(প্রিয়.কম) মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর জাতিগত নিধনের অভিযোগের ভিত্তিতে দেশটির সেনাবাহিনী প্রকাশিত তদন্ত প্রতিবেদনের সত্যতা ও বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটির দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক জেমস গোমেজ সেনাবাহিনীর এ অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদন প্রসঙ্গে বলেন, ‘রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির ওপর চালানো ভয়াবহ নির্যাতনকে আবারও গোপন করতে চাইছে সেনাবাহিনী।’

আন্তর্জাতিক চাপ ও অবিরত অভিযোগের মুখে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইয়াং তার ফেসবুক পেজে ওই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, রাখাইনের রোহিঙ্গা গ্রামে গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যা, নারীদের ধর্ষণ বা বন্দীদের নির্যাতনসহ যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগেরও অভিযোগ অস্বীকার করা হয় ওই প্রতিবেদনে।

প্রাণ বাঁচাতে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে রোহিঙ্গা এসেছে বাংলাদেশে। ছবি: ফোকাস বাংলা

প্রাণ বাঁচাতে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে রোহিঙ্গা এসেছে বাংলাদেশে। ছবি: ফোকাস বাংলা

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ওই তদন্ত রিপোর্টে সেনা অভিযানের সাফাই গেয়ে আরও বলা হয়, রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলায় ৩০ জন নিরাপত্তাকর্মী নিহত হওয়ার পর রাখাইনে ক্লিয়ারেন্স অপারেশন চালানো খুব জরুরি ছিল। গত ২৫ আগস্ট চালানো ওই হামলার জন্য এতদিন ৫ হাজার রোহিঙ্গা বিদ্রোহীকে দায়ী করা হলেও সেনাতদন্ত বলছে, এই সংখ্যা ছিল ১০ হাজার।

ওই তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে অ্যামনেস্টি বলেছে, ‘নির্যাতন ও ভয়াবহতার অসংখ্য ঘটনা রেকর্ড করার পর ও স্যাটেলাইট চিত্রে রাখেইনের ধংসলীলা প্রত্যক্ষ করার পর আমরা শুধু একটি সিদ্ধান্তেই উপনীত হতে পারি যে, এসব হামলা মানবাতার বিরুদ্ধে অপরাধের সমতুল্য।’

প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন অভিযান শুরু হওয়ার পর প্রাণ বাঁচাতে সাড়ে ছয় লাখেরও বেশি মানুষ পালিয়ে এসে বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার টেকনাফ ও উখিয়ার শরণার্থী শিবিরগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। ওই অভিযানে গণহত্যা-ধর্ষণ-অগ্নিসংযোগের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠে।

অ্যামনেস্টি বলছে, প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি, স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবি-ভিডিও এবং সব ধরনের তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এ উপসংহারে উপনীত হওয়া যায় যে, ‘রাখাইনে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশুদের ওপর পরিকল্পিত আক্রমণ চালানো হয়েছে এবং এটি মানবতার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অপরাধ।’

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দেওয়া আগুনে পুড়ে গেছে গ্রামের পর গ্রাম। যা সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে অস্বীকার করা হয়েছে। ফাইল ছবি

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দেওয়া আগুনে পুড়েছে গ্রামের পর গ্রাম। ফাইল ছবি

এদিকে অভিযানের নামে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী খুন, ধর্ষণ, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া, কুপিয়ে হত্যাসহ বর্বরতার চূড়ান্ত সীমাও অতিক্রম করেছে বলে অভিযোগ নিউইয়র্ক ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ)। স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত ছবি বিশ্লেষণের মাধ্যমে সংস্থাটি বলেছে, ইতোমধ্যে প্রায় ২৮৮টি রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রাম জনশুন্য। সংস্থাটি আরও জানায়, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী মানবতাবিরোধী অপরাধ করছে। 

পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে গড়ে উঠেছে শরনার্থী শিবির। ছবি: ফোকাস বাংলা

পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে গড়ে উঠেছে শিবির। ছবি: ফোকাস বাংলা

এ ছাড়া বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিনিধিদলের কাছে তাদের ওপর নেমে আসা নির্মম নির্যাতন, নির্বিচার গণহত্যা, নারী-শিশু ধর্ষণ, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে বাস্তুচ্যুত করার বিবরণ দিয়েছেন। ফলে এসব নির্যাতন বন্ধে সুচি ও সেনা সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত ছিল। কিন্তু দেশটির সেনাবাহিনী নিজেদের বরাবরই নির্দোষ দাবি করে আসছে।

প্রিয় সংবাদ/শান্ত