(প্রিয়.কম) দশকের পর দশক ধরে নির্যাতন ও নৃসংশতার শিকার রোহিঙ্গাদেরকে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠি হিসেবে আখ্যায়িত করেছে জাতিসংঘ। গত বছর বৈশ্বিক এ সংস্থাটি প্রথমবারের মতো মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের উপর জাতিগত নিশ্চিহ্নকরণের অভিযোগ তোলে। 

বহু দশক ধরে নানা ‘অভিযোগে’ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির উপর দমন পীড়ন চালিয়ে আসছে দেশটির কর্তৃপক্ষ যারা রোহিঙ্গাদেরকে বাংলাদেশি অভিবাসী হিসেবে দাবি করে থাকে। প্রতিবার রোহিঙ্গাদের উপর পুলিশ বা সেনা অভিযানের পর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে নানা রকম বিভৎস নির্যাতনের ছবি ছড়িয়ে পড়ে এবং এগুলোকে রোহিঙ্গাদের উপর নির্যতনের ছবি হিসেবে দাবি করা হয়। 

গত ৩১ আগষ্ট রাখাইনের বেশ কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলাকে কেন্দ্র করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দমনাভিযান শুরু করেছে। এরপর বাংলাদেশের সামাজিক মাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুকে নৃসংশ বিভিন্ন নির্যাতনের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করে দাবি করা হচ্ছে এসব রোহিঙ্গা নির্যাতনের ছবি। কিন্তু যথাযথ অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখা গেছে, এসব অনেক ছবিই অনেক আগের এবং এসবের সাথে রোহিঙ্গা সংশ্লিষ্টতা নেই। 

উপরের যে চারটি ছবি দেওয়া হয়েছে, গত কয়েকদিনে এসব ছবিগুলো অনেক বাংলাদেশি তাদের ফেসবুকে শেয়ার করছেন রোহিঙ্গা নির্যাতনের ছবি হিসেবে। কিন্তু দেখা গেছে এ চারটি ছবিই আগের। 

প্রথম ছবিটিকে অনেকগুলো ফুলে-ওঠা মৃতদেহ দেখা যায়।  অনেকেই বলছেন এগুলো ২০০৮ সালে সাইক্লোন নার্গিসে নিহতদের ছবি। অন্য অনেকে বলেন, এটা এক নৌকাডুবিতে নিহতদের ছবি। তবে ওই ঘটনাগুলো এমন কোন ছবি পাওয়া যায় নি, যা হুবহু এ রকম। তবে এ ছবিগুলো কিছু ওয়েবসাইটে বেরিয়েছিল, কিন্তু তা গত বছর । এর মানে, ছবিগুলো রাখাইন রাজ্যে গত কয়েকদিনের সহিংসতার ছবি নয়।

দ্বিতীয় ছবিটি গাছের সাথে বাঁধা একজন মৃত পুরুষের জন্য বিলাপরত এক নারীর। বিবিসি নিশ্চিত করেছে যে এটি ২০০৩ সালের জুন মাসে ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশে তোলা, আর তা তুলেছেন রয়টারের একজন ফটোগ্রাফার।

তৃতীয় ছবিটি মায়ের মৃতদেহ নিয়ে ক্রন্দনরত দুটি শিশুর। এটি তোলা হয়েছে রোয়ান্ডায় ১৯৯৪ সালের জুলাইয়ে। ওয়ার্ল্ড প্রেস এওয়ার্ড পুরস্কার প্রাপ্ত একটি সিরিজের অংশ এই ছবিটি তুলেছিলেন সিপা'র আলবার্ট ফাসেলি।

চতুর্থ ছবিটি একটি নালায় ডুবে থাকা কিছু লোকের। এ ছবিটির উৎস বের করা কঠিন ছিল। কিন্তু নেপালের সাম্প্রতিক বন্যার জন্য সাহায্যসংগ্রহকারী একটি ওয়েবসাইটে এই ছবিটি আছে। (সূত্র: বিবিসি বাংলা)

গত ২৯শে আগস্ট তুরস্কের ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী মেহমেত সিমসেক এ চারটি ছবি টুইট করে রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তবে ছবিগুলোর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর তিনি তার সেই পোস্টটি মুছে ফেলেন।

সামাজিক মাধ্যমে কথিত রোহিঙ্গা জঙ্গীদের রাইফেল নিয়ে ট্রেনিং নেবার আরেকটি ছবি ছড়ানো হচ্ছে। কিন্তু এ ছবিটিও ভুয়া। মূলত এই ছবিটি  ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কার মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি।

ছবি

জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন রাখাইন রাজ্যে মানবাধিকার লংঘন নিয়ে এক গবেষণা করে। এতে গবেষকরা তাদের নিজেদের তোলা ছবি বা ভিডিও ছাড়া আর কোনকিছু ব্যবহার করেন নি, যার কারণ ছিল ছবিগুলোর সত্যতা নির্ণয়ের সমস্যা।

তবে তাদের রিপোর্টে তার রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর ‘ভয়াবহ নিষ্ঠুরতার’ যে তথ্য উঠে আসে, তা ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বলে আখ্যায়িত হতে পারে’ বলে উল্লেখ করা হয়।

উল্লেখ্য, গত ৩১ আগষ্ট রোহিঙ্গাদের বিষয়ে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি অনানের একটি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের দিন রাখাইনের বেশ কয়েকটি পুলিশ পোস্টে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। এর পরপরই ‘সন্ত্রাসীদের’ রুখতে রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযান শুরু করে মিয়ানমার। এ অভিযানে এখন পর্যন্ত ৪০০ জনকে হত্যার কথা স্বীকার করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। যদিও সেখান থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বলছেন এ সংখ্যা অারও বহুগুণ বেশি। তাদের ভাষ্যমতে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী শিশুদের জবাই করছে, শিরোশ্ছেদ করছে, নারীদের ধর্ষণের পর হত্যা করছে, পুরুষদেরও বর্বরোচিত নির্যাতনের পর হত্যা করছে, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে। 

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, স্যাটেলাইট চিত্রের মাধ্যমে তারা নিশ্চিত হতে পেরেছে যে রাখাইনে বহু গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। 

এদিকে ১ সেপ্টেম্বর মিয়ানমার সরকার জানিয়েছে রাখাইন রাজ্যে ২ হাজার ৬০০ বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে দেশটির সরকার এজন্য আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (এআরএসএ) কে দায়ী করেছে, যে গোষ্ঠিটি ৩১ আগষ্ট নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার দায় স্বীকার করেছিল। যদিও পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বলছে এসব সেনাবাহিনীরই কাজ। 

প্রিয় সংবাদ/মিজান