কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে। ছবি: সংগৃহীত

‘হে আগামী প্রজন্ম, তোমাদের জন্য আমরা লড়েছিলাম’

সারা দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একযোগে আন্দোলন আসলেই স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত৷

মাহবুব মানিক
গবেষক, মার্সেবুর্গ ইউনিভার্সিটি অব এপ্লায়েড সায়েন্স, জার্মানি
প্রকাশিত: ১০ এপ্রিল ২০১৮, ২১:৫৮ আপডেট: ১৮ আগস্ট ২০১৮, ১৮:০০


কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) সারা দেশে কোটাব্যবস্থা নিয়ে একরকম যুদ্ধাবস্থা়। কোটা সংস্কার নিয়ে পত্রিকার পাতা থেকে শুরু করে টিভি টকশোতে উত্তপ্ত অবস্থা। পক্ষ-বিপক্ষ-নিরপেক্ষ মিলিয়ে তিন অংশের লড়াই। 

সারা দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একযোগে আন্দোলন আসলেই স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত। এই আন্দোলন আমার বিচারে স্বার্থের উর্ধ্বে থেকে কোনো আন্দোলন মনে হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ইউনিটি ও চেইন অব কমান্ড আমাকে অবাক করেছে। দাবি আদায় হোক আর না হোক, আশা করছি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এটি একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। অন্তত গর্ব করে বলতে পারবে, ‘তোমাদের জন্য আমরা লড়েছিলাম।’

যদি একটু কষ্ট করে ভবিষ্যৎ দেখার চেষ্টা করি, তাহলে স্পষ্টতই দেখতে পাব যে, রাস্তায় যারা নেমেছে, এদের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আগামীর উন্নত বাংলাদেশ। সত্যি বলতে একজন রাজনীতিবিদ বা অপরাধীর কাছে পুলিশের হুমকি-ধমকি, বুটের লাথি, লাঠির আঘাত, গুলি খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। যদিও একজন সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীর কাছে পুলিশের সামান্য একটা ধমকও তার মনের ওপর চরম বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। আর এই নিষ্পাপ শরীরগুলোর ওপর উপর্যুপরি হামলা, গুলিবর্ষণ, টিয়ারশেল নিক্ষেপ যে কী পরিমাণ মন ও শরীরের ক্ষতি করতে পারে, তা বর্ণনাতীত। এ দুঃসহ স্মৃতি সারা জীবনেও ভোলার মত নয়। বোধগম্য নয় যে, আগামীতে দেশে কী হতে যাচ্ছে। 

কোটা আন্দোলন নিয়ে কিছু সরকারি পদধারী ভারী মানুষের মন্তব্য শুনলাম। এরা শুধু ওজনেই ভারী নন, পদ ও পদবিতেও ভারী। এদের কথা শুনে যা মনে হলো, এরা এসব মেধাবী শিক্ষার্থীদের একরকম নোংরা ভাষায় অপমান করতেও পিছপা হননি। তাদের মন্তব্যগুলো আমার কাছে খুব নিম্নমানের মনে হয়েছে।

এতটুকু বুঝি, এগুলো তাদের মনের কথা নয়, এত বোকা তারা নন। এগুলো তাদের চেয়ারের উপরে বিছানো মখমলের তোয়ালেটার শেখানো কথা। এই তোয়ালে মানুষকে নিষ্ঠুর বানিয়ে দিতে পারে। অদ্ভুত ক্ষমতাধর এইসব যাদুর তোয়ালে। এতটুকু বুঝি যে, যাদের আগে-পিছে কোন নেতা বা স্লোগান নেই, তাদের কাছে কোটা সংস্কারের দাবি মোটেও অযৌক্তিক নয়, এটি ন্যায্য।

এই ছেলেগুলো একটিবারের জন্যও কিন্তু আপনাদের কাছে চাকরি ভিক্ষা চায়নি, কোনো পদ দাবি করেনি। এমন কথা এরা একবারও বলেনি যে, আমাদের অমুক পদে বসিয়ে দিতে হবে। শুধু চেয়েছে মেধার যোগ্যতা যাচাইয়ে অন্তত অংশ নিতে। কিন্তু বিপরীতে আপনাদের মতো শিক্ষিত মানুষগুলোর মন্তব্য সত্যিই জাতিকে হতাশ করেছে।

সরকারের নিকট একটিই আবেদন, আপনারা কোটাসহ সকল সুযোগ-সুবিধা তাকেই দিন যিনি যুদ্ধ করে দেশটি স্বাধীন করেছেন। তার সারা শরীর আপনি মনি-মুক্তা দিয়ে মুড়িয়ে দিন, হীরা-জহরত দিয়ে সাজিয়ে দিন। এতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু কোনো মহান ব্যক্তি যদি ভালো কাজ করেন, তার সন্তান কি পুরস্কৃত হবে?

বাংলাদেশে চাকরি বা কোনো কিছুতেই আমার কোনো কোটা নেই। দেশে আমার কোনো কোটার প্রয়োজনও নেই৷ তারপরেও যদি একটি নিরপেক্ষ বিন্দুতে দাঁড়িয়ে থাকি, অবশ্যই আমাকে কোটা সংস্কারের পক্ষেই যেতে হবে। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি যে, আমার প্রিয় দেশটি পিছিয়ে যাচ্ছে। এই সামান্য ব্যাপার বুঝতে বেশি লেখাপড়ার দরকার নেই। দরকার ন্যূনতম কমনসেন্স, নেতাহীন ও স্লোগানহীন শিক্ষা।

ব্যাপারটা এমন নয় যে, কোটাধারীরা দেশের জনগণ আর বাকি সব বহিরাগত। মন চাইল খাবার দিলাম, মন চাইল তাড়িয়ে দিলাম। সুতরাং একটি সাম্যাবস্থার দরকার।

কোটা পদ্ধতি যাদের জন্য প্রয়োজন, শুধু তাদের জন্য রেখে বাকি সব বাতিল করাই সরকারের কাছে কাম্য। 

আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে সরকারের উন্নয়ন কাজে কোটাধারীরা কোনো কাজে আসবে বলে মনে হয় না। যদি কোনো কাজে আসে, তবে এসব শিক্ষিত, মেধাবী মানুষগুলোই আসবে৷ 

শেষ কথা হচ্ছে, সরকার যদি একেবারেই অপারগ হয়, তবে অন্তত সব কোটাধারীদের আলাদা করে পরীক্ষা নিয়ে নিয়োগ দিলেও ভালো হয়। এতে সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের ক্ষেত্রটা অন্তত প্রশস্ত হয়। সর্বোপরি বলতে হয়, উন্নত বাংলাদেশ গড়তে মেধার মনোনয়নই কাম্য, কোটার মনোনয়ন নয়৷

[প্রকাশিত লেখা ও মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কমের সম্পাদকীয় নীতির মিল না-ও থাকতে পারে।]

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
স্পন্সরড কনটেন্ট
ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণের দাবি | কালের কণ্ঠ
ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণের দাবি | কালের কণ্ঠ
কালের কণ্ঠ - ১ দিন, ২ ঘণ্টা আগে
ট্রেন্ডিং