(প্রিয়.কম) বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় রোহিঙ্গা মুসলিম অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যের কয়েকটি শহরে নতুন করে সেনা মোতায়েন ও কারফিউ জারি করা হয়েছে। রাখাইনে নতুন করে সেনা মোতায়েনের খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। গত বছরের অক্টোবরে রাখাইনে সেনা অভিযানের পর নতুন করে সেনা মোতায়েন ও অভিযানের খবরে বাংলাদেশেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, সেনা অভিযানে বাধ্য হয়ে রোহিঙ্গা মুসলিমরা শরণার্থী হিসেবে আবারও বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে। তবে এরই মধ্যে দুই শতাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের খবর পাওয়া গেছে। এদিকে শরণার্থীর ভারে ন্যূব্জ দেশটিতে আবার নতুন করে আবার শরণার্থীর ঢল নামার আশঙ্কা করছে বিশ্লেষকেরা।  

নিপীড়িত জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গা

ঐতিহাসিক ও ভূগোলবিদদের মতে, খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দের কাছাকাছি সময়ে রাখাইন প্রদেশে পূর্ব ভারত হতে অষ্ট্রিক জাতির ‘কুরুখ’ নামের একটি নৃগোষ্ঠী প্রথম বসতি স্থাপন করেছিল। পরবর্তীতে বাঙালি হিন্দু (পরবর্তী সময়ে ধর্মান্তির মুসলিম), পার্সিয়ান, তুর্কি, মোগল, আরব ও পাঠানরা রাখাইন রাজ্য সংলগ্ন বঙ্গোপসাগর উপকূল বরাবর বসতি স্থাপন করে। ওই অঞ্চলে বসবাসরত সকল নৃগোষ্ঠীর সংমিশ্রণে এয়োদশ-চর্তুদশ শতাব্দীতে পূর্ণাঙ্গ জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে শংকরজাত জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গা। অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে রোহিঙ্গা জাতিই রাখাইনের (মধ্যযুগীয় নাম আরাকান) একমাত্র ভূমিপুত্র।

নিজস্ব ভাষা সংস্কৃতি ও রাজ্য নিয়ে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর চূড়ান্ত সমৃদ্ধি অর্জন করেছিল মধ্যযুগে। ১৪৩০-১৭৮৪ সাল পর্যন্ত ২২ হাজার বর্গমাইল আয়তনের স্বাধীন রোহাঙ্গা (মধ্যযুগে এর নাম ছিল আরাকান) রাজ্যও ছিল। কিন্তু ১৭৮৪ সালের শেষ দিকে মিয়ানমারের রাজা বোদাওফায়া রাজ্যটি দখল করে দিলে চরম বৌদ্ধ আধিপত্যবাদের সূচনাই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির জীবনে নির্মমতা ডেকে আনে, হত্যা করা হয় হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে। জীবন বাঁচাতে হাজারো রোহিঙ্গা পালিয়ে চট্টগ্রামে চলে আসে। প্রথমবারের মতো শরণার্থী হয় স্বাধীন রোহিঙ্গা জাতি। 

কক্সবাজারে একটি রোহিঙ্গা শরনার্থী ক্যাম্প। ফাইল ছবি

কক্সবাজারে একটি রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প। ফাইল ছবি

১৮২৬ এবং ১৮৮৬ সালে দুটি যুদ্ধের মাধ্যমে সম্পূর্ণ মিয়ানমার দখল করে নেয় ইংরেজরা। ওই সময়ে তারা মিয়ানমারে ১৩৯টি জাতিগোষ্ঠীর তালিকা তৈরি করে যার মধ্যে রোহিঙ্গা জাতির নাম ছিল না। এটি ব্রিটিশদের ইচ্ছাকৃত নাকি ‍ভুল এ এক বড় প্রশ্ন। নির্যাতিত রোহিঙ্গারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের সহায়তা করে। এক পর্যায়ে জাপান কর্তৃক মিয়ানমার দখল করলে জাপানি বাহিনী ও বার্মিজরা পরাজিত রোহিঙ্গাদের ওপর নির্বিচার গণহত্যায় ২০,০০০ রোহিঙ্গা নিহত হয়। ওই সময়ে অন্তত ৪০,০০০ রোহিঙ্গা স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে চলে আসে।  

১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি মিয়ানমার স্বাধীনতা অর্জন করলে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অবস্থার সাময়িক পরিবর্তন হয়। এ সময়ে তারা পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্বসহ সরকারের উচ্চপদেও কয়েকজন দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থান করে ক্ষমতা দখল করলে রোহিঙ্গাদের ভাগ্যধারা আবার বদলে যায়। ১৯৮২ সালে সামরিক জান্তা রোহিঙ্গাদের বিদেশি জনগোষ্ঠী বলে চিহ্নিত করে সমস্ত নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে। ‘রোহিঙ্গারা হলো বাংলাদেশি, যারা বর্তমানে অবৈধভাবে মিয়ানমারে বসবাস করছে’ মিয়ানমার সরকারের এমন ঘোষণার মাধ্যমে ওই ভূমিতে হাজার বছর ধরে বাস করা জাতিগোষ্ঠিকে অস্বীকার করা হয়। মহাদুর্যোগ নেমে আসে রোহিঙ্গাদের জীবনে। 

শান্তির প্রচারক বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও দেশটিতে রোহিঙ্গা বসবাসের বিরোধিতা করেন। ছবি: রোমিও গাকার্ড, এএফপি

শান্তির প্রচারক বৌদ্ধরাও দেশটিতে রোহিঙ্গা বসবাসের বিরোধিতা করেন। ছবি: রোমিও গাকার্ড, এএফপি

পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর 'নাগামান' (ড্রাগন রাজা) অভিযানে অসংখ্য রোহিঙ্গা নিহত এবং প্রায় ২,০০,০০০ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে। ১৯৯১-৯২ সালে একটি নতুন এক সেনা অভিযানে প্রায় আড়াই লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে আসে। এমনই ভিন্ন অভিযানে ২০১৫ সালে অন্তত ২৫ হাজার এবং ২০১৬ সালে প্রায় ৮০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এ ছাড়া ১৯৯৭ সালে দেশটির মান্ডালে, ২০০১ টাউনগোতে, ২০১২ সালে রাখাইনে, ২০১৩ সালে মধ্য ও পূর্ব মিয়ানমারের বিভিন্ন শহরে, ২০১৪ মান্ডালে, ২০১৬ সালে বাগো অঞ্চলের রোহিঙ্গা বিরোধী অভিযান ও দাঙ্গায় আরও অন্তত ৫ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। যদিও বাংলাদেশ সরকারের হিসেবে এ সংখ্যা (নিবন্ধিত) ৫ লাখের কিছু বেশি। প্রসঙ্গত, প্রতিটি সেনা অভিযান ও দাঙ্গায়ই দেশটির সেনাবাহিনী ও বার্মিজদের বিরুদ্ধে অসংখ্য হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদির মাধ্যমে জাতিগত নিধন ও মানবাধিকার লংঘনের মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠে।

আবার সেনা মোতায়েনে নির্যাতনের আশঙ্কায় জাতিসংঘ

২০১৬ সালের ২৪ আগস্ট ২০১৬ দেশটির নোবেলজয়ী ও গণতন্ত্রী আন্দোলনের নেত্রী অং সান সুচি জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানকে প্রধান করে ‘রাখাইন উপদেষ্টা কমিশন’ নামে ৯ সদস্য বিশিষ্ট কমিশন গঠন করার পর বিশ্লেষকেরা ভেবেছিলেন, আপাতত রোহিঙ্গা ইস্যুতে শান্তি বিরাজ করবে। কিন্তু অক্টোবর মাসেই হঠাৎ অজ্ঞাতদের আক্রমণে দেশটির ৯ পুলিশ সদস্য নিহত অভিযোগ তুলে রাখাইনে সেনা অভিযান শুরু করে দেশটির সেনাবাহিনী। ওই অভিযানে সহস্রাধিক রোহিঙ্গাকে হত্যা, অজ্ঞাত সংখ্যক নিখোঁজ, নির্বিচারে নারী-শিশু ধর্ষণ এবং অগ্নি সংযোগের অভিযোগ ওঠে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। জাতিসংঘও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ, ও অগ্নিসংযোগের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আনলেও তা বানোয়াট ও গালগল্প বলে বর্ণনা করে অভিযোগ প্রত্যাখান করে দেশটির কর্তৃপক্ষ। পরবর্তী আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রাখাইন থেকে সেনা প্রত্যাহার করে মিয়ানমার।

গত বছরের অক্টোবরের সেনা অভিযানে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা শিবিরে আগুন দিয়েছে বার্মিজ সৈন্যরা। ছবি: সংগৃহীত

গত বছরের অক্টোবরের সেনা অভিযানে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা শিবিরে আগুন দিয়েছে বার্মিজ সৈন্যরা। ছবি: সংগৃহীত

কিন্তু বছর না যেতেই বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে অবস্থিত রাখাইন রাজ্যের বুথিডং এবং মংডুসহ কয়েকটি শহরে সেনা মোতায়েন ও কারফিউ জারির খবর পাওয়া গেছে। দেশটির কর্তৃপক্ষের এ উদ্যোগে গত বছরের মতো দমন-পীড়নের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা করছে স্থানীয় রোহিঙ্গা মুসলিমরা। এবার নতুন করে সেনা মোতায়েনর খবরে জাতিসংঘের মানবাধিকার দফতর থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সামরিক সমাবেশের পর এখন এটা বলা মুশকিল যে নতুন করে কোনো সংঘাতের ঘটনা ঘটবে না। এজন্য অবশ্য জাতিসংঘ ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে।

১১ আগস্ট শনিবার দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের উদ্বৃতি দিয়ে সংবাদমাধ্যম রয়টার্সআল জাজিরা বলেছে, রাখাইন রাজ্যে নতুন করে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ চালাবে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। গত বছর অক্টোবরে চালানো সেনা অভিযানের সময় ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ শব্দটি ব্যবহার করেছিল মিয়ানমারের সেনাবাহিনী।

খবরে আরও বলা হয়, রাখাইন প্রদেশে ভারী অস্ত্রশস্ত্রসহ ব্যাপক সেনা মোতায়েন করার পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের ঘরে ঘরে অভিযান শুরু হয়েছে। এ অভিযানে ইতোমধ্যেই শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। রোহিঙ্গারা বলছে, দেশ থেকে তাদেরকে বিতাড়িত করার জন্য পরিকল্পিত অভিযান চালাচ্ছে সরকার। 

এদিকে নিরাপত্তার অজুহাতে রাজ্যের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে কারফিউ জারি করা হয়েছে। কারফিউ জারি করা রাথিদাউং এলাকার বাসিন্দা হাসুমইয়ার জানান, রাথিদাউংয়ের মুসলিমপ্রধান কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দারা বাড়ি থেকে বের হতেও ভয় পাচ্ছে।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের একটি রোহিঙ্গা ক্যাম্প। ছবিটি ৭ সেপ্টেম্বর তোলা। ছবি: রোমিও গাকার্ড, এএফপি

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের একটি রোহিঙ্গা ক্যাম্প। ছবিটি ৭ সেপ্টেম্বর তোলা। ছবি: রোমিও গাকার্ড, এএফপি

রাজ্যটিতে নতুন করে সেনা মোতায়েন করার বিষয়ে রাখাইনে নিয়োজিত দুই সামরিক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, গত সপ্তাহে মংডু শহরের কাছে একটি পর্বতে ৭ বৌদ্ধের মৃতদেহ পাওয়ার পর নিরাপত্তা কঠোর করতে সহায়ক হিসেবে সেনাবাহিনী রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে সেনা পাঠিয়েছে। অপরদিকে অন্য এক সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সেনাবাহিনী বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে বুথিডং, রাথিদাউং এবং মংডুসহ কয়েকটি শহরে কয়েক ব্যাটালিয়নে প্রায় ৫০০ সেনা মোতায়েন করেছে।

সেনা মোতায়েনের সাফাই দিয়ে রাজ্যটির পুলিশ প্রধান কর্নেল সেইন লুইন বলেন, ‘আমাদেরকে নিরাপত্তা অভিযান বাড়াতে হবে। কারণ, নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বিদ্রোহীদের হাতে কয়েকজন মুসলিম এবং বৌদ্ধ নিহত হয়েছে।’

সম্প্রতি মুখোশধারী আততায়ীদের হাতে অনেক গ্রামবাসীর অপহরণ ও নিহত হয়েছেন মন্তব্য করে দেশটির সীমান্তরক্ষী জানান, ‘মুসলিম বিদ্রোহীরা বনের মধ্যে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। তারা সরকারের হয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের মেরে ফেলেছে। তাই দুর্গম এলাকায় অন্য নৃগোষ্ঠীর লোকদের সুরক্ষার জন্য সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।’

সরকারের উচিত রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যকলাপ পরিমিত রাখা মন্তব্য করে জাতিসংঘের বিশেষ দূত ইয়াংঘি লি গত শুক্রবার বলেন, ‘সহিংসতাপ্রবণ রাখাইনে নতুন করে সেনা মোতায়েন করা অত্যন্ত উদ্বেগের’।

তবে সেনা মোতায়েনের বিষয়ে দেশটির সামরিক মুখপাত্র বা মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সুচি কেউই কোনো মন্তব্য করেনি।

নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আশঙ্কায় বাংলাদেশ, বিশেষজ্ঞরা যা বললেন

আয়তনে বিশ্বের ৯১তম দেশ হয়েও জনসংখ্যায় বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম। দরিদ্র ও জনবহুল বাংলাদেশে ইতোমধ্যে সব মিলিয়ে ২০ লাখের মতো (বেসরকারি হিসাব) শরণার্থী বহন করছে যা পৃথিবীর শীর্ষ শরণার্থী বহনকারী দেশগুলোর একটি। এরই মধ্যে রাখাইন রাজ্যে নতুন করে সেনা মোতায়েনের খবরে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করছেন, সেখানে সেনা নির্যাতনের শিকার হয়ে রোহিঙ্গারা সীমানা অতিক্রম করে আবারও বাংলাদেশে প্রবেশের ঢল নামবে।

রাখাইনে সেনা মোতায়েনের খবরটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের মন্তব্য করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল আলম প্রিয়.কমকে বলেন, ‘নির্যাতন শুরু হলেই বাংলাদেশে ব্যাপক হারে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটবে। তাই জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিৎ এখনই দেশটিকে সতর্ক করা এবং অনাকাঙ্খিত যে কোনো ঘটনার জন্য দেশটির বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এতে সেনা অভিযান দীর্ঘায়িত হওয়া থেকে দেশটিকে বিরত রাখা সম্ভব হবে’।

সেনা নির্যাতনে বাধ্য হয়ে বাংলাদেশমুখী নৌকা বোঝাই রোহিঙ্গা শরনার্থী। ফাইল ছবি

সেনা নির্যাতনে বাধ্য হয়ে বাংলাদেশমুখী নৌকা বোঝাই রোহিঙ্গা শরণার্থী। ফাইল ছবি

সেনা অভিযানে বাংলাদেশমুখী রোহিঙ্গা জনস্রোত ঠেকাতে বাংলাদেশ এখনই সতর্কতামূলক উদ্যোগ নিতে পারে জানিয়ে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব হুমায়ুন কবির প্রিয়.কমকে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা আমাদের আশঙ্কার কথা দ্বি-পাক্ষিকভাবে মিয়ানমারকে জানাতে পারি। তাদেরকে এটা বলে সতর্ক করতে পারি যে, আমরা কোনো ভাবেই নতুন করে শরণার্থী গ্রহণে প্রস্তুত নই। অতএব তারা যেন এমন কোনো পদক্ষেপ না নেয় যেন রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে।’

বর্ষীয়ান এ সাবেক কূটনৈতিক আরও বলেন, ‘প্রয়োজনে আমরা একই সাথে আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র, আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠন যেমন আসিয়ান, ওআইসি বা জাতিসংঘের শরণার্থী বিয়ষক সংস্থাকে বিষয়টি অবহিত করতে পারি যেন তারা দেশটিকে চাপ দিতে পারে। কেননা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর এমন অভিযান বাংলাদেশের ওপর শরণার্থীর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করা ছাড়াও এ অঞ্চলকে সন্ত্রাসবাদী অপতৎপরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে’।       

বাংলাদেশ সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার

এদিকে সেনা নির্যাতনের মুখে আবারও ব্যাপক হারে রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে পারে এমন আশঙ্কায় সীমান্তে নজরদারি ও টহল জোরদার করেছে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি।

টেকনাফে বিজিবি-২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল এস এম আরিফুল ইসলাম বলেছেন, সীমান্তের ওপারে রাখাইনে সেনা মোতায়েন করার খবর আমরা অবহিত হয়েছি। তারা জানিয়েছে, বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অভিযানের জন্য সেনা সদস্য বাড়ানো হয়েছে। তারপরও সীমান্তের কাছাকাছি এভাবে সেনা সমাবেশ বাড়ানোর ঘটনায় আমরা উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রতিবাদ জানিয়েছি। তবে রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের কারণে আবার যেন রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ না ঘটে, সে ব্যাপারে বিজিবি সতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন পয়েন্টে বিজিবির টহল এবং নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সতর্ক প্রহরা।ছবিটি ২৪ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে তোলা।ছবি: মনিরুজ্জামান, এএফপি

রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সতর্ক প্রহরা। ছবিটি ২৪ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে তোলা। ছবি: মনিরুজ্জামান, এএফপি

এদিকে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের বিষয়টি অস্বীকার করে মেজর আরিফুল ইসলাম আরও বলেন, গত অক্টোবরের পর যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল সে তুলনায় এখনকার পরিস্থিতি ভালো। কখনও কখনও অনুপ্রবেশের চেষ্টা করা হলে তা পুশব্যাক করা হচ্ছে।

তবে টেকনাফের লেদা অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের সভাপতি দুদু মিয়া ১৫ আগস্ট সন্ধ্যায় জানান, গত তিন দিনে রাখাইন থেকে অন্তত ৫০ পরিবারের প্রায় দেড় শতাধিক রোহিঙ্গা টেকনাফ পৌঁছেছে। এরা শিবির ও আশপাশের গ্রামে আশ্রয় নিয়েছে।

এছাড়া উখিয়ার কুতুপালং অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের সভাপতি আবু সিদ্দিক জানান, ওই শিবিরে গত দুই দিনে আশ্রয় নিয়েছে নতুন আসা প্রায় ৫০ জন রোহিঙ্গা। 

দুর্গম সীমান্তে সহজ যাতায়াতের জন্য একটি সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে যা বাস্তবায়িত হলে বিজিবি টহল ও নজরদারি নিশ্ছিদ্র করতে পারবে জানিয়ে কক্সবাজার বিজিবি ৩৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মনজুরুল হাসান খান জানান, ‘রাখাইন রাজ্যে সেনা মোতায়েন করার খবর আমরা পেয়েছি। বিজিবি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সতর্ক রয়েছে। কোনোভাবে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।’

প্রিয় সংবাদ/আশরাফ/রিমন