(প্রিয়.কম) মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ২৫ আগস্ট শুক্রবার দেশটির সেনাবাহিনী পরিচালিত নৃশংস 'ক্লিয়ারেন্স অপারেশন' অভিযানে ইতোমধ্যে ১১০ রোহিঙ্গার মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে গ্রামের পর গ্রাম। রোদ-বৃষ্টিতে ভিজে বা রাতের অন্ধকারে  দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে অনাহার-অর্ধাহারে আশ্রয়ের খোঁজে বাংলাদেশ সীমান্তে জড়ো হয়েছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী-শিশু-বৃদ্ধ। বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে দেশের অভ্যন্তেরে স্রোতের মতো ঢুকে পড়া রোহিঙ্গার ঢল বাংলাদেশকে বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দেবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।  

এর আগে গত ১১ আগস্ট শনিবার দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের উদ্বৃতি দিয়ে সংবাদমাধ্যম রয়টার্স ও আল জাজিরা জানায়, রাখাইনে ‘অপারেশন ক্লিয়ারেন্স’ চালানোর প্রস্তুতিতে ভারী অস্ত্রশস্ত্রসহ ব্যাপক সেনা মোতায়েন করে মিয়ানমার সরকার। নিরাপত্তার অজুহাতে ওই সময়ে কয়েকটি এলাকায় কারফিউও জারি করা হয়। ভুক্তভোগী রোহিঙ্গাদের অভিযোগ, দেশ থেকে তাদেরকে বিতাড়িত করার জন্য পরিকল্পিত অভিযান চালাচ্ছে সরকার। 

আনান কমিশনের রিপোর্ট ও মিয়ানমারের প্রতিক্রিয়া

জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে গঠিত রোহিঙ্গা ইস্যুতে ‘এ্যাডভাইজরি কমিশনের’ রিপোর্ট গত ২৪ আগস্ট বুধবার প্রকাশিত হয়েছে। এর আগে ২৩ আগস্ট বুধবার মিয়ানমার সফররত কফি আনান ৯ সদস্য বিশিষ্ট কমিশনের রিপোর্ট মিয়ানমার সরকারপ্রধানের কাছে দাখিল করেন। পরে ইয়াংগুনে এক সংবাদ সম্মেলনে কফি আনান বলেন, ‘নাগরিকত্ব না পাওয়ায় এবং নিদারুণ বৈষম্যের কারণে মুসলমান রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছে। তাদের ওপর বল প্রয়োগের পথ ছেড়ে মিয়ানমার সরকারকে যৌক্তিক সমাধানের পথে আসতে হবে এবং তাদেরকে নাগরিকত্ব দিতে হবে।’

প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের ‘বিশ্বের একক বৃহত্তম রাষ্ট্রহীন সম্প্রদায়’ হিসেবে অভিহিত করে তাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, মানবিক সহায়তা, লোকজনের অবাধ চলাচল সুযোগসহ মোট ৮৮টি সুপারিশ করা হয়। এ ছাড়া এতে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের জন্যও বিড়ম্বনা সৃষ্টি করেছে বলেও উল্লেখ করা হয়।

সেনা প্রবেশ করছে রোহিঙ্গা গ্রামে। তাদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলছে কয়েকজর স্থানীয় বৌদ্ধ। ছবি: সংগৃহীত

সেনা প্রবেশ করছে রোহিঙ্গা গ্রামে। তাদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলছে কয়েকজর স্থানীয় বৌদ্ধ। ছবি: সংগৃহীত 

আনান কমিশনের প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায়, এনএলডি নেত্রী ও স্টেট কাউন্সিলর এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী অং সান সুচির অফিস থেকে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘রাখাইনের সমস্যার সমাধান রাতারাতি সম্ভব নয়, এ জন্য সময়ের প্রয়োজন। দেশটিতে বসবাসরত সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে বিশ্বাস, ভ্রাতৃত্ব এবং মনস্তাত্ত্বিক উন্নতি সাধনের জন্য সরকার কাজ করে যাচ্ছে।’ তবে আনান কমিশনের সুপারিশে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেয়ার পরামর্শ দেওয়ার বিষয়ে রহস্যজনকভাবে নিরব থেকেছে সুচির দফতর।

গত বছর জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানকে প্রধান করে এই উপদেষ্টা কমিশন গঠন করে দিয়েছিলেন স্টেট কাউন্সিলর আউং সান সুচি নিজে। তখন তিনি বলেছিলেন, কফি আনান কমিশনের তদন্তে যা বের হয়ে আসবে, তা-ই মেনে নেয়া হবে। কিন্তু প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় তার বিজ্ঞপ্তি ও রোহিঙ্গা নাগরিকত্বের বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে যাওয়াকে অপ্রত্যাশিত এবং শান্তির পথে বাধা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

রাস্তা-খেতখামারে রোহিঙ্গাদের লাশের মিছিল

বৃহস্পতিবার আনান কমিশনের রিপোর্ট প্রদানের মাত্র চার ঘণ্টা পরই রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় নতুন করে অভিযান শুরু হয়। দেশটির সেনা-পুলিশ-বিজিপি ও উগ্র বৌদ্ধবাদীদের যৌথ অভিযানে নির্বিচারে রোহিঙ্গাদের লাশ পড়তে থাকে। মিয়ানমারের স্থানীয় পত্রিকা মিজিমার'র এক প্রতিবেদনে বলা হয়, শুক্রবার অভিযান শুরুর পর শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত আরাকানের বিভিন্ন এলাকা থেকে ১১০টি রোহিঙ্গার মৃতদেহ পাওয়া গেছে। সময়ের সাথে এ সংখ্যা ক্রমশ বেড়ে চলছে। হত্যার শিকার রোহিঙ্গাদের মধ্যে নারী, শিশুসহ সব বয়সী মানুষই রয়েছে। এছাড়া নিখোঁজ রয়েছে অসংখ্য। অভিযানে রাচিদং শহরের নিকটবর্তী শিলখালী গ্রামটি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

হেলিকপ্টার থেকে নিক্ষিপ্ত মর্টার শেল ও অগ্নিসংযোগ করে সম্পূর্ণ গ্রামটিকে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, পুড়ে গেছে চারটি মসজিদ ও মক্তব। বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়, এখন পর্যন্ত দুই শতাধিক রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে। এখনও রাখাইনের মাওন তাও, বুথিডাং ও রাথেডং গ্রামের খেত ও সড়কে মিলছে রোহিঙ্গাদের গুলিবিদ্ধ লাশ।

অভিযানের মুখে পালাচ্ছে রোহিঙ্গা নারী-শিশু। ছবিটি ২৭ আগস্ট রাখাইন থেকে তোলা। ছবি: ওয়াই মোও/এএফপি

অভিযানের মুখে পালাচ্ছে রোহিঙ্গা নারী-শিশু। ছবিটি ২৭ আগস্ট রাখাইন থেকে তোলা। ছবি: ওয়াই মোও/এএফপি  

এদিকে অভিযানের পক্ষে সাফাই দিয়ে শুক্রবার সন্ধ্যায় মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের প্রধান ও সরকারের কাউন্সেলর অং সান সুচির কার্যালয় থেকে জানানো হয়, 'আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা)' নামে দেড়শরও বেশি মুসলিম রোহিঙ্গা জঙ্গিদের একটি দল শুক্রবার ভোরে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যের ৩০টি পুলিশ ও সেনা চৌকিতে বন্দুক, চাপাতি ও ঘরে তৈরি গ্রেনেড নিয়ে হামলা চালালে রোহিঙ্গা জঙ্গিদের সঙ্গে পুলিশ লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে। এতে ৫৯ জন রোহিঙ্গা বিদ্রোহী ও ১২ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ ৭১ জন নিহত হয়। পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে তারা অভিযান শুরু করে। এ সময় বিদ্রোহী ও নিরাপত্তা বাহিনীর লড়াইয়ের মধ্যে ওই এলাকার ভীত-সন্ত্রস্ত বহু মানুষ আটকা পড়েছে। তবে নিরাপত্তা বাহিনী রোহিঙ্গা বাদে অন্য অধিবাসীদের সরিয়ে নিচ্ছে।

আনান কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশের পর রাখাইনের মুসলিম জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলে অভিহিত করা হয়। এ ঘটনাটিকে বিশেষজ্ঞরা রোহিঙ্গাবিরোধী নতুন ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে মনে করছেন।

চলছে থেমে থেমে সংঘর্ষ

শুক্রবার ভোরে শুরু হওয়া মিয়ানমারের যৌথ বাহিনীর ‘অপারেশন ক্লিয়ারেন্স’ প্রতিহত করতে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ‘আত্মরক্ষামূলক’ পাল্টা হামলা হামলা চালাচ্ছে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (এআরএসএ)। রোববারও রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় ফলে দুই পক্ষের মধ্যে থেমে থেমে সংঘর্ষ চলছিল বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো।

মংডু শহরের এক বাসিন্দা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, তিনি গোলাবর্ষণের মতো শব্দ শুনেছেন যেগুলো মায়ো থু জি লক্ষ্য করে ছোড়া হচ্ছিল। তিনি আরও বলেন, ‘নিরাপত্তা বাহিনী ও মুসলিম গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে লড়াই শুরু হওয়ার পর ওই এলাকার দিকে প্রচুর পুলিশ ও সেনাবাহিনীর গাড়ি গিয়েছে।’

শহরটির স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মংডু শহরের কয়েক কিলোমিটার পূর্বে ও দক্ষিণে প্রত্যন্ত পল্লী এলাকা মায়ো থু জি ও নায়াং চুতে দু’পক্ষের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র লড়াই হয়েছে। মংডুর বাসিন্দা রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের কোরি মোল্লা জানান, তারা ঘর থেকে বের হতে সাহস পাচ্ছেন না। কারণ শহরের পরিস্থিতি উত্তেজনায় স্তব্ধ হয়ে আছে। রাস্তাগুলো খালি। স্কুল, দোকান ও মার্কেটগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। লোকজন বাইরে বের হচ্ছে না।

 রোহিঙ্গা ভিশনের স্কিন শর্ট। ছবি: সংগৃহীত।

রোহিঙ্গা ভিশনের স্কিন শর্ট। ছবি: সংগৃহীত 

রোহিঙ্গা ভিশন জানিয়েছে, গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। রোববার মংডুর হ্যাইনডাফারায় রোহিঙ্গাদের একটি মার্কেটে অন্তত পাঁচ রোহিঙ্গাকে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে এবং মার্কেট জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। এতে গুরুতর আহত হয়েছে আরও সাতজন।

মিয়ানমার সীমান্ত থেকে রয়টার্সের প্রতিনিধি জানায়, রোববার তারা সীমান্তের মিয়ানমার অংশে গোলাগুলির শব্দ শুনেছেন। দুই দেশের মাঝে ‘নো ম্যান্স ল্যান্ড’র দিকে যাওয়ার চেষ্টার সময় রোহিঙ্গাদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হচ্ছে।

এদিকে মিয়ানমারের সরকারের বরাত দিয়ে রয়টার্স আরও জানায়, দেশটির যৌথ বাহিনী ওই সংঘাতপূর্ণ এলাকা থেকে সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক এবং রোহিঙ্গা নয় এমন শত শত গ্রামবাসীকে সরিয়ে এনে সেনাবাহিনীর ঘাঁটি ও পুলিশেরপ্রধান স্টেশনে রেখেছে। এছাড়া আটকে পড়া আরও কিছু লোককে হেলিকপ্টারে করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হবে।

সেনা অভিযানের নিন্দা-বন্ধের আহবান

রাখাইন রাজ্যে নতুন করে সেনা অভিযানের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘ। সংঘাত বন্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া না হলে, সেখানে আবারও বেসামরিক নাগরিকদের ক্ষয়ক্ষতির শিকার হবার আশঙ্কা করে জাতিসংঘ মুখপাত্র আলেসান্দ্রা ভেলুসি বলেন, রাখাইনে সহিংসতায় বহু মানুষ হতাহতের খবরে আমরা উদ্বিগ্ন। আমরা সব পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। চলমান পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের উচিত আলোচনার উদ্যোগ নেয়া। যে কোনো পরিস্থিতিতে বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা ও তাদের জীবন রক্ষার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত।

সহিংসতার ঘটনায় পাল্টা প্রতিশোধ না নেওয়ার আহবান জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হিদার নুয়ার্ট বলেন, নিরাপত্তারক্ষীরা সহিংসতা প্রতিরোধ ও অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাতে পদক্ষেপ নিয়েছে, তাই তাদের আইনের শাসন, মানবাধিকার সুরক্ষা ও মৌলিক স্বাধীনতার প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ যদি এ ঘটনার প্রতিশোধ নেয়, তাহলে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।

রাখাইন গ্রামে অভিযানে চালাচ্ছে দেশটির পুলিশ। ছবি: সংগৃহীত

রাখাইন গ্রামে অভিযানে চালাচ্ছে দেশটির পুলিশ। ছবি: সংগৃহীত

কয়েক দশক ধরে মিয়ানমার সরকারের নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর নতুন করে গণহত্যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কোনোভাবেই মেনে নেবে না হুঁশিয়ারি মালয়েশিয়ান বেসরকারি সংস্থা মাফিম একটি বিবৃতি দিয়েছে। সংস্থাটির সভাপতি মুহাম্মদ আজমি আব্দুল হামিদ স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে, অবিলম্বে সেনা অভিযান ও গণহত্যা বন্ধ করতে দেশটির প্রতি আহ্বান জানায় সংগঠনটি। এছাড়া সমস্যা সমাধানে আসিয়ানভুক্ত দেশ, জাতিসংঘ নিরাপত্তা কাউন্সিল এবং ওআইসির হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়। 

এছাড়া রাখাইন রাজ্যে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাতকে 'ভয়াবহ' উল্লেখ করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। তবে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রশংসা করে সুচির দেওয়া এক বিবৃতি দেশটির মনোভাব বুঝিয়ে দিয়েছে বলে মন্তব্য করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকেরা। ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ পরিচালনার মাধ্যমে হামলার জবাব দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে শুক্রবার রাতের ওই বিবৃতিতে অং সাং সু চি বলেন, ‘আমি পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের প্রশংসা করতে চাই, যারা অসীম সাহসের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করছেন।’

স্রোতের মতো বাংলাদেশে ঢুকছে রোহিঙ্গা শরণার্থী

এদিকে ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়ে দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি এবং বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) চোখ ফাঁকি দিয়ে স্রোতের মতো বাংলাদেশে আসতে শুরু করেছে নির্যাতিত রোহিঙ্গা সম্প্রদায়। অভিযান শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় চারশত রোহিঙ্গা আটকের পর মিয়ানমারে ‘পুশব্যাক’ (ফেরৎ) পাঠানো হয়েছে। তবে একশ্রেণির দালাল চক্র টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে আসতে সাহায্য করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

মূলত ঘুমধুম পূর্বপাড়া, জলপাইতলী, তেঁতুলগাছতলা, বাঁশবাগান, তুমব্রু পশ্চিমকুল, বাজারপাড়া, চাকমাপাড়া, বাজাবনিয়া, মধ্যমপাড়া, উত্তরপাড়া ও রেজু আমতলী, লেদা, নাইট্যংপাড়া, জালিয়াপাড়া, সাবরাং, নয়াপাড়া ও শাহপরীরদ্বীপের প্রত্যন্ত এলাকা পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। তবে বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, নতুন করে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বাংলাদেশে প্রবেশে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি। ফলে শুক্রবার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশের পর নাফ নদীর তীরে প্রায় চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বসে আছে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা।

নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বাংলাদেশ সীমান্তের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে রোহিঙ্গা নারী-শিশুরা। ছবিটি বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন বালুখালী থেকে ২৭ আগস্ট তোলা। ছবি: ওয়াই মোও/এএফপি

নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বাংলাদেশ সীমান্তের উদ্দেশে রওনা হয়েছে রোহিঙ্গা নারী-শিশুরা। ছবিটি বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন বালুখালী থেকে ২৭ আগস্ট তোলা। ছবি: ওয়াই মোও / এএফপি

মিয়ানমারে সেনা নির্যাতনের শিকার হয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের বিষয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবুল হোসেন বলেন, বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ কঠোর হস্তে দমন করা হবে। কোনো রোহিঙ্গা যাতে বাংলাদেশ প্রবেশ করতে না পারে তার জন্য বিজিবি প্রস্তুতি নিয়েছে।

এদিকে, টাকার বিনিময়ে দালাল শ্রেণির লোকজন রোহিঙ্গাদের সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে আসতে সাহায্য করছে। বেসরকারি হিসেবে ইতোমধ্যে প্রায় চার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। শুক্রবার ঘুমধুম সীমান্তের আমতলি পয়েন্ট দিয়ে ৪টি রোহিঙ্গা পরিবার বাংলাদেশে এসেছে। এদের মধ্যে রোহিঙ্গা আবু ছিদ্দিক বলেন, ‘প্রাণ বাঁচাতে আমরা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছি। এজন্য দুইজন দালালকে মাথাপিছু এক হাজার টাকা করে দিতে হয়েছে।’

নতুন বিপর্যয়ের শিকার হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ

রাখাইন রাজ্যে সেনা ‘কিলিং অপারেশনের’ মুখে স্রোতের মতো রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঘটনায় বাংলাদেশ নতুন বিপর্যয়ের মুখে পড়তে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল আলম প্রিয়.কম-কে বলেন, আনান কমিশন রিপোর্ট মিয়ানমার সরকারের প্রতিকূলে যাবে- শাসকগোষ্ঠী তা জানত বলে কৌশলে আগেই রাখাইনে সেনা সমাবেশ করেছে। সেখানে সৃষ্ট ঘটনার দায় রোহিঙ্গাদের ওপর চাপিয়ে আনান কমিশনের রিপোর্ট মেনে নেওয়ার প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ সময়ের জন্য পিছিয়ে দেওয়া যাবে। ফলে বাংলাদেশকে নতুন শরণার্থীর চাপ ও পুরনো শরণার্থীর বোঝা বইতে হবে। যা জনবহুল বাংলাদেশকে এক সময় বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশমুখী রোহিঙ্গা স্রোত কীভাবে বন্ধ করা যায় এমন প্রশ্নের জবাবে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব হুমায়ুন কবির প্রিয়.কম-কে বলেন, ‘রাখাইনে নির্যাতন হলে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা আসবেই। তবে দুটি উপায়ে এটা বন্ধ করা যেতে পারে। প্রথমত, মিয়ানমারকে সতর্ক করা প্রয়োজন যে তাদের নিরাপত্তা অভিযান এমনভাবে চালাক যাতে আমাদের দেশে শরণার্থীর চাপ তৈরি না হয়। যদিও বাংলাদেশ ইতোমধ্যে দেশটির রাষ্ট্রদূতকে ডেকে প্রতিবাদ জানিয়েছে’।  

দ্বিতীয়ত, ‘আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র ও সংগঠন যেমন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ওআইসি বা আসিয়ানের অন্য দেশগুলোর সহযোগিতা নিয়ে দেশটির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে। তবে সমস্যাটির সমাধান হতে পারে’। বাংলাদেশের অবস্থান থেকে সমস্যার সমাধানে কূটনৈতিক চেষ্টাই বাংলাদেশের জন্য শ্রেষ্ঠ উপায় বলেই মনে করেন সাবেক এ পররাষ্ট্র সচিব।

বাংলাদেশ সীমান্তে সতর্ অবস্থানে বিজিবি। ছবিটি ২৬ আগস্ট তোলা। ছবি: স্যাম জাহান/এএফপি

বাংলাদেশ সীমান্তে সতর্ক অবস্থানে বিজিবি। ছবিটি ২৬ আগস্ট তোলা। ছবি: স্যাম জাহান/এএফপি

প্রসঙ্গত, মিয়ানমারের শাসক সম্প্রদায় রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে অস্বীকার করে রাখাইন রাজ্য থেকে সমূলে বিতাড়িত করতে প্রকাশ্য তৎপরতা চলছে বছরের পর বছর। গত বিশ বছরে সেখানে অগণিত প্রাণহানির পাশাপাশি লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। সরকারি হিসেবে নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে ৫ লাখ রোহিঙ্গা। যদিও বেসরকারি হিসেবে এ সংখ্যা ১২ লাখের ওপরে। এর মধ্যে শুধু গত বছরের অক্টোবর মাসেই বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় ৮০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী।

প্রিয় সংবাদ/শান্ত