(প্রিয়.কম) শীত দোরগোড়ায়, বাতাসে হিমের ছোঁয়া। গত ১৬ নভেম্বর, বিকাল পাঁচটা। শহুরে যানজট পাড়ি দিয়ে গন্তব্য হয়ে উঠল, চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা ও প্রযোজক মনোয়ার হোসেন ডিপজলের সাভারের ফুলবাড়িয়ার 'অমি অনি' স্টুডিও (ডিপজল এর বাড়ি)। তখন শরতের সন্ধ্যা নামেনি। শীতের আগমন যেন নিষ্প্রাণ, ছন্দ-গন্ধহীন। প্রকৃতিতে ছাতিম আর শিউলি ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ। আর কারওয়ানবাজার থেকে গন্তব্যস্থানে পৌঁছাতে খুব বেশি সময় লাগেনি।

এরপর কিছুক্ষণের অপেক্ষা। তারপরই দেখা মিলল কাঙ্খিত মানুষটির। বাইরে থেকে দেখতে অনেকটা মজলিসের (বসার ঘর) মতো। সেখানেই প্রবেশ করলাম। যার নামের সঙ্গে ভয় শব্দটি জড়িত কিন্তু তার গৃহে প্রবেশ করার সাথেই মিহি শীতল হাওয়াও প্রবেশ করল। পরিবেশটাকেও মলিন করে দিলো। এরপরই তার সঙ্গে শুরু হল আলাপচারিতা। দেখে বোঝার উপায় নেই যে এ মানুষটির উপর দিয়ে সম্প্রতি কত ঝড়ই না বয়ে গিয়েছে!

গলায় স্বর্ণের একটি মোটা চেইন। সেটি খুলতে খুলতে বললেন, বুকে চাপ লাগতেছে। আমাকে আবার ডিসেম্বরের ২৫ তারিখ সিঙ্গাপুরে যেতে হবে। সেখান থেকে ফেরার পর আমার চিন্তা-ভাবনা হলো জানুয়ারির ৫ তারিখ থেকে নতুন ছবির শুটিংয়ের কাজ আবার আরম্ভ করা। আর কোনো অসুবিধা হবে বলে মনে হয় না। তখন তো অপারেশনের তিনমাস পূর্ণ হয়ে যাবে। আমি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাবো বলে মনে হয়। এভাবেই শুরু হলো আড্ডা। বললেন, চলো শুরু করি...

(প্রিয়.কম) সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে ৫১ দিন চিকিৎসার পর গত ৯ নভেম্বর দেশে ফিরেছেন। শুনেছি আপনি আপনার জীবনের চতুর্থ অধ্যায় শুরু করতে যাচ্ছেন ১ জানুয়ারি থেকে। সেটি হলো- নতুন চলচ্চিত্র প্রযোজনা করতে যাচ্ছেন। নাম ‘পাথরের মন’। ছবির বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা! পরিচালনা করবেন ছটকু আহমেদ। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসার ফাঁকে মেয়ে অলিজার সঙ্গে বসে গল্পটি ভেবেছেন। কথা হলো- নাম কেন ‘পাথরের মন’?

ডিপজল: ‘পাথরের মন’ নাম দেওয়ার পেছনেও যুক্তি রয়েছে। আমি অসুস্থ হওয়ার পর বিভিন্ন সময় আমার এমনটা উপলব্দি হয়েছে। আমি যে দিন অসুস্থ হয়ে মেডিকেলে গেলাম, ডাক্তার আমাকে বললেন- আপনি হুইলচেয়ারে বসেন। আমি বললাম, আমি কেন ওখানে বসবো? তিনি আমাকে বললেন, আপনার রিপোর্ট দেখে বুঝলাম, আপনি খুব একটা সুস্থ না। আমি বললাম মানে? আমি তো হাঁটতেছি, চলতেছি, সবই তো ঠিক আছে। তিনি আবারও আমাকে বললেন, আপনি সুস্থ না। এরপর আমাকে হুইল চেয়ারে বসাইয়া দিলো।

তারপর বলল, আপনি রুমে যান। আমি বললাম কোন রুমে? সে বলল, হসপিটালের! আমি বললাম কেন? তখন সে একটু উঁচু স্বরেই বলল, আমি আপনাকে অসুস্থ বলছি, তাই। আমি রুমে এসে কথা বলব। এর কিছুক্ষণ পরেই আমি রুমে গেলাম হুইলচেয়ারে বসে। তখন নিজের মধ্যে একটা ঝড় বয়ে গেল। সবকিছুই কেমন জানি হয়ে গেল! নিরবেই মনটা কেমন জানি ভারী হয়ে গেল! এইটা আবার ডাক্তার কী কয়? কিছুক্ষন পরই আবার আমাকে বলল, আপনি সিঙ্গাপুর চলে যান। বাংলাদেশে আপনার চিকিৎসা করা সম্ভব নয়।

(প্রিয়.কম) তারপর...

[একটু হাসলেন এ অভিনেতা। হাসি মুখে রেখেই বললেন....

আবারও প্রশ্ন করলাম, আমি কেন সিঙ্গাপুরে যাবো? তখন সে আমাকে বলল, আপনার হার্টে অনেকগুলো ব্লক ধরা পড়েছে! যখন চিকিৎসক আমাকে এ কথা বললেন, এরপর থেকেই মনে হয়-আমি কানে আর কিছু শুনতে পাচ্ছি না! কি কয়? এ কথা শুনে তো আমার স্ত্রী এবং মেয়ে দুজনই হতবাক। সে সময় আমাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে যাওয়া হল সিঙ্গাপুর। এরপর তিনদিন আমার আর কিছু মনে ছিল না।

সিঙ্গাপুর যাওয়ার পর সেখানকার চিকিৎসক বললেন, আপনার এখন চিকিৎসা করা সম্ভব নয়। মুছিবত কারে কয়! তাইলে? তিনি বললেন, তার আগে আপনি ঔষধ খান। আপনার লিভারের অবস্থা ‍খুবই খারাপ! আপনার তো বেঁচে থাকারই কথা নয়। সে কথা শুনে আমি আরও বেশি দুর্বল হয়ে গেলাম। মনটা আরও ভেঙে গেল।

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আমার একমাস চিকিৎসা চলল। এরপর আবার চেকআপ করল। রিপোর্ট দেখে বলল, আপনি এখন ঠিক আছেন। কিন্তু অপারেশনের জন্য প্রস্তত নন। আবার বার-তের দিন ঔষধ চলল। তারপর বলল, এখন আপনার অপারেশন করা যাবে। কিন্তু রিং পড়ানো যাবে না। আপনার ওপেন হার্ট সার্জারি করা লাগবে। তখন আমার মনের যে কী অবস্থা হয়েছিল সেটা আমিই জানি।

যাই হোক, আর যত বড় শক্তিশালী মানুষই হোক-যখন বলবে আপনার হার্টে সার্জারি হবে, তখন কী আর সেই মানুষ স্বভাবিক থাকে! একটা সময় গিয়ে মনে হচ্ছিল, ডাক্তার মনে হয় মিথ্যা কথা বলতেছে। নিজেকেও অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল। ছেলে, মেয়ে ও স্ত্রী তিনজনেই কান্নাকাটি শুরু করল। আমি বললাম, আল্লাহ ভরসা, প্রথমে আমি রিং পড়তে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে চিকিৎসক একটা কথার প্রতিশ্রুতি দিতে বলল, যদি সিগারেট না খান, তাহলে আমি ওপেন হার্ট সার্জারি করব। এতে আপনার এবং আপনার জীবনের জন্যই ভাল। আমি আর চিন্তাভাবনা করলাম না, বললাম ওকে আল্লাহ ভরসা। এই আর কী। যত যাই হোক, ফিল্মকে ভুলেও যাওয়া যায়না, ছেড়েও যাওয়া যায় না। কারণ আমি তো এরমধ্যেই ঢুইকা গেছি। জীবনে যা করছি, এইটা নিয়েই খেলা। আমি তো ফিল্মে আসি ১৯৮৬ সালে। ফিল্ম ছাইড়া চইলা যামু, এই কথা আমি মুখ দিয়া বলতে পারুম না।

(প্রিয়.কম) ডিপজল, শুধু তো একটি নাম নয়! চলচ্চিত্রের অনেক আলোচিত ঘটনার স্বাক্ষীও, বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?

ডিপজল: আমি তো মনে করি, ডিপজল মানে অবাক করার মত কিছুই নয়। ডিপজল মানে বাস্তব। তার জীবিত একটি মন আছে। আর যেদিন মৃত্যু হবে সেদিন তো সবকিছু শেষই হয়ে যাবে। আমার যে কয়দিন জীবন আছে, সে কদিন ফিল্ম নিয়েই থাকব। অনেকেই নারী কেলেঙ্কারির কথা বলে। আমার লাইফে কোনোদিন আসেও নাই। আসবেও না। যদি আসতো তাহলে তো বহুই আসতো। একটা কথা, ফিল্ম থেকে টাকা-পয়সা কামানোর চিন্তুা আমি কোনোদিন করি নাই। টাকা ধইরা রাখারও চিন্তা করি নাই। যা আসছে তা দুই হাত ও মন খুইলাই খরচ করছি। সিনেমা, আমি মনে করছি এটা আমার ঘর। আমি সাজাইবার চেষ্টা করছি মন দিয়া। ফিল্মতো আর, আরামের জায়গা না! কষ্ট তো আর কম করি নাই, ফিল্মরে কিছু দেওয়ার লাইগা।

(প্রিয়.কম) কিন্তু একটা বিষয়, আপনার প্রতি মানুষের যেমন ভালোবাসা আছে, তেমনি আবার অনেকেই ভয়ও পায়?

ডিপজল: যে ভয় পায় সে তো ভয়ই পায়। আমি ভয় পাওয়ার মত কখনও কিছু করি নাই। কিন্তু একটা কথা, যে আমাকে একবার দেখেছে কিংবা কথা বলেছে সে কিন্তু আবার আমাকে কখন ভুলে যেতেও পারে না। যদি কেউ ভুলে যায় সেটি অবাস্তব। কিন্তু ভালো মন নিয়ে আমার সঙ্গে মিশতে হবে। আর কেউ যদি আমার সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে চায়, তাহলে সে পারবে না। আমি লুকোচুরি খেলার লোকও না। আমি স্ট্রেট কথা বলি। যার কারণেই মনে হয় আমাকে মানুষ ভয় পায়। যদি আপনার সঙ্গে আমার আবার না মিলে, আমি আবার বহু দূরের লোক।

[কথা থামিয়ে তিনি ক্যান্টিন বয়কে ডেকে বললেন...] এখানে সবাইকে চা দাও তো, তোমরা কী অন্যকিছু খেতে চাও? তাও বলতে পারো....]

(প্রিয়.কম) একটা বিষয়- আপনি যে সিনেমাগুলোতে অভিনয় করেছেন; সেগুলোর দিকে খেয়াল করলে দেখা যায়, তারকা নায়ক-নায়িকা থাকলেও গল্প ছিল আপনি কেন্দ্রীক, এ ছবিতেও কী তেমনটিই থাকবে?

ডিপজল: এই জায়গাটা সম্পূর্ণ আলাদা একটি বিষয়। আমি যখন ফিল্মে অভিনয় করতে চেয়েছি তখন এর প্রতি আমার ভালোবাসাটা অনেক স্ট্রং ছিল। আর যদি দায়ভারের কথাও বলি, সেটিও ছিল অনেক। ভালো ছবি, বড় ছবি, সুন্দর গল্পের ছবি সাধারণ দর্শক সিনেমা হলে দেখতে চায়। আপনি যদি দর্শকের মনের খোড়াকের কিছু বানান পাবলিক দেখবে না, তা কী হয়! ছবি যদি মনের আবেগকে ধরতে পারে, তাহলে অবশ্যই ছবি চলবে। আমার কেন্দ্রীক গল্প থাকলেও ছবি বানানোর সময় সবকিছু মাথায় রাইখাই বানাই। 

(প্রিয়.কম) আপনার ছবির তো আলাদা দর্শক রয়েছে, মুক্তি পেলেই হুমড়ি খেয়ে পড়তো, তবে ধারাবাহিকতার জায়গায় মধ্যখানে বড় একটা বিরতি পড়েছে?

ডিপজল: সে ট্রেন্ড আবার চালু হবে। আমার হাতে তিন-চারটা ছবি রয়েছে। এখন তো এ ছবিগুলোর কাজ চলছে। মুক্তি পেলে দর্শকদের মধ্যে আগে আমার ছবি দেখার জন্য এক ধরনের যে স্পৃহা ছিল সেটি আবার ফিরে আসবে। কিন্তু এখন সিনেমা বানাইতে গিয়া দেখতাছি, এক শ্রেনীর লোক সিনেমা হল বন্ধ করে দিতে চাচ্ছে! এরপর মেশিন লাগায়, এই করে, সেই করে, নানান জটিলতা সৃষ্টি করে। বিষয়টা এমন হয়ে গেছে যে, সিনেমা হল কারও পিতার সম্পদ। ছবি তাদের আদেশ ছাড়া মুক্তি পাবে না। এটা তো ইহজগত কিংবা পরজগত কোথাও ছিল না। আমার সিনেমা, সময় মতো কিংবা তারিখ অনুযায়ী, প্রদর্শকদের চাহিদা অনুযায়ী আমি মুক্তি দিবো। বিষয়টা অনেকটা এ রকম এটা কারও বাপের জমিদারি! কেনো? পৃথিবীতে তো এমনটা কখনও ঘটেনি।


এই সময়ে মনোয়ার হোসেন ডিপজল/ ছবি: আবু সুফিয়ান জুয়েল

[এরই মাঝে ক্যান্টিন বয় চা দিয়ে গেলো। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আলাপ চালিয়ে গেলাম।]

(প্রিয়.কম) কিন্তু সিনেমায় অশ্লীলতার সময় তো আপনি ইন্ডাস্ট্রির চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন, এখন কী আবারও সেটা সম্ভব না?

ডিপজল: আচ্ছা, তাইলে মেশিনের কথাই ধরো, বহুদিন আগে শুনেছি সরকার হলে মেশিন দিচ্ছে। কই এখনও নতুন কোন আপডেট এ বিষয়ে পাচ্ছি না। দিচ্ছে-আসছে, এভাবে কী আমাদের ফিল্ম হবে? বছরের একবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার দেয়। পুরস্কারও শেষ। ফিল্মও শেষ। এখন কী সব ছবি হচ্ছে, যাচ্ছি, খাচ্চি, শুচ্ছি। কলকাতার সংস্কৃতি, ভাষা বাংলাদেশে আনতে চায়! ওদের কালচার আর আমাদের কালচার কী এক? আমাদের এখনকার সময় ও কালচারের কথা মাথায় রেখেই সিনেমা বানাতে হবে। কিন্তু এটাও মাথায় রাখতে হবে, বিশ্ব এখন কিভাবে চলছে। দর্শকরা কি ধরনের ছবি চায়। আরেকটা বিষয় গত ঈদে আমার হলে ছবি চলল না কেন? কে আমার হলে ছবি দিল না! কেউ তো কিছুই বলে নাই। আবার বলে আমার থেকে কিসের বিশ লাখ টাকা পাবে! কথা নাই, মেশিনের দাম বাড়াইয়া রাখব। আমি টাকা দিয়ে দিবো। এটা অবাস্তব। এখন কী আমার হলে ছবি চলে না? চলছে তো। ঈদে কেন আমার, খসরুর (খোরশেদ আলম খসরু) হলে ছবি চলল না। আমরা দুইটা ভাল-মন্দ কথা বলছি, আমাদের হলে ছবি চলবে না। হল বন্ধ করে দিই? বন্ধ হওয়া কী এতোই সহজ! তাইলে তো আমরাই বন্ধ হয়ে গেলাম!

(প্রিয়.কম) ফিল্মে তো পলেটিক্স সব সময়ই ছিল...

ডিপজল: আগে এখনকার মতো এত নোংরামি ছিল না। এখন একঘেঁয়েমিভাবে চলতেছে। কেউ কেউ ভাবে দেশটা তার বাবার। বাংলাদেশের সব সিনেমা হল তাদের। সে যা বলবে তাই হবে। এভাবে আর বেশি দিন চলবে না। যত দ্রুতই সম্ভব আমরা কাজ দেখাব। তবে এজন্য আমাদের সরকারের কাছ থেকে সহযোগিতার দরকার ছিল। কিন্তু হায়! যে লোক এখন নিজেকে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির বাবা-মা দাবি করে ওই লোক কোথা থেকে আসল, তাকে দুদকের জিজ্ঞসাবাদ করা উচিত। তাদের টাকার উৎস জানা উচিত। কারণ সিনেমার বাজারের কি অবস্থা সবাই আমরা জানি।

[এর মধ্যে সেল ফোন বেজে ওঠে অভিনেতা ডিপজলের। অনেকক্ষণ ধরে রিং বাজতে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ রিং হবার পর তিনি বলেন...দেশে ফেরার পর সবাই ফোন করছে। কেমন আছি জানতে চাচ্ছে। মানুষের ভালোবাসা কার না ভালো লাগে?’ তারপর ফোনটা রিসিভ করলেন। ফোনের কথা শেষে প্রসঙ্গে ফিরে আসেন আবার।]

(প্রিয়.কম) আপনি যখন ফিল্ম পলেটিক্সের কথাই বললেন, আমি আরেকটা বিষয় যোগ করতে চাই, যদিও বিষয়টা ওপেন সিক্রেট- একটা বিষয় দেখা যাচ্ছে, তাদের প্রতিষ্ঠানের হয়ে যেসব নায়িকারা কাজ করেন, তারা অন্যকোনো প্রতিষ্ঠানের ছবিতে কাজ করার নজির নেই, এটিকে কীভাবে দেখছেন?

ডিপজল: আমি তাদের নাম দিয়েছি ‘ঘরের বউ’! ফিল্মের নায়িকা নয়। আর কোন শিল্পী যদি কুক্ষিগত হয়ে কাজ করেন, সেখানে কী ভালো কিছু করা সম্ভব? আমি মনে করি বাংলাদেশের সিনেমা হলগুলো কারও হাতে থাকতে পারে না। যার কারণে আজ ইন্ডাস্ট্রির এমন অবস্থা। মানে অনেকটা মা-বাবাহীন। অল সেটআপ সুন্দরী ওদের হাতে থাকবে। মেয়ে মানুষ যখন যার, সময় তখন তার। বিষয়টাই তো এমন। কেউ আপন না। আর নায়িকা কখনও আপন হইতে পারে না।

(প্রিয়.কম) ক্যারিয়ারের প্রসঙ্গ, দীর্ঘ তিন দশকের আপনার ফিল্মের জীবন। যদি পিছন ফিরে তাকান, কী মনে হয়?

ডিপজল: সেই ১৯৮৬ সাল থেকে, একটা দীর্ঘ সময়। আমি শান্তি বলে এখানে কিছু পাই নাই, সব অশান্তি। অনেকেই টাকা নিয়ে আসছে আবার চলেও যাচ্ছে। এটাও কষ্ট লাগে দেখলে। বিষয়টা এমন, একজন প্রযোজক সকালে ভাড়া করা হলুদ একটা ট্যাক্সি নিয়া শুটিং করার জন্য আসছে। শো অফ করার জন্য। আর শুটিং শেষে বাড়ি ফেরার সময় হাঁইটা যায়। গাড়ি চালানোর জন্য তেল কেনার টাকা নেই। টাকা থাকলে রংয়ের অভাব নাই। এজন্য ফিল্মে আসলেই হবে না, হিসাব-নিকাশ করতে হবে। একটা লোক গাড়ি নিয়া আসল গেল রিক্সা নিয়া। এতে করে লাভটা কী? ক্ষতি তো ইন্ডাস্ট্রিরই হচ্ছে।

(প্রিয়.কম) ফিল্ম থেকে কী পেলেন, এমন হিসেব-নিকেশ কখনও করেছেন?

[প্রশ্নটা শুনে একটু লাজুক হাসলেন। কিছুটা সময় নিয়ে বললেন...

ডিপজল: ফিল্ম থেকে এখনও মনের কিছুই পাই নাই, আবেগ ও ভালোবাসা কোনোটাই পাই নাই। ফিল্ম থেকে দু:খ ছাড়া আর কিছুই পাই নাই। কারণ ফিল্মটারে কোনো সরকারই ভালভাবে দেখে নাই। আর এর ভালোও চায় নাই। শুধু গপ্পই মেরে গেছে। এফডিসির দিকে তাকান, ঐ যে আমাদের জাতির পিতা করে দিয়ে গিয়েছিলেন। ঐটা ঐভাবেই রয়েছে। এছাড়া কবিরপুরে দিছে মহাবিদ্যালয় (কবিরপুর ফিল্ম সিটি), এর তালগাছও নাই, মাথাও নাই। যে যার পকেটের ধান্ধা নিয়া ব্যস্ত। ফিল্মে বাংলাদেশ না বাড়ুক, এটা অনেকেই চায়!

(প্রিয়.কম) সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে, এমন কোনো ছবি দেখেছেন?

ডিপজল: এখন ছবি যে-ই বানায়, আমার কাছে নাটক মনে হয়। আমি সে সব ছবিগুলোর মধ্যে 'ছ'ও বুঝি না, 'ব'ও বুঝি না। সিনেমা দেখার পর মনে হয় তারা সিনেমার কিছুই বোঝে না। যারা এমন করছে তারা সিনেমা নিয়ে খেলা খেলতে আইছে। মানে ফিল্মের খারাপ কিছু করতে আইছে। ওরা ফিল্মের জন্য কখনোই মঙ্গল বয়ে আনতে পারবে বলে আমার মনে হয় না। আর যে লোক বড় ইন্ডাস্ট্রি নিয়া বইসা আছে, সে কি করতাছে তা আমার চেয়ে আপনি আরও ভাল বুঝেন। তিনি হলেন মুভি লর্ড না, তিনি হলেন লেডি লর্ড!

(প্রিয়.কম) মাঝখানে আপনি ১০০ সিনেমা হল ডলবি সাউন্ড সিস্টেম করতে চেয়েছিলেন, তার কী খবর?

ডিপজল: আমি এখনও রাজি আছি। তবে আমার এখন আর সময় নাই, সিনেমা হলের পেছনে দৌঁড়ানোর। আমি শিল্পী সমিতির নেতাদের বলছিলাম তোমরা বানাও, আমি সাথে আছি। কিন্তু গর্ভমেন্ট থেকে ৫০টা মেশিন নিতে পারলে আমাদের জন্য সুবিধা হতো। ওই মেশিনগুলোর জোরে আমরা একটা সাপোর্ট পাইতাম আইনের দিক থেকে। আমি দিলে তো হয়তো কোনো কিছুর গুরুত্ব থাকবে না। শুধু সরকারের পলিসির জন্যই আমরা ঐ মেশিনগুলা চেয়েছিলাম।

(প্রিয়.কম) ওলিজা মনোয়ার (আপনার মেয়ে) দেশের বাইরে বিশ্বখ্যাত নির্মাতাদের ছবিতে মেকআপ আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন। এর পাশাপাশি মেকআপ নিয়ে পড়াশোনা করেছেন, তার তো একটি ছবি নির্মাণেরও কথা ছিল?

ডিপজল: ও আমার পরবর্তী ছবির কাজ করবে। মেকআপ এবং পরিচালনায়। ছবির গল্প রেডি। এরমধ্যে তো আমি অসুস্থই হয়ে গেলাম। দেশের প্রথম হরর মুভি ‘মেঘলা’ ও নির্মাণ করতে যাচ্ছে। সে অনুযায়ী এখন পরিকল্পনা এগিয়ে চলছে। আমার মনে হয় ভালো কিছুই হবে।

(প্রিয়.কম) প্রিয়.কম’কে সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

ডিপজল: প্রিয়কেও।

[আমাদের আড্ডা আরো দীর্ঘতর হতে থাকে। এরইমধ্যে যে প্রায় দুই ঘন্টা সময় চলে গেল টেরই পেলাম না। রাত বেড়ে যায়। কথা চলতেই থাকে। সব কথা প্রকাশ করা গেলো না এবার। কিছু কথা সামনের দিনগুলোর জন্য তোলা থাক।]

প্রিয় বিনোদন/সিফাত বিনতে ওয়াহিদ