গভীর রাতে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে অজ্ঞাত তরুণীকে জোর করে গাড়িতে তুলে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগে রনি হক নামের এক ব্যক্তি ও তার গাড়িচালককে গণপিটুনি দেওয়া হয়েছে।

‘মব জাস্টিস’, অসহিষ্ণু সমাজ আর বিচারহীনতার প্রতিচ্ছবি

ঢাকার রাস্তা একজন তরুণী বা নারীর জন্য কতটা অনিরাপদ, তা এই ‘মব জাস্টিস’ই প্রমাণ করে দিয়েছে।

কাকন রেজা
সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক
প্রকাশিত: ১১ জুন ২০১৮, ১৮:২১ আপডেট: ১৯ আগস্ট ২০১৮, ০৭:৩২
প্রকাশিত: ১১ জুন ২০১৮, ১৮:২১ আপডেট: ১৯ আগস্ট ২০১৮, ০৭:৩২


গভীর রাতে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে অজ্ঞাত তরুণীকে জোর করে গাড়িতে তুলে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগে রনি হক নামের এক ব্যক্তি ও তার গাড়িচালককে গণপিটুনি দেওয়া হয়েছে।

‘ওয়েস্টার্ন’ বইয়ের প্রচুর পাঠক রয়েছেন এ দেশে। সেবা প্রকাশনী ‘ওয়েস্টার্ন’ উপন্যাসের পাঠক সৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। আমার কৈশোর-যৌবনও কেটেছে সেবার ‘ওয়েস্টার্ন’ উপন্যাসের মোহময়তায়। গরুর খামার, আইনহীনতা, অপরাধী চক্র, জুয়ার আড্ডা, এসবই এমন উপন্যাসের পটভূমি।

খুব বেশি দিনের কথা নয়, একশ বছরও হয়নি, এমনটাই ছিল দক্ষিণ আমেরিকার রাজ্যগুলো। বলা হতো ‘বুনো পশ্চিম’। এসব রাজ্যে আইন বলতে একজন শেরিফ আর তার সহকারী। ন্যায়বিচার যেখানে অনেকটাই অসহায়। এতে মানুষকে নিজের হাতে আইন তুলে নিতে হতো। একটু সন্দেহ হলেই, কোনো কিছুর ধার না ধেরে অভিযুক্তকে ঝুলিয়ে দেওয়া হতো অথবা গুলি করে হত্যা করা হতো। মূলত ‘আউট ল’ আর ‘লিঞ্চিং মবে’র কারণেই সে সময় পশ্চিমের ওই অঞ্চলগুলো আখ্যায়িত হয়েছিল ‘বুনো পশ্চিম’ নামে।

‘লিঞ্চিং মবে’র এমন বিচারকে বলা হয় ‘মব জাস্টিস’। মানুষ যখন ক্রমাগত অন্যায়ে আর বিচারহীনতায় অতিষ্ট হয়ে উঠে তখনই ‘মব জাস্টিসে’র নামে ‘লিঞ্চিং মবে’র প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। বলা যায়, ‘মব জাস্টিস’ অসহিষ্ণু সমাজেরই প্রতিচ্ছবি। সম্প্রতি বেশ কিছু প্রতিচ্ছবি বা ঘটনায় আমাদের দেশেও তেমন প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে কি-না, এমন সন্দেহ-সংশয় মনে জাগছে।

মোহাম্মদপুরে রনি নামে এক যুবককে ধর্ষণের অপরাধে গণধোলাই দিয়ে দিগম্বর করেছেন কিছু মানুষ। এ ঘটনায় দুটি দিক রয়েছে। প্রথমটা হলো, দেশের আইনশৃংখলা বিষয়ে। যে দেশে রাস্তা থেকে একটি মেয়েকে গাড়িতে তুলে নিয়ে প্রকাশ্য রাজপথে গাড়ির ভেতরেই ধর্ষণ করা সম্ভব হয়, সে দেশের আইন-কানুন স্বভাবতই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। দেশটা ‘আউট ল’দের দেশ হয়ে গেল কি-না, এমন প্রশ্ন উঠাও অস্বাভাবিক নয়। হয়তো এ প্রশ্নের গতানুগতিক উত্তর হতে পারে, ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’। কিন্তু এমন ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ ঘটালেন কে- একজন রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রভাবশালী, পয়সাওয়ালা এবং উপর মহলে যোগাযোগ রয়েছে এমন একজন মানুষ। অর্থাৎ রাজনৈতিক পরিচয় থাকলে, অর্থ ও লবিং থাকলে এমন ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ ঘটানো সম্ভব।

রনি’র মতন এমনটা যারা করেন, তারা ভেবেই করেন, তাদের কিছু হবে না। হতোও না যদি নাছোরবান্দা সেই বাইকার রণে ভঙ্গ দিতেন। সেই বাইকার রণে ভঙ্গ দেননি, বরং ঘটনাটি প্রতিরোধের চেষ্টা করেছেন। তার সাহসে সঙ্গী হয়েছেন কিছু মানুষ, সাথে কিছু এসেছেন চান্সে ঘটনাটা দেখতে আর হাতের সুখ মেটাতে। তারা ইচ্ছেমতো রনি ও তার ড্রাইভারকে পিটিয়েছেন এবং শেষে দিগম্বর করে ছেড়েছেন।

অন্য দিকটি হলো, বিচারহীনতার আশঙ্কায় সৃষ্ট সামাজিক অসহিষ্ণুতাই ‘মব জাস্টিস’ তৈরির কারণ, এ কথাটা সত্যি। ঢাকার রাস্তা একজন তরুণী বা নারীর জন্য কতটা অনিরাপদ, তা এই ‘মব জাস্টিস’ই প্রমাণ করে দিয়েছে। অবশ্য সাথে এটাও সত্যি যে, এ মবের মাধ্যমে ‘লিঞ্চিং’-এ যারা অংশ নিয়েছেন, তারাও কিন্তু আইনহীনতারই অংশ, বাইরে নন। কেন নন বলছি- আইনের অংশ হলো বেআইনি কাজ প্রতিরোধ করা, এটা শুধু পুলিশের দায়িত্ব নয়, সাধারণ নাগরিকেরও দায়িত্ব। রবার্ট পিলের গড়া আধুনিক পুলিশিংয়ে নাগরিকও একটা পার্ট। তবে এক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে, প্রতিরোধ করা দায়িত্ব কিন্তু শাস্তি দেওয়া নয়। শাস্তি দিতে গেলেই ‘মব জাস্টিস’ ও ‘লিঞ্চিং মবে’র কথাগুলো এসে পড়বে।

‘মব’ অবশ্যই একটা অপরাধ। মোহাম্মদপুরের ঘটনায় যারা প্রতিরোধ করতে গিয়ে ‘মবে’ অংশ নিয়েছেন, সাথে যারা তাল মিলিয়ে বলেছেন, ‘পিটিয়ে ঠিক করেছে, শালাকে ঝুলিয়ে দেওয়া হলো না কেন’- তাদের এমন কথাগুলোও অপরাধের অংশ। বিনা বিচারে হত্যাকে যারা সমর্থন করেন, যারা মানুষের মৃত্যু কামনা করেন, তাদের সাথে এমন বক্তব্যের খুব একটা ফারাক নেই। ক্রসফায়ারে সমর্থনকারী অসহিষ্ণুরাও একই ভাষায় কথা বলেন।

যারা এমন ‘মবে’ সমর্থন দেন, তাদের যদি প্রশ্ন করা হয়, এই যে প্রতিদিন ধর্ষণের মতন ভয়ংকর অপরাধ ঘটছে, রাস্তাঘাটে মেয়েরা নিগৃহীত হচ্ছেন, তার প্রতিবাদের একদিন কি রাজপথে নেমে এসেছিলেন? বরং রাস্তায় যখন কেউ এর প্রতিবাদে চোঙ্গা ফুঁকেছেন, তাকে আপনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আখ্যা দিয়েছেন। নিরাপদ দূরত্ব রেখে পেড়িয়েছেন সেই প্রতিবাদের জায়গাটিকে। কই আপনিতো আপনার জায়গা থেকে সেই প্রতিবাদের সাথে সুর মেলাননি, বলেননি, ‘এনিয়ে যদি আপনাদের প্রতিবাদ হয়, তাহলে আমরা সাথে আছি’।

কদিন আগে দেখলাম ক্রসফায়ারের প্রতিবাদে একটি পরিবার ঢাকার রাজপথে গলায় পোস্টার ঝুলিয়ে প্রতিবাদ করছে। একটি পরিবারের কয়েকজন মাত্র মানুষ, কই কেউ তো আর তাদের সাথে গিয়ে দাঁড়াননি, সবাই ছিলেন নিজেকে বাঁচাতে ব্যস্ত। ছিলেন তাদের থেকে নিরাপদ দূরত্বে। এই মানসিকতার লোকজন যখন সুযোগ পেয়ে রাস্তায় ‘লিঞ্চিং’য়ে লিপ্ত হয়, তখন সত্যিই বিস্ময় জাগে।

ধর্ষণ, মাদকসহ সকল অপরাধ বন্ধে প্রয়োজন সম্মিলিত প্রতিরোধ। ভয়ে গা সিঁটিয়ে থাকবেন, আর সুযোগ পেলে হাতের সুখ মেটাবেন, এতে অপরাধ, অবিচার প্রতিরোধ হবে না। হওয়া সম্ভব নয়। ভীতু মানুষ দিয়ে ‘মব জাস্টিসে’র নামে ‘লিঞ্চিং মব’ হতে পারে, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত হতে পারে না।

পুনশ্চ: এক শ্রেণির মানুষকে দেখছি ‘মব জাস্টিসে’র বিরোধিতা করতে গিয়ে রনিকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করছেন। মেয়ে দুটিকে ‘শরীরজীবী’ আখ্যায়িত করে অপরাধকে ‘সহনীয় মাত্রা’ হিসেবে ব্যাখ্যা দিতে চাচ্ছেন। তাদের উদ্দেশ্যে বলি, একটি মুসলিম প্রধান দেশে মদ্যপ অবস্থায় রাস্তা থেকে মেয়ে তুলে সে যেই হোক, প্রকাশ্য রাস্তাতেই যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়া গুরুতর সামাজিক অপরাধ এবং সেটা যদি ছেলে-মেয়ে উভয়ের সম্মতিতেও হয়।

উন্নত রাষ্ট্রগুলোতেও এমনটা মেনে নেওয়া হয় না। সুতরাং, যারা রনি নামের দুর্বৃত্তের এহেন কর্মকে নানাভাবে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করছেন, তাদের বলি- আপনাদের কারণেই সমাজে অসহিষ্ণুতার প্রেক্ষাপট তৈরি হচ্ছে, মানুষ অসহিষ্ণু হয়ে ‘লিঞ্চিং মবে’ অংশ নিচ্ছে। আপনারাই রনিদের তৈরি করছেন, দানব বানাচ্ছেন। এবার ক্ষ্যান্ত দিন, জায়গা ছাড়ুন, না হলে ‘মব জাস্টিসে’র ‘লিঞ্চিং মব’ আপনাদেরও ঝুলিয়ে দেবে।

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কমের সম্পাদকীয় নীতির মিল না-ও থাকতে পারে।]