ক্লাস সিক্সে থাকতেই প্রোগ্রামিং শুরু করেছিলাম: রিজওয়ানুর রহমান

তরুণ প্রোগ্রামার রিজওয়ানুর রহমান ক্লাস সিক্সে থাকতেই প্রোগ্রামিং শুরু করে দুই বছরের মধ্যে মাইক্রোসফটের উইন্ডোজ এক্সপি ভেঙ্গে ৪০ হাজার ড্রাইভার নিয়ে নিজের তৈরি করা প্যাকেজ তৈরি করেন। পরবর্তীতে নিজের স্কুলে সেই প্যাকেজ ইন্সটল করে রীতিমত বিখ্যাত হয়ে যান।

এম. রেজাউল করিম
প্রতিবেদক
২৭ মার্চ ২০১৭, সময় - ১৫:৪৮

ছবি সংগৃহীত

রিজওয়ানুর রহমান রাহাত। ছবি: আর কে জ্যান, প্রিয়.কম

(প্রিয়.কম) একটা সময় ছিল, কম্পিউটার সেটআপ দিলে আলাদা আলাদা সিডিতে ড্রাইভারগুলো সেটআপ করতে হতো। এই ঝামেলাকে দূর করতেই হঠাত মরিয়া হয়ে উঠলেন ক্লাস নাইন পড়ুয়া এক শিক্ষার্থী। এরপর ২০০৭ সালে ইন্টারনেট ঘাটাঘাটি করে মাইক্রোসফটের ৪০ হাজার ড্রাইভার এক করে একটি প্রোডাক্ট প্যাকেজ করেন। উইন্ডোজ ভেঙ্গে নিজের প্যাকেজটাকে ইন্সটল করে একদম অবাক, কারণ সবগুলোই কাজ করছে। এরপর তা অনলাইনে অবমুক্ত করার পর বিশ্বের ৩৫টি দেশে শুরু হয় এর ব্যবহার। এভাবেই তথ্যপ্রযুক্তির সাথে নিজের পথচলা শুরু করেছিলেন তরুণ প্রোগ্রামার রিজওয়ানুর রহমান রাহাত।

সম্প্রতি প্রিয়.কমের কার্যালয়ে কথা হয় ২য় বারের মতো মাইক্রোসফট সার্টিফাইড ট্রেইনার অ্যাওয়ার্ড পাওয়া এই তরুণ প্রোগ্রামারের সাথে। সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন তার উঠে আসার গল্প, বর্তমান ব্যস্ততা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে।

প্রিয়.কম: বর্তমান ব্যস্ততা কী নিয়ে?

রিজওয়ানুর রহমান: আমি এখন মেন্টরনেশন বাংলাদেশ নামের আন্তর্জাতিক একটি অলাভজনক সংগঠনের বাংলাদেশের প্রধান হিসেবে কাজ করছি। এই প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে এখনও আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করতে পারেনি কিছু লিগ্যাল ফর্মালিটিস এর কারণে। অর্ধেক কাজ ইতিমধ্যেই শেষ করেছি, বাকীটা সম্পন্ন হলেই আমরা বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করতে পারবো। সেগুল নিয়েই একটু দৌড়াদৌড়ি করছি।  এছাড়াও মাইক্রোসফট ইয়ুথস্পার্ক এডভোকেট হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির কর্পোরেট সিটিজেনশীপ অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্স টিম (গ্লোবাল হেডকোয়ার্টার) এর সাথে কাজ করছি। পাশাপাশি মাইক্রোসফট স্টুডেন্ট ফোরামের এআইইউবি লিড হিসেবেও আছি। আর সবকিছুর সাথে নিজের একটা স্টার্টআপ আছে সুপারনোভা নামের। সুপারনোভাকে দাড় করাতেও সময় দিচ্ছি। আর বিভিন্ন বেসরকারী আইটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে অফিস৩৬৫, শেয়ার পয়েন্ট এবং মাইক্রোফস্ট এজিউর নিয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি।

প্রিয়.কম: আপনি তো ২য় বারের মতো মাইক্রোসফট সার্টিফাইড ট্রেইনার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। এই জন্য কী করতে হয়েছে?

রিজওয়ানুর রহমান: আমি ২০১৬ সালের ১৩ মে অফিস ৩৬৫'র ওপর অভিজ্ঞ হিসেবে আমি প্রথম মাইক্রোসফট সার্টিফাইড ট্রেইনার অ্যাওয়ার্ড পাই। তখন অবশ্য আমি মাইক্রোসফটে ইন্টার্ণ হিসেবেও কাজ করেছি। এরপর ট্রেইনার হিসেবে কাজ করে এর স্বীকৃতি স্বরূপ চলতি বছরের ১৫ মার্চ আমি দ্বিতীয়বারের মতো এই অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি। এর জন্য গত একবছরে আমি ২০০টিরও বেশি মানুষকে আমি অফিস ৩৬৫টি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিয়েছি এবং একইসাথে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে এই বিষয়ে ভালো ফলাফল করতে সাহায্য করেছি।   

প্রিয়.কম: কেউ যদি এই অ্যাওয়ার্ড পেতে চায় তাকে কী কী করতে হবে?

রিজওয়ানুর রহমান: এটা আসলে মোটামুটি পর্যায়ের একটা দীর্ঘ পর্যায়ের ব্যপার। কারণ, এই জন্য প্রথমে মাইক্রোসফটের কিছু বিষয়ের উপর সার্টিফিকেশন কোর্স আছে সেখান থেকে নির্দিষ্ট একটি বিষয়ের উপর একটা কোর্স সম্পন্ন করতে হয়। যেমন আমি অফিস ৩৬৫তে পাঁচটি কোর্স করেছি। কোর্স সম্পন্ন করে পরীক্ষাও দিয়ে পাস করলেই সার্টিফাইড ট্রেইনারের এই অ্যাওয়ার্ড পাওয়া যাবে। প্রথম অ্যাওয়ার্ড দেওয়ার পর কাজের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবছর এটার আপগ্রেশন হতে থাকে। কারণ, তখন মাইক্রোসফট দেখে যে একজন সার্টিফাইড ট্রেইনার এক বছরে এই বিষয়ে কতগুলো ট্রেনিং করানো হয়েছে। সেখান থেকে কেমন জনশক্তি তৈরি হয়েছে। কতজন ভালো করছে, তাদের ফিডব্যাক কেমন। কতজন সফল হলেন, কতজন নিয়মিত কাজ করছেন এগুলোর ভিত্তি করে। এককথায় সার্টিফাইড ট্রেইনার হওয়ার পর তার কাজের রিভিউ দেখে প্রতিবছর এই অ্যাওয়ার্ড দেয়া হবে। তবে পরবর্তী বছর আর পরীক্ষা দিতে হয় না।

প্রিয়.কম: এই অ্যাওয়ার্ড স্বরূপ এখানে কী দেয়া হয়?

রিজওয়ানুর রহমান: অ্যাওয়ার্ড হিসেবে মাইক্রো সফটের একটা সফটওয়্যার একাউন্ট দেয়া হয়। যেখানে মাইক্রোসফটের ১১ টেরাবাইটের একটা সফটওয়্যার একাউন্ট থাকে এবং প্রতিটা সফটওয়্যারের ১০টা করে কপি থাকে। এই সফটওয়্যার গুলোর দাম হিসেব করলে প্রায় ছয় হাজার ডলারের মতো হয়, যা আমি বিনামুল্যেই পাচ্ছি। এছাড়াও আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইটগুলোতে যেই প্রিমিয়াম কোর্সগুলো থাকে সেগুলো বিনামূল্যে করা যায়। একইসাথে নিজের তৈরি করা টিউটোরিয়ালগুলো ওইসব সাইটে আপলোড করা যায়। এতে করে নিজের ক্যারিয়ার যেমন ডেভেলপ হচ্ছে। তেমনি আমার টিউটোরিয়াল দেখে মানুষের ক্যারিয়ারেরও উন্নতি হচ্ছে, তারা নিত্যনতুন কিছু শিখতে পারছে। এগুলোকেও আমি অ্যাওয়ার্ডের অংশ হিসেবেই দেখি।

প্রিয়.কম: টিউটোরিয়ালগুলো কী বাংলায় করেন?

রিজওয়ানুর রহমান: না, ওখানে আমি ইংরেজী ভাষাতেই টিউটোরিয়ালগুলো আপলোড করে থাকি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলায় প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। এছাড়াও মাইক্রোসফটের সাথে দুটি প্রজেক্টে কাজ করেছি। এরমধ্যে উইন্ডোজ উইমেন নামে মাইক্রোসফট ও এটুআই এর সাথে একটি প্রজেক্টে প্রায় ১৯টা জেলার নারীদেরকে মাইক্রোসফট উইন্ডোজ নিয়ে দুইদিন ব্যপী প্রশিক্ষণ দিয়ে এসেছি এবং ইয়াং বাংলার সাথেও এমন আরেকটা প্রজেক্টে সম্পৃক্ত ছিলাম। এই প্রশিক্ষণগুলো সম্পূর্ণ বাংলায় ছিলো।

প্রিয়.কম: আপনি মাইক্রোসফট ইয়ুথস্পার্ক অ্যাডভোকেট হিসেবে কী কাজ করেন?

রিজওয়ানুর রহমান: ইয়ুথস্পার্ক অ্যাডভোকেটদের সিলেক্ট করা হয়,মাইক্রোসফটের যেই রিসোর্সেসসমূহ, যেমন উইন্ডোজ, অফিস, এমএস ব্লগ অথবা সোশ্যাল যেই সমস্ত পরিবর্তনগুলোকে নিয়ে, মাইক্রোসফট ব্যবহার করে মানুষের পরিবর্তনের গল্পগুলোকে এক করে অন্যান্য তরুণদের সামাজিক সংগঠনগুলোকে আমরা এসব জানাই। অনলাইন এবং অফলাইনে মাইক্রোসফটের কার্যক্রম পরিচালনা করাই ইয়ুথস্পার্ক অ্যাডভোকেটের কাজ। আর এই কাজের কারণে ২০১৫ সালে ২০ এপ্রিল আমি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলাম মাইক্রোসফটের ১৩ দিন ব্যপী একটা প্রোগ্রামে। যা আমার কাছে অনেক বড় প্রাপ্তিগুলোর একটি। আগে বাংলাদেশে তিনজন থাকলেও নানা কারণে তারা এখান থেকে সরে গেছেন। এখনও শুধু আমি একাই কাজ করে যাচ্ছি।

রিজওয়ানুর রহমান রাহাত। ছবি: আর কে জ্যান, প্রিয়.কম

প্রিয়.কম: মেন্টরনেশনস এর কাজ কী?

রিজওয়ানুর রহমান: মেন্টরনেশনস আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে মিলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেই সমস্ত দেশের প্রত্যান্ত অঞ্চলে এখনও প্রযুক্তি পৌছায়নি। সেসব এলাকার মানুষদেরকে প্রযুক্তির আওতায় নিয়ে আসার লক্ষ্যেই আমরা কাজ করি। আমরা বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন, ইউএন, ইউনেস্কো'র মতো বড় বড় সংগঠন গুলোর সাথে মিলে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ায় গত নভেম্বরে সাড়ে ১০ হাজার শিশু ও নারীদের হাতে ল্যাপটপ দেওয়ার মাধ্যমে প্রযুক্তির আওতায় নিয়ে এসেছি। এইজন্য আমাদের প্রোডাক্ট পার্টনার এইচপি এই ল্যাপটপগুলো দিয়েছে। এছাড়াও বাংলাদেশে পাবনাসহ কয়েকটি জেলায় ২০০টির মতো ল্যাপটপ পৌছে দিয়েছি।  যাতে তারাও প্রযুক্তির আওতায় চলে আসতে পারে।

প্রিয়.কম: মেন্টরনেশনস কোন কোন দেশে আছে?

রিজওয়ানুর রহমান: মেন্টরনেশনস বাংলাদেশ ছাড়াও আরও ছয়টি দেশে আছে। দেশগুলো হচ্ছে সিরিয়া, তিউনেশিয়া, পাকিস্তান, জর্ডান, ইন্ডিয়া।। এই দেশগুলোতেই তারা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

প্রিয়.কম: প্রোগ্রামিং শুরু করেছেন কবে থেকে?

রিজওয়ানুর রহমান: ছোটবেলা থেকেই কম্পিউটার প্রোগ্রামারই হতে চেয়েছিলাম। সেই ইচ্ছে থেকেই ২০০৪ সালে যখন ক্লাস সিক্সে পড়ি, তখনই প্রথম প্রোগ্রামিং শুরু করি। আমার প্রথম প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ ছিলো সি++। ২০০৭ সালে আমার অপারেটিং সিস্টেমের একটা ডেভেলপ অ্যাডিশন উন্মোচন করি। দুই বছর চেষ্টা করে উইন্ডোজ এক্সপি ভেঙ্গে ৪০ হাজার ড্রাইভার সহ একটি প্যাকেজ তৈরি করেছিলাম। এর দুই বছর ২০০৯ সালে ৮০ হাজার ড্রাইভার নিয়ে আরো একটা প্যাকেজ তৈরি করেছিলাম। সেটাও অনেক ভালো মার্কেট পেয়েছিলো।

প্রিয়.কম: ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

রিজওয়ানুর রহমান: ইচ্ছে আছে প্রথমেই নিজের স্টার্ট-আপ টাকে দাঁড় করাবো। আর মাইক্রোসফটের সাথেই কাজ করবো। আমি যেহেতু মাইক্রোসফট থেকে ইন্টার্ণ সম্পন্ন করেছি, যদি সম্ভব হয় তাহলে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয়ে ভালো একটা পজিশনে যেতে চাই। 

প্রিয়.কম: প্রিয়তে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

রিজওয়ানুর রহমান: আপনাকে এবং প্রিয়.কমকেও ধন্যবাদ। 

সম্পাদনা: শামীমা সীমা

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


স্পন্সরড কনটেন্ট
জনপ্রিয়
আরো পড়ুন