জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জহির রায়হান মিলনায়তনে ‘প্রিয় মুক্তিপিন’ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী শিক্ষার্থীরা। ছবি: প্রিয়.কম

‘মুক্তিপিনের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের বার্তা পৌঁছে যাচ্ছে’

‘মুক্তিপিন গাঁথো, যুদ্ধকে জানো’ -স্লোগানকে প্রতিপাদ্য করে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত স্থান ও ঘটনাসমূহকে ডিজিটাল আর্কাইভ ‘প্রিয় মুক্তিপিন’ কার্যক্রমে অংশ নিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

রাকিবুল হাসান
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৯ জানুয়ারি ২০১৮, ২০:০৭ আপডেট: ১৯ আগস্ট ২০১৮, ০২:১৭
প্রকাশিত: ২৯ জানুয়ারি ২০১৮, ২০:০৭ আপডেট: ১৯ আগস্ট ২০১৮, ০২:১৭


জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জহির রায়হান মিলনায়তনে ‘প্রিয় মুক্তিপিন’ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী শিক্ষার্থীরা। ছবি: প্রিয়.কম

(প্রিয়.কম) ‘আজ ভালো লাগছে প্রিয় মুক্তিপিনের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের বার্তা পৌঁছে যাচ্ছে’—বললেন কথাসাহিত্যিক আখতার হোসেন। সঙ্গে তিনি যেন হারিয়ে গেলেন তার কৈশোরে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তুলে ধরলেন মুক্তিযুদ্ধের সময়ের নানান স্মৃতি।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত স্থান ও ঘটনাগুলোর ডিজিটাল আর্কাইভ ‘প্রিয় মুক্তিপিন’ কার্যক্রমে অংশ নিয়ে নিজের অনুভূতির কথা জানান এই কথাসাহিত্যিক। প্রিয় মুক্তিপিনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি এ কাজে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

১৯৭১ সালের যুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা ও স্থানসহমূহ সংরক্ষণে শিক্ষার্থীদের তথা তরুণ প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করতে ২৯ জানুয়ারি সোমবার ‘প্রিয় মুক্তিপিন’ টিম গিয়েছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কর্মসূচিতে অংশ নেন আখতার হোসেনও। নিজেদের জানা ঘটনা ও পরিচিত স্থানগুলোকে অনলাইনে মুক্তিপিন গাঁথার মাধ্যমে ডিজিটাল ম্যাপ গড়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানান তারা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জহির রায়হান মিলনায়তনে এ কর্মসূচির শুরুতেই প্রিয় মুক্তিপিন সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। এরপর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেন কথাসাহিত্যিক আখতার হোসেন। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ এতো সহজ ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ আসলেই আমি কৈশোরে চলে যাই’।

‘মুক্তিযুদ্ধের একটি সময়ে আমি ঢাকায় ছিলাম। এসময় ঢাকা ছিল আমাদের জন্য ভাইব্রেন্ট। সেসময় এমন ছিল যে কোনোদিন যদি বোমা না পড়ে, তাহলে মনে হতো কোনো সিমটমই যেন নাই। ঢাকার পাওয়ার হাউজ, ডেমরা ব্রিজ এসব স্থানে প্রতিদিন বোমা ফুটত। আর এসব বোমা ফাটাত মুক্তিবাহিনী। তারা আক্রমণ করত না। সেসময় ঢাকায় আন্তর্জাতিক সংস্থার লোক ছিল। তাদের কাছে যুদ্ধের বার্তা পৌঁছানোর জন্য এই কাজ করতেন মুক্তিবাহিনীরা। তবে পাকিস্তানিরা আন্তর্জাতিক সংস্থার লোকদের মুক্তিবাহিনী সম্পর্কে ভুল ধারণা দিত,’ বলেন তিনি।

 

jahangirnagor-versityবিশ্ববিদ্যালয়ের জহির রায়হান মিলনায়তনে প্রিয় মুক্তিপিন কর্মসূচিতে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেন কথাসাহিত্যিক আখতার হোসেন। ছবি: প্রিয়.কম

আখতার হোসেন আরও বলেন, ‘আজিজ মার্কেটের ওইখানে একটি খাল ছিল। সেই খালের ভেতর ডুবে জুয়েল, সাজুরা বিভিন্ন স্থানে যেয়ে ডিনামাইট সেট করে এসে আবার চলে আসে। একই টাইমে তারা ৭-৮টি স্থানে ডিনামাইট স্থাপন করে। যখন সেগুলো বিস্ফোরিত হলো তখন পুরো ঢাকা শহর কালো অন্ধকার হয়ে গেল। তখন আমি আমার বাবা-মায়ের কাছে চলে আসি।’

কৈশোরের স্মৃতিচারণ করে এই কথাসাহিত্যিক আরও বলেন, ‘আমি নিজেও ব্যক্তিগতভাবে পাকিস্তানিদের হাতে দুই-একবার থাপ্পর খেয়েছি।’

‘সবশেষ আমি গ্রামে চলে যাই। এরপর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সহযোদ্ধা হিসেবে কাজ করি। আজ ভালো লাগছে প্রিয় মুক্তিপিনের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের বার্তা পৌঁছে যাচ্ছে’, যোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, 'আমরা তখন কুমিল্লায় ছিলাম। ২৬ মার্চ আমাদের বাসার পাশে প্রথম গুলির আওয়াজ পাই। এসময় আমরা ছোটাছুটি করতে থাকলে এক সাংবাদিক আমাদের বলে এখানে পাকিস্তানি বাহিনীরা আক্রমণ করেছে, তোমরা বাসার ভেতরে থাকো। আমরা বাসার ভেতরে যাই এবং পরে বাসার জানালা দিয়ে বাইরে আগুন জ্বালার দৃশ্য দেখতে পাই।'

নিজের নানি মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করতেন জানিয়ে আখতার হোসেন বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমার নানি কখনও বাইরে যেতেন না। সারারাত জেগে থাকতেন, আর সকাল বেলা উঠে বাড়ির পেছনে থাকা খেত নিড়ানি দিতেন।’

‘পরে আমরা জেনেছিলাম, তিনি (নানি) সারারাত ধরে মুক্তিযোদ্ধাদের খাওয়ানোর জন্য অপেক্ষা করতেন। আর সকালে জমি নিড়ানি দিতেন যাতে মুক্তিযোদ্ধাদের পায়ের চিহ্ন না থাকে’, বলেন তিনি।

আখতার হোসেন প্রিয় মুক্তিপিনের এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে এ কাজে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ ও পরামর্শদান কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক ড. রাশেদা আক্তার

jahangirnagor-versityঅতিথির হাতে  প্রিয় মুক্তিপিনের ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হচ্ছে। ছবি: প্রিয়.কম

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ শুরু হয়ে দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধের পরে ১৬ ডিসেম্বর বাংলার আকাশে উদিত হয় বিজয়ের লাল সূর্য। সেসময়কার বিভিন্ন ঘটনা খণ্ড খন্ডভাবে বিভিন্ন জায়গায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। কোনো কোনো জায়গা রয়ে গেছে অজানা। আবার কোনো কোনো ঘটনাস্থল রয়েছে অবহেলিত। অনেক মুক্তিযোদ্ধা বা শহীদ পরিবারের খোঁজ হয়তো আসেনি গণমাধ্যমে। রয়েছে সবার অগোচরে। এসব ঘটনাসহ বিভিন্ন স্মৃতি বিজড়িত স্থান ও ঘটনাকে একজায়গায় সংরক্ষণে ‘ডিজিটাল আর্কাইভ’ করার উদ্যোগ নেয় প্রিয়.কম। সে লক্ষ্যে ১ ডিসেম্বর থেকে দেশব্যাপী চলছে প্রিয় মুক্তিপিনের কার্যক্রম। 

প্রিয়’র আয়োজনে সহযোগী হয়েছে সরকারের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি)। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বাংলাদেশের ডিজিটাল ম্যাপে সংরক্ষণে তরুণ সমাজকে উদ্বুদ্ধ করাই এই কর্মসূচির লক্ষ্য।

মুক্তিপিনের উপদেষ্টা কমিটিতে রয়েছেন গওহর রিজভী, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদ, অধ্যাপক জাফর ইকবাল

‘মুক্তিপিন গাঁথো, যুদ্ধকে জানো’ -স্লোগানকে সামনে রেখে চলমান কর্মসূচির অংশ হিসেবে মুক্তিপিন আয়োজক দল সারাদেশের বিভাগীয় শহরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে। সেসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানানোর পাশাপাশি ‍মুক্তিপিন কর্মসূচি সম্পর্কে সচেতন করা হচ্ছে।

 

প্রিয় সংবাদ/রিমন