‘কাঁচি নিয়ে আয়, এই শালার দাড়ি কেটে দেব’

‘মুজিব সরোয়ার মাসুম কয়েকবার চেয়ার থেকে উঠে আমার উপর অমানবিক নির্যাতন চালায় এবং বলে “তুই কেন হাইকোর্টে গিয়েছিলি”?’

জনি রায়হান
নিজস্ব প্রতিবেদক
১০ মার্চ ২০১৮, সময় - ২১:৪৭

ক্র্যাবে হযরত শাহ আলী বাগদাদী (রহ.) কামিল (এম.এ) মাদরাসার শিক্ষকদের সংবাদ সম্মেলন। ছবি: জনি রায়হান, প্রিয়.কম

(প্রিয়.কম) ‘আমি রুমের মধ্যে প্রবেশ করা মাত্রই মুজিব সরোয়ার মাসুম আমার দুই গালে চড়-থাপ্পড় মারে, পেটে ও পিঠে কিল-ঘুষি-লাথি মারে। শত শত ছাত্র ও গুন্ডা বাহিনীর সামনে মহানবির সুন্নাত দাাড়ি ধরে টানাহেঁচড়া করে এবং আমার দাড়ি টেনে ছিঁড়ে ফেলে। তখন দাড়ি নিয়ে কটাক্ষ করে সরোয়ার মাসুম বলে, “কাঁচি নিয়ে আয়, এই শালার দাড়ি কেটে দেব।” মুজিব সরোয়ার মাসুম কয়েকবার চেয়ার থেকে উঠে আমার উপর অমানবিক নির্যাতন চালায় এবং বলে “তুই কেন হাইকোর্টে গিয়েছিলি”?’

ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য আসলামুল হকের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মুজিব সরোয়ার মাসুমের হাতে হযরত শাহ আলী বাগদাদী (রহ.) কামিল (এমএ) মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এবং সিনিয়র শিক্ষকদের উপর সন্ত্রাসী হামলা ও ঘরবাড়ি ভাঙচুর, প্রাণনাশের হুমকি ও জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেওয়ার প্রতিবাদে আজ দুপুরে ক্রাইম রিপোর্টার অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব) এক সংবাদ সম্মেলনে এভাবেই নিজের উপর নির্যাতনের বর্ণনা দেন ওই মাদরাসার সহকারী অধ্যাপক মো. আব্দুল করিম।  

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন মাদরাসার ভাইস প্রিন্সিপ্যাল আফজাল হোসেন।  

আফজাল হোসেন বলেন, ‘গত ৫ মার্চ আনুমানিক বেলা ১২টার দিকে ঢাকার মিরপুর এলাকার হযরত শাহ আলী বাগদাদী (রহ.) কামিল (এমএ) মাদরাসায় ঢাকা-১৪ আসনের এমপি আসলামুল হকের ঘনিষ্ঠ সহযোগী স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মুজিব সরোয়ার মাসুম এবং সহকারী মৌলভী (কনিষ্ঠ শিক্ষক) কে এম সাইফুল্লাহ কর্তৃক বহিরাগত ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের হাতে মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. আব্দুছ ছামাদ, সহকারী অধ্যাপক মো. আবদুল করিমসহ অন্য শিক্ষকদেরকে মারধর ও শারীরিক নির্যাতন করেছে। এ সময় তাদের প্রাণনাশের হুমকি  দিয়ে জোর করে পদত্যাগপত্রে ও সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘মাদরাসার এই সহকারী মৌলভি কে এম সাইফুল্লাহ তার ভায়রাভাই কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা আবু কাওসারের প্রত্যক্ষ ও  পরোক্ষ সহযোগিতায় দীর্ঘদিন থেকে অবৈধভাবে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের পদ দখল করে আসছিল। কিন্তু গত বছরের ৩০ মে বিগত কমিটির মেয়াদ শেষ  হয়। তখন বিষয়টি মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে জানানো হলে তিনি কে এম সাইফুল্লাহকে বাদ দিয়ে সরকারি বিধি মোতাবেক  মাদরাসার জ্যেষ্ঠতম সহকারী অধ্যাপক (ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ) মো. আব্দুছ ছামাদ  ও জেলা প্রশাসক, ঢাকার যৌথ স্বাক্ষরে বেতন উত্তোলনের দায়িত্ব প্রদান করেন। ফলে তাদের স্বাক্ষরে শিক্ষক/কর্মচারীগণ ডিসেম্বর-২০১৭ ও জানুয়ারি-২০১৮ মাসের বেতন-ভাতা উত্তোলন করেন।’

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আফজাল হোসেন বলেন, ‘এরপর গত ৫ মার্চ (সোমবার) দুপুর ১২টার দিকে কে এম সাইফুল্লাহ ও মুজিব সরোয়ার মাসুম  ৬০/৭০ জন বহিরাগত ভাড়াটে সন্ত্রাসী নিয়ে মাদরাসায় অনুপ্রবেশ করেন। তারা প্রথমে অধ্যক্ষের কক্ষে প্রবেশ করেই অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে। তখন কে এম সাইফুল্লাহ মাদরাসার মৌলভি এমারত হোসেন ও দপ্তরি আলমগীর হোসেনকে নির্দেশ দেয় যে, ‘‘আমার বিরোধীদের নামের তালিকা তৈরি করো এবং তাদেরকে ধরে ধরে আমার কক্ষে নিয়ে আসো।’’ এমারত হোসেনের তালিকা অনুসারে সন্ত্রাসীরা সর্বপ্রথম ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. আব্দুছ ছামাদকে তার ক্লাস থেকে ডেকে আনে। রুমে প্রবেশ করামাত্রই মুজিব সরোয়ার মাসুম তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। সরোয়ার মাসুম ও তার সহযোগীরা তার দুই গালে চড়-থাপ্পড়, পেটে-পিঠে কিল-ঘুষি ও লাথি মারে। তখন রুমের ভিতরে ও রুমের বাহিরে ভাড়াটে সন্ত্রাসী বাহিনী পাহারায় থাকে। ছাত্রের সামনে শিক্ষককে এভাবে চড়-থাপ্পড় মারা, লাথি মারা পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম দুর্ঘটনা-যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। মারধরের পর তাকে দিয়ে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্র লেখায় এবং তাকে ব্ল্যাংক কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে মাদরাসা থেকে বের করে দেয়। তিনি চোখ মুছতে মুছতে বের হয়ে আসেন।’

প্রবীণ শিক্ষক মো: আব্দুছ ছামাদ

আহত প্রবীণ শিক্ষক মো. আব্দুছ ছামাদ। ছবি: সংগৃহীত

দুঃখ প্রকাশ করে আফজাল হোসেন আরও বলেন, ‘প্রবীণ শিক্ষক মো. আব্দুছ ছামাদ মাত্র এক বছর পরে রিটায়ার্ড করবেন। তিনি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। জীবনের শেষ বেলায় শিক্ষকতার সায়াহ্নে এসে ছাত্রছাত্রীর সামনে মানসম্মান হারিয়ে তিনি নির্বাক। তিনি কল্পনাও করতে পারেননি এমপি আসলামের সহযোগী সরোয়ার মাসুম বাহিনী এমন জঘন্য কাজ করতে পারে। তিনি দু’চোখের পানি ফেলে উপরওয়ালার কাছে বিচার চান। কোনো এক ছাত্র শিক্ষকের প্রতি জঘন্য আচরণ করার দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করলে সন্ত্রাসীরা সঙ্গে সঙ্গে ওই মোবাইলের সিম কার্ডসহ মোবাইলটি ভেঙে ফেলেন।’

সংবাদ স্মমেলনে উপস্থিত হামলার শিকার অপর এক শিক্ষক সহকারী অধ্যাপক মো. আবদুল করিম বলেন, ‘দপ্তরি আলমগীরসহ অন্যরা আমাকে ক্লাস রুম থেকে ডেকে নিয়ে আসে। রুমের মধ্যে প্রবেশ করামাত্রই মুজিব সরোয়ার মাসুম আমার দুই গালে চড়-থাপ্পড় মারে, পেটে-পিঠে কিল-ঘুষি ও লাথি মারে। ন্যক্কারজনকভাবে শত শত ছাত্র ও গুন্ডা বাহিনীর সামনে মহানবির সুন্নাত দাড়ি ধরে টানাহেঁচড়া করে এবং দাড়ি টেনে ছিঁড়ে ফেলে। আর দাড়ি নিয়ে কটাক্ষ করে সরোয়ার মাসুম বলে, “কাঁচি নিয়ে আয়, এই শালার দাড়ি কেটে দেব।” মুজিব সরোয়ার মাসুম কয়েকবার চেয়ার থেকে উঠে আমার উপর অমানবিক নির্যাতন চালায় এবং বলে “তুই কেন হাইকোর্টে গিয়েছিলি? কেন আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলি?” এ দৃশ্য দেখে শিক্ষক কে এম সাইফুল্লাহ ও তার স্ত্রী পরিতৃপ্তির হাসি হাসতে থাকে।’

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে ভাইস প্রিন্সিপ্যাল আফজাল হোসেন বলেন, ‘মুজিব সরোয়ার মাসুম মারধর করেই ক্ষান্ত হয়নি। কেএম সাইফুল্লাহর পরামর্শে উভয় শিক্ষকের নিকট থেকে পদত্যাগপত্রে জোরপূর্বক স্বাক্ষর করায় এবং সাদা কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে ছেড়ে দেয়। তিনি বের হওয়ার সময় দরজায় দাঁড়ানো একজন তার পাঞ্জাবি ধরে টান মারে এবং গায়ে থুথু ছিটিয়ে দেয়। এরপর সন্ত্রাসী বাহিনীর লোকেরা এমারতের দেয়া তালিকা অনুসারে অন্যান্য শিক্ষক কর্মচারীর খোঁজে বের হয়ে পড়ে। তারা বলতে থাকে “আফজাল কই? মুজিব কই? মতি কই? হালিম, মোখলেস, আশরাফ কই?” ইতোমধ্যে দুজন শিক্ষকের উপর এমন অমানবিক ও শারীরিক অত্যাচার দেখে প্রাণভয়ে অন্যান্য শিক্ষক-কর্মচারীগণ দৌড়ে পালিয়ে যান।’

তার বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, ‘এরপর এ হায়েনা বাহিনীর ১৫/২০ জন সন্ত্রাসী আমার বাসায় গিয়ে ভাঙচুর চালায়, লুটপাট করে, নারী-শিশুদের উপর নির্যাতন চালায়। তারা বাসা থেকে একটি দামি মোবাইল ও টাকা লুটপাট করে নিয়ে আসে। আমার ঘরে অসুস্থ স্ত্রী একাই ছিলেন। আমার স্ত্রী বাধা দিলে তারা কোনো কথায় কর্ণপাত না করে দরজা ভেঙে পানির ড্রাম, চৌকির তল, বাথরুমসহ বিভিন্ন স্থানে খুঁজতে থাকে। নারী-শিশুদের প্রতি আসলাম বাহিনীর এ আচরণ পাক হানাদার বাহিনীকেও হার মানায়। এমপি আসলামের লোকজনের ভয়ে আমি থানায় জিডি ও মামলা করতে যেতে পারেননি। এরপর তারা পদার্থবিজ্ঞানের প্রভাষক মো. মোখলেসুর রহমান ও উচ্চতর গণিতের প্রভাষক আব্দুল হালীম সাহেবের বাসায় গিয়ে অনুরূপ তাণ্ডবলীলা চালায়। তাদের ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা অত্যন্ত আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। এ তাণ্ডব দেখে ভয়ে তারা রাতে ঘুমাতে পারছে না। প্রাণভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।’

সন্ত্রাসীরা আফজাল হোসেনের বাড়ি ভাঙচুর করে। ছবি: সংগৃহীত

আফজাল হোসেন অভিযোগ করে বলেন, ‘মুজিব সরোয়ার মাসুম মাদরাসা ত্যাগ করার সময় শাসিয়ে বলে যায়, “মাদরাসায় যতবার আসব শুধু মাইর আর মাইর। কারো সাথে কোনো কথা বলব না।” তার এ ধমক শুনে শিক্ষক/ কর্মচারীগণ ক্লাস নিতে পারছেন না। তারা নিরাপদ স্থানে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। আমরা বিষয়টির আইনি সহায়তা চাই ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাই এর সমাধান দিতে পারেন। এ ঘটনার ব্যাপারে নির্যাতিত শিক্ষকদের পক্ষ থেকে দারুস সালাম থানায় দুটি ডাইয়েরি করা হয়েছে। জিডি নং ২৭৮ ও ২৮০।’

এসব ঘটনার বিষয়ে ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য আসলামুল হককে জানানো হয়েছিল কি না? জানতে চাইলে ভাইস প্রিন্সিপ্যাল আফজাল হোসেন বলেন, ‘এমপি সাহেবকে অনেকবার জানানো হয়েছে। কিন্তু তিনি তেমন গুরুত্ব দেননি।’  

সংবাদ সম্মেলনে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য আসলামুল হকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এই সব অভিযোগের কোনো গুরুত্ব নেই।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে মুজিব সরোয়ার মাসুমের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।    

সংবাদ সম্মেলনে আনা অভিযোগের বিষয়ে জানতে ওই মাদরাসার সহকারী শিক্ষক কে এম সাইফুল্লাহর সঙ্গে মুঠোফোন যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তিনিও ফোন ধরেননি।

প্রিয় সংবাদ/আজাদ চৌধুরী

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


স্পন্সরড কনটেন্ট
জনপ্রিয়
আরো পড়ুন