চলছে দুধ প্রক্রিয়াকরণ। ছবি: সংগৃহীত

৭৫ শতাংশের বেশি পাস্তুরিত দুধ অনিরাপদ

রমজান শুরুর আগ মুহূর্তে ভয়ঙ্কর এক তথ্য দিয়েছেন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর, বি)-এর গবেষকরা।

ফারজানা মাহাবুবা
সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ১৬ মে ২০১৮, ২১:৩৮ আপডেট: ১৯ আগস্ট ২০১৮, ১৯:১৬


চলছে দুধ প্রক্রিয়াকরণ। ছবি: সংগৃহীত

(ইউএনবি) রমজানে ভোক্তা পর্যায়ে দুধের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। পুরো মাস সিয়াম পালনের পাশাপাশি দেহকে সুস্থ-সবল রাখতে পুষ্টি চাহিদা মেটাতে দুধ পান করেন ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা। যে কারণে বাজারে এর চাহিদা অন্য সময়ের চেয়ে অনেক বেশি থাকে।

তবে রমজান শুরুর আগ মুহূর্তে ভয়ঙ্কর এক তথ্য দিয়েছেন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর, বি)-এর গবেষকরা।

আইসিডিডিআর, বি-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্থানীয় বাজারের প্রাস্তুরিত দুধের ৭৫ শতাংশেরও বেশি দুধ সরাসরি পানের জন্য অনিরাপদ।

১৬ মে, বুধবার আইসিডিডিআর,বি’র গবেষকরা জানান, গবেষণায় শিশুদের পুষ্টির প্রাথমিক উৎস- বাণিজ্যিকভাবে পাস্তুরিত দুধ সম্পর্কে অপ্রীতিকর ফল পাওয়া গেছে। দুগ্ধ খামার থেকে শুরু করে বিক্রয়ের দোকান পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে দুধ ব্যাকটেরিয়া দ্বারা দূষিত, যা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য নয়।

তবে, এটি শুধু বিপজ্জনক হতে পারে যদি এই দুধ ‘কাঁচা’ (ফুটানো ছাড়া) অবস্থায় পান করা হয়। উদ্বেগের বিষয় হলো বাংলাদেশে প্রায়ই কাঁচা দুধ পানের প্রবণতা দেখা যায়। 

গবেষণায় দুগ্ধ শিল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে দুধের মাইক্রোবায়োলজিক্যাল মান যাচাই করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের দুধ উৎপাদকারী, হিমাগার এবং স্থানীয় রেস্তোরাঁ থেকে কাঁচা দুধের ৪৩৮টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এ ছাড়া ঢাকা এবং বগুড়ার বিভিন্ন দোকান থেকে বাণিজ্যিকভাবে প্রক্রিয়াজাতকৃত দুধের ৯৫টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, প্রাথমিক দুধ উৎপাদনকারী পর্যায়ে ৭২ শতাংশ ও ৫৭ শতাংশ নমুনা যথাক্রমে কলিফর্ম (≥১০০ সিএফইউ/এমএল) এবং ফিক্যাল কোলিফর্ম (≥১০০ সিএফইউ/এমএল) ব্যাকটেরিয়া দ্বারা দূষিত এবং নমুনাসমূহের ১১ শতাংশ উচ্চসংখ্যক ই. কোলাই (≥১০০ সিএফইউ/এমএল) দ্বারা দূষিত।

ফিক্যাল কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। দুধে এই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতির ফলে বোঝা যায় যে দুধ জীবাণু বা রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস দ্বারা দূষিত, যা উষ্ণ রক্তের প্রাণীর মলে থাকতে পারে বা দুধ দোয়ানোর সময় দুধে মিশতে পারে।

দুধ সংগ্রহের স্থানে দেখা যায়, নমুনাসমূহ উচ্চসংখ্যক কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া (≥১০০ সিএফইউ/এমএল) দ্বারা দূষিত এবং মল দ্বারা দূষিত হওয়ার হার ছিল ৯১ শতাংশ এবং ৪০ শতাংশ নমুনায় উচ্চসংখ্যক ই.কোলাই ছিল।

হিমাগারসমূহ থেকে সংগৃহীত নমুনাসমূহে দুধ সংগ্রহের স্থানের নমুনাসমূহের চেয়েও দূষণের হার বেশি দেখতে পেয়েছেন গবেষকরা। পাঁচটি জেলার ১৫টি হিমাগারে সংগৃহীত নমুনাসমূহে উচ্চসংখ্যক কলিফর্ম ও মলবাহিত কলিফর্ম পাওয়া যায়। এ ছাড়া সবগুলো হিমাগার থেকে সংগৃহীত নমুনায় ই.কোলাই পাওয়া যায়। দেখা যায় ৬৭ শতাংশ নমুনা ই.কোলাই দ্বারা উচ্চমাত্রায় দূষিত।

এ ছাড়া বি. সেরেয়াস এবং স্ট্যাফাইলোকক্কি-র মতো আরো কিছু ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায়, তবে এগুলোর মাত্রা ছিল স্বাভাবিক।

গবেষণায় আরো দেখা যায়, দুধ উৎপাদনকারীর থেকে শুরু করে হিমাগার এবং সবশেষে ভোক্তা ও স্থানীয় রেস্তোরাঁ পর্যায় পর্যন্ত দুধে ব্যাকটেরিয়ার মাত্রা ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

উদ্বেগের বিষয় হলো বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, পরীক্ষিত পাস্তুরিত দুধের নমুনার প্রায় ৭৭ শতাংশে ব্যাকটেরিয়া রয়েছে, (অ্যারোবিক প্লেট কাউন্ট) যা বিএসটিআই-এর (বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন) মানদণ্ডকে ছাড়িয়ে যায়।

অন্যদিকে ৩৭ ও ১৫ শতাংশ নমুনা যথাক্রমে কলিফর্ম এবং মলবাহিত কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া দ্বারা দূষিত ছিল। দুধকে পানের জন্য নিরাপদ করে তোলার জন্য একে পাস্তুরিত করা হয়। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক উভয় মানদণ্ডে পাস্তুরিত দুধে এ ধরনের মলবাহিত কোলিফর্মের উপস্থিতি একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়।

একজন ভোক্তার জন্য এ ধরনের গবেষণা ফলাফল কেমন তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আইসিডিডিআর,বি’র সহযোগী বিজ্ঞানী ও ফুড মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবরেটরির প্রধান এবং এই গবেষণার প্রধান তত্ত্বাবধায়ক ড. মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘বাজারের পাস্তুরিত কাঁচা দুধে রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুর উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে এবং এসব দুধ খুব ভালোভাবে না ফুটিয়ে খাওয়া উচিত নয়। তবে, ইউএইচটি দুধ থেকে সংগৃহীত নমুনায় জীবাণুর সংক্রমণ দেখা যায়নি, কাজেই সেগুলো পানের জন্য নিরাপদ। এই গবেষণায় আমরা দুধে রাসায়নিক পদার্থ দ্বারা দূষণ এবং ভেজাল মিশ্রণ-সংক্রান্ত পরীক্ষা করিনি।’

সকলের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর দুধ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের দুগ্ধ শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহকে স্বাস্থ্যকরভাবে দুধ দোয়ানো, সংগ্রহ ও সরবরাহ, সংরক্ষণ এবং পাস্তুরিত করার বিষয়ে আরো যত্নবান হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এ ছাড়াও পানের জন্য দুধকে নিরাপদ রাখতে দুধ উৎপাদনের স্থান থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে পাস্তুরিত দুধকে নিরবচ্ছিন্নভাবে শীতল রাখার পদ্ধতি অনুসরণ করার পরামর্শ দেন তিনি।

কেয়ার বাংলাদেশের আর্থিক সহায়তায় ‘স্ট্রেনদেনিং দ্য ডেইরি ভ্যালু চেইন (এসডিভিসি)’ প্রকল্পের আওতায় বগুড়া, গাইবান্ধা, নীলফামারী, দিনাজপুর, জয়পুরহাট, রংপুর এবং সিরাজগঞ্জ জেলার মোট ১৮টি উপজেলায় এই গবেষণা পরিচালিত হয়।

গবেষণাটির ফলাফল ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ফুড মাইক্রোবায়োলজি-তে প্রকাশিত হয়েছে।

প্রিয় সংবাদ/রুহুল

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
সরকারকে ‘সোজা রাস্তায়’ আসার আহ্বান ফখরুলের
মোক্তাদির হোসেন প্রান্তিক ২০ অক্টোবর ২০১৮
স্পন্সরড কনটেন্ট