(প্রিয়.কম) মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনীর নির্যাতনের ঘটনায় নড়ে চড়ে বসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটিতে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

শুনানিতে রাখাইনের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর সেনাবাহিনীর দমন অভিযান থামাতে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ অথবা সাহায্য বন্ধের মতো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের মত দেন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন আইনপ্রণেতা ও কর্মকর্তা। আন্তর্জাতিক তদন্তকারীদের রাখাইনে যাওয়ার সুযোগ দিতে সু চির সরকারের প্রতি আহ্বানও জানিয়েছেন তারা।

এ ছাড়াও গত ১১ আগস্টে রাখাইন রাজ্যে সেনা মোতায়েনের পর চলমান রোহিঙ্গা সংকটে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বনের কথা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের ডেপুটি অ্যাসিসট্যান্ট সেক্রেটারি প্যাট্রিক মার্ফি।

স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটিতে রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে শুনানিতে এ কথা জানান তিনি। প্যাট্রিক মার্ফি বলেন, ‘মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে না যায়।’

পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান রিপাবলিকান পার্টির কংগ্রেস সদস্য এড রয়েস বলেন, ‘সর্বশেষ বিবৃতিতেও সু চি ‘জাতিগত নির্মূল অভিযানের’ বিষয়টি অস্বীকার করেছেন, যা ‘সঠিক নয়’। যারা ওই সহিংসতার জন্য দায়ী, তাদের অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।’

মিয়ানমারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার পেছনে কারা আছে- তাদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে বলে জানান মার্ফি। আর রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য স্কট পেরি বলেন, ‘আমরা এখানে স্যুট পরে বসে আছি, আর ওখানে মানুষ খুন হচ্ছে, তাদের নিজের দেশ থেকে উৎখাত করা হচ্ছে। কাউকে না কাউকে এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে।’

জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে রাখাইনে যেতে বাধা দিচ্ছে মিয়ানমার সরকার। এমনকি সেখানে আইসিআরসি ছাড়া অন্য কোনো সংস্থাকে ত্রাণ দিতেও বাধা দেওয়া হচ্ছে। ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষের জন্য খাবার, পানি, আশ্রয় আর ন্যূনতম চাহিদাগুলো মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলোকে।

‘জাতিসংঘের তদন্তকারীদের রাখাইনে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার আগ পর্যন্ত মিয়ানমার সরকারকে মার্কিন সাহায্য বন্ধ রাখলে ফল পাওয়া যাবে কি না’ তা ভেবে দেখার আহ্বান জানান পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির এশিয়া বিষয়ক উপ কমিটির প্রধান কংগ্রেস সদস্য টেড ইয়োহো।

প্রসঙ্গত, গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা নিধন অভিযান শুরুর পর প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ইতোমধ্যে ৫ লাখ ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।

তবে বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা ৬ লাখেরও বেশি। এদিকে পালিয়ে আসার হার আগের চেয়ে কিছুটা কমলেও, তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে বলার সময় এখনও হয়নি বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির মুখপাত্র। 

সারা বিশ্বে ইউএনএইচসিআর কতৃক নিবন্ধিত ১৭.২ মিলিয়ন শরণার্থীর ৩০% এখন বাংলাদেশে। এরই মধ্যে চলমান রোহিঙ্গা ঢল অব্যাহত থাকলে শরণার্থীর এ সংখ্যা ১০ লাখে পৌঁছাতে পারে বলেও সতর্ক করেছে জাতিসংঘ।

অভিযানের নামে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী খুন, ধর্ষণ, ঘরবাড়ি পুরিয়ে দেওয়া, কুপিয়ে হত্যাসহ বর্বরতার চূড়ান্ত সীমাও অতিক্রম করেছে বলে অভিযোগ নিউইয়র্ক ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইচ ওয়াচের।

স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত ছবি বিশ্লেষণের মাধ্যমে সংস্থাটি বলেছে, ইতোমধ্যে প্রায় ২১৪টি রোহিঙ্গা অধুষ্যিত গ্রাম পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী মানবতাবিরোধী অপরাধ করছে উল্লেখ করে দেশটির ওপর কিছু ক্ষেত্রে ও সেনাবাহিনীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপেরও আহ্বান জানায় সংস্থাটি।

গত ১৩ সেপ্টেম্বর বুধবার মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর সরকারি বাহিনীর চলমান নির্মম নির্যাতনের প্রেক্ষিতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক আহ্বান করা হয়। রোহিঙ্গা ইস্যুতে এ বৈঠকের অনুরোধ জানিয়েছিল নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য যুক্তরাজ্য এবং অস্থায়ী সদস্য সুইডেন।

তবে ১২ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইউ কিউ জেইয়া দেশটির সংবাদমাধ্যমকে জানান, এই বৈঠকে অংশ নেবেন না মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের নেত্রী অং সান সু চি

আর বুধবার বৈঠক শেষে আরাকানে চলমান রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানান জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দেশগুলো।

এ ছাড়া রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলোচনার জন্য ফের বৈঠক ডাকতে অনুরোধ করেন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের তিন স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সসহ সাত দেশ। নিরাপত্তা পরিষদের তিন স্থায়ী সদস্য ছাড়া অন্য দেশগুলো হচ্ছে- মিসর, কাজাখস্তান, সেনেগাল ও সুইডেন।

ভিডিও

 

প্রিয় সংবাদ/রাকিব