(প্রিয়.কম) রেজাউল কবিরের শৈশব-কৈশোর থেকে বেড়ে উঠা সবকিছুই ঢাকাতে। ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞানের বই নিয়ে পড়ে থাকা, মজার মজার সব খুঁটিনাটি যন্ত্র বানানো-আবিষ্কার আর নানা রকম এডভেঞ্চার করাই ছিল তার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু। বিজ্ঞান জাদুঘরের লাইব্রেরিতে আর ছাদের অবজারভেটরির টেলিস্কোপে চোখ রেখেই কেটেছে রেজাউল কবিরের পুরো ছোট বেলাটা। নিউটন, আইনেস্টাইন, আলফ্রেড নোবেল এবং নিকোলা টেসলাসহ বড় বড় বিজ্ঞানীদের আবিষ্কারের গল্প পড়ে বেড়ে উঠা রেজাউল হাই স্কুলে উঠে পরিচিত হন স্টিফেন হকিংসের লেখার সাথে। কিন্তু সবার দ্বারা অনুপ্রাণিত হলেও ইবনে হাইসাম ছিল তার সবসময়ের প্রিয় বিজ্ঞানী। নানা রকম ঝড়-ঝাপটা সামলে কাজ করে যাচ্ছেন রেজাউল কবির এবং প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘জলপাই’ (JolPi) ইলেক্ট্রনিক্স-এর মতো দেশের অন্যতম সৃজনশীল একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। তিনি জলপাই ইলেক্ট্রনিক্সের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান স্থপতি। ইসলামের সাথে বিজ্ঞান ও শিল্পায়নের বিভিন্ন সম্পর্ক নিয়ে তার সাথে কথা বলেন মাওলানা মিরাজ রহমান।

আপনার প্রতিষ্ঠানের নাম জলপাই রাখলেন কেন? এর নেপথ্যে বিশেষ কোনো কারণ রয়েছে কী?

এই নামটা রাখার অনেক কারণ ছিল। আমাদের বিজনেসটা হচ্ছে টেকনোলজি নির্ভর। এছাড়া আমাদের একটা ইসলামিক পরিচয়ও আছে। ব্যবসার ক্ষেত্রে ব্র্যান্ডিংয়ের একটা বড় ভূমিকা থাকে আর সে জন্য আমরা এমন একটা নাম খুঁজছিলাম যেটা ছোট হবে আবার মানুষের মাথায়ও তাড়াতাড়ি ঢুকে যাবে এবং নামটা যেন একবার শুনলেই মনে রাখতে পারে। নাম খুঁজতে গিয়ে অনেক নামই পেলাম। একটা নাম পেলাম পাই। এটা হচ্ছে ম্যাথের পাই। এটার সাথে মোটামুটি সবাই পরিচিত। কিন্তু এই পাই নামে অনেকেই তাদের প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করেছেন। আবার অনেকে খাবারের নামে নাম রেখেছেন, যেমন- আপেল। যাহোক আমরা এ শব্দ নিয়ে খেলা করতে করতে কোরআনের শব্দ যাইতুন -এর বাংলা অর্থ পেলাম জলপাই। আবার সেটা একটা ফলের নামও হয়। আবার নামটাও এমন হয়েছে যে, যে কেউ একবার শুনলে আর ভুলে যাবে না। এটা ব্র্যান্ডিংয়ের জন্যও খুব ভালো। এভাবে জলপাই নাম সিলেক্ট করা হয়। 

ইলেক্ট্রনিক্স পণ্যের প্রস্তুতকরণ থেকে শুরু করে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত গোটা প্রক্রিয়াটি এমন যে সাধারণ মানুষ এসব কিছুই বুঝে না বা জানতে অক্ষম। পণ্যের মান, প্রস্তুতকরণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ইত্যাদির কোনো একটি বিষয় বা প্রক্রিয়ার ধোঁকাবাজি, প্রতারণা বা ঠকবাজি করার সুযোগ রয়েছে কি না? এসব খারাপ পন্থায় পণ্য প্রস্তুতকরণ ও বাজারজাতকরণ এবং উপার্জন বৈধ হবে কী না?

প্রথম কথা হচ্ছে একটা জিনিস বানানোর পর সেটার দাম নির্ধারণ করার স্বাধীনতা আল্লাহ মানুষকে দিয়েছেন। তবে কোনো জিনিসের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বৃদ্ধি করা আর একটা জিনিস নিজে তৈরি করে সেটার দাম চাওয়া কিন্তু এক জিনিস নয়। দশ টাকার চাল আর দশ টাকার ডাল দিয়ে খিচুড়ি রান্না করলে সেটার দাম ২২-২৫ টাকা হওয়ার কথা, কিন্তু আমি যদি সেটা ভালো করে রান্না করতে পারি তাহলে কিন্তু সেটা ২০০ টাকাও বিক্রি করতে পারবো। একজন ক্রেতার মনে চাইলে আমার এখান থেকে কিনবে, না হয় সে অন্য কোনো জায়গা থেকে কিনবে। এখানে অবৈধ হওয়ার জায়গাটা হচ্ছে, আপনি আমার কাছে একটা ক্যালকুলেটর বিক্রি করলেন আর বললেন এখানে ২ আর ২ যোগ করলে ৪ হবে কিন্তু কেনার পরে দেখলো ২ আর ২ যোগ করলে ৫ হচ্ছে। তাহলে আপনার টাকাটা বৈধ হবে না। আপনি যা বলছেন আপনার জিনিসটা যদি তেমনই হয়, তাহলে দামের বিষয়ে আপনি স্বাধীন। আল্লাহপাক আপনাকে এ স্বাধীনতা দিয়েছেন।

কী কী কারণে ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য সামগ্রীর ব্যবসা হারাম বলে বিবেচিত হতে পারে?

ইলেক্ট্রনিক্স পণ্যের ক্ষেত্রে যদি কোনো পণ্য এমন থাকে যে, সেটা শুধু হারাম কাজেই ব্যবহার হয় তাহলে সেটা হারাম হবে। কিন্তু এমন পণ্য খুবই কম। দেখুন! টিভিকে কিন্তু আপনি যন্ত্র হিসেবে হারাম বলতে পারেন না। কেননা সেটাতে ভালো-খারাপ দুইটাই আছে। এখন ব্যবহারকারীর ব্যবহারের ওপর সেটা হারাম-হালালের বিষয়টা নির্ভর করবে। তবে হ্যাঁ, এমন কোনো পণ্য যেটার মাঝে প্রতারণা আছে আর জেনে বুঝে যদি কেউ এই ব্যবসার সাথে যুক্ত থাকে তাহলে সে অবশ্যই হারাম কাজের সাথে যুক্ত। যেমন ধরুন, বাইর থেকে পাওয়ার ব্যাংক আসে- একটা পাওয়ার ব্যাংকে চারটা ব্যাটারি থাকার কথা এবং সেখানে চারটা ব্যাটারিই আছে কিন্তু একটা ভালো তিনটাই নষ্ট। এখন কেউ যদি জেনে বুঝে এই খারাপ পণ্যকে ভালো বলে বিক্রি করে তাহলে তো সেটা অবশ্যই হারাম হবে।

প্রতিযোগিতায় বিজয়ী স্টার্টআপ হিসেবে ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কিতে যাচ্ছে জলপাই। ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশে ইলেক্ট্রনিক্স পণ্যের ব্যবসায় সৎভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য করার ক্ষেত্রে কী কী বিষয় বাধা হিসেবে রয়েছে বলে আপনি মনে করেন এবং সেগুলোর সমাধান করণে করণীয় কী?

এই ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হচ্ছে আমার বাংলাদেশি ভাইয়েরা। আমি যখন একটি পণ্য বাজারে আনছি তখন তারা আমার পণ্যের বিপরীতে চাইনিজ পণ্য এনে বিক্রি করছেন। আমার কথা হচ্ছে, যারা চাইনিজ পণ্য বিক্রি করছে, তারা ব্যবসা কেন করছে? ব্যবসা করছে লাভ করার জন্য। তো লাভ করাই যখন প্রকৃত উদ্দেশ্য দেশীয় পণ্য বিক্রি করে লাভ করতে সমস্যা কোথায়? আমি ভারতে দেখেছি ওদের মাঝে দেশীয় পণ্য ক্রয় ও বিক্রয়ের আলাদা একটা মানসিকতা রয়েছে। এটা আমাদের মাঝে নেই। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানুষ বাইরের প্রডাক্ট থেকে দেশীয় প্রডাক্টকেই বেশি মূল্যায়ন করে। যেমন ধরুন, খাওয়ার সেলাইন এটা কিন্তু কেউই বাইরেরটা খায় না। বলতে গেলে সবাই দেশীয়টাই খায়। আমাদের দেশের মানুষের মাঝে একটা খারাপ ধারণা আছে যে, সবাই খারাপ প্রোডাক্ট তৈরি করে। মানুষের এ ধারণাটা ঠিক নয়। আমাদের দেশেও ভালো ভালো অনেক কোম্পানি আছে যারা অনেক ভালোভালো প্রোডাক্ট তৈরি করেন।

ইসলাম ও বিজ্ঞানের সম্পর্ক বিষয়ে যদি কিছু বলতেন...

ইসলামের সাথে বিজ্ঞান ও শিল্পায়নের সম্পর্ক খুবই গভীর। আপনি যদি ইসলামের আবিষ্কারকে ভুলে যান, তাহলে আজই আপনার চোখের সামনে থেকে এ্যাপেল নাই হয়ে যাবে। কারণ আধুনিক সব বিজ্ঞানের মূল গোড়ায় মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদান রয়েছে। আপনি যদি মুসলিমদের আবিষ্কারকে বাদ দেন, তাহলে আপনি আধুনিক এ পৃথিবীকে চিন্তাই করতে পারবেন না। অবশ্য মানুষ এখন আর আমাদের বিজ্ঞানীদের নাম ও অবদান খুঁজে পায় না। এর কারণ হচ্ছে আমাদের বিজ্ঞানীরা যা আবিষ্কার করেছেন, আমাদের শিল্প সেগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে পারেনি। আমাদের আবিষ্কারকৃত বিষয়গুলো শিল্পায়ন করে মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারিনি। অনেকেই বলেন যে, এই শিল্পায়ন না হওয়ার পিছনে মুসলিম সমাজের গোঁরামি ছিল। আমি আসলে বিষয়টিকে সেভাবে বলতে চাই না। আসলে কোনো একটা কালচার প্রচার হওয়ার জন্য সেখানে শক্তিরও প্রয়োজন থাকে। আসলে একটা কালচার ও একটা শিল্প বাস্তবায়ন হওয়ার পিছনে শক্তিরও দখল রয়েছে। সেটা মুসলিম সমাজের ছিল না। মুসলিমদের অনেক আবিষ্কার রয়েছে।

ইবনে হাইসামকে আমেরিকাও স্বীকৃতি দেয়। বর্তমান বিজ্ঞানীরা যেসব সূত্র বলে থাকে এসব সূত্র কয়েকশ বছর আগে ইবনে হাইসাম বলে গেছেন। কিন্তু তাকে আমরা মুসলিমরাই স্বীকৃতি দেই না। দেখুন আমাদের সামনে কোনো খারাপ কিছু হলে আমরা বলি স্যাট, এটা ব্রিটিশদের কালচার। আমরা তাদের কাছে মাথা নত করেছি। আমরা কখনো বলি না, ইন্না লিল্লাহ। এটার সুন্দর অর্থ আছে। আমরা আল্লাহর সামনে মাথা নত করতে শিখিনি। আমরা আজও ব্রিটিশ নাগরিক হতে পারলে গর্ব করি। অথচ তারা আমাদের সাথে কি আচরণ করেছে সেটা আমরা সবাই জেনেও না জানর ভান করে আছি। এটা হলো আমাদের মানসিক পরাজয়। আর এই পরাজয়ের কারণেই আমরা আমাদের বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার নিয়ে কাজ না করে অন্যদের নিয়ে কাজ করেছি। এই দোষ হচ্ছে আমাদের। এখানে ইসলামের কোনো দোষ নেই। আর একটা বিষয় হচ্ছে, একটা সময় মুসলিমরা বিজয়ী শক্তি ছিল, কিন্তু এখন তারা পরাজিত শক্তি। সুতরাং সবাই এখন বিজয়ী শক্তিরই অনুসরণ করতে চায়। মুসলিমরা যখন আবার বিজয়ী শক্তি হতে পারবে তখন আবার সবাই মুসলিমদের জ্ঞান-বিজ্ঞান নিয়ে চর্চা করবে।

বিজ্ঞান ও শিল্পের বর্তমান উন্নয়নকে ইসলাম কীভাবে দেখে?

এটাকে ইসলাম অবশ্যই ভালোভাবে দেখে। মক্কা বিজয় মুসলিমদের জন্য একটা বড় ইভেন্ট ছিল। সেখানে সব সাহাবিই আসতে চেষ্টা করেছে। সেখানে কিন্তু দুইজন সাহাবি ছিলেন না। এর কারণ বলতে পারেন? তখন সেই দুইজন সাহাবি রাসূলের (সা.) নির্দেশনায় সিরিয়াতে গিয়েছিলেন টেকনোলজি শেখার জন্য। মক্কা বিজয়ের কয়েকদিন পরেই তায়েফের যুদ্ধ হয়। তখন সেই সাহাবিরা নতুন শিখে আসা টেকনোলজি ব্যবহার করেছিলেন এবং বিজয় মুসলিমদের পদচুম্বন করেছিলো। যে শিল্পায়ন মানুষের উন্নয়ন করে, মানুষের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে এবং যে শিল্পায়ন সমাজের উন্নয়ন করে অবশ্যই ইসলাম তাকে সমর্থন করে। সবশেষে বলি, সব ভালো কাজই ইসলাম সমর্থন করে। 

প্রিয় বিনোদন/গোরা