কমের সম্পাদকীয় নীতির মিল না-ও থাকতে পারে।]